ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতাই আবার প্রমাণ হবে

অধ্যাপক ডাঃ দীন মোহাম্মদ নূরুল হক
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৪:৫৯ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতাই আবার প্রমাণ হবে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ৩০শে জানুয়ারী করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বৈশ্বিকভাবে জরুরি অবস্থা জারি করে। এর আগে আরো পাঁচবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিকভাবে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল। ২ বার ইবোলা নিয়ে, জিকা, পোলিও এবং সোয়াইন ফ্লু নিয়ে ১ বার করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান করোনা ভাইরাসকে সবচেয়ে মারাত্বক বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

করোনা ভাইরাস পৃথিবী ও পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের জীবন ও জীবিকা বদলে দিয়েছে। সারা দুনিয়ার সব দেশ ও জাতির একই অবস্থা। মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ বেশ কিছুদিন স্ট্যাটিক হয়ে আছে। ৫ মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়েছে সংক্রমণের কার্ভ এখনো নিন্মমুখী হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত ৩১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলায় জীবন ও জীবিকার এক ঐতিহাসিক মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩১ দফা কর্মসূচিই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতাই আবার প্রমান হবে।

দেশে বর্তমানে লকডাউন বলে কিছু নেই। স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি বাদে সবকিছুই খোলে দেওয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাস নিয়ে মানুষের ভীতি কমে গেছে। সংক্রামিত হওয়ার পরও মানুষ সিজনাল সর্দি, কাশি ও জ্বরের মত বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে। প্রায় সকলেই বাড়িতে থেকে ভালোও হয়ে যাচ্ছে। করোনা টেস্ট করা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছাও আগের মত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শুধু শ্বাসকষ্ট হলেই হাসপাতালে যেতে হবে এ ধরণের মানুষিকতাই সবাই পোষণ করে।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শুধু আরটি-পিসিআর মেশিন দিয়েই করোনা টেস্ট করা হচ্ছে। এন্টিবডি ও এন্টিজেন টেস্ট এখনো শুরু হয় নাই। উপসর্গ সহ ও উপসর্গ বিহীন করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর কত শতাংশ মানুষের রক্তে এন্টিবডি তৈরী হয়েছে তা একমাত্র এন্টিবডি টেস্ট করে জানা যাবে। এন্টিজেন টেস্ট এর মাধ্যমে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি জানা যাবে। এই ২টি টেস্ট দ্রুত শুরু করা দরকার।

বিশ্বব্যাপী মানুষের সম্মুখে একদিকে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক অন্যদিকে জীবন ও জীবিকার তাগিদ। বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবন ও জীবিকার জন্য আস্তে আস্তে সকল কর্মক্ষেত্রই খোলে দেওয়া হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা, মাস্ক পরিধান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা ও সাবান দিয়ে ভালো করে হাত না ধুয়ে নাক মুখ স্পর্শ না করার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ব্যাপারে সরকারি ভাবে আইন করা হয়েছে। মাস্ক না পরলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ফাইনেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকল স্তরে সঠিক ভাবে মাস্ক পরার ব্যাপারে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্ঠা অব্যাহত আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, চিকিৎসক সমাজ, বিভিন্ন মিডিয়া, সাংবাদিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক সবাই সারাক্ষন মাস্ক পরার উপকারিতা নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু অন্তত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে দেশের অধিকাংশ মানুষ বর্তমান অবস্থায় মাস্ক পরাকে একটি রুটিন কাজ হিসেবে গ্রহণ করছে না।

উল্লেখ্য যে অনেক পরিবারের সদস্যরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং কেউ কেউ মারাও গেছে, কেউ কেউ মরতে মরতে বেঁচে উঠেছে। তারপরও বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয় কেন আমরা মাস্ক পরার ব্যাপারে উদাসীন। অনেকে বলেন মাস্ক পরলে কিছুক্ষন পর দমবন্ধ হয়ে আসে। তা কিন্তু হতেই পারে। হাসপাতাল, অফিস, আদালত, হাট বাজার, বাস, স্টিমার, লঞ্চ ও রেল অর্থাৎ যেখানে লোক সমাগম বেশি সেখানে কষ্ট হলেও মাস্ক পরতেই হবে। শাসকষ্ট হলে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে নাক বের করে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করা যেতেই পারে। তবে মাস্ক পরা অবস্থায় নাক বের করে অথবা নাক মুখ খোলা রেখে গলায় মাস্ক ঝুলিয়ে লোকজনের ভিড়ে ঘুরে বেড়ানোর নাম মাস্ক পরা নয়। এর যেমন কোন মূল্য নাই, তেমনি এক মাস্ক প্রতিদিন পরারও কোন মূল্য নাই।

স্বল্প মূল্যের সার্জিকাল মাস্ক প্রতিদিন একটি ব্যবহার করার পর নিরাপদ স্থানে ফেলে দেওয়া বা পুড়ে ফেলা ভালো। তবে এন ৯৫ মাস্ক হলে বার বার ব্যবহার করা যাবে। সেই ক্ষেত্রে ৫টি মাস্ক এক থেকে পাঁচ নম্বর লেখে ৫টি প্যাকেটে রাখা যায়। প্রথমদিন ১ নম্বর মাস্ক এবং পঞ্চমদিন ৫ নম্বন মাস্ক পরতে হবে। প্রতিদিন মাস্ক পরার পর আবার নির্দিষ্ট প্যাকেটে রেখে দিতে হবে। ৫ দিন পর আবার ১ নম্বর মাস্ক পরা শুরু করতে হবে। এভাবে পরলে মাস্ক এর কার্যকারিতা নষ্ট হবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক দূরত্ব। বাংলাদেশের কোথাও বিষয়টি সঠিক ভাবে পালন করা হচ্ছে না। দোকানে বা হাটে বাজারে তো একজনের গায়ের উপর দিয়ে আরেকজনকে বাজার করতে দেখা যায়। এদের মধ্যে অনেকের মাস্ক পরাও থাকে না। সকল স্থানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বাধ্যতামূলক প্রজ্ঞাপন জারি করতে অসুবিধা কোথায়? তবে আইন করে প্রজ্ঞাপন জারি করলেই হবে না - এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব অবশ্যই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিতে হবে।

এক বারের কাশি বা হাঁচি থেকে কমপক্ষে ৩০০০ ড্রপলেট বা জলীয় কণা বের হয়ে আসে যার মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। মলমূত্রের মধ্যে করোনা ভাইরাস বেশি সময় বেঁচে থাকে - কাজেই টয়লেট ব্যবহার করার পর ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে। ড্রপলেট ভাইরাসটি ৩ ঘন্টা বাঁচে, কাঠ বা কার্ডবোর্ডের মত শক্ত জিনিসের উপর ২৪ ঘন্টা, প্লাষ্টিক পদার্থের উপর ২ থেকে ৩ দিন, ধাতব তৈরী হাতল, লিফটের বাটন ও কিচেন ওয়ার্কটপের উপর ভাইরাসটি ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

করোনা মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশের মডেলটিই সবদেশে গৃহীত হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে হবে এবং দেশে ১৭ কোটি মানুষকে বাঁচানোর জন্য অর্থনীতির চাকাও সচল রাখতে হবে। সুখের কথা যে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ স্থিতিশীল রয়েছে। মৃত্যুহারও খুবই কম। মানুষের মনোবল আগের চেয়ে অনেক বেশি। গ্রামের অনেক মানুষতো করোনা ভাইরাস বিশ্বাসই করে না। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ৪০ শতাংশের বেশি উপসর্গহীন। এটি একটি শুভ লক্ষণ। তারমানে করোনা ভাইরাসের ভিরুলেন্স দ্রুত কমে যাচ্ছে। ভিরুলেন্স বা সংক্রমণ শক্তি কমতে কমতে এক সময় করোনা ভাইরাস মানবদেহে আর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়।

সকলের প্রতি আমার অনুরোধ আসুন আমরা যে কোন জনসমাগম স্থলে এবং গণ পরিবহনে সঠিক ভাবে মাস্ক পরি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি। কর্মক্ষেত্রে কম্পিউটার কীবোর্ড, মাউস, চেয়ার, টেবিল জীবাণু নাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের একই কলম ব্যবহার করতে না দেই। এটিএম বুথ, লিফট, ব্যাংক নোট ও ধাতব মুদ্রা ব্যবহার করার পর ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করি। যে কোন অনুষ্ঠানে করমর্দন ও শুভেচ্ছা বিনিময় থেকে বিরত থাকি।

এবার কোরবানির ঈদের পর করোনা সংক্রমণ খুব একটা বাড়েনি। আমরা যদি সচেতন থাকি এবং করোনা প্রতিরোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত ৩১ দফা কর্মসূচির সঠিক অনুসরণ করি, তা হলে অতিশীগ্রই বৈশ্বিক করোনা মহামারী থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক