ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কোভিড- ১৯: বাংলাদেশ এবং এর গবেষণা উদ্যোগসমূহ

অধ্যাপক ডা: কাজী মনিরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২০ রবিবার, ০৫:০০ পিএম
কোভিড- ১৯: বাংলাদেশ এবং এর গবেষণা উদ্যোগসমূহ

সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে বসে প্রতিদিন আমি কয়েকটি বাংলাদেশি অনলাইন সংবাদপত্র পড়ি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে কোভিড-১৯ অ্যান্টিবডি টেস্টের গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশের পরে বিভিন্নজনের মধ্যে অস্বস্তি, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এবং কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি লক্ষ্য করেছি। কর্মকর্তারা যে ভীতসন্ত্রস্ত তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। অতীতের ব্যর্থতা, বোঝার ও দক্ষতার অভাব থাকায় তারা ভীতসন্ত্রস্ত, নাকি গ্রহনযোগ্যতা ও চাকরি হারানো এবং ভবিষ্যতে পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এই ভেবে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন ?

ভারতে অ্যান্টিবডি টেস্টের গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েকটি রাজ্যে ৫০ ভাগের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সেখানে এই রিপোর্ট প্রকাশের সময় বাংলাদেশের মত এত শোরগোল হয়নি। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এবং ভারতীয় অর্থনীতির খারাপ অবস্থা সত্ত্বেও আমার এরকম কোনো বিতর্ক চোঁখে পড়েনি! এটিকে সরকারের ব্যর্থতা হিসাবে দেখা হয়নি! আমাদের জেনে রাখা দরকার অ্যান্টিবডি টেস্ট বিশ্বের অনেক দেশেই করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে। আমার আগের লেখাগুলো পড়লে আপনি দেখবেন যে,  আমি বাংলাদেশে কোভিড- ১৯ পরিস্থিতির ব্যাপকতা জানতে বারবার অ্যান্টিবডি টেস্ট করার জন্য বলেছি।

গবেষণাটির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্ক ও ইতিবাচক আলোচনা করতে পারি। ভবিষ্যতে কীভাবে আমরা আরও ভাল গবেষণা চালাতে পারি সেটাই এই বিতর্ক এবং আলোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। তবে সর্বাগ্রে প্রত্যেকেরই বিজ্ঞানীদের আন্তরিক উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে তাদের উৎসাহিত করা এবং এই সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় গবেষণায় বিনিয়োগ করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানানো উচিৎ। বিভিন্ন ব্যক্তি বা মিডিয়া ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণাটি ব্যাখ্যা করতে পারেন। আমরা এটা বন্ধ করতে পারব না। কিন্তু অযথা একে অন্যকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করবে এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সামনে এনে নিজেদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করবে।

অ্যান্টিবডি কি এবং অ্যান্টিবডি টেস্টের প্রয়োজন কেন সে প্রসঙ্গে শুরুতে কিছু কথা বলে নেই

কোভিড-১৯ সংক্রমণ বা অন্য কোনো সংক্রমণের পরে প্রায় সমস্ত সুস্থ-সবল ব্যক্তির শরীরে ঐ রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়। অ্যান্টিবডি সশস্ত্র বাহিনীর মত আক্রমণকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং তাকে মেরে ফেলে আমাদের দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। কিছু মানুষের অ্যান্টিবডি তাদের অসুস্থতা শুরুর প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সনাক্ত করা যায়। কোভিড-১৯ সংক্রমণের বেলায় আইজিএম এবং আইজিজি অ্যান্টিবডিগুলি অসুস্থতা শুরুর ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে সিরামের মধ্যে প্রায় একসাথে তৈরি হতে পারে। সংক্রমণের পরে আমাদের দেহে কতক্ষণ আইজিএম এবং আইজিজি অ্যান্টিবডিগুলি সনাক্তযোগ্য থাকে তা জানা যায়নি।

সংক্রমণের পর কিছু মানুষের শরীরে আইজিজি এবং আইজিএম এর উপস্থিতি নাও সনাক্ত করা যেতে পারে। সুতরাং, নেগেটিভ রিপোর্ট এবং সনাক্তযোগ্য আইজিএম ও আইজিজি অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতি তাদের পূর্বে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাকে বাতিল করে না। কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে রক্তে আইজিএ এবং অন্যান্য অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা কমই জানি। কারো শরীরে নিরপেক্ষ অ্যান্টিবডিও তৈরি হতে পারে। তবে অ্যান্টিবডি সনাক্তকরণের জন্য দেশে অবশ্যই একটি ৪ স্তরের (সর্বোচ্চ স্তর) বায়োসফটি পরীক্ষাগার থাকতে হবে।

নির্দিষ্ট রিএজেন্ট এবং ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার সাহায্যে আমরা আমাদের দেহে আইজিজি, আইজিএম এবং আইজিএর মত ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবডির উপস্থিতি সনাক্ত করতে পারি। যদিও বিজ্ঞানীরা জানেন না যে, কোভিড-১৯ এর বেলায় কত সময় পর্যন্ত অ্যান্টিবডি সনাক্ত করা যায়, তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সংক্রমণ নির্ণয়ের জন্য আইজিএম সবচেয়ে কার্যকর এবং এটি সাধারণত সংক্রমণের পরে কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস পর্যন্ত সনাক্ত করা যায়। আইজিজি কয়েক মাস বা বছর পর্যন্ত সনাক্তযোগ্য হতে পারে। আইজিএ শ্লেষ্মা প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্ত ছাড়াও লালা জাতীয় শ্লেষ্মা নিঃসরণ থেকে এটি সনাক্ত করা যেতে পারে, যদিও কোভিড-১৯ সংক্রমণে এর ভূমিকা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। এ পরীক্ষাগুলো মাঠপর্যায়ে বা পরীক্ষাগারে দ্রুত (৩০ মিনিটেরও কম সময়ে) করা যায়।

সাধারণ জনগণের মধ্যে করোনাভাইরাসের বিস্তার বুঝতে এবং সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠীগুলো চিহ্নিত করতে অ্যান্টিবডি টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারো মধ্যে সংক্রমণের কোনো লক্ষণ না থাকলেও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার সাহায্যে সনাক্ত করা যায় সে পুর্বে সংক্রমিত হয়েছিল কিনা। অন্যদিকে পিসিআর বা অ্যান্টিজেন সনাক্তকরণ পরীক্ষা দ্বারা তীব্রভাবে সংক্রমিত ব্যক্তিদের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত করা যায়। অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির শরীরে প্রবেশকৃত ভাইরাসের বিরুদ্ধে জীবদেহের প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা যায়। এটি পূর্বে কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত বা সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী সনাক্ত করতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে।  

কোভিড- ১৯ মহামারী পর্যবেক্ষণ এবং এটি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে অ্যান্টিবডি টেস্ট খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্বে সংক্রমিত জনসংখ্যার অনুপাত নিরূপণ করতে এবং নিরাপদ ও সম্ভাব্য সুরক্ষিত জনসংখ্যা সম্পর্কে তথ্য পেতে এ পরীক্ষাগুলো সহায়তা করে। কোন কমিউনিটি সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হয়েছে এবং সাময়িকভাবে কাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কম তা অ্যান্টিবডি টেস্টের জনতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক ফলাফলের চিত্র দেখে বের করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে, অ্যান্টিবডি টেস্টের ফলাফল সম্ভাব্য কোভিড- ১৯ এ সংক্রমিতদের সনাক্ত করতে এবং কোভিড- ১৯ এ আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের সম্ভাব্য চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্লাজমা কারা দিতে পারবে তাদের খুঁজে পেরে সহায়তা করে।

বাংলাদেশে অ্যান্টিবডি টেস্ট সমীক্ষা প্রসঙ্গে ফিরে আসি

২১ মিলিয়ন জনসংখ্যা বিশিষ্ট ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকায় করোনার বিস্তার সম্পর্কে জানতে একটি সমীক্ষা চালানো হয় হয়। সমীক্ষাটি সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। ইউএসএআইডি-এর সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি ১৮ এপ্রিল থেকে ৫ জুলাইয়ের মধ্যে এই সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষায় রাজধানীর ৩,২২৭ টি পরিবারের ৫৫৩ জন উপসর্গযুক্ত এবং ৮১৭ জন উপসর্গবিহীন মানুষের আইজিজি এবং আইজিএম পরীক্ষা করা হয়েছে। এছাড়া বস্তিতে থাকা ৯৬০ পরিবারের ৯৬ জন উপসর্গযুক্ত ও ৩১৪ জন উপসর্গবিহীন মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের  অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে এবং বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে এই হার ৭৪.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তাদের অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড -১৯ সংক্রমিতদের মধ্যে ষাটোর্ধ্বদের সংখ্যা শতকরা ২৪ ভাগ এবং ১৫-১৯ বছর বয়সীদের সংখ্যা শতকরা ১৬ ভাগ। সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, করোনা টেস্টে পজিটিভ আসা লোকদের মধ্যে শতকরা ৮২ জনের কোনো উপসসর্গ ছিল না এবং তারা সংক্রমণের ব্যাপারে সতর্কও ছিল না। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কোভিড-১৯ বাংলাদেশে আসে এবং মার্চের মধ্যে এই ভাইরাসটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জিনোমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,  ভারত, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কোভিড- ১৯ সংক্রমিতরা বাংলাদেশে এসেছে।

হ্যাঁ, আমরা গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনার আকার, এর বাছাই প্রক্রিয়া, পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা এবং প্রাপ্ত ফলাফলের সরলীকরণ নিয়ে বিতর্ক করতে পারি। আমরা এটিও বলতে পারি যে, সমীক্ষাটি এখনো বিশেষজ্ঞ দ্বারা পর্যালোচনা করা হয়নি। অথবা ফলাফল ঘোষণার আগে সরকারি সব রীতিনীতি অনুসরণ করা হয়নি। কোভিড-১৯ একটি জরুরি অবস্থা। এ রোগটি সম্পর্কে অনেক কিছুই আমাদের অজানা। এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের একসাথে কাজ করা প্রয়োজন। তাই, সর্বদা এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমালোচনা করা উচিৎ নয়। বরং আমাদের গর্ব করা উচিৎ এই কথা ভেবে যে অনেক সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতা থাকা সত্ত্বেও আমরা বাংলাদেশে অ্যান্টিবডি সমীক্ষা চালিয়েছি।

গবেষণাটি আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করতে এবং আরো ভালোভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়তা করবে। হ্যাঁ, গবেষণালব্ধ ফলাফলকে পরিবর্তন করতে নয়, বরং সীমাবদ্ধতা ও বিভ্রান্তি এড়াতে ভবিষ্যতে আমাদেরকে গবেষণার সমস্ত নিয়ম-কানুন অনুসরণ করতে হবে। পরীক্ষিত মানুষের সংক্রমণের হার (২৩ শতাংশ থেকে কমে এখন ১০-১২ শতাংশের মধ্যে উঠানামা করছে) লক্ষ্য করে আমাদের সকলকে অবশ্যই একমত হতে হবে, এখনো বাংলাদেশে ব্যাপকহারে সংক্রমণ চলছে। ঢাকায় আক্রান্ত জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ যদি তাদের সংক্রমণ সম্পর্কে অবগত না থাকে এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ না করে, তবে এটা কল্পনা করা খুবই সহজ যে, এই রোগের ব্যাপক সংক্রমণ কেন হয়।

এ গবেষণাটি এপ্রিল-জুলাই মাসে করা হয়েছিল এবং সেই সময়ে অনেকে সংক্রমিত হলেও তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি বা সনাক্তযোগ্য অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। উপরের বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের চেয়ে সংক্রমিতের হার অনেক বেশি ছিল এবং এখন এ সংখ্যা আরো বেড়েছে এবং দিন দিন বাড়তেই আছে। এতক্ষণে বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা সম্ভবত হার্ড ইমিউনিটির পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভাগ্যক্রমে, এ পর্যায়ে আসতে সংক্রমিত ও মৃত্যুবরণ করা মানুষের সংখ্যা অনেক কম। সংক্রমিতদের মধ্যে কেবল শতকরা ১ ভাগ লোককে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন পড়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর মতে, কোভিড -১৯ এর কারণে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে সৃষ্ট মারত্মক অর্থনৈতিক মন্দার তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ভাল পর্যায়ে আছে এবং ইতিবাচক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জীবন রক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েও শক্ত হাতে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে, তা নিয়ে হয়তো একদিন গবেষক এবং ঐতিহাসিকরা গবেষণা করে লিখবেন। গবেষকরা হয়তো কম মৃত্যু এবং দ্রুত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কারণগুলোও অনুসন্ধান করবেন। ধনী দেশগুলোসহ অনেক দেশই বিশাল সমস্যার সম্মুখীন এবং কেউই এখনো জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য সঠিক সমাধান নিয়ে আসতে পারেনি। এই গবেষণা অনেক দেশকে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ও কর্মপন্থা ঠিক করতে  সহায়তা করবে। তবুও, আমি জোর দিয়ে বলব যে, আসুন আমরা আত্মতুষ্টিতে না ভুগে গণজমায়েত এড়িয়ে চলি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি, বাইরে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করি এবং সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে বারবার হাত ধুই। এটি এখনকার জন্য এবং ভবিষ্যতে একটি নতুন নিয়ম হিসাবে গ্রহণ করা উচিত। ভবিষ্যতের মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশকে অবশ্যই প্রাথমিক সনাক্তকরণ, কন্টাক্ট ট্রেসিং, এবং আইসোলেশন সুবিধা প্রস্তুত রাখতে হবে এবং সুপরিকল্পিত জরুরি চিকিৎসা সেবা সুবিধা তৈরি করতে হবে।

অন্য যে বিষয়টি এই গবেষণাকে বিতর্কিত করেছে তা হল, ভাইরাসটির বাংলাদেশে আসা এবং কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সরকার কোনো মিথ্যাচার করেছে কিনা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এটি বাংলাদেশে মার্চে নয়, ফেব্রুয়ারির দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কেউ কেউ এই তথ্যের নেতিবাক ব্যাখ্যা করেছেন। আমি তা দেখে হতবাক।  ফ্রান্সের সরকার গত ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ সালে প্রথম সেদেশে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেখানকার একটি হাসপাতালে এক নিউমোনিয়া রোগীর পুরনো নমুনা জেনেটিক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ঐ লোক ফ্রান্সের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে করোনা রোগী সনাক্তের ঘোষণা দেয়ারও এক মাস আগে ২৭ ডিসেম্বর করোনায় আক্রান্ত হন।

ফ্রান্সের জনগণ কি মিথ্যাচারের জন্য সে দেশের সরকারকে দোষ দিয়েছে? না, তারা তা করেনি। বরং এটিকে বাস্তবতা এবং সত্য হিসাবে গ্রহণ করেছে। কোভিড- ১৯ নতুন একটি রোগ। শুরুতে এটি সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানতাম না। আমরা এখন এটি সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক কিছু জানি, তারপরও এখনো বেশিরভাগ তথ্যই অজানা রয়ে গেছে। যেমন একবার সংক্রমিত হওয়ার পর কারো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে তা কতদিন টিকে থাকে? কেউ কি পুনরায় সংক্রমিত হতে পারে? আমরা এখনও পর্যন্ত বিশ্বে পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার তিনটি ঘটনা সম্পর্কে জানি- একটি হংকং- এ, একটি নেদারল্যান্ডসে এবং একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আমাদের আরও জানতে, সজাগ থাকতে, আরো ভালো কর্মপন্থা প্রণয়ন করতে এবং অতীতের ভুলগুলো থেকে শিখে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে গবেষণা ও বিজ্ঞান সহায়তা করবে।

গবেষণা এবং এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কিছু বলি

মার্কিন জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন (এনএসএফ) থেকে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত তিন দশকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশে চীন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়কে ছাড়িয়ে তৃতীয় থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির পাশাপাশি বিজ্ঞানকে বর্তমান সরকার বেশি গুরুত্ব দেয়ায় এই অগ্রগতি হয়েছে। চীন সরকার বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে একটি হলো জার্নালে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ করা বিজ্ঞানীদের অর্থ প্রদান। এটি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাগুলোর সংখ্যা ৩০০০% বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করেছে এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরো বাড়বে। কেন চীন আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি এবং শীঘ্রই প্রথম হয়ে উঠতে পারে তা ভেবে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

গবেষণা ও প্রকাশনায় আমরা কোথায় আছি তা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। জেনেভাতে আমাদের প্রতিবেশীর নাতি ঘরে বসে পড়াশুনা করে এবং মানূষের সাক্ষাৎকার নিয়ে আলঝেইমার রোগ এবং এ রোগাক্রান্তদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটি অসাধারণ লেখা লিখেছিল তার মাধ্যমিক পড়াশুনার অংশ হিসেবে। এটি দেখে আমি খুব বিস্মিত হয়েছিলাম।  দেশ ও সমাজের উন্নয়নের জন্য গবেষণা প্রয়োজনীয় এবং জরুরী হওয়ায় অনেক দেশেই তা স্কুলের পাঠ্যক্রমের মধ্যে সন্নিবেশ করা হয়েছে। অনেক দিন আগে, যখন আমি স্কুলে বা মেডিকেল কলেজে ছিলাম, তখন আমাদের গবেষণার সুযোগ ছিল না। আমরা বেশিরভাগই আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণার সক্ষমতা অর্জন করি।

নিজের সমস্ত সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে আমি জানতে চাই, আজ বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রমের মধ্যে গবেষণার স্থান কোথায়? বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে এফিয়ে যাচ্ছে।  বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আমরা যদি আরো দ্রুততার সাথে এগিয়ে যেতে চাই, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একেবারে শুরুতে গবেষণাকে অন্তর্ভুক্ত করে এর পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। আমাদের গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। আমাদের গবেষণার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা উচিত এবং গবেষণার ফলাফল নেতিবাচক হতে পারে দেখে বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়া উচিত না। আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শিখতে হবে, সততার সাথে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং সত্যকে সাহসিকতার সাথে গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। আজ বাংলাদেশের তরুণদের জন্য গবেষণার দ্বার অনেকটাই উন্মুক্ত। আমাদের অবশ্যই তাদের সাথে থাকতে হবে, তাদেরকে গবেষণার মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক অবস্থা আরো ভালভাবে বুঝতে এবং তাদের মাঝে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার এবং দেশ গড়ার সাহস গড়ে তুলতে সহায়তা করতে হবে। আমাদের বিজ্ঞানীদের সীমাবদ্ধতার জন্য তাদের নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়, বরং তাদের ছোট ছোট সাফল্যেও আমাদের গর্ব করা উচিৎ।