ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

শংকার সমর

মাহাবুব মোর্শেদ রিফাত
প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২১ মঙ্গলবার, ১০:০০ পিএম
শংকার সমর

স্ট্যালিনের জমানায় এক লোক মস্কোর রেড স্কোয়্যারে দাঁড়িয়ে চেচাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন স্ট্যালিন একটা গাধা। স্ট্যালিন একটা গাধা। পরে তাকে শত শত গুপ্তপুলিশ এসে ধরে নিয়ে আদালতে চালান দিলো। সোভিয়েত আদালত তাকে দিলো সতেরো বছরের কারাদন্ড। দণ্ডাদেশে লেখা রইলো জনৈক ব্যক্তির এক বছরের শাস্তি প্রকাশ্যে পাগলামী ও চিল্লাচিল্লি করার জন্য। আর ষোল বছর কারাদন্ড স্টেট সিক্রেট ফাঁস করে দেয়ার জন্য (নিশ্চয়ই হাসতে হাসতে তালি বাজানোর মতো লাগছে তাইনা?)

দেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালে গণতান্ত্রিক এই বাংলাদেশে যে সংবিধানটি প্রণীত হয়েছিলো সেখানে তৃতীয় ভাগটি ছিলো জনগণের মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ৩৯ নাম্বার অণুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে ছিলো চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা। একই সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টিও। গণমাধ্যমকে বলা হয় একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। গণমাধ্যম জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এবং জনগণের জন্য ক্ষতিকর এমন বিষয়গুলোকে সামনে এনে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করবে।

করোনা মহামারীর এই সময়ে যে মন্ত্রণালয়টির উপর গোটা দেশ তাকিয়ে ছিলো সেটি হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যার দায়িত্বে ছিলেন এবং আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের উপর ডিগ্রীধারী সম্মানিত মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় স্যার জনাব জাহিদ মালেক। দেশের যে কোনো শ্রেণী পেশার মানুষকে যদি চোখ বন্ধ করে বলতে বলা হয় দেশের এই কঠিন পরিস্থিতিতে কোন মন্ত্রণালয়ে সব থেকে বেশি দুর্নীতি হয়েছে তাহলে এক বাক্যে উত্তর আসবে এটি অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। 

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সংবিধানও বলে যে জনগণই এই রাষ্ট্রের মালিক। আমলারা হচ্ছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী যারা কেবলমাত্র এবং শুধুমাত্র জনগণ তথা দেশের মানুষের সেবায় নিযুক্ত থাকবেন। প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারীদের মাস শেষের বেতন, বছরে বছরে বোনাস সবই আসে এদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। যে কনফিডেনশিয়াল যায়গাটিতে (সচিবালয়) তারা জনগণের সেবায় কাজ করার জন্য মাস গেলে টাকা পান সেটিও ওই জনগণের টাকাতেই নির্মিত। 

এবার মূল গল্পে আসা যাক। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ তাঁকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। রাত পৌনে ১২টার দিকে পুলিশ জানায়, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হয়েছে। তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এবার চলুন স্ক্রিনপ্লে শুরু করি। রোজিনা ইসলাম হছেন সেই সাংবাদিক যিনি ৫৭ ধারার ভয় ডর মগজে রেখে কলম চালানোর এই সময়টিতে উচ্চবাচ্য না করার অঘোষিত নিয়মের বৃত্তে বন্দী হয়েও এদেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির ক্যালকুলেশন ভাঙ্গা মন্ত্রণালয়ের কেঁচো খুঁড়ে খুঁড়ে একটা একটা করে সাপ বের করছিলেন। রোজিনা ইসলাম হচ্ছেন সেই সাংবাদিক যার কলমের গতি আর ডরহীনতায় টেবিল কাঁপা শুরু হয়েছিলো বিসিএস টেবিলে ঘন্টাখানেকের চেষ্টায় হন্ডুরাসের রাজধানী আর বজ্রপাতের পরিসংখ্যান উগরে দেওয়া প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী আমলাদের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে যখন আরো গভীরে রোজিনা ইসলাম ঠিক তখনি আতে ঘা লাগা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা শুরু করলেন চিরচেনা ধার করা তামিল তেলেগু মুভির গল্পে মিল রেখে অভিনয়। যেখানে নায়ক নায়িকার উপস্থিতিকে পেছনে ফেলে সামনে থেকে ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যের নেতৃত্বে ছিলেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গলাচিপা বিশেষজ্ঞ কাজী জেবুন্নেছা বেগম। কথিত আছে নবম শ্রেণীতে থাকাকালীন অবস্থায় বাল্যবিয়ের শিকার প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যুক্ত হবার পরেই গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। যেখানে কানাডায় ৩ টি, পুর্ব লন্ডনে ১ টি এবং ঢাকায় ৪টি বাড়ী, গাজীপুরে ২১ বিঘা জমি সহ রয়েছে নামে-বেনামে আছে ৮০ কোটি টাকার এফডিআর।

এছাড়াও বিভিন্ন ভূমিকায় অবদান রাখতে শুরু করেন জিনিষপত্র কেড়ে নেওয়াতে বিশেষজ্ঞ জাকিয়া পারভীন, যিনি আবার সুপারপাওয়ারের জোরে হয়তো খানিক সময়ের জন্য নিজেকে আইনের লোক মনে করেই শুরু করে দিয়েছিলেন রোজিনা ইসলামের দেহ তল্লাশী। সম্মানিত জনাব স্বাস্থ্যসচিব মহোদয় স্যারের একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম ভুইঞা মহোদয়, হাল্ক হয়ে সাংবাদিক প্রবেশ ঠেকানোর জন্য গেটে দাঁড়িয়ে যাওয়া মোসাদ্দেক মেহেদী ইমাম, অফিস সহায়ক পদধারী দুই মাস্তান মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম স্যার ও সোহরাব হোসেন স্যার। সেইসাথে ছিলেন মোস্ট ইন্টারেস্টিং এবং সাসপেন্স রেখে যাওয়া চরিত্র কনস্টেবল মিজানুর রহমান। এছাড়াও প্রজাতন্ত্রের দুই বড় কর্মচারী মাননীয় লোকমান হোসেন মিয়া স্যার ও জনসংযোগের মাইদুল ইসলাম স্যার। এদের অভিযোগ আবার বেশ জটিল। এদের মতো সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম (যদিও তারা জনৈক নামক শব্দটি ব্যবহার করেছেন) তাদের সচিবের একান্ত সচিবে স্যারের রুমে ঢুকে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি চুরি করেন এবং ছবি তোলেন। আচ্ছা বলেন তো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কি রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি নির্মানের গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো? গত ৫০ বছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির নথি ছাড়া সিক্রেট একটা জিনিসও হয়তো হারিয়ে যাওয়া বিরোধীদলের গবেষণা সেলের এক্সপার্টরাও দেখাতে পারবেনা।  কল্পনায় ভাসছে সচিবের একান্ত সচিব স্যারের রুমটা, মাননীয়র রুমটা অতি নিরীহদর্শন মনে হলেও এই সচিবের সচিব স্যারের রুমের নথি প্রকাশ পেলে রাশিয়া আর চীনের সাথে ভ্যাকসিন ভ্যাকসিন যুদ্ধ লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আহ বয়ান আহ। অথচ আপনারাই হয়তো ভুলে গিয়েছেন জনগণের টাকা দিয়ে বুকিং দেওয়া ভ্যাকসিনের ডোজ এখনো কিন্তু দেশে আসেনি পুরোটা। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় স্যার আবার নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট বোঝালেন সাংবাদিকদের। যেখানে মহোদয় ভুলেই গিয়েছেন যে ফার্মাসিউটিক্যাল এসওপি বা কোনো ভ্যাকসিনের ফর্মুলা জনগণ জানলে ঘরে ঘরে ফার্মা প্ল্যান্ট খোলা ফার্মাসিস্ট (পড়ুন টেকনিশিয়ান) এই বাংলায় নাই। এছাড়াও জনগণের টাকার কেনা ভ্যাকসিনেও যে আপনারা দুর্নীতির আশ্রয় নেন নি বা নেবেন না সেটা কে বলতে পারে! জনগণের এখনো মনে আছে আপনার মন্ত্রণালয়ের সেই হাজারকোটি কামানো সেই ড্রাইভারের কথা, মাস্ক কেলেঙ্কারির কথা, হাসপাতাল হাওয়া করে দেবার কথা, জনগণের মনে আছে বালিশ আর ফরিদপুর মেডিকেলের পর্দা কেলেঙ্কারির কথা। আপনাদের নিজ হাতে তৈরী করা সাহেদ, সাবরিনা আর তাদের মামলার উন্নতি এখনো মানুষ খোজে এই সাংবাদিকদের কাছেই। 

মাননীয় আজ বললেন “উনি সেখানে গেছেন কেনো”! হ্যা মাননীয় আপনি ঠিকই বলেছেন, ডাকাতের আখড়ায় চুরি করতে গেলে বাড়ির মালিক হিসাবে চোরকে যে ডন বানিয়ে দেননি সেটাই রোজিনা ইসলামের মতো সত্যান্বেষীর সাত জনমের ভাগ্য। রোজিনা ইসলাম হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে এখানে রুমে রুমে কনফিডেনশিয়াল দুর্নীতি হয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা সচিবালয়ে আপনাদেরই সরবরাহকৃত প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড সাথে থাকার পরেও যে দেশে একজন সাংবাদিককে জনৈক ট্যাগ লাগিয়ে দেন, সে দেশে কিছুদিন পরে আপনারা কি কি ঘাটাবার অপেক্ষায় রয়েছেন সেই নথি জনগণের স্বার্থে রোজিনা ইসলামরা প্রকাশ করবেন এটা কি অস্বাভাবিক লাগছে মাননীয়! 

তদন্ত হবে, তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন এসব শুনে শুনে জনগণের বিশ্বাসের জায়গাতে ফাটল ধরিয়েছেন আপনারাই। সরকারের সব অর্জন ম্লান হয় আপনাদের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী রুপী ডাকাতদের কারনেই। এই দেখেন একজন সত্যান্বেষীকে রুখে দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় আর স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় কি সুন্দর সমন্বয়ের সাথে কাজ করছেন। অথচ কোভিড মোকাবেলার বেলাতেই শুনি আপনার মন্ত্রণালয় সমন্বয়হীন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নামে যে নথির আড়ালে আপনারা আপনাদের দুর্নীতি লুকানোর চেষ্টা করেন সেটা তুলে ধরলেই যদি আপনাদের আতে ঘা লাগে তাহলে নিশ্চিত থাকেন জনগণের সাথে আপনাদের  যুদ্ধ অনিবার্য। 

মাননীয় চলেন আপনাকে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের কনসেপ্টটা শোনাই। দুনিয়ার সকল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমই তথ্য চুরি করে। এই তথ্য এমনসব তথ্য যা জনগণের জন্য বয়ে আনে মঙ্গল। গোপন করে রাখা তথ্যের মুক্তি দিয়ে স্বার্থবাদীদের মুখোশ খুলে দেওয়াই ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম। 

মাননীয়! প্রেসনোট আর টাকার বাণ্ডিলের বিনিময়ে দেওয়া তথ্য পত্রিকায় লিখে দিতে বিশেষজ্ঞ জার্নালিস্ট হতে হয় না। যুগে যুগে জুলিয়ান এসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেন আর রোজিনা ইসলামরা আপনাদের মনে ভয় ধরায়। কারন কখনো কখনো বন্দুকের গুলি থেকে কলমের কালি শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়। লম্বা করে শ্বাস নিয়ে সময় থাকতে নিজেদের শুধরে নিন। নয়তো শঙ্কার সমরে কে জানে জয় পরাজয় কার হাতে!