ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

শেখ হাসিনার মুক্তি বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয় 

ডঃ ফরিদ আহমেদ
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২১ শুক্রবার, ১২:০১ পিএম
শেখ হাসিনার মুক্তি বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয় 

আজ ১১ জুন ২০২১। আজ থেকে ১৪ বছর আগে জাতির পিতার কন্যা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে নানা ধরণের মিথ্যা মামলা দিয়ে জুলাই মাসের ১৬ তারিখ ভোরবেলা গ্রেফতার করা হয়। আমি তখন মেলবোর্নের Clayton রোডে থাকি।মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছি।সকাল বেলাতে পত্রিকার পাতায় নজর রাখতেই খবরটি পাওয়া গেলো।  থমকে গেলো আমার হৃৎপিন্ড। এতো সাহস ওদের ? একজন নিরপরাধ মানুষকে এভাবে গ্রেফতার করবে।প্রথমে কান্না পেলো।এভাবে আমি কারো জন্য কাঁদিনি।বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টার দেখেছি যাতে লেখা ছিল "কাঁদো বাঙালি কাঁদো।" আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করলাম- আমরা কি তবে সারা জীবন কেঁদে যাবো? আমাদের কি হাসতে মানা? 

ধীরে ধীরে মনকে শক্ত করলাম। না আমার যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি, যারা বাঙালি চেতনা ধারণ করি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন করি তাদের কাঁদতে নেই।কাঁদলে চলবেনা।পাকিস্তানী হানাদারদের পরাস্থ করে যদি বাঙালি সোনার বাংলার লাল সবুজ পতাকা উড়াতে পারে তবে কেন আমরা পারবোনা বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার, শেখ হাসিনার মুক্তি আনতে।  আমাদের পারতেই হবে।  ইমেইলে চললো আমাদের লড়াই।মাঝে মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আই টি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এর ব্লগে লিখতাম। আর অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত প্রিয় অস্ট্রেলিয়া  ও নিউ ইয়র্ক থেকে  প্রকাশিত বাংলা পত্রিকায় লেখালেখি।  এবং আমাদের সময় পত্রিকায় মন্তব্য দেয়া।  এবং সেখানে কিছু লেখা লেখি।

আমার বাসার পিছনেই ছিল মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়।  সেখানে এলেন আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান ভাই।  ওনার কাছ থেকে তেমন কিছু জানতে পারলাম না।  উনি তখন সংবাদের শেষে পাদটীকা লিখতেন। আমি বললাম - নতুন ধারা তবে নাইমুল ভাই এটা আসলে যায় না।  একটু কষ্ট পেলেন বোধহয়!  বললেন তিনি বরাবর স্বাধীনচেতা।  বাবার কথাও তিনি প্রতিবাদ করেন। আমি একটু চুপসে গেলাম। তবে জানতাম নাইমুল ভাই আমাদের নেত্রীর জন্যই করবেন। তবে আমার মূল ভরসার জায়গা ছিল- আল্লাহ- যিনি নিরপরাধকে শাস্তি দেন না। তিনি তার মোমেন বান্দাকে নিরাপদে রাখেন -যেভাবে আজ তিনি বাংলার মানষুদেরকে করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদে রেখেছেন।আল্লাহ ততটুকু ভার দেন যতটুকু সে বহন করতে পারে।  

আমার দ্বিতীয় ভরসা ছিল আরও একজন মানুষের প্রতি। তার নাম অনুমতি ছাড়া আজ লিখতে চাই না। আমি বিশ্বাস করতাম তিনি জীবনের শেষ চেষ্টা করে যাবেন একটি গণতান্ত্রিক সরকার উপহার দিতে।  দোআ করতাম তিনি যেন নিরাপদে কাজ করতে পারেন। আমার এই বিশ্বাসে সংশয় সৃষ্টি করতে অনেকেই অনেক কথা বলতেন। কিন্তু আমি আশা হারাইনি কখনো।  

১/১১-র আগে পরে সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ স্যার এর সঙ্গে কথা হতো।  আমি তাকে বলতাম স্যার ভাববেন না।  নেত্রী মুক্তি পাবে , গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে একদিন আমরা প্রাণ খুলে হাসবো।আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করবোই -যে বিচার খালেদা জিয়া ৫ বছর বন্ধ করে রেখেছিলেন। 

২০০৭ সালের নভেম্বর মাস-দেশে ফিরবো। শুনতেই ক্যানবেরার কামরুল ভাই বললেন তুমি গেলে তোমাকে গ্রেফতার করবে। আমি বললাম -করবে না। আমার কথা শুনে কামরুল ভাই হতবাক!  কিভাবে এমন কথা বলছি। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘটে গেলো মহাদুর্যোগ আয়লা। ১৬ নভেম্বর বিমানবন্দরে নেমে বাসায়। ১৭ নভেম্বর বিভাগে যোগদান করলাম।  একটি বাস গুলিস্তান থেকে মালিবাগ বনানী উত্তরা আশুলিয়া হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। আমি উত্তরা থেকে উঠি যখন তখন বাস ভর্তি। কদিন আগেই ঘটে গেছে আরেকটি দুর্ঘটনা।  র্যাংগস ভবন ভাঙতে গিয়ে শ্রমিক মারা গেছে।  শুরু করলাম প্রতিবাদ - শ্রমিক হত্যা মানবাধিকারের অবহেলা।  আমার এই প্রতিবাদের সকলের হতবাক।কারণ জরুরি আইনে এসব কথা বলা মানা। একদিন পরেই আমাদের সময়ও লিখছে মানবাধিকারের কথা।  আমাদের সাহস আরও বেড়ে গেলো।স্বাধীনতার সংগ্রামে ছিল ইত্তেফাক আর নেত্রীর মুক্তির সংগ্রামে ছিল আমাদের সময়।     

বিশ্ববিদ্যালয় নেমে দেখা করলাম শিক্ষক সমিতির সভাপতির সঙ্গে।  বললাম স্যার কিছু করেন।  অন্যান্য সহকর্মীদেরকে বোঝাতে চাইলাম কিছু একটা করতে হবে।  কারণ আরেকজন বরেণ্য ব্যক্তি ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেছেন আইনি প্রক্রিয়ায় নেত্রীদের মুক্তি হবে না।  আন্দোলন করতে হবে।  দেখা করলাম সাবেক ছাত্র নেতাদের সঙ্গে ।  শিক্ষকদের অনেকেই কিছু করতে চান।  তবে এটাও বলেন ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী টহল দেয়।  আর ঢাকা রাজশাহী প্রতিবাদ করাতে অনেক শিক্ষক এখন জেলে।  কিভাবে সম্ভব ? বললাম শিক্ষকদের মুক্তির দাবি করলেইতো টনক নড়বে।  

শেষ পর্যন্ত দিনটি এলো।  আমার শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে গেলাম।  খুলে গেলো মুক্তির দার।  বদলে গেলো উপদেষ্টা পরিষদ, শিক্ষকরা মুক্তি পেলেন।  মনের জোর আরও বেড়ে গেলো। নেত্রীর মুক্তি পাবেন আজ হোক কাল হোক।  সবকিছু থমকে আছে যেন হটাৎ করে।  ঠিক সেই সময় ৬৯ এর গণ অভ্যুর্থানের নেতা জনাব তোফায়েল আহমেদ বললেন - বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতে পারবো না।  প্রমান হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক আছে।  আর বিএনপি দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে।  সকলের মন থেকে সংশয় দূর হতে চললো।  

জামাল বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহবায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক।  ছাত্র জীবনে সে আমার রুমমেট ছিল এবং ছাত্র লীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক।  তার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাউঞ্জে দেখা করলাম।  বললাম নেত্রী মুক্তি পাবে ভেবোনা। কাজ করে যাও।  আমার এই ধারণার সঙ্গে জামালও একমত।  নেত্রী মুক্তি পাবেন।  কিন্তু অপেক্ষার যেন শেষ হয় না।  আবার কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কি না ? সংশয় তাড়িয়ে বিশ্বাসকে আরও জোরালো করলাম। ২০০৮ সালের ১১ জুন নেত্রী মুক্তি পেলেন। শেখ হাসিনার মুক্তি বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয় - যেন পুরো জাতি মুক্তি পেলো। বাঙালির লাল সবুজ পতাকা আবার পতপত করে উড়তে শুরু করলো। ২৯ ডিসেম্বর এলো সেই মহেন্দ্র ক্ষণ। আমরা নির্বাচনে বিজয়ী হলাম। এই মুক্তির সংগ্রামে কাছে পেয়েছি সম্পাদক বোরহান কবীর ভাইকে। মূলত ই-মেইলে যোগাযোগ হতো। পেয়েছি আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান ভাইকে।  গণতন্ত্র ও নেত্রীর মুক্তিতে তাদের অবদান অনেক।  

হয়তো এখন আমরা ভুলেই গেছি সেই দিন গুলোর কথা।  প্রথম আলো-ডেইলি ষ্টার এর বিপরীতে চলেছেন নাইমুল ইসলাম খান আমাদের সময়কে নৌকা বানিয়ে।  আর সে নৌকার মাঝি বোরহান ভাই, নঈম নিজাম ভাই, পীর হাবিব, শাবান মাহমুদ প্রমুখ। 

আজ নেত্রী যেন আমাদের স্বপ্নগুলো দেখতে পান আর সেগুলো তিনি একের পর এক বাস্তবায়ন করছেন। পদ্মা সেতু , ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, আকাশে স্যাটেলাইটে,  প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কর্ণফুলী টানেল - এ যেন এক স্বপ্নের বাংলাদেশ।  বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন আর তারই কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের স্বপ্নগুলোকে সত্য বানিয়ে দিচ্ছে।আদালত -আন্দোলন- রাজনৈতিক কথার মাঝে নেত্রীর একটি কথা আমাদের শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল - তিনি বলেছিলেন “আমি জাতির পিতার কন্যা -তিনি দুর্নীতি করতে পারেন না।“  আমাদের স্বপ্ন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু আমরা আপনার সোনার বাংলা গড়বোই । আপনার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। আল্লাহ আমাদের নেত্রীকে দীর্ঘজীবি করুন।