ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তোমার ছোঁয়া 

হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২১ সোমবার, ০৮:০০ এএম
তোমার ছোঁয়া 

তোমার চলে যাওয়ার পর পুরো একবছর পূর্ণ হল আজ। কবিদের মতন করে বললে, অসুস্থতা নিয়েও আমাদের এই পৃথিবী আরও একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম হয়েছে। ভাবতেই অবাক হয়ে যাচ্ছি, শিউরে উঠছি বার বার। অবশেষে এ-ও সম্ভব হল। আমি এবং তোমার আদরের সন্তানরা, স্নেহের জামাই, দু`ভাই, আত্মীয়-স্বজন এমনকি যাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় বিদীর্ণ হতে সেই আম্মাও করোনাক্রান্ত হন এবং ভালো আছেন। তোমার পরে আমরা সবাই একে একে আক্রান্ত হই। হাসপাতালে গিয়েও একেবারে পাতালে যাই নি। সত্যি বলতে, তুমি ছাড়া নিষ্ঠুরতম এই করোনা আমাদের আর কাউকে এখনাবধি হত্যা করতে পারেনি। আমাদের চারপাশের সর্বত্র এখনো তুমি। তোমার স্পর্শ থেকে বের হয়ে আসতে একবিন্দুও এগুতে পারি নি। বিগত তিনশত পঁয়ষট্টি দিবসের যাপিত সময়ে তোমাকে বিস্মৃত হয়ে একটানা একটি ঘন্টাও কাটাতে পারি নি। বলা যায়, তোমার বত্রিশ বছরের দেনা-পাওনার হিসাব  প্রতিক্ষণের অব্যক্ত যন্ত্রণার বিনিময়ে আমি শোধ করে যাচ্ছি। 

২) তোমার শূন্যতায় সন্তানরাও একই ভাবে শোকাবহ জীবনের সঙ্গী হয়ে বেড়ে উঠতে চাচ্ছে। তোমার  সবচেয়ে আদরের কনিষ্ঠ পুত্র অম্লান তোমারই স্বপ্ন পূরণে দৃঢ় শপথে বলীয়ান হয়ে এখন প্রায় স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। মাঝে মধ্যে ভাবি, তোমার অকাল প্রস্থান কোন কোন সরব উপস্থিতির চেয়েও অধিক কার্যকর। তোমার আদিত্য ডাক্তার হয়ে দেশেই এক বিদেশি সংস্থায় কর্মরত আছে। নাতনি সুন্দরীকে দেখোনি সে ভালোই হয়েছে। তার বয়স এখনো 
পাঁচ মাস হয়নি। তাতে কী? এখন তো সে-ই আমার সব। তোমার সাজানো সংসার আজ তার দখলে। কী যে হিংসা হত তোমার, এসব ভেবে আজকাল প্রায়ই আমি আনন্দাশ্রুতে স্নাত হয়ে উঠি। তবে কাউকে বলি না। তুমি তো জান, আসলে আমার বলার তেমন কেউ নেই। আমাদের কেমন দুর্ভাগ্য দেখ! উভয়ই নিজেদের বার্ধক্যের সৌন্দর্য থেকে আকস্মিক বঞ্চিত হলাম। অপরাহ্নের অস্পষ্ট আলোয় হাত ধরে হাঁটাটা আর হল না। শোন, তুমি নেই বলে অফিসে আর কোন দিন খাবার নিয়ে যাই নি। তাছাড়া আমি এখন আর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে নেই, যা দেখে যাওয়ার জন্য অযথা দুটোদিন অপেক্ষার পর তুমি হাসপাতালে গিয়েছিলে। কেন যে এমনটি করেছিলে? দু`দিন আগে হলে হয়ত বা বেঁচে যেতে পারতে। না,এসব আমার অনর্থক ভাবনা। এর কোন মানে হয় না। পাগলের প্রলাপতুল্য বচন। এসব মূলত সান্ত্বনা খুঁজে ফেরার অপপ্রয়াস। কখনো বেদনার্ত হৃদয়ে ভাবি, তোমার চলে যাবার দিন বাংলাদেশে করোনায় মোট একহাজার মানুষও মৃত্যুবরণ করেনি। আজ এ সংখ্যা তের হাজারের কাছাকাছি। অথচ সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন উদ্বেগ, উৎকন্ঠা দৃশ্যমান নয়। 

৩)  কী বিস্ময়কর এক ভবিষ্যত বাণী করে গেলে! 
আমাদের লাল পাসপোর্ট আজও অব্যবহৃতই রয়েছে। অভিশপ্ত করোনা বিদেশ ভ্রমনের ওপরও কঠোর হস্তক্ষেপ করেছে। ভালোই হয়েছে। এখন স্বদেশই 
আমার কাছে বিদেশ বিভূঁইয়ের মতন। আজকাল হঠাৎ করে ফেইসবুকের কল্যাণে মাঠ প্রশাসনের চাকরিকালীন নানা গ্রুপছবিতে তোমাকে পেয়ে যাই।
অথচ ওরা জানেনা এসব আমাকে শুধু শুধু কষ্ট দেয়, চোখের কোণে অযথা এক ফোটা জলের কারণ হয়ে উঠে। অফিসার্স ক্লাবের তৎকালীন মহিলা কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যরাও নানা সময়ে গ্রুপছবি পোস্ট করে থাকেন এতেও লক্ষ্য করলে দেখি, তুমি ছাড়া প্রায় সকলই বহাল তবিয়তে করোনার দুনিয়ায় বেঁচে আছেন। 

৪) আমার পাঠাভ্যাস এবং লেখালেখির বাতিকগ্রস্ততা আগের মতই রয়ে গেছে। মনে পড়ে, যেদিন বহুল আলোচিত দৈনিক পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হত মুখে প্রকাশ না করলেও তোমার আনন্দ আমি অনুভব করতাম। তোমার দেয়া সেই টেবিলটা বেডরুমের যথাস্থানেই আছে বরং নতুন সংগ্রহিত বইয়ের জন্য আরও একটি শেলফ কেনা হয়েছে। বইয়ের ভেতর দিয়ে জীবনকে ভাগ করে নেয়া ছাড়া আপাতত আমি কোন অবলম্বন পাচ্ছি না। আমার মতন বাচ্চারাও বলে, ঘরের সব জায়গায় নাকি কেবল তোমার ছোঁয়া। আম্মা এখন আমাদের সাথেই থাকেন, নিজেই অসুস্থ অথচ আমার শারীরিক অবস্থা ও খাবার-দাবার নিয়ে সারাদিন উদ্বীগ্ন হয়ে থাকেন। মনে হয়, পঁয়ত্রিশ বছর আগে তোমাদের কিশোরগঞ্জের বাসার মতো তিনি পাশে বসে আমাকে খাওয়াচ্ছেন। সময়ের কী অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি! কী নিষ্ঠুর নিয়তি! এ যেন অসীম শূন্যতার মধ্যে হাত বাড়ালেই জীবনের পরমানুভূতি। 

৫) তিলে তিলে গড়ে তোলা তোমার গার্হস্থ অর্থনীতি, কৃষিজপন্য, ধানকাটার মৌসুমের দীর্ঘ দিনের সাহায্যকারীগণ সবাই আছে। গাভী, গরু, কবুতরের বাসা, ফলজবৃক্ষ, লতাগুল্ম সবই যে যার স্থান দখল করে আছে। মনে হয়, ছেলেরা এগুলো সহজে হারিয়ে যেতে দিবে না। তারা এখন বেশ পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত। যেখানে তোমার হাতের ছোঁয়া লেগে আছে সেখানেই তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমার প্রবল আস্থা, তোমার মেয়ে এবং ছেলেরা এমন কষ্ঠার্জিত অর্জনগুলোকে কখনো অবহেলা করবে না। বরং একাগ্রতায় ধারণ ও লালন করবে। 

৬) গতবছর শেষবারের মতো তোমাকে নিয়ে যে জায়গাটায় হেঁটে হেঁটে বলেছিলাম, ভবিষ্যতে এখানে একটি গার্লস স্কুল বা হাসপাতাল নির্মান করব। আর তুমি হবে এর প্রধান কর্ণধার। তুমি বলেছিলে, `আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়, আমি এখন বিশ্রামে থাকব`। তখন বুঝতে পারি নি, এ কেমন বিশ্রামের কথা জানিয়েছিলে। সেদিন থেকে মাত্র তের দিন পরই তুমি চিরবিশ্রামের নামে হারিয়ে যাও। 

এই একই জায়গায় আজ তোমার নামে কমিউনিটি ক্লিনিক হয়েছে। এটি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু`র সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ভাবনাপ্রসূত গ্রামীন স্বাস্থ্যসেবার এক অভূতপূর্ব তৃণমূল কেন্দ্র। সাধারণের প্রবেশাধিকারের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান এটি। যুগ যুগ ধরে অসহায়, নিঃস্ব ও সুযোগবঞ্চিতদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার এক মহান অবলম্বন হয়ে টিকে থাকবে এই মডেল ক্লিনিক। সঙ্গে তোমার নাম। মানুষ তোমাকেই স্মরণ করে যাবে অনাগত কাল। আসলে তুমিই ভাগ্যবতী! তুমি অনন্যা! অসাধারণ এক বিদুষী নারী। তুমি আমার রত্নগর্ভা মহীয়সী। ভালো থেকো। 

৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ 
১৪ জুন ২০২১ খ্রিঃ ।