ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মুতা’আ বিয়ে, ধর্ষণ এবং কুলসুমদের লাশ

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ১২:০০ পিএম
মুতা’আ বিয়ে, ধর্ষণ এবং কুলসুমদের লাশ

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ৯০০ জনের মতো বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীর লাশ দেশে ফেরত এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ দেশে আসার সংখ্যাও বেড়েছে। সব শেষে এলো কুলসুমের লাশ। ১৪ বছরের শিশু কুলসুমকে ২৬ বছর বয়স দেখিয়ে ভালো বেতনের আশায় সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। বেতনের পরিবর্তে কপালে জোটে মালিকপক্ষের শারীরিক ও যৌন নির্যাতনে মৃত্যু। পরিবারের ভাগ্য বদলাতে গিয়ে লাশ হয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের নূরপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে কুলসুমের লাশ গত শনিবার তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। সৌদি আরবে থাকা কুলসুমের পরিচিত জোনের বয়ান আর লাশ দেখে জানা যায় যে, সৌদি আরবে গৃহকর্তা ও তার ছেলে মিলে কুলসুমের দুই হাঁটু, কোমর ও পা ভেঙে দেয়। এর কিছুদিন পর একটি চোখ নষ্ট করে রাস্তায় ফেলে দেয়।  

ইসলাম পূর্ব বা ইসলামের পরেও বহুগামিতা বা মুতা’আ ছিল আরবীয় পুরুষদের সমাজ স্বীকৃত অতি সাধারণ বিষয়। মুতা`আর ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মক্কা বিজয়ের পরে নবীর অনুসারীরা যে পরমাণ গণিমতের মালের সাথে যুদ্ধবন্দী নারী পেয়েছিলেন তাতে তারা সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে তারা তাঁদের তাঁবু এলাকার বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধর্মের কুমারী বা যুবতি নারী সম্ভোগের অনুমতি চান। তখনকার প্রেক্ষিতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুমতি দেন কিছু দেনমোহর বা অর্থ দিয়ে যে কোন ধর্মের কুমারী মেয়ের সাথে মুতা’আ বিয়ে করার। নবীর এই অনুমতির পরে দেখা গেল যে, তাঁর সফর সঙ্গীদের একেকজন গনিমতের অঢেল টাকায় একাধিক মুতা’আ বিয়ে করে ইসলামের কাজ তথা তাঁর নবীর কথা ভুলেই গেছেন। এতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নবী কিয়ামত পর্যন্ত মুতা’আ বিয়ে নিষিদ্ধ করেন।   

যা হউক, মুতা’আ যুদ্ধবন্দি দিয়ে শুরু হলেও পরে তা আর যুদ্ধ বন্দিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমাজের সব খানেই ছড়িয়ে গেছে। তখনকার দিনের ইসলামী চিন্তাবিদগণের মতে সূরা নিসার ২৪ নং আয়াতের যে সারমর্ম বা মূলকথা,  তাহলো- যুদ্ধবন্দী স্ত্রীলোকদেরকে যদি কারও মালিকানায় ইসলামী সরকার দিয়ে দেয় তবে সেই স্ত্রীলোক তার অধিকারভুক্ত বাঁদিদের মত হয়ে যায়। তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক বৈধ। তাই তৎকালীন ইসলামের নেতারা মনে করতেন যে, পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াত যা মুতা`আ র বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে তা হ`ল সুরা আন-নিসার ২৪ নম্বর আয়াত, যা হাদিছ ভাষ্যকারদের (সুন্নি ও শিয়া) নিকট মুতা’আ আয়াত হিসাবে পরিচিত। এই আয়াত অস্থায়ী বিবাহের অনুশীলনের জন্য একটি সুস্পষ্ট এবং অনর্থক অনুমতি সরবরাহ করে। শরিয়াহ ব্যভিচার নিষিদ্ধ করে তবে একই সাথে মুতা’আ অনুশীলনের অনুমতি দেয়।  বলা হয়, “সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে একটিই, অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।” [সূরা নিসা: আয়াত ৩]।

ইসলামী চিন্তাবিদ্গনের ধারণা কিয়ামত পর্যন্ত মুতা’আ বিয়ে নিষিদ্ধ করার পরে এটা নিয়ে নবীজীর উপর নও মুসলিমদের একটা অংশের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। যদিও যুদ্ধবন্দি নারীদের ভোগ করা অর্থাৎ দাসীদের সাথে যৌনাচার নিষিদ্ধ হয়নি তখনো। এই বিভেদ দিনে দিনে বাড়তে থাকে। অনেকে বলেন, শিয়া সুন্নির ভাগের প্রধান কারণ মুতা’আ বিয়ে। যারা নবীজীকে সম্মান করতেন না তারাই পরে শিয়া হয় বলে সুন্নিরা অভিযোগ করেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন যেঃ    

১. সুন্নি মুসলিমদের কালেমা হল "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। অপরদিকে শিয়া মুসলিমরা সাথে যোগ করে "Aliyun waliyullah khalifatahu billa fasl" মানে হচ্ছে "আলী আল্লাহর প্রতিনিধি/বন্ধু""

২. শিয়ারা আলী (রঃ)-এর অনুগত ১২ জন ইমাম-কে মান্য করে। এবং ইমামদের পরবর্তীতে যারা আসে তাদেরকে বলে মুজতাহিদ। শিয়ারা মনে করে, মুজতাহিদরা ধর্মীয় এবং প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করার যোগ্য। অপরদিকে সুন্নিরা ইমাম পদটাকে সংকীর্ণ করে দেখে। ইমামের পরিবর্তে তারা খলিফা প্রথায় বিশ্বাসী। সুন্নিরা মনে করে, খলিফারা প্রশাসনিক কাজে লিপ্ত থাকতে পারে তবে ধর্মীয় সংশোধনে নয়।

৩. শিয়ারা শুধুমাত্র কুরআন  এবং হাদিস (যেগুলো মুহাম্মদ (সঃ) এবং আলী রঃ এর পরিবার বর্ণনা করেছেন) মেনে চলে। অপরদিকে সুন্নিরা কুরআন, হাদিস (মুহাম্মদ (সঃ) এর সকল অনুসারী কর্তৃক বর্ণণাকৃত), ইজমা, কিয়াস মেনে চলে।

৪. সুন্নিদের বিয়েতে ২ জন সাক্ষী আবশ্যক। শিয়াদের বিয়েতে সাক্ষী আবশ্যক নয়। শিয়ারা অস্থায়ী বিয়ে(মুতা`আ) সমর্থন করেন যা সুন্নিরা করে না।

৫. শিয়ারা দৈনিক ৩ বার, সুন্নিরা দৈনিক ৫ বার প্রার্থনা করে।

৬. শিয়াদের যুক্তি হচ্ছে হাদিস দিয়ে কোরআনের কোন আয়াত বাতিল করা যায় না, বাদ দিলে তা হয় বেদআত। এই বিশ্বাস থেকেই শিয়ারা হযরত অমরকে কাফের আখ্যা দিয়েছিলেন, কারণ তিনি মুতা’আ বিয়ের কঠোর বিরোধী ছিলেন।

ইরান শিয়া অধ্যুষিত। শিয়াদের শরিয়া আইনে মুতা’আ  বিয়ে করার অনুমোদন দেয়া আছে, যা সুন্নিদের সম্ভবত নেই। ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী ইরানে মুতা`আ বিবাহের লেবাসে মোটামুটি আশি হাজার বেশ্যা ছিল তেহরান শহরেই। আর সারা দেশে ছিল আরো কয়েক লাখ। এমন পরিস্থিতির কারণ হচ্ছে ওদেশে অতি বিত্তবানেরা ছাড়া আর তেমন কোনো পুরুষ বিয়ে করতে সমর্থ হয় না, আর বিত্তবানেরা করে বহুবিবাহ। সাধারণ দরিদ্র জিহাদি যুবকদের বিয়ে করা যেহেতু সম্ভবপর না, তাই তারা চায় বেশ্যা। আর এই পরিস্থিতিতে অনেক মেয়েরই বিয়েও হয় না, খাদ্যসংস্থানও থাকে না। তাই তাদেরকে বেশ্যাবৃত্তিতে নেমে পড়তে হয় বা নামানোটা সোজা হয়।

শুধু ইরান নয়, শিয়া অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশ এমনকি সুন্নিদের মাঝেও এটি এখনো বিদ্যমান। ভারতের কেরালা সহ অনেক শিয়া প্রধান এলাকাতেই মুতা’আ বিয়ের প্রচলন অনেক বেশি।  সুন্নিরা বাসার কাজের মেয়েকে দাসী ভেবে নিয়ে তাঁদের সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন স্থানে একাধিক অপারেশনের মাধ্যমে কুমারী বানিয়ে মেয়েদের মুতা’আ বিয়ের নামে ব্যবসা করা হয়। আইএস জঙ্গিরাও এই ব্যবসা ও কুমারী বানানোর অপারেশনে অভ্যস্ত ছিল তা খবরে জানা যায়। ভারতের কেরালা, পাকিস্তান সহ যেখানে শিয়া মুসলিমদের প্রাধান্য সেখানে প্রতি বছর আরবের শেখরা আসেন মুতা’আ বিয়ে করতে, ধরাও পড়েন, পুলিশের হাতে নানা কারণে, তবুও তা বন্ধ হয় না।   

মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সূত্রে জানা যায় যে, শিয়া সুন্নি ভেদে অধিকাংশ এয়ারাবিয়ান পরিবারে এখনো সেই মুতা’আ  বিয়ে আর দাসীদের বেপরোয়া ভোগ করার সংস্কৃতি চালু আছে। তারা মুতা’আ  বিয়ের চেয়ে দাসীদের ভোগ করা সহজ ও নিরাপদ মনে করে। এতে তারা সপরিবারে পালাক্রমে দাস দাসীদের ভোগ করে থাকেন। বাংলাদেশের মত এশিয়ার অন্যসব দেশ থেকে যারা মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী নেন তারাও যৌন হেনস্তার শিকার হন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কারণে কোন মেয়ে এতে আপত্তি করলেই নেমে আসে নির্মম নির্যাতন, যার ফলশ্রুতিতে অনেক সময় হয় মৃত্যু।  

নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানা যায়, বাংলাদেশের একটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদর্শন একজন সিনিয়র ডেপুটি রেজিস্টার যৌবনে মধ্যপ্রাচ্যে ছোট্ট একটি কারখানার ম্যানেজার হিসেবে কাজে যান। মালিকের স্ত্রী ও অবিবাহিত দুই কন্যার নজরে পড়ে যান সেই যুবক। তাঁকে গড়ে প্রতিদিন তিন জনকে যৌনসেবা দিতে বাধ্য করা হতো। এই সেবা দিতে গিয়ে তাঁর প্রায় মৃত্যুমুখে পতিত হবার যোগাড় হয়। অনেক কান্নাকাটি ও ফিরে আসার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তাঁকে ২ মাসের ছুটি দেওয়া হলেও তিনি আর ফিরে যান নি। এখনো কোন যুবতি মেয়ে বা মহিলা তাঁর সাথে হেসে কথা বললে তিনি আতংকিত হয়ে পড়েন। তিনি আজও অবিবাহিত।  

সুত্রঃ বিবিসি, অন্যান্য  

লেখক: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী