ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স - আমার জীবনের গল্প

ড. সেলিম মাহমুদ
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার, ১০:৫২ পিএম
কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স - আমার জীবনের গল্প

 

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর একটি অভিশপ্ত ও কাল দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে খুনি মোশতাক- খুনি জিয়ার যৌথ ও অবৈধ সরকার কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেছিলো। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের দোহাই দিয়েই দীর্ঘ ২১ বছর সপরিবারে জাতির পিতার হত্যার বিচার বন্ধ রাখা হয়েছিলো।  

স্কুল জীবন থেকেই জাতির পিতার হত্যাকান্ড নিয়ে নানা কথা শুনেছিলাম। যা শুনেছিলাম তার কিছু ছিল সত্য, বাকিটা মিথ্যাচার l ১৫ই আগস্টে খুনি চক্র শুধু জাতির পিতাকে শারীরিকভাবেই হত্যা করেনি, প্রায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তার রাজনৈতিক চরিত্র হনন করার চেষ্টা করে আসছিলো । খুনি চক্র ও তাদের সুবিধাভোগিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মাধ্যমে তাদের নির্মম হত্যাকান্ড ও অবৈধ শাসনকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলো ।

সেই স্কুল জীবন থেকে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিলো, জাতির পিতাকে কারা হত্যা করলো? কেন হত্যা করা হলো? আমার বাবা বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে সেনাবাহিনীর কিছু বরখাস্ত হওয়া ও বিপথগামী অফিসার একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হত্যা করেছিল। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল কারণ তিনিই এই দেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এই দেশের প্রকৃত জাতীয়তাবাদী নেতা। একই কথা আমার বড়ো ভাইও বলেছিলেন। তিনি বর্তমানে একজন জেলা জজ হিসেবে কর্মরত। স্কুল জীবনে বিভিন্ন সময়ে কিছু ক্লাশমেটের কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু কথা শুনেছিলাম। তারা মূলত তাদের পরিবার থেকেই এই কথাগুলো জেনেছিল। শিশু অবস্থায়ই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এই কথা গুলো মিথ্যাচার। পরে জানতে পারলাম, ঐ ক্লাশ মেটদের বাবারা পাকিস্তান পন্থী ছিলেন।

আমাদের শৈশব আর কৈশোর কেটেছিল ইতিহাস বিকৃতি, অপপ্রচার আর মিথ্যাচারের এক অন্ধকার সময়ের মধ্যে দিয়ে। তবে, শৈশব থেকেই আল্লাহ প্রদত্ত আমার একটা ক্ষমতা রয়েছে। কেউ কোন মিথ্যা তথ্য দিলে আমি সেটা বুঝতে পারি। তাই বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে ১৫ই আগস্ট পরবর্তী শাসকেরা যে মিথ্যাচার আর অপপ্রচার চালিয়েছিল, সেগুলো আমার মনোজগতে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আমাদের পরিবারে যে কথা শুনেছিলাম, আমার মনে সেটাই গেঁথে গিয়েছিলো। তাছাড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর অবদান, তাঁর ক্যারিশমেটিক  ব্যক্তিত্ব, সপরিবারে জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার বিষয়টি শৈশবেই আমার মনে ভীষণ দাগ কেটেছিল। ঐ সময়ে নিজের অজান্তেই এটিকে একটা হাইপোথিসিস হিসেবে ধরে আমার চিন্তা- চেতনা আবর্তিত হয়েছিলো। পরবর্তী জীবনে অধিকতর পড়াশুনা আর তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে আমার সেই হাইপোথিসিস আমি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে পেরেছিলাম।

আমি স্কুল জীবন থেকে শুনে আসছিলাম, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা যাবে না কারণ যারা তাঁকে  হত্যা করেছে, তারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে আরও সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারলাম, এই বিচার করা যাবে না কারণ ১৫ই আগস্টের পরের অবৈধ সরকার গুলো আইন করে বিচার বন্ধ রেখেছে।  এই আইন সম্পর্কে কেও কেও এমনভাবে উপস্থাপন করতো যেন এটি একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তামূলক আইন এবং এই আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের একজন ‘শত্রুর’ হত্যার বিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা কি রকম একটা বর্বর, নির্মম, অসভ্য আর পৈশাচিক অবস্থার মধ্যে ছিলাম যে, রাষ্ট্রের জনক আর জাতির পিতার প্রতি এই ধরণের আচরণ করেছিলো এই দেশেরই  কিছু মানুষরূপী পিশাচ। এরা আর কেও নয়; পঁচাত্তরের খুনি এবং পঁচাত্তর পরবর্তী অবৈধ সরকার পরিচালনাকারি ব্যক্তি গুলো আর তাদের সুবিধাভোগী কুলাঙ্গাররা।  আমার যতদূর মনে পরে, এই কালো আইন নিয়ে কেও প্রকাশ্যে কথা বলতো না। তবে পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতা বিরোধী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদেরকে এই আইনের পক্ষে কথা বলতে শুনেছি। আমরা তাদেরকে চ্যালেন্জ‌  করলে তারা আবার পিছু হটত।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আগে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করার আইনটির নাম আমি  জানতাম না। ঐ সময়ে পত্র পত্রিকায় এই কালো আইনটির নাম কখনও আসতো না। আমার ধারণা, দেশের হাতে গোণা কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া এই আইনটির নাম দেশের কোন মানুষই জানতো না। ১৯৮৮-৮৯ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আমি বেশ গুরুত্ব দিয়ে আইন বিষয়ক অধ্যয়ন শুরু করলাম। ১৯৮৯ সালে ড. আলীম আল রাজীর The Constitutional Glimpses of Martial Law বইয়ে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স  নামটি প্রথম আমি দেখেছিলাম; যদিও বইটিতে মূলত আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দর্শন প্রতিফলিত হয়েছিলো। ড. আলীম আল রাজীর বই এ  ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স  নামটি দেখার পর আমি এই  আইনটি সংগ্রহ করে ভাল ভাবে পড়লাম; যতবারই পড়েছি, ততবারই অবাক হয়েছি। কোন সভ্য দেশে এই রকম একটি আইন থাকতে পারে, সেটি আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আইন শাস্রের একজন ছাত্র হিসেবে এই কালো আইনটিকে জুরিস্প্রুড্যান্স, আমাদের সংবিধান এবং দেশের অপরাপর আইনের আলোকে বিশ্লেষণ করলাম। প্রতিটি বিশ্লেষণে দেখলাম, এটি একটি অসভ্য ও বর্বর আইন। একজন আইনের ছাত্র হিসেবে ১৯৮৯ সাল থেকেই এই কালো আইনটি নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করেছিলাম। ১৯৯১ সালে আমি এটি নিয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছিলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র অবস্থায় এই কালো আইনটি নিয়ে আমি অনেক কাজ করেছিলাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এই বিভাগেরই ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক হিসেবে সরকার ও রাজনীতি, সাংবিধানিক আইন, হিস্ট্রি অফ পলিটিকেল থট, রোমান আইন ইত্যাদি বিষয় আমি পড়িয়েছিলাম। পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি জ্বালানি আইন ও পলিসি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলাম। মূলত আমার গবেষণা জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিলো ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স নিয়ে গবেষণার মাধমেই। ছাত্র জীবনে এই কালো আইনের বিরুদ্ধে অনেক স্লোগান দিয়েছিলাম। ঐ সময় গুলোতে এই আইনের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক প্রতিবাদ আর ঘৃণা উচ্চারিত হয়েছিলো।  

এই কালো অধ্যাদেশটি ১৯৭৫ সালের ১৯ নম্বর (XIX) অধ্যাদেশ হিসেবে গেজেট ভুক্ত হয়। অন্যান্য আইনের মতো এটির লং টাইটলে (Long Title) এই কালো আইনটির উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়। এতে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এবং সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এর পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও কর্ম সম্পাদন সহ এই ঘটনার সাথে যারা যুক্ত ছিল,তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নিষিদ্ধ করতে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

অধ্যাদেশটির প্রথম অংশে বলা হয়, প্রতিরক্ষা বাহিনীর চাকুরি সংক্রান্ত আইন সহ অন্যান্য আইনে যা কিছু  থাকুক না কেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এবং সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এর পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও কর্ম সম্পাদনসহ এই ঘটনার সাথে যারা যুক্ত ছিল,তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট এবং সামরিক আদালত (কোর্ট মার্শাল) সহ কোন আদালতে সকল প্রকার মামলা সহ যে কোন আইনি ব্যবস্থা কিংবা শৃঙ্খলা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না ।

অধ্যাদেশটির দ্বিতীয় অংশে বিধান করা হল, প্রত্যেক খুনির অনুকূলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করা হবে এবং এই সার্টিফিকেট ধারী খুনিদের এই হত্যাকাণ্ড ও অবৈধভাবে সরকার উৎখাতের ঘটনার কারণে কোন বিচার করা যাবে না।

এই অর্ডিন্যান্সে যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল শুধুমাত্র তাদেরকেই বিচারের বাইরে রাখা হয়নি, যারা পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল তাদেরকেও রক্ষা করা হয়েছিলো। এই অর্ডিন্যান্সে সুস্পষ্টভাবে সেটি উল্লেখ আছে। আমাদের দণ্ডবিধিতে যে সকল অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া আছে, তাতে আলাদা ভাবে এটি বলা নেই যে, অপরাধের পরিকল্পনার সাথে যারা যুক্ত, তারাও অপরাধী। এটি আলাদা ভাবে বলার প্রয়োজন পড়ে না; কারণ এটিই আইনের মূল বিধান যে, অপরাধের পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ব্যক্তিও অপরাধী। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সে এটি আলাদা ও সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করায় এটি বুঝা যায় যে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, ষড়যন্ত্রকারী ও আয়োজকরা নিজেদের রক্ষার জন্য বেশ সতর্ক ছিল। বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অর্ডিন্যান্স জারী করতে দুই-একদিন সময় লাগে। ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সকল ষড়যন্ত্রকারীকে রক্ষার জন্যই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারী করতে খুনি মোশতাক-জিয়া সরকার এক মাস এগারো দিন সময় নিয়েছিল। তৎকালীন সময়ের আইন মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে তারা এই আইনের খসড়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রস্তুত করেছিলো। 

পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন দেশের রাজা, সম্রাট, রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান হত্যার বিষয়টি নতুন কোন বিষয় নয়। এই ধরণের হত্যাকাণ্ড কে  ‘রেজিসাইড’ (regicide) বলা হয়। ইতিহাসের প্রাপ্ত  তথ্য অনুযায়ী খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৫২-এ  প্রথম ‘রেজিসাইড’ সংঘটিত হয়। এই ধরণের ঘটনা যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংঘটিত হয়েছে। তবে পৃথিবীর কোথাও  ‘রেজিসাইড’ সংঘটিত হওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়নি। ১৫ই আগস্টে জাতির পিতাকে তার পুরো পরিবার, এমনকি শিশু পুত্র রাসেল কে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, এই রকম নৃশংস ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। পৃথিবীর কোথাও ‘রেজিসাইড’ এর ক্ষেত্রে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মতো কালো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে এই রকম দ্বিতীয় ঘটনা আর ঘটেনি।

জাতির পিতাকে হত্যার পর স্বাধীন বাংলাদেশে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারির ফলে তিনটি মৌলিক বিষয় সামনে চলে এসেছিলঃ এক. পৃথিবীতে ‘রেজিসাইড’ এর ঘটনা অনেক থাকলেও কোন রাষ্ট্রের জনকের হত্যার ঘটনা খুবই বিরল। রাষ্ট্রের জনকের হত্যা আর রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের হত্যার ঘটনা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের জনককে হত্যা মানে রাষ্ট্রকেই হত্যা আর জাতির পিতাকে হত্যা মানেই জাতিকে হত্যার সামিল। এটি শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, এটি সরবচ্ছ রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ। কোন রাষ্ট্রের জীবদ্দশায় সেই রাষ্ট্রের জনকের হত্যার বিচার সেই রাষ্ট্রে নিষিদ্ধকরণের আইন জারীর ঘটনা রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও জুরিসপ্রূডেন্সে নেই। এই ঘটনায় একটি সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের আর কোন মর্যাদা রইল না; স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে মর্যাদা জাতির পিতাই আমাদের জন্য এনে দিয়েছিলেন।

দুই. এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারির ফলে এদেশে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। গনতন্ত্রের বিপরীতে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, নির্বাচনের বিপরীতে হত্যা, ক্যু ও খুন-খারাবির রাজনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে সংবিধান বহির্ভূত- অসাংবিধানিক ও সামরিক শাসনকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স এদেশে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্বাচনের পরিবর্তে হত্যা, ক্যু আর ষড়যন্ত্রকেই মূল পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। 

তিন. কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স এদেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আমাদের সংবিধান এবং আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়; বিশেষ ভাবে, দেশের ফৌজদারি আইন সকলের জন্যই প্রযোজ্য। সকল দেওয়ানি আইন সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও, ফৌজদারি আইন সমুহ সবার জন্য প্রযোজ্য। কেউই ফৌজদারি আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অর্থাৎ কেও অপরাধ করলে তার বিচার হবেই। দেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোন ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায় না বা চালু রাখা যায় না এবং তাঁর গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোন আদালত হতে পরোয়ানা জারী করা যায় না। তবে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একই বিষয়ে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং তাঁর বিচারের ক্ষেত্রে কোন আইনি বাধা নেই।

১৫ই আগস্টের পর থেকে খুনিদের পক্ষে একটা কথা বলা হচ্ছিল – তাদের বিচার করা যাবে না, কারণ তারা বিপ্লবী; এদেশে তারা বিপ্লব সংঘটিত করেছে। ১৫ই আগস্টকে তারা বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেছিলো ! বিপ্লব অর্থ কি ? কেন খুনিরা স্বপরিবারে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডকে বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেছিলো? তাদের এই উক্তিতেই ৭৫ এর এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য উদ্ঘাটিত হয় । বিপ্লব অর্থ হচ্ছে একটা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা ধ্বংস করে আরেকটি নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিটা বিপ্লবের ক্ষেত্রে সে দেশের জন্য নতুন সংবিধান তৈরি করা হয়। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। খুনিরা এবং ১৫ই আগস্টের সুবিধাভোগীরা ১৫ই আগস্ট কে বিপ্লব বলেছিল, কারণ তারা জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে পাকিস্থান পন্থী একটি বিকৃত রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল। ১৫ই আগস্টের পর তারা সংবিধানকে যেভাবে ক্ষত- বিক্ষত করে এর মৌলিক আদর্শ গুলো বাতিল করেছিলো, তাতেই এটি প্রতিফলিত হয় যে, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করে আরেকটি বিকৃত রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিল।

রাষ্ট্র ধ্বংসকারী এই অপরাধের জন্য তাদেরকে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধেও বিচার করা যেতো। আবার, তৎকালীন সময়ে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত খুনিদেরকে কোর্ট মার্শালেও বিচার করা যেতো। সেই আশংকা থেকেই খুনি মোশতাক- খুনি জিয়ার যৌথ সরকার ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সে একটি overriding clause  যুক্ত করে। তাতে  ‘অন্যান্য আইনে যা কিছু  থাকুক না’ শব্দগুলো যুক্ত করে। ঐ overriding clause  এ বলা হয়,  প্রতিরক্ষা বাহিনীর চাকরি সংক্রান্ত আইন সহ অন্যান্য আইনে যা কিছু  থাকুক না কেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এবং সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এর পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও কর্ম সম্পাদনসহ এই ঘটনার সাথে যারা যুক্ত ছিল,তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট এবং সামরিক আদালত (কোর্ট মার্শাল) সহ কোন আদালতে সকল প্রকার মামলা সহ যে কোন আইনি ব্যবস্থা কিংবা শৃঙ্খলা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সে খুব সতর্কভাবে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রকারী ও পরিকল্পনাকারীদের বিচারের বাইরে রাখা হয়েছিলো, কারণ এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল জিয়াউর রাহমান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাথে সাথেই জিয়া সেনা প্রধান নিযুক্ত হয়। খুনি জিয়া সহ সকল পরিকল্পনাকারীদের রক্ষা করতেই এই বিধান করা হয়। খুনি জিয়া জাতির পিতার হত্যার মূল ষড়যন্ত্রকারী ছিল বলেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারির প্রায় চার বছর পর জিয়ার রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্টে  ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স কে কন্সটিটিউশনাল রেটিফিকেশন প্যাকেজের আওতাভুক্ত করে একে বৈধতা দেয়া হয়। সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী এই ধরণের বৈধকরণ প্রক্রিয়া অসাংবিধানিক ও অবৈধ। বাংলাদেশের সরবচ্ছ আদালত এই পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করেছে। খুনি জিয়া নিজেকে রক্ষার জন্য এবং তার অসাংবিধানিক শাসনকে নিষ্কণ্টক রাখার জন্য ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে স্থায়ি আইনে পরিণত করতে চেয়েছিল। সেজন্যই পঞ্চম সংশোধনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত করেছিলো।

একটি স্বাধীন দেশে সেদিন সপরিবারে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডকে মধ্যযুগীয় কায়দায় ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটির’ (Doctrine of Necessity) কথা বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দেয়া হয়। খুনি চক্রের এই ঘৃণ্য বৈধকরণ প্রক্রিয়া এদেশে বহু বছর অব্যাহত ছিল। আগস্ট হত্যার মূল পরিকল্পনা কারীদের পরামর্শে খুনি মোশতাক কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জাতির পিতার হত্যার বিচার প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রেখেছিল। পিতার হত্যার বিচারের জন্য আমরা দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। ১৫ই আগস্ট পরবর্তী সরকারগুলো ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের দোহাই দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে দেয়নি। তারা মূলতঃ খুনিদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গনতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর আমরা সংসদে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিলের দাবি করেছিলাম। বিএনপি তখন বলেছিল, এই অর্ডিন্যান্স বাতিল করা যাবে না, কারণ এটি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে। আমরা বার বার বলেছিলাম, এটি একটি সাধারণ আইন যা সংসদে Simple Majority দিয়ে বাতিল করা যায়। তারা বিচারের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিলো। তাদের ঐ পাঁচ বছরের মেয়াদে জাতির পিতার হত্যার বিচারের বিষয়ে তারা একটি ইতিবাচক কাজও করেনি। বরং তারা খুনিদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো; তাদের পুরস্কৃত করেছিলো। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সরকার খুনিদের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকুরী দিয়েছিল। আশির দশকে সরকারের পক্ষ থেকে খুনিদের একটি ব্যাংকও দেয়া হয়। এমনকি পরবর্তীতে ১৫ই ফেব্রুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি রশিদকে খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়ে জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করেছিলো।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আমরা জয়লাভ করে সরকার গঠন করে সংসদে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করেছিলাম। এর ফলে প্রচলিত আদালতে সপরিবারে জাতির পিতার হত্যার বিচার শুরু হয়েছিলো। ট্রায়াল কোর্ট হিসেবে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছিলো। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর উচ্চতর আদালতে এই মামলার কার্যক্রম উদ্দেশ্যমূলক ভাবে থামিয়ে দিয়েছিলো। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ জয়লাভ করে সরকার গঠন করার পর উচ্চতর আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে বিএনপি- জামাতের সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয় এবং বহু প্রতিক্ষিত এই বিচার সম্পন্ন হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত কয়েকজন খুনি এখনও বিদেশে পলাতক থাকায় রায় এখনও সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করা যায়নি। পলাতক খুনিদের খুজে বের করে এই রায় কার্যকর করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্র সমুহ সহ সকলের সহযোগিতা চাই। এছাড়া, বিচারের সময় জীবিত না থাকার কারণে জিয়া-মোশতাক সহ এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা কারীদের বিচার করা যায়নি। আমরা মনে করি, ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতা ও অগ্রাধিকার রয়েছে। এই আলোকে এখন সময় এসেছে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং  সুবিধাভোগীদের নাম উম্মোচিত করার।

যারা আজ অপপ্রচার চালাচ্ছে, এই দেশে ন্যায় বিচার নেই । তাদের উদ্দেশে বলছি, আপনারা ন্যায় বিচারের কথা বলছেন। শেখ হাসিনার সরকার এদেশে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। খুনি মোশতাক - খুনি জিয়া গং এবং তাদের লিগ্যাসি যারা বহন করেছে, তারাই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। ২১ বছর আমরা ন্যায় বিচার তো দূরের কথা, বিচারই চাইতে পারিনি। বিচার চাওয়ার জন্য মামলাই করতে পারিনি। আমাদের বিচার চাইবার অধিকারই ছিল না। আজ তারা গণতন্ত্র, আইনের শাসন আর  মানবাধিকারের কথা বলছেন ।তারাই এদেশে জাতির পিতার হত্যার বিচার অবৈধ আইন করে বন্ধ রেখেছিলো। তাদের মুখে আইনের শাসন আর মানবাধিকারের কথা মানায় না। আইনের শাসন ও মানবাধিকারের নীতির আলোকে এই ধরণের ঘটনা চিন্তাও করা যায় না।

 

লেখকঃ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ