ঢাকা, রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আমি আমার সুহৃদ হারালাম

অধ্যাপক ডা: সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২০ শনিবার, ০৪:০০ পিএম
আমি আমার সুহৃদ হারালাম

এদেশে আইন বিশারদদের মধ্যে মহীরুপে যিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন সেই ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ব্যাক্তিগতভাবে এই অতুলনীয় গুণের অধিকারী এবং দানবীরের সাথে আমার পরিচয় বেশ কিছু দিনের।

ব্যারিস্টার রফিকুল হকের সাথে আমার বেশি ঘনিষ্ঠতা হয় ২০০৯ সালে। যখন তিনি চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন হিসেবে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

সেই প্রতিষ্ঠানের একটি চেক। সম্ভবত ৩৯ কোটি টাকার একটি চেকের অর্থ ছাড়ে আমি আপত্তি জানাই। এবং এই অর্গানাইজেশনের সঙ্গে কারা কারা যুক্ত আছেন সেটা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেই।

আমি তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমাজ কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ছিলাম। বিশেষকরে সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জামাতের আলী আহসান মুজাহিদের ঘনিষ্ঠ কিছু লোক সে সময় পর্যন্ত কিছু অর্গানাইজেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলো। সেজন্য চেকটির অর্থ ছাড় না করার জন্য আমি তৎকালীন সমাজকল্যাণ সচিবকে নির্দেশ দেই।

আমি তখনো জানতাম না এই চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক জড়িত আছেন। ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক সাহেব এবং আমার শিক্ষক ডা: এম আর খান সাহেব দুইজনই আমার সঙ্গে এসে একদিন দেখা করেন।

ডা: এম আর খান এবং ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক সাহেবের সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও খুব ভালো সম্পর্ক এটা আমি জানতাম।

ওনারা আসার পর আমি সোজাসোজি বললাম আমি তো এই কারণে চেকের অর্থ ছাড়ে আপত্তি জানিয়েছি। তখন তারা বললেন আমরা এই অর্গানাইজেশনের সাথে আছি। তখন আমি ওই অর্গানাইজেশনের কিছু কর্মকর্তার বিষয়ে আমার আপত্তির কথা জানালাম।

তখন তিনি বললেন ঠিক আছে আমি ওই কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করলে পরে তুমি চেকটা পাস করে দিও। তখন আমি বললাম ‘স্যার এটা আপনাদের সাথে বেয়াদবী করা হয় । আপনারা চেক নিয়ে যান।’ উনি তার একদিন পরেই বিতর্কিত লোকদের ওই অর্গানাইজেশন থেকে বাদ দেন।

ব্যারিস্টার রফিকুল উল হককে সবসময় আমি দুলাভাই বলে ডাকতাম। কারণ ওনার সহধর্মিণী শুধু একজন চিকিৎসক নন তিনি গবেষণা ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছেন। আমি চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। প্রথমবার যখন আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই তখন আমার নির্বাচন করতে হয়েছে।

আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন অধ্যাপক তাহের সাহেব। তিনি খুবই ভালো মানুষ এবং সবার কাছে খুব প্রিয়। আমি তাকে বললাম ‘আপনি যদি আমার সাথে নির্বাচন করেন তবে আমার জেতার সম্ভাবনা তো কমে যাবে’। তিনি বললেন আমি তো নির্বাচনে হারি নাই তুমি বরং প্রত্যাহার করো।

তখন আমার জেদ চাপলো। তখন আমি বললাম ‘আমিও নির্বাচনে হারি না’। তাহলে দেখা যাক কে জেতে। আপনি বড় ভাই বড় ভাইয়ের জায়গায় থাকেন। ওই নির্বাচনে আমি মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করি। ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক সাহেবের সহধর্মিণী ওখানে ভোটার ছিলেন। আগে থেকেই তাকে আমি বড় বোনের মতো শ্রদ্ধা করতাম।

আমি যখন ভোট চাইতে গেলাম তখন উনি বললেন ‘তুমি আমাকে খুব বিপদে ফেললে। তুমি যদি এখন ভোট চাইতে আসতে আমি সোজা না বলতাম। কিন্তু তুমি দীর্ঘদিন ধরে আমাকে বড় বোনের মতো সম্মান করো। যে তোমার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে সেও আমার অত্যন্ত কাছের লোক। আমি এখন একটা কাজ করতে পারি। ভোট দানে বিরত থাকতে পারি।’

আমি বললাম ‘আপা আপনি ভোট দিতে যান এবং যাকে যোগ্য মনে করেন তাকেই ভোট দিয়েন।’ আমি জানি ভোট দিতে গেলে তিনি আমাকেই ভোট দিবেন। এরপর আমি এক ভোটের ব্যবধানে জিতি। সেজন্য আরও কৃতজ্ঞ ছিলাম। ব্যারিস্টার রফিকুল উল হককে দুলাভাই বলে ডাকলেই উনি স্বভাবসুলভ একটা হাসি দিতেন।

ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক সাহেব বঙ্গবন্ধুর আইনজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এক এগারোর কঠিন সময়ে তিনি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। একই সাথে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষেও দাঁড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যেহেতু তিনি জুনিয়র আইনজীবী ছিলেন তাই অনেকেই তার নাম মনে করতে পারেন না।

কিন্তু এই মানুষের জীবনের ব্যাপ্তী এবং অবদান অস্বীকার করা যায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমাজ কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে আমি যত প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি; কমপক্ষে ১৪-১৫টি অর্গানাইজেশনে আমি শুনেছি ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক সাহেব কম করে হলেও সেখানে পাঁচ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। উনি খুব নীরবে দান করতেন।

ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক খুব বেশি ফি নিতেন এটা লোকে জানতো কিন্তু ওনার আয়ের বেশিরভাগ অর্থ উনি মানব কল্যানে ব্যয় করে গেছেন।

তার মতো একজন মানব হিতৈষি আইনজ্ঞ আর কবে আমরা পাবো জানি না। ব্যারিস্টার রফিকুল উল হক সাহেবের মৃত্যু সংবাদে আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত। ব্যাক্তিগতভাবে আমি একজন আমার সুহৃদ হারালাম। আর দেশ হারালো একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক।

সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।


লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা,  বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান।