ঢাকা, বুধবার, ১৯ মে ২০২১, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চিকিৎসার চেয়ে করোনার সংক্রমণ কমানো জরুরী

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন
প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২১ রবিবার, ০৯:৫৯ এএম
চিকিৎসার চেয়ে করোনার সংক্রমণ কমানো জরুরী

কোভিড রোগীর চিকিৎসা নিয়ে আবার তোপের মুখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। ঢাকাসহ অনেক শহরেই হাসপাতাল-ক্লিনিকের উপর কোভিড রোগীর চাপ বেড়েছে। হাসপাতালে শয্যা খালি নেই বলে অনেক কোভিড রোগীই বাসায় থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেক রোগীই আবার একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও একটা আইসিইউ বেডে ভর্তি হতে পারছেন না। আইসিইউতে বেড না পেয়ে কেউ কেউ মৃত্যুবরণও করেছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা এই মুহূর্তে দিশেহারা। 

অনাকাঙ্খিত হলেও এই অবস্থাটি অপ্রত্যাশিত নয়। করোনার ঢেউয়ে কোভিড রোগীর চিকিৎসা প্রদানে উন্নত বিশ্বের হাসপাতালগুলোরই যেখানে টালমাটাল অবস্থা, সেখানে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো আর কতটা সামাল দিতে পারবে? এখনো দেশের অধিকাংশ জেলায়ই কোন আইসিইউ নেই। আবার আইসিউ থাকলেও অনেকখানে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ এবং লোকবলের অভাবও তীব্র। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর সব জেলায় আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দিলেও যথেষ্ট সময় পাওয়া সত্বেও সেটাও বাস্তবায়িত হয় নি। রাতারাতি এই অবস্থা থেকে উত্তরণও এখন সম্ভব নয়। করোণা সংক্রমণের এক বছরের বেশী অতিবাহিত হলেও স্বাস্থ্যখাত কেন কোভিড রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালসমূহেপ সক্ষমতা পর্যাপ্ত পরিমানে বাড়ায় নি, সেটা তদন্তের দাবি রাখে। এই নিয়ে আমরা টক শোতেও ঝড় তুলতে পারি। তবে তাতে, এই মুহূর্তে বাস্তব পরিস্থিতির কত দ্রুত উন্নতি সম্ভব তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

পত্রিকায় দেখলাম, করোনা চিকিৎসার জন্য আমদানীকৃত প্রচুর জরুরী চিকিৎসা সরঞ্জাম শুল্ক-করের গ্যাড়াকলে পড়ে ঢাকার বিমানবন্দরে আটকে আছে। এসবের অধিকাংশই দান-অনুদান হিসেবে আমদানীকৃত। স্বভাবতই এসব ক্ষেত্রে কর বা শুল্কের জন্য কোন বাজেট থাকার কথা নয়। এমন পরিস্থিতিতে আইনের ঘেরাটোপে এসব সামগ্রী আটকিয়ে রাখা, নাকি বিশেষ ব্যবস্থায় এগুলো ছাড়ের অনুমতি দেওয়াটা যৌক্তিক? বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবস্থা হয়েছে নন্দঘোষের মত। অনায়াসে সব দোষ তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়। 

তবে করোনা মোকাবেলায় জনস্বাস্থ্যের আলোকে যে পদক্ষেপগুলো গুরুত্বের সাথে নেওয়া উচিত ছিল, শুরু থেকে দেখছি সেখানেও ঘাটতি রয়ে গেছে। আজ অব্দি আমরা সংখ্যাগরিষ্ট মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে পারি নি। মানুষের আচরণ বদলানো একটি কঠিন কাজ, তবে অসম্ভব নয়। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষ এক সময় খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতো। তাদেরকে সেখান থেকে ফেরাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এই আচরণ পরিবর্তনে তৃণমূল পর্যন্ত এনজিওরা কাজ করেছিল। এবারের পুরো করোনাকালে মানুষের আচরণ পরিবর্তনে সারাদেশব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব ছিল। অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নি। এখনো অনেক মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে যে খুব একটা সন্তুষ্ট, তাও মনে হয় না। বরং চলমান লকডাউনের ব্যাপারে অনেক মানুষই দেখলাম অসন্তুষ্ট। 

মানুষের এই ব্যাপারটা অদ্ভুত। তারা করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে চায়, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে না। লকডাউনের মত কার্যক্রম তো একটা দেশের জন্য দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এর একটা নেতিবাচক অর্থনৈতিক দিকও আছে, বাংলাদেশের মত দেশের জন্য যা ব্যাপকভাবে ক্ষতিকর। বাংলাদেশ দক্ষতার সাথে ভ্যাক্সিন কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে জনসংখ্যার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ভ্যাক্সিন প্রদান করতে তো কমপক্ষে বছরখানেক লেগে যাবে। সেই সময়টাও তো করোনার সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দরকার। শুরুতেই বলেছি, সংক্রমণ বাড়তে থাকলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে কুলানো যাবে না। বরং, করোনার সংক্রমণ কমাতে দেশব্যাপী, বিশেষ করে ‘হটস্পট’ শহরগুলোতে কার্যকরী প্রতিকার-প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। চিকিৎসা করার চেয়ে সংক্রমণ কমানোই করোনা নিয়ন্ত্রণে অধিক কার্যকর, বাংলাদেশের উচিত সে পথেই আগানো। যেভাবেই হোক, জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে বাধ্য করতেই হবে। আপাতত এর কোন বিকল্প নাই। 

লেখক: চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেসপন্সিবিলিটিজ (এফডিএসআর)।