ঢাকা, শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৪ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মহানগর 

হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ০৭ মে ২০২১ শুক্রবার, ০৪:০১ পিএম
মহানগর 

সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত সাপ্তাহিক `দেশ` পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদ হয়েছে `মহানগর` শিরোনামে। কভার স্টোরি করার জন্য তারা সবসময় সাদামাটা বিষয়ই নির্বাচন করে অথচ এতে দারুণ একটা চমক থাকে । ( দেশ ৩ চৈত্র ১৪২৭ ১৭ মার্চ ২০২১, ৮৮ বর্ষ ১০ সংখ্যা)। তারা সাধারণ পাঠকের মেজাজ বুঝতে ও মননকে স্পর্শ করতে বরাবরই পারদর্শী এবং এটা প্রমানিত সত্য। 

২) ঢাকার এক শ্রেণির বনেদি পাঠক পত্রিকাটি পড়েন এবং সংরক্ষণ করেন। এদের মধ্যে শিক্ষক, লেখক, গবেষক ও আমলা পাঠকই অধিক। যারা লেখালেখি করেন না তাদের সংখ্যাও নেহায়েৎ কম নয়। বিগত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আমি নিজেই তা দেখে এসেছি। মনে পড়ে, নব্বই দশকের গোড়ায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আড্ডা শেষে অধ্যাপক আহমদ শরীফের সাথে পদব্রজে তাঁর ধানমন্ডিস্থ বাসা অবধি হাঁটার পথে সাইন্সল্যাবের মোড়ে ফুটপাতে পড়ে থাকা পুরনো `দেশ পত্রিকা` তিনি আনত ভঙ্গিতে ঋজু হয়ে খুঁজে বের করতেন। তখনকার দিনে চলতি সংখ্যা পেতে বোধহয় কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হতো। 

৩) গত ক`বছর আমাদের বন্ধু বিজু`র বইয়ের ভুবন পাঠক সমাবেশের কল্যানে প্রায় প্রতি সংখ্যাই আমি পেয়ে যাই। মাঝে মধ্যে মিস হলে প্রিয় অনুজ প্রতিম সুভাষ সিংহ রায় তা পূরণ করে দেন। ৮৮ বছর যাবৎ এমন মান এবং নান্দনিকতার আমেজ ধরে রাখা কি চাট্টিখানি কথা? অনেক বিদগ্ধজনের সংশয়োচ্ছারণ ছিল এর সম্পাদক কিংবদন্তি সাগরময় ঘোষ এর প্রয়ানের পর এ পত্রিকা আর সেই জৌলুশ নিয়ে এগুতে পারবে না। কিন্তু কী আশ্চর্য! তাঁরা পারছেন এবং তা নিখুঁত ভাবেই পারছেন। আমার মনে হয়, সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে পত্রিকাটি আজও দু`বাংলাতেই  টিকে আছে। অধ্যাপক আহমদ শরীফ তাঁর আড্ডায় একবার বলেছিলেন, "কোন বইপুস্তক রচনা না করে আমাদের জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক যেমন কিংবদন্তি হয়েছেন, নিজে কোন লেখালেখি না করে সাগরময় ঘোষও তেমনি জাদরেল সম্পাদক হয়েছেন। 

৪) উল্লিখিত সংখ্যায় মজার লেখাটি লিখেছেন, বাংলা ভাষার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শিরোনাম `আমার প্রিয়তম শহর`। জাত লেখক বলতে আমরা যেমন বুঝতে পারি। কলকাতা শহরের কতবিচিত্র রূপ-রূপান্তর নিয়ে তিনি রম্যরস স্মৃতিচারণ করেছেন। বৃটিশ ভারত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা, স্বাধীন ভারতের কলকাতা, চোখের সামনে থরথর করে পরিকল্পনাবিহীন অসংখ্য অট্টালিকায় ছেয়ে যাওয়া কলকাতা মহানগর, বাবার সরকারি চাকরি,সংসারের  টানাপোড়েন, দারিদ্র্য,অভিজাত এলাকায় না থাকতে পারার ক্লেদাক্ত হৃদয় এ-সব নিয়েও যে রঙ্গকরে পাঠক মাতানো যায় ---- এটা শীর্ষেন্দু বলেই সম্ভব। তিনি রেল বিভাগের চাকুরে তার বাবার সততা নিয়ে বলেন, --- "রেলে প্রচুর ঘুষের ব্যাপার আছে বটে,কিন্তু আমার গোঁয়ার বাবা ঘুষকে গোমাংসতুল্য মনে করতেন বলে আমরা চিরকাল টানাটানির মধ্যে মানুষ "।
আরেক জায়গায় বলেন, "মেট্রো গলি আর স্টার থিয়েটারের উল্টো দিকে যে দুটো তেলেভাজার দোকান ছিল তা কলকাতাবাসীর বড় আদরের। আমার গুরুদেব ঠাকুর একটা কথা বলেছেন, জিহ্বার লাম্পট্য। কথাটা বড় খাঁটি। এইসব দোকান কলকাতা- বাসীর জিহ্বাকে লাম্পট্যে প্ররোচিত করে আসছে  বহু বছর ধরে "। 

৫) এই আমি-বিগত চারদশকের অধিক ঢাকা মহানগরকে কাছে থেকে দেখেছি এবং তার কোলে সযত্নে বেঁচে আছি। এমনকি নিবিড় পর্যবেক্ষনের সীমানায় তার ক্রমাগত বেড়ে ওঠা, তার অপ্রতিরোধ্য সম্প্রসারণ, টি,আই,এ্যাক্ট, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান সবকিছু সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছি। দেখতে দেখতে নানা বর্ণের আকাশছুঁয়া ভবনের মিছিলের আড়ালে যেন ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে আমার দেখা প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের ঢাকা শহর। কাজেই এ শহর নিয়ে আমারও কিছু বলার থাকতে পারে। আমাদের পুরান ঢাকা, চানখারপুল, শাহবাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর, মধুদা`র রেস্তোরাঁ,  নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, মীরপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরা কোথায় নেই তেলেভাজা? এখানেও জিহ্বাকে সংবরণ করে রাখা এত সহজ কাজ নয়। 

৬) শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  বলেছেন, তার শৈশবের দেখা কলকাতা শহর নাকি একটু করে বিশ্রী হয়ে যাচ্ছে। দেশভাগের পর থেকেই কলকাতা দ্রুত অধপাতে চলেছে। এখানে বলা যায়, চক্ষুস্মান সকল মানুষের কাছে অতীত সবসময় বর্ণিল আনন্দময় এবং বর্তমান খানিকটা ধুসর। এটি মনুষ্য-সহজাত প্রবৃত্তির ঘোর ছাড়া অন্য কিছু নয়। 

৭) এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন আসতে পারে, ঢাকার এমন অধঃপতন আমরা অনুভব করি কিনা? জানি অনেকে বলবেন, করি না। কারন, বৃটিশ ভারতে রাজধানী কলকাতার অনেক কিছু ছিল যা আমাদের ঢাকার ছিল না। ঢাকায় রাস্তা-ঘাট, দালান-কোঠা, মতিঝিল পাড়ার বহুতল অফিস, কর্পোরেট হাউস, ইডেন ভবনখ্যাত সচিবালয়, ফ্ল্যাটবাড়ি, ফ্লাইওভার, ফুটব্রীজ, নান্দনিক হাতিরঝিল লেক,পাঁচতারকা মানের হোটেল, নির্মিয়মান মেট্রোরেল স্টেশন, বিভিন্ন এভিনিউ,   রাজধানীর সঙ্গে মহাসড়কের একাধিক লেন সংযোগ স্হাপন সবই চোখের সামনে সাম্প্রতিক আয়োজনের অংশবিশেষ। চল্লিশবছর অতিবাহিত হওয়ার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় গেলে নবাব স্যার সলিমুল্লাহদের স্মৃতিস্মারক সেই ফোলার রোড, বৃটিশ কাউন্সিল, জগন্নাথ হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বিস্তৃত ছায়াঘেরা রাস্তার পাশের সুরম্য অট্টালিকা বা কার্জন হলের গা ঘেঁষে ফজলুল হক হল, বেগম সুফিয়া কামাল হল, শহীদুল্লাহ হলের পার্শ্ববর্তী সুউচ্চ দালান ও হলগুলো আমাকে বরং আগের তুলনায় অনেক বেশি চাঞ্চল্য ও আনন্দ দেয়। ফেব্রুয়ারি আসলে অনাবিল প্রেরণা জোগায় বাংলা একাডেমির আগ্রহে উদ্যানের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে দুনিয়াসেরা বইমেলা। যা কলকাতার গড়ের মাঠে তারা করতে পারছে না। এসবের বাইরেও ঢাকাকে ক্রমবর্ধমান আধুনিক শহরই আমি বলবো। এখনো বিশ্রী বলার অবকাশ নেই। বলা যায়, দুটো কর্পোরেশনের আওতায় প্রতিযোগিতামূলক নাগরিক সেবার মানও ইতমধ্যে অতীতকে অনায়াসে অতিক্রম করেছে। টঙ্গী বা পূর্বাচলসহ আগামীকালের ঢাকা মহানগরকে কল্পনা করে আমি তো রীতিমত উচ্ছ্বসিত ও বিমোহিত হয়ে বসে থাকি। আহ্! আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ঢাকা কেমন বাসযোগ্য হবে। কাজেই আমাদের যা আছে তা কেবল আমাদের। পৃথিবীর আদি সভ্যতা-নিদের্শক সেরা শহরের সাথে ঢাকাকে তুলনায় এনে অহেতুক নিজেকে খাটো করার কোন মানে আছে? অগনিত পথচারীর ভিড়ে লক্ষ কোটি মানুষের পদস্পর্শে টিকে থাকা প্রায় ৩১০ বর্গ কি:মি: আয়তনের ঢাকাকে নিয়ে অন্য যাদের শঙ্কা, হতাশা এবং মানসিক যাতনা থাকুক আমার একেবারেই নেই। যাপিত চার দশক শেষে আজ আমার দু `চোখের আলোয় উদ্ভাসিত ঢাকাশহর যেন সত্যিকারের এক তিলোত্তমা নগরীর নাম। 

০৫ মে ২০২১ খ্রি:
২২ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ