ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

৫ থেকে ৫০০`র গল্প

ডা. সামন্ত লাল সেন
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ১০:০৬ এএম
৫ থেকে ৫০০`র গল্প
 
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদ। দগ্ধ হলেন নামাজরত বহু মুসল্লি। তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। কারও কারও শরীরের ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে। এত মানুষ, সবার অবস্থা আশংকাজনক, কোথায় হবে তাদের চিকিৎসা? যেখানে তাদের নেওয়া হবে, সেখানে এত মানুষের সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে তো? দগ্ধ মানুষগুলো সর্বোচ্চ চিকিৎসা পাবে তো? দেশে বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে বা অনেক মানুষ দগ্ধ হলে একটা সময় এসব প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিত।  অনেকেই দগ্ধ হয়ে সুচিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারাতেন। কিন্তু এখন এ ধরনের ঘটনায় নির্ভরযোগ্য এক নাম- শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের মধ্যেই সর্ববৃহৎ এই বার্ন ইনস্টিটিউট। অনেকেই হয়তো জানেন না,  ৫০০ শয্যার অত্যাধুনিক এই হাসপাতালটির শুরুটা হয়েছিল মাত্র ৫টি শয্যা দিয়ে। এত বড় এই হাসপাতালটির পেছনে বিশাল এক ইতিহাস রয়েছে। এই ইতিহাসের নীরব স্বাক্ষী হলাম আমি। 
 
১৯৭২ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়কার কথা। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলতে নতুন এক যুদ্ধ শুরু করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময় তার আমন্ত্রণে আমেরিকা থেকে একজন অর্থোপেডিক সার্জন দেশে আসেন। তাকে সাহায্য করতে ভারত থেকে একজন প্লাস্টিক সার্জন আসতেন। সে সময় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শুরু হয়েছিল বার্ন ওয়ার্ড। আমি তখন একেবারেই তরুণ। ৫টি বেডে রোগী দেখা শুরু করেছিলাম। সারাদিন এই রোগীদের নিয়েই পড়ে থাকতাম। জাতির পিতা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওই ওয়ার্ড বরাদ্দ করেছিলেন। সেখানেই দগ্ধ রোগীদের সেবা দেওয়া হতো। এভাবেই এটা চলছিল। 
 
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন, তিনি একবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে এসেছিলেন। সেখানে তিনি দেখলেন, দগ্ধ রোগীদের দুর্দশার চিত্র। তিনি তখন আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমার কাছে জানতে চাইলেন যে, দগ্ধ রোগীদের সেবায় কী করা যায়। আমরা তখন তাকে একটা আলাদা হাসপাতাল করার প্রস্তাব দিলাম। প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই প্রস্তাবটা গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখলেন। সে সময় ঢাকা মেডিকেলের পাশে একটা বস্তি ছিল। সেখানে একটা হাসপাতাল হলো। এর পর অনেকটা সময় পার হলো। সরকার বদল হলো। ২০০৯ এ বঙ্গবন্ধু কন্যা আবারও রাষ্ট্রপরিচালনায় এলেন। ২০১০ এ রাজধানীর নিমতলিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হলো। সে সময় দগ্ধ রোগীদের দেখতে হাসপাতালে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আমাকে বললেন, এত রোগী, এদেরকে কীভাবে তোমরা চিকিৎসা দেবে, মানুষের এত ভোগান্তি, এত কান্না, আমাদের করণীয় কী হতে পারে। আমরা তখন প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা একটা বড় হাসপাতাল করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী বললেন, একটা হাসপাতাল হলেই তো হবে না, সারা দেশে আলাদা বার্ন ইউনিট দরকার, সেই সঙ্গে আমাদের অনেক ডাক্তারও দরকার, যারা দগ্ধ রোগীদের সুচিকিৎসা দিতে পারবে। অর্থাৎ আমাদের একটা ইনস্টিটিউট দরকার। এভাবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে সেই ৫ বেডের বার্ন ওয়ার্ড এখন  ৫০০ বেডের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। ৫ থেকে ৫০০ হয়ে ওঠার এই পথপরিক্রমাটাকে একটা যুদ্ধ বলা যেতে পারে। আর এই যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে ছিলাম আমিসহ আরও অনেকে। এক্ষেত্রে যার নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন আমার শিক্ষক প্রয়াত প্লাস্টিক সার্জন ডা. শহিদুল্লাহ। আমাদের নানা জায়গায় ধর্না দিতে হয়েছে। অনেকেই নানাভাবে এই কর্মযজ্ঞকে বিঘ্নিত করতে চেয়েছে। কিন্তু আমাদের মিলিত প্রচেষ্টার ফলে সেসব অপতৎপরতা নস্যাত হয়েছে। 
 
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আমাদের কাছে যেসব রোগীদের আনা হয়, তাদের সবাইকেই আমরা সুস্থ করে তুলতে পারি, এমনটা নয়। তবে এটা বলতে পারি যে, আমাদের কাছে আসা প্রত্যেককেই আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিতে পারি। আমাদের সেই সক্ষমতা রয়েছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে।   গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য আমাদের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ২০টি শয্যা রয়েছে। রোগীর উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য পুরুষদের জন্য ২২টি এবং নারী ও শিশুদের জন্য ৩৬ শয্যা বিশিষ্ট হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ), ১০টি অপারেশন থিয়েটার এবং একটি অত্যাধুনিক পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড আছে। আমাদের স্কিন ব্যাংকও আছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগী নিয়ে আসার জন্য ভবনের ছাদে হ্যালিপ্যাড সুবিধাও রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে স্বপ্ন- দেশের মানুষ চিকিৎসার  প্রয়োজনে আর বিদেশে যাবে না, দেশেই হবে সর্বাধুনিক চিকিৎসা। সেই স্বপ্ন পূরণে সক্ষম শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। 
 
জাতির পিতা ৫ শয্যার মাধ্যমে যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন, তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে ৫০০ শয্যার বার্ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই বীজ আজ বটবৃক্ষ রূপে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশও পারে- এর বড় প্রমাণ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। এর ভিতটা গড়ে দিয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিববর্ষে এই মহামানবের প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। 
 
লেখক: প্রধান সমন্বয়ক, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট।