ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এত ‘বিজ্ঞ’ লইয়া আমরা কী করিব?

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১১:৫৭ এএম
এত ‘বিজ্ঞ’ লইয়া আমরা কী করিব?

কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস)-এর সংক্রমণ ঠেকাতে লড়ছে গোটা বিশ্ব। কোনো কোনো দেশে করোনা বাড়ার পরে কমেছে, কোথাও আবার কমে যাওয়ার পরে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধাপে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। এই ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বহু দেশ এবং সংস্থা। এ নিয়ে নানা বিতর্কও হচ্ছে। রাশিয়া সমস্ত নিয়ম অনুসরণ করে ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে। আমি বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি)’র চেয়ারম্যান। সুতরাং এসব বিষয়ে কিছুটা হলেও আমি জানি এবং বুঝি। কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যতটা সময়ের প্রয়োজন হয় এবং যে সমস্ত ধাপ সম্পন্ন করতে হয় রাশিয়া সে সমস্ত ধাপ অনুসরণ করেছে বলে আমি মনে করি না। সে যাই হোক, আমার আজকের এই লেখার কারণটা হলো অন্য।

এবার করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে রোগী যেমন বেড়েছে, ঠিক সেভাবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারেও বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ফেজে রয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে এসব খুব একটা ঘটেনি। গ্লোব ফার্মাসিউটিকাল নামের একটি মাত্র কোম্পানি ভ্যাকসিন তৈরি করা শুরু করেছে। সায়েন্টিফিক্যালি যেভাবে এগুনোর কথা, সেভাবেই তারা এগুচ্ছে। করোনায় আমাদের দেশে ভ্যাকসিন তৈরি সেভাবে না বাড়লেও বেড়েছে ‘বিজ্ঞ’ লোকের সংখ্যা। কোভিড-১৯ কে ঘিরে আমাদের দেশে যে ‘বিজ্ঞ’ লোক বেড়েছে এই বিজ্ঞদের সংজ্ঞা হচ্ছে তিনি নির্দিষ্ট একটা জিনিস জানেন, আর বাকি সব জিনিসে অজ্ঞ।

আজকাল যেহেতু ইন্টারনেটের যুগ, ইন্টারনেটে কিছু কিছু বিষয় দেখে এবং পড়ে, নিজেদের জাহির করার জন্য তারা বিজ্ঞ সাজেন। এখন অনেক টেলিভিশন চ্যানেল হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত বিজ্ঞ লোকের অভাব থাকায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এখন বিজ্ঞ তৈরির ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছে। যদি আমাদের দেশে আরও কিছুদিন কোভিড-১৯ থাকে তাহলে এই ফ্যাক্টরি থেকে কত বিজ্ঞ লোক যে বের হবে, আমি সেটাই ভাবছি।

আজকাল টেলিভশন খুললেই দেখা যায় অনেক বিজ্ঞই নিজেদের জ্ঞান জাহির করার জন্য সরকার কি কি করতে পারতো তা নিয়ে বক্তব্য শুরু করে কি কি করতে পারে নাই, তা দিয়ে বক্তব্য শেষ করে। তাদের চিন্তা ভাবনা অনেকটা এরকম যে, যদি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু না বলা যায়, তাহলে তো আর বিজ্ঞ হওয়া গেল না।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা একটা টেলিভিশন কেনার ক্ষমতা রাখতো কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে, তাদের অনেকেই এখন জননেত্রী শেখ হাসিনার বদৌলতে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হয়েছে। যারা পাড়ায় পাড়ায় মাথায় একটা ডালা বা টুকরি নিয়ে ঘুরে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে তাদের সঙ্গে আমি কিছু কিছু টিভি চ্যানেল মালিকদের মিল খুঁজে পাচ্ছি। যখন পাকিস্তান আমল ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো ভালো শিল্পপতি ছিল না। সে সময় অনেকেই চাতুরির আশ্রয় নিয়ে কোনো কিছুর লাইসেন্স কব্জা করে সেটা বিক্রি করে মূলধন গড়তো। তারপর কিছু লোক শিল্পপতি হয়ে ওঠত। আমাদের দেশেও এরকমভাবে টেলিভিশনের লাইসেন্স নিয়ে ডালায় করে বিক্রি করছে অনেকে। এভাবে বিভিন্ন লোকের থেকে টাকা নিয়ে তারপরে তারা টেলিভিশন চালাচ্ছে। আমি নাম ধরে বলতে পারি এরকম বহু লোক আছে যারা আওয়ামী লীগের বড় ভক্ত বলে দাবি করে এসব কাজ করছে।

দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়ে অনেকেই সেটার অধিকাংশ শেয়ার আওয়ামী বিরোধীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। এভাবে দু একটি চ্যানেল বাদে অধিকাংশ চ্যানেলের মালিক হয়ে যাচ্ছে আওয়ামী বিরোধীরা। যেহেতু এখন বাতাস আওয়ামী লীগের পক্ষে আছে, সেহেতু চ্যানেলগুলো আওয়ামী লীগের পক্ষে কিছু কিছু কথা বলে। কিন্তু যদি খোঁজা হয় যে, সেখানে কারা নিউজ করছে তাহলে দেখা যাবে, অধিকাংশই হলো ঘোরতর আওয়ামী বিরোধী। এরা হলো নিরপেক্ষ লেবাস লাগিয়েছে।

সদ্যই স্বাস্থ্যবিভাগ সিদ্ধান্ত নিল যে, লাইভ করোনা বুলেটিন আর হবে না। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর পরিচালক আধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার কল্যাণে এটা শুরুতে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা এটার দায়িত্ব নিলেন। তিনি সেব্রিনা ফ্লোরার মতো প্রশংসিত না হলেও এটার মোটামুটি দর্শক ছিল। তারপর সিদ্ধান্ত হলো এটা বন্ধ করে দিয়ে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে করোনার তথ্য জানানো হবে। আমার মনে হয় এটা সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মানুষ যে তথ্যগুলো জানতে চায় প্রেস রিলিজে সেটা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা নিয়ে আমাদের অনেক ‘বিজ্ঞ’রা নাখোশ হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও তাদের জ্ঞান জাহির করার জন্য এটা নিয়ে নানা মতামত দিচ্ছেন।

করোনা হয়তো চলে যাবে, কিন্তু করোনা যে অসংখ্য বিজ্ঞ লোক রেখে যাবে, এই বিজ্ঞ লোকদের যে কী হবে তা নিয়ে আমি খুব চিন্তিত। আল্লাহর কাছে আমি দোয়া করি, তিনি যেন এই বিজ্ঞদের সংখ্যাটা একটা সীমারেখার মধ্যে রাখেন। নয়তো পরবর্তীতে এরা আরও কত বিষয় নিয়ে যে মতামত দিয়ে বসবেন, তা কে বলতে পারে!

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান।