ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

জাতীয়তাবাদ ও গরিব দেশ: কোভিড -১৯ ভ্যাকসিন বণ্টনের নৈতিকতা

অধ্যাপক ড. ফরিদ আহমেদ ও ড. সোচনা শোভা
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার, ০২:২০ পিএম
জাতীয়তাবাদ ও গরিব দেশ: কোভিড -১৯ ভ্যাকসিন বণ্টনের নৈতিকতা

 

করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত প্রতিটি রাষ্ট্র ও জাতির জন্য কোভিড -১৯ ভ্যাকসিনের সুষ্ঠু বন্টন বিশ্ব নেতাদের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। সবার জন্য স্বাস্থ্য নীতিকে বাস্তবায়নে অতিপ্রয়োজনীয় ঔষধের একটি তালিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) করেছে।  সেই তালিকার ঔষধের  প্রাপ্তির বিষয়টি  নিচ্চিত করতে বিশ্বমানের একটি  কাঠামো রয়েছে - যেটাকে ভিত্তি করে বিশ্বনেতারা  সকল মানুষের জন্য স্বাস্থ্য নিচ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । তবে, কোভিড -১৯ এর মতো বিশ্বব্যাপী মহামারীর প্রতিক্রিয়ায় ভ্যাকসিন সরবরাহের নিমিত্তে সর্বজনীন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণকারী এমন কাঠামো তৈরি করা হয়নি।

বর্তমানে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দৃষ্টিতে মূলত তিনটি ভ্যাকসিন রয়েছে। একটি রাশিয়া থেকে আসছে, অন্যটি চীন থেকে এবং অপরটি ইউকে থেকে বাজারজাত করবার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে এটি প্রকাশিত হয়েছে যে ভ্যাকসিনগুলোর কার্যকারিতার জন্য দরিদ্র দেশগুলোতে পরীক্ষা করা হবে । এবং যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিন যুক্তরাষ্টে পরীক্ষা চলছে। অতীতে আরও অনেক ক্লিনিকাল ট্রায়াল গরীব দেশে হয়েছে।  সুতরাং, তাদের অবদান সঠিকভাবে মূল্যায়ণ হওয়া দরকার।

সহযোগী উদ্ভাবনের সুবিধা ভাগ করে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক কোনও নিয়ম নেই। এই ক্ষেত্রে, কোনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায়বিচারের নীতিও নেই যা জাতির মধ্যে ভ্যাকসিনগুলোর সুষ্ঠু বিতরণের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে।

 নীতিদার্শনিকদের মধ্যে একটি প্রবণতা রয়েছে জন রলসের পার্থক্যের নীতি (the greatest benefit of the least advantaged members of society) ধারণাকে প্রয়োগ করে বন্টনের নীতিমালা প্রণয়ন করা। কিন্তু রলস নিজেই বলেছেন তার ন্যায়বিচারের নীতিগুলো কেবল একটি সার্ভভৌম রাষ্ট্রর  বেলায় প্রযোজ্য।  বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনের বিতরণে জন রলস  এর নীতির ভিত্তিতে যদি  বন্টন নীতি গ্রহণ করা হয়, তবে সুবিধাবঞ্চিত দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর উদ্ভাবন থেকে সুবিধা পেতে পারে। এই বন্টন  কি কোনো  জাতি তাদের জনসংখ্যার ভিত্তিতে আনুপাতিকভাবে প্রাপ্ত হওয়া উচিত?

যুক্তরাজ্য ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক। এবং, ভারত ভ্যাকসিনের প্রধান নির্মাতা। তদুপরি, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষার আয়োজন করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, ব্রাজিল, আমিরাত চীনের  ভ্যাকসিনের পরীক্ষার আয়োজন করছে। অস্ট্রেলিয়া তাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছে। তারা ভ্যাকসিনের ক্লিনিকাল পরীক্ষার জন্য কোনও দেশ বেছে নেয়নি। যদি বাংলাদেশ চীনের ভ্যাকসিনএর ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পন্ন করে, তবে চীন ক্লিনিকাল ট্রায়ালের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে সুবিধা পাচ্ছে- কেন বাংলাদেশকে সমান ভাবে বরাদ্দ করা হবে না যদি বাংলাদেশের উৎপাদন ক্ষমতা থাকে।  যদি অক্সফোর্ড ব্যর্থ হয়, তবে কেন ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমানভাবে বিবেচনা করা হবে না- কারণ তারা তাদের সাফল্যের জন্য বাকী বিশ্বের মানুষকে সুবিধা দেবে ।

এই জটিল ও যৌক্তিক সমস্যাগুলোর একটি সন্তোষজনক উত্তরের প্রয়োজন। ক্লাসিকাল নৈতিক নীতিগুলো ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের সুবিধাগুলো বিতরণের জন্য কার্যকর হতে পারে কি?

জন রলসের প্রিন্সিপল অফ ডিফারেন্স পিছিয়ে পড়া মানুষদেরকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলে। সেই বিবেচনায় স্বল্প আয়ের দেশগুলো বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু যারা আবিষ্কার করলো তাদের অধিকার ক্ষুন্ন হয় কি না সেটা গভীর ভাবে ভেবে দেখার বিষয়। 

অক্সফোর্ড যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে সেটির পেছনে যুক্তরাজ্যের কলোনিভুক্ত দেশগুলোর অবদান আছে। অনুরূপ একটি ধারণা ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ ফেরার সময় ব্রিটিশ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে দিয়েছিলেন। সুতরাং, প্রথম বিবেচনায় যুক্তরাজ্য ভ্যাকসিন পেলেও অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র সহ ৫৩টি রাষ্ট্র ভ্যাকসিনের দাবি নৈতিকভাবে করতে পারে। আনন্দের বিষয় হলো ভারত অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন বাংলাদেশের সঙ্গে শেয়ার করবার জানিয়েছে।

পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবনীতিবিদ এজকাল ইমানুয়েল WHO এর পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে দেশ গুলোর শুরু থেকেই তালিকার শীর্ষে সে দেশ গুলোর থাকা উচিত।

ভ্যাকসিন বন্টনের বিষয়টিকে তিনি পরিস্থিতিকে উপচে পড়া জরুরি বিভাগে আগত রোগীদের মুখোমুখি একজন চিকিৎসকের সাথে তুলনা করেন। “ডাক্তার ওয়েটিং রুমে প্রবেশ না করে বললেন, ‘আমি ওয়েটিং রুমে বসে থাকা  প্রত্যেককে ৩ মিনিট সময় দিচ্ছি।’ ডাক্তার আরও বলেছেন:‘ ঠিক আছে, সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায়  কে আছেন? আমি প্রথমে তাদেরকে সেবা দিতে যাচ্ছি’।এই রকম একটি মুহুর্তের কথা উল্লেখ করে ইমানুয়েল বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড বা আফ্রিকার অনেক দেশগুলোতে ভ্যাকসিন প্রেরণ করা হলে কভিড -১৯ থেকে মৃত্যুর পরিমাণ হ্রাস করতে তেমন কিছু করতে পারেন না- কারণ এই দেশগুলিতে সংক্রমণের  হার কম রয়েছে ; তিনি বলেন, এই (দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড বা আফ্রিকার অনেক দেশ) ভ্যাকসিন অন্য কোথাও ব্যবহারের জন্য অনুমতি দিলে আরও সুফল অর্জন করা যেতে পারে।

তবে WHO র ব্রুস অ্যালওয়ার্ড মন্তব্য করেছেন যে নতুন প্রাদুর্ভাবগুলি হঠাৎ করে নতুন জায়গায় সংক্রমণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, আমরা একটি সর্বব্যাপী হুমকি (ভাইরাস) এবং সর্বব্যাপী দুর্বলতা (অত্যন্ত সংবেদনশীল উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী) নিয়ে কাজ করছি! অতএব আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে দ্রুত ঝুঁকি হ্রাসের দিকে যাওয়া উচিত।

আসুন স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ভ্যাকসিন ক্রয় এবং বিতরণের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী মহামারী COVID-19-কে মোকবেলা করার জন্য WHO এর নীতি পরীক্ষা করি। WHO তাদের নীতিমালা: "ন্যায্য বরাদ্দ মেকানিজম" দুটি পর্যায়ে ভ্যাকসিন বিতরণের প্রস্তাব করেছে। প্রথম পর্যায়ে, সমস্ত দেশ তাদের জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে  ভ্যাকসিন পাবে ; প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন তাদের জনসংখ্যার ৩% এর সমান পরিমান দেয়া হবে ,সেখান থেকে, প্রথম ডোজ স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক যত্নের সম্মুখভাগের কর্মীদের দেয়া হবে।

তারপরে, কোনও জাতির ২০% জনসংখ্যার সমপরিমাণ না পাওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে। ডাব্লুএইচও অনুমান করে করে যে এই ডোজাগুলো COVID-১৯ থেকে সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের টিকা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হবে: বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের কম্বারবিডিটিস রয়েছে তাদের।

WHO কাঠামোটি প্রস্তাব দেয় দুটি মানদণ্ড অগ্রাধিকার সিদ্ধান্ত নিতে ব্যবহার করা উচিত: ভাইরাসটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে (কার্যকর প্রজনন সংখ্যা) এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা বা হামের মতো অন্যান্য রোগজীবাণু একই সাথে ছড়াচ্ছে কিনা; এবং হাসপাতালে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের অধিগ্রহণের মতো মেট্রিকের উপর ভিত্তি করে কোনও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা দুর্বল সেটা বিবেচনা করা।

আমরা যে নীতিমালা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে পেয়েছি তার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে- কিভাবে ধনী দেশগুলোর জাতীয়তাবাদী চিন্তা এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। আমরা এটাও জানি যুক্তরাষ্ট্র WHO থেকে নিজেদেরকে প্ৰত্যাহার করে নিয়েছে। আমরা বিভিন্ন মহল থেকে ভারত -চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আলোচিত হতে দেখছি। আমরা এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছি। এমন একটি পরিস্থিতিতে অতীতের মতো স্বল্প আয়ের দেশগুলো বঞ্চনার শিকার হবে বলে অনুমান করতে পারি। 

বাংলাদেশ বিভিন্ন ভাবে বিপদে মধ্যে আছে অনুমান করা যায়। এসময় সকলকে শান্ত থাকতে হবে এবং হটকারী সিদ্বান্ত থেকে দূরে থাকতে হবে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন পুরো জাতি বিভাজিত। মাত্র ৩% ভোটার কোনো পক্ষ গ্রহণ করেননি। সুতরাং, বিষয়টা সকলকে ভাবনায় ফেলছে। মহামারীর এই সময়ে রাজনীতিকে দূরে রাখা খুবই জরুরি। কিন্তু সেটার পরিবর্তে চারপাশ থেকে ভিন্ন খাতে দৃষ্টি ফেরানোর অপচেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ভারতের পত্রিকাগুলো এবং দলগুলো বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যা খুবই বেদনাদায়ক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো যেভাবে আবর্তিত হচ্ছে তাতে ভয়ের অনেক কারণ আছে। ভারত ও চীন উভয়ে বলেছে তাঁরা ভ্যাকসিন শেয়ার করবে। অপরদিকে রাশিয়া বাংলাদেশে ভ্যাকসিন দিতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। এখনো কোনো জাতীয়তাবাদ চেতনা আমাদের সম্পর্কে চিড় ধরাতে পারেনি। পৃথিবীর অন্য কোথাও ভ্যাকসিন নিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি হোক কারও কাম্য নয়। জাতিসংঘে এখনও চীন ও যুক্তরাষ্ট্র  বিতর্কে যুক্ত। ভয়ের কারণ এখানেই অনেকের। 

বাংলাদেশ ভালো থাকুক যদি আমাদের সকলের নীতি হয় তবে আমাদের সতর্ক আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয়তাবাদের উর্ধে ধনী দেশগুলো যাতে উঠতে পারে সেজন্য আমাদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বন্ধুত্বকে মর্যাদা দিতে আমরা আমাদের পুরনো বন্ধুদেরকে যেন সম্মান করি। এ রকম ভারসাম্য মূলক নীতির চর্চা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আশা করি বাংলাদেশ সরকার সকল বন্ধু রাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হবে এবং মহামারী থেকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সংগ্রহে সফল হবে। 

লেখকদ্বয়ঃ অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়