ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আমলারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে চিকিৎসকদের দূরত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছেন

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৪:৫৮ পিএম
আমলারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে চিকিৎসকদের দূরত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছেন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন তিনি যে কাজগুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা। এ জন্য তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন এবং করছেন। তিনি যে এ কাজে সফল হয়েছেন সেটা কারও অজানা নয়। সমগ্র বিশ্ব এর স্বীকৃতিও দিয়েছে। কিন্তু ২০০১ এ বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশরত্ন শেখ হাসিনার নীতি থেকে উল্টো পথে চলতে শুরু করে। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে তারা আরও পিছিয়ে দেয়। তখনকার অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আলাপ করে একটি ফিলোসফি গ্রহণ করেন। সেটি হচ্ছে, দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে আছে, এটা আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ করা যাবে না। বরং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত প্রমাণ করতে হবে। তা না হলে আমরা লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি হিসেবে যেসব সুযোগ সুবিধা পাই সেগুলো থেকে বঞ্চিত হবো। অর্থাৎ বিএনপির ফিলোসফি ছিল তারা ভিক্ষা পেলেই হলো, দেশের মর্যাদা বাড়াবার কোনো প্রয়োজন নাই। দুর্ভাগ্যবশত করোনার এই সংকটে আমাদের কিছু আমলা ঠিক বিএনপি আমলের সেই ধ্যানধারণা নিয়ে চলছেন এবং দেশকে ফকির প্রমাণিত করার চেষ্টা করছেন।  

আমরা লক্ষ্য করছি যে, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজগুলো না করে অতিকথনে বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। একটি উদাহরণ দেই, আমি বাংলাদেশে মেডিকেল রিসার্স কাউন্সিলের (বিএমআরসি)র সভাপতি। আমরা বিএমআরসির পক্ষ থেকে চীনের একটি কোম্পানিকে তাদের ভ্যাকসিনের থার্ড ফেজের পরীক্ষা বাংলাদেশে চালানোর ব্যাপারে ইথিক্যাল ক্লিয়ারেন্স দেই। ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার আগে আমরা বিএমআরসির পক্ষ থেকে সমস্ত বিষয় পুংখানুপুংখভাবে পড়ে দেখেছি। এমনকি স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিদের সাথে কথাও বলেছি। পররাষ্ট্র দপ্তরেও আমি কথা বলেছি। বিএমআরসি চলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আইন করে দিয়েছিলেন সেই আইন অনুযায়ী। আমরা সেই আইন এবং রীতিনিতি মেনেই ট্রায়ালের অনুমতি দিলাম। কিন্তু এরপর দেখলাম স্বাস্থ্যখাতের কেউ কেউ এটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলছেন। এমনকি গণমাধ্যমে এসেও কয়েকজন ট্রায়ালের নিয়ম কানুন নিয়ে তাদের পান্ডিত্য জাহির করছেন।

আরেকটি বিষয় হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকল সময় চিকিৎসকদের খুব সম্মান করেন। আমরা অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাপের চিকিৎসক হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সহ সকলকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনিই প্রথম চিকিৎসকদের সেকেন্ড ক্লাস থেকে ফার্স্ট ক্লাসে উন্নীত করেছিলেন। এরপর তার কন্যা নার্সদের সেকেন্ড ক্লাসে উন্নীত করলেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, জাতির পিতা এবং তার কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকারের কিছু কিছু আমলা উল্টো পথ  ধরেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে হচ্ছে জাতির পিতার চেয়ে এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছেন।

আমরা লক্ষ্য করছি আমলারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে চিকিৎসকদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করছেন। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের পছন্দ করেন এটা হয়তো তাদের সহ্য হচ্ছে না। টাকা যাতে না নষ্ট হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু তারা দেখা যাচ্ছে ভিক্ষার ঝুলি মেলে ধরেছেন। চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা করাটা টাকার অপচয় বলে উল্লেখ করছেন তারা। এর বদলে চিকিৎসকদের টাকা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকরা তো করোনার ডিউটির জন্য টাকা চায়নি। অনেকের ছোট বাচ্চা আছে, তারা যদি এই ডিউটি করে বাসায় যায়, তাহলে বাচ্চাদেরও করোনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাদের পরিবারও ঝুঁকিতে পড়ে যায়। কিন্তু যখন ভালো ভালো হোটেলের নাম শোনা গেল, তখন আমলারা পাগল হয়ে গেল। এই প্রয়োজন যদি কোনো আমলাদের হতো, এমনকি সবচেয়ে জুনিয়র আমলারও যদি থাকার জায়গার দরকার হতো তাহলে হোটেল খরচ কত এই প্রশ্ন উঠতো না। যেহেতু এটা চিকিৎসকদের ব্যাপার তাই এই কথাগুলো উঠছে।

আমি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেছি। স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমলারা যদি চিকিৎসকদের এভাবে অসম্মান করেন তাহলে তাদেরও একইভাবে অসম্মানিত হয়ে তাদের জীবন শেষ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কাউকে অসম্মান করে নিজে সম্মানিত হওয়া যায় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার আকূল আবেদন থাকবে যে আপনি আমলাদের প্রতি আরও সতর্ক হোন। যদিও আমি ঢালাওভাবে সবার কথা বলছি না। অনেক সচিবই আছেন, যারা সত্যিকার অর্থে প্রধানমন্ত্রীর জন্য জীবন দিতে পারেন। কিন্তু এর পুরো বিপরীতটাও আমরা দেখতে পাচ্ছি।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান।