ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সিনহা হত্যা এবং দুই বাহিনী প্রধানের বার্তা

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৭:০০ পিএম
সিনহা হত্যা এবং দুই বাহিনী প্রধানের বার্তা

সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনাটি সারা দেশেই ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এই তরুণের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত এবং নির্বাক বলা চলে। যেহেতু বিষয়টি বিচারাধীন, সে জন্যে এ সম্পর্কে আমি এই মুহুর্তে কোনো মন্তব্য করবো না। তবে সিনহার মৃত্যুর পরে আমাদের দুই বাহিণীর প্রধানগণ যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে আমি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ গতকাল কক্সবাজারে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন এবং তারা সংবাদ সম্মেলনে কিছু বার্তা দিয়েছেন, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একই সঙ্গে তাদের প্রতি আমার সম্মান বহুগুণে বেড়ে গেছে।  

ছোট বড় যেকোনো ঘটনাতেই আমরা দেখি যে শীর্ষপর্যায়ে যারা আসীন থাকেন, তারা দায়সারা গোছের কোনো একটা বক্তব্য দেন। তদন্ত হচ্ছে, কমিটি হয়েছে এসব বলে তারা তাদের দায়িত্ব শেষ করার চেষ্টা করেন। আমাদের সেনা প্রধান এবং পুলিশ প্রধান ইতিমধ্যেই দেখিয়েছেন যে তারা সেই দলের নন। আর গতকাল নতুন করে তারা তাদের দায়িত্ববোধের প্রমাণ দিলেন।

ড. বেনজীর আহমেদকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি। সর্বপ্রথম আমি যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিউইয়র্কে গেলাম, তখন তার সাথে আমার দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিভাগে চিফ অব মিশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট সার্ভিসেস হিসেবে তিনি তখন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। সে সময় প্রবাসী বাঙালিরা তাকে নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বসিত ছিল। সবাই তার প্রশংসা করছিল এবং বলছিল যে, একজন বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তা এত উঁচুপদে আছেন এবং তিনি তার কাজের মাধ্যমে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। সোজা কথায়, তাকে নিয়ে নিউইয়র্কের বাঙালিরা ভীষণ গর্বিত ছিল। আমি নিউ ইয়র্কে আছি শুনে, ড. বেনজীর নিজেই আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তার সাথে আগে আমার খুব বেশি পরিচয় ছিল না। কিন্তু সেদিন তার ব্যবহার, কথাবার্তা, দেশপ্রেম দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট হওয়াতে এবং আমার এলাকার হওয়াতে আমি তাকে ‘তুমি’ করেই সম্বোধন করেছিলাম এবং বলেছিলাম যে, ‘তুমি তো এখানে অনেক বেতনে চাকরিতে আছো, কিন্তু আমার মনে হয় তোমার মতো একজন সৎ, দক্ষ এবং চৌকস পুলিশ অফিসার দেশে খুব দরকার।’

আমার কথা শুনে ড. বেনজীর এক সেকেন্ডও চিন্তা না করে বললেন, ‘আমি যত তাড়াতাড়ি পারি দেশে চলে আসবো’। কোন পোস্ট পাবে না পাবে সেটা না ভেবেই তার মাঝে দেশে আসতে চাওয়ার যে আগ্রহটা আমি দেখেছিলাম, সেটা তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।

দেশে আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই ড. বেনজীরকে চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব প্রদান করেছেন। আর বেনজীর আহমেদও সেটা অসাধারণ দক্ষতার সাথে পালন করেছেন। পুলিশ অফিসারদের কাছে তিনি এখন রোল মডেল বলা চলে।

আমাদের সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা পরিচয় নেই। তবে আমার পরিচিত যারা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছেন, তারা একটি কথা জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্পর্কে বলেন, তা হলো দেশের সংবিধানকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ তিনি করেন না এবং করবেনও না।

আমরা দেখলাম, গতকাল সেনাপ্রধান এবং পুলিশপ্রধান দুজনেই সিনহা হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন এবং সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিলেন। তারা খুব স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে, সেনা বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনী দুটোই জনগণ এবং দেশের সেবায় নিয়োজিত। এই বাহিনী দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কেউ বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা করলে সেটাও মেনে নেওয়া হবে না। তাদের বার্তাটা ছিল পরিষ্কার যে, ঘোলা পানিতে কাউকে মাছ শিকার করতে দেওয়া হবে না।

দুই বাহিনীর প্রধানের বক্তব্যে আমি অভিভূত। আমি বিশ্বাস করি যে, এই ধরনের মানসিকতা এবং দায়িত্ববোধ আমাদের দেশে উচ্চ পদে যারা আসীন তাদের মধ্যে থাকলে দেশ এবং জাতি নিরাপদ বোধ করে এবং তাদের নিয়ে গর্ব অনুভব করে। এই মানুষগুলোর জন্য জনগণ আশান্বিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ এবং জনগণকে নিরাপদে রাখতে, তাদের মুখে হাসি ফোটাতে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। আমাদের সকল পর্যায়ে যদি এমন দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক এবং দক্ষ কর্মকর্তারা থাকেন তাহলে নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর কাজটা কিছুটা হলেও সহজ হয়ে যাবে। 

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান।