ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগকে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীমুক্ত করা জরুরি

ড. মো. আওলাদ হোসেন
প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১১:০০ এএম
ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগকে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীমুক্ত করা জরুরি

‘আওয়ামী লীগ আমলে রাজাকার-বিএনপির রাজত্ব’ শিরোনামে ‘বাংলাইনসাইডারে’ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পড়েছি যে, গভর্নর মোনায়েম খান এখনও বাংলাদেশ চালায়। তার নাতী সাজেদ এ এ আদেল এখন হকি ফেডারেশনের সহ সভাপতি । তিনি হকির নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যানও। ...কুখ্যাত রাজাকার জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল (সাকা চৌধুরীর চাচা শ্বশুর এবং মোনায়েম খানের মেয়ের জামাই) ২০০০ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে তার পুরান ঢাকার আরমানিটোলার বাড়িতে পাকিস্তানি পতাকা উত্তলন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলনের কারণে তাৎক্ষনিক প্রতিবাদে মিছিল বের করেন ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি জনাব কামাল হোসেন। ... কুখ্যাত জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলের দুই কুলাঙ্গার জোবায়েদ আদেল এবং তারেক আদেল ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে সদল বলে বাসায় তার ঢুকে হত্যা করে আওয়ামীলীগের ওয়ার্ড সহ-সভাপতি কামাল হোসেনকে, যিনি পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনের প্রতিবাদ করেছেন।


২০০০ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের একাধিক স্থানে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেই উত্তোলনকারীদের বংশধররা বর্তমানে আওয়ামীলীগের আমলেও আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন।


২০০৪ সালে ২১ আগস্ট মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সংঘটিত গ্রেনেড হামলা মামলার মূল আসামী তারেক জিয়াকে নিয়মিত অর্থ যোগানদাতাদের বংশধরেরাও ঢাকা মহানগর আওয়ামীলীগের থানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন।


আওয়ামীলীগ টানা প্রায় ১১ বছর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় সুযোগ সন্ধানী ও বিতর্কিত অনেকেই আওয়ামী লীগে ঢুকেছেন, এদের হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারী বলা হয়। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামীলীগ দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর মাঠ পর্যায়ে অন্য দল থেকে সরকারি দলে যোগ দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও ফ্রিডম পার্টির মতো দল থেকেও অনেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করেছে। এরা সকলেই কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামীলীগের পদ দখল করেছেন। অপরাধীরা আত্মরক্ষার্থে, ব্যবসায়ীরা  প্রভাব বিস্তার করে ব্যবসায়ী সুবিধার জন্য উচ্চমূল্যে আওয়ামীলীগের পদ ক্রয় করেছে। আওয়ামীলীগের অনেকে দলের মধ্যে নিজের গ্রুপ ভারী করার জন্য অন্য দল থেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করিয়েছেন। আবার অনেকেই আওয়ামীলীগের ভিতরে নিজেরাই গ্রুপিং শক্তিশালী করে বা বিবাদ সৃষ্টি করে আওয়ামীলীগকে দুর্বল করার জন্য আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশ করাচ্ছেন। আবার অনেকে ‘পদ বানিজ্য’ করে আর্থিক লাভবান হওয়ার জন্য ভিন্ন মতাবলম্বীদের দলে ভিড়িয়েছেন। বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরকারি দলে আনা নিয়ে বিভিন্ন সময় ‘পদ বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামীলীগ কমিটি গঠনে ‘পদ বানিজ্য’এর একাধিক লিখিত অভিযোগনামা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট জমা আছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার রয়েছে।‘পদ বানিজ্য’ অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায়, এর প্রভাব তৃনমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকার থানা পর্যায়ে এক ছাত্রদল নেতা ছাত্রলীগের থানা পর্যায়ের একটি পদ বাগিয়ে নির্বিঘ্নে চাঁদাবাজি করছে এবং পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। স্থানীয় ঐ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির নিকট এব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ছাত্রলীগের কাউকে পদটি দিলে সে তো আমাকে টাকা দিতো না। আমিওতো টাকা দিয়েই আমার এই পদে এসেছি’।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য মরহুম মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, অনুপ্রবেশকারীদের বেশির ভাগই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত ও দলের বদনাম সৃষ্টি করছেন। দলেরও কেউ কেউ এই সুযোগটা করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘সুযোগসন্ধানী অনুপ্রবেশকারীরাই দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। তাই তাদের আশ্রয় দেওয়া যাবে না।’ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সকল সহযোগী সংগঠণের ভেতরে থাকা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দলে আর কোনভাবেই অনুপ্রবেশকারী সুবিধাবাদীদের ঠাই দেওয়া যাবে না’।


আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘রাজনীতিবিদরাই রাজনীতি করেন, এটা ঐতিহ্যগতভাবে শুধু বাংলাদেশ নয়; সারা বিশ্বে স্বীকৃত। কেননা সকল সমীকরণ শেষে রাজনীতিবিদরাই দেশের মানুষের কথা ভাবেন, দেশের কল্যাণে কাজ করেন; এটাই একজন রাজনীতিবিদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। অনেক সময় ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি-চাকুরিজীবী, আমলা কিংবা অন্যান্য পেশাজীবীদের কর্মজীবন শেষে রাজনীতিতে আসতে দেখা যায়। তারা আসতে পারেন, রাজনীতি করতে কারও কোন বাধা নেই, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি দেশের সকল সচেতন নাগরিকের সে অধিকার রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কোনভাবেই ব্যবসায়ী কিংবা আমলাদের হাতে চলে যাওয়া সমীচীন নয়। একজন ব্যবসায়ী কিংবা আমলা হুট করে রাজনীতিতে এসে দলের নেতৃত্বে চলে আসা কিংবা মুখপাত্র বনে যাওয়া কোনভাবে দেশ ও জাতির জন্য শুভ কিছু বয়ে আনতে পারে না’।


বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, এখন অনেক সুবিধাবাদী মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বার্থ হাসিলের প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে সেসব দলে অনেক মানুষ আসে। তারা মূলত আদর্শভিত্তিক কোনো কর্মী বা নেতা না। তারা নিজেদের স্বার্থে আসে।


বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের আদর্শিক কর্মীগড়ার পাঠশালা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগেরও সাংগঠনিক নেত্রী। তৃনমূল পর্যায়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ব্যানারেই কর্মী সংগ্রহ হয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকরাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে নেতা নির্বাচিত হয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা ছাত্র-ছাত্রীদের ভোটে ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিজেকে গড়ে তোলেন। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা নেতাদের শিক্ষা, আচার-ব্যবহার, নৈতিকতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সর্বোপরি দলীয় আদর্শ বিচার-বিশ্লেষণ করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র-প্রতিনিধি নির্বাচিত করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কর্মজীবনেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনারবাংলা গড়ে তুলতে আত্মনিয়োগ করে এবং ছাত্রনেতারা জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দেয়। এছাড়া জেলা-উপজেলা, গ্রাম-পাড়া-মহল্লায়ও ছাত্র, যুব, মহিলা ও শ্রমিক নেতৃত্ব গড়ে উঠে। এই সকল নেতারাও জাতীয় রাজনীতিতে দেশ গড়ার কাজে আওয়ামীলীগকে সহযোগীতা করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পর রক্তের দামে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেন মহাননেতা জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাশাপাশি শুরু হয় স্বাধীনতা বিরোধীদের ষড়যন্ত্রও। স্বাধীনতা বিরোধীচক্র রাজনীতির অঙ্গনে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্যবোধকে প্রশ্নবোধক করার জন্য সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে থাকে, স্বাধীনতাবিরোধীদের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে ওরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সুযোগে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগদান করে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বাঙ্গালী জাতির ভাগ্যাকাশে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। এরইমাঝে ওরা বিভিন্ন কৌশলে আওয়ামীলীগ ও সরকারে শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছে। ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী আদর্শ বাস্তবায়নকারী জিয়ার সৈনিক এখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নকারী সংগঠন আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।‘জিয়া আমার পিতা, তারেক আমার ভাই’ শ্লোগানের প্রবক্তারা এখন আওয়ামীলীগ দলীয় জাতীয় সংসদ সদস্য। এটা সত্যি লজ্জার! এভাবে  চলতে পারেনা। এখন পরিশুদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিলে দল আরও শক্তিশালী হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডাঃ দীপু মনির নেতৃত্বে হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরী করেছেন। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দলীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ শুরু করেছেন। দুঃখের বিষয় এরই মাঝে হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করার জন্য তাদের পৃষ্ঠপোষকরা ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলা শুরু করেছে। অনেকে বলেন, অন্য দল থেকে কেউ আসলেই যে সে আদর্শপরিপন্থী তা কিন্তু নয়। হতে পারে যে সে ইতিহাস বিকৃতি বা ইতিহাসের অপপ্রচারের শিকার। একটা ভুল জিনিস সে জেনে এসেছে। হঠাৎ করে ইতিহাসের সত্যটা জেনে তার মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া আসলো এবং তার আদর্শগত পরিবর্তন ঘটলো। আর সে দল পরিবর্তন করলো। সে সত্যটা ধারণ করলো। এটা তো খারাপ কিছু নয়।


অনেকের মতে, আওয়ামীলীগ যখন বিরোধীদলে ছিল তখন আওয়ামীলীগের মিটিং মিছিলে যে সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করতো, এখন সেই সংখ্যা বেড়েছে, বিএনপি-জামাত থেকে আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশ হওয়ায় আওয়ামীলীগ বড় দলে পরিনত হয়েছে, এতে খারাপ কি হয়েছে? এসকল প্রবক্তাদের শিকড় খুঁজতে হবে। তৃনমূল থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জিবিত হওয়া নেতাকর্মীরা এধরনের সাফাই গাইবে না, গাইতে পারে না।


আওয়ামীলীগ বিরোধীদলে থাকাকালীন সময়ে কয়েকটি ইসলামিক দলের সাথে একটি সমঝোতা করা হয়েছিল। তখন অনেকেই সাফাই গেয়েছিলেন, ঐ ইসলামিক দলগুলোর ২% ভোট আছে। এই সমঝোতায় আওয়ামীলীগের ভোটবাক্সে ২% ভোটবৃদ্ধি পাবে। পরবর্তীতে তা মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। এখানে আদর্শের কোন মিল ছিল না, আদর্শের মিল না থাকলে, কোন সমঝোতাই টিকে না। আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বলেন, সারা বিশ্বে রাজনৈতিক দলগুলো যখন গঠিত হয়, তখন প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আদর্শ থাকে। এগুলোই হচ্ছে প্রকৃত রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দর্শনভিত্তিক যে সংগঠনগুলো পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, যারা এই দলগুলোতে আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগদান করে, তাদের একটা দীর্ঘমেয়াদী আদর্শভিত্তিক লক্ষ্য থাকে। আমরা যারা তৃনমূল থেকে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছি, আমরা জানি এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমার দলের আদর্শ আছে এবং দলের আদর্শের সঙ্গে আমি একমত হয়ে তা বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করি। অন্যদল থেকে আসা বা যোগদানকারীরা কোনদিনও মনেপ্রাণে আওয়ামীলীগার হতে পারে না। তারা আসে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নয়। আওয়ামীলীগের দুর্দিনগুলি তাই সাক্ষী দেয়।

এখনই সময়, আওয়ামীলীগ সভাপতির নির্দেশনা মোতাবেক সারাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে সংগঠন থেকে বের করতে হবে। এদের যারা লালন পালন করছে, এদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তাদের স্বরূপ উন্মোচিত করতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে আর হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারী সৃষ্টি হবে না।

 
আওয়ামী লীগের সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগঠনের একাধিক নেতাকে বলেছেন, “আওয়ামী লীগে ত্যাগী পরীক্ষিত কর্মীর অভাব নেই। আওয়ামী লীগে এ রকম কর্মীর সংখ্যাই বেশি। কাজেই তাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে দলকে সংগঠিত করাই এখন প্রধান কাজ। অনুপ্রবেশকারী, চাটুকার এবং দুর্বৃ্ত্তদের আওয়ামীলীগে রেখে আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোন মানে হয় না”।


২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে সামিল করার লক্ষ্য সামনে রেখে রূপকল্প ২০৪১ এর রূপরেখা অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ২০২১ সাল থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৯.৯ শতাংশ, গড় মাথাপিছু আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯৯৪ মার্কিন ডলার, প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ৮০ বছর। এ সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ দাঁড়াবে ৪৬.৯ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায়ের হার দাঁড়াবে ২৪.১শতাংশ। এফডিআর ৩ শতাংশ, সরকারি বিনিয়োগ ৮.৯ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ৩৮ শতাংশের উপর ভর করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেগবান হয়ে উঠবে। মোট জাতীয় সঞ্চয় ৪৬.৭ শতাংশ, মোট দেশজ সঞ্চয় ৪২.৭ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ৪.৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দারিদ্র্য নিরসন, আয়বৈষম্য হ্রাস, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, টেকসই বিদ্যুত ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মতো ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে এই রূপকল্প প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে দৃশ্যমান এসব প্রত্যাশা, পরিকল্পনা তথা রূপকল্প খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে চলমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রা এবং জনগণের আস্থা অর্জন কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। বিশেষত: গণতন্ত্রায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মতো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিরসনের উপর এই রূপকল্পের বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। সরকার ঘোষিত ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে আমাদের নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংগঠিত করতে হবে।


মনে রাখতে হবে, ২০০৮ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে আওয়ামী লীগ প্রথম রূপকল্প ২০২১ বা ‘ভিশন ২০২১’ এর ঘোষণা দিয়েছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে তা ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা, যা ২০২১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য ভিশন-২০২১ এর লক্ষ্য হিসেবে যে ৮টি বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছিল, তা হচ্ছে- ১. গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা, ২. রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ, ৩. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসন এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এড়ানো, ৪. রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর, ৫ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, ৬. ক্ষমতায়ন ও মহিলাদের জন্য সমান অধিকার, ৭. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উদ্যোগ এবং ৮. বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করা। চলমান বাস্তবতার বিচারে ভিশন ২০২১’র রূপরেখা বা লক্ষ্যসমূহ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও জনআকাঙক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আজ ২০২০ সালে এসে ভিশন ২০২১’র রূপরেখা অর্জন সম্ভব হয়েছে দেশপ্রেমিক ও সংগঠিত নেতাকর্মীর সমর্থনে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত দিকনির্দেশনারসজন্য । দেশপ্রেমিক ও সংগঠিত নেতাকর্মী ছাড়া কোথাও কোন সফলতা আসেনি। তাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম ও ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে, জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিনত করতে আওয়ামীলীগকে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীমুক্ত করা জরুরি প্রয়োজন।