ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আমার অস্তিত্বের প্রগাঢ় প্রতিমা 

মোহন রায়হান
প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২১ শুক্রবার, ১০:০২ এএম
আমার অস্তিত্বের প্রগাঢ় প্রতিমা 

মা`র ঘরের দরজা খুলে দেখি মা শুয়ে আছে। আমাকে দেখে প্রতিদিনের মতোই মা`র চোখ চকচক করে উঠল আনন্দে। গেদা আইছ?` আমার কাছে বইসো।` বলে মা বিছানায় উঠে বসল। আমি মা`র কাছে গিয়ে বসলাম। মা আমাকে  জড়িয়ে ধরল। কপালে, গালে, চোখেমুখে চুমু খেল। মাথায়, ঘাড়ে, পিঠে আদর করতে করতে বলল, খাইছ?`` হ্যা, মা। শিশুকালের মতনই মা`র বুকের মধ্যে পরম শান্তিতে মুখ ডুবিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর মা`কে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে প্রতিদিনের মতোই মা`র সিল্কের মতন নরম সাদা চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে বিলি কেটে দিলাম। মাথা, কপাল, ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, হাত, পা টিপে দিলাম, হাত আর পায়ের আঙুলগুলো টেনে দিলাম। মা আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেল। মা`র জ্যোর্তিময় মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলাম। কী সুন্দরী ছিল আমার মা! কী দুধে-আলতায় গায়ের রং! সেই অপূর্ব সুন্দর মুখখানি আজ বয়সের ভাটায় কেমন কুঁকড়ে গেছে! কপালে বলিরেখা। গোলাপের পাঁপড়ির মতন গাল দুটো চোয়ালের ভেতর ডুবে গেছে। তবু কী যেন এক অলৌকিক পবিত্র বিভা ছড়িয়ে আছে মা`র সারামুখে। ভীষণ নষ্টালজিয়ায় কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম!  কিন্তু কোথায় মা? ভালো করে তাকিয়ে দেখি মা নাই!  নাই নাই নাই!  সেই ঘর! সেই বিছানা-বালিশ- চাদর-পর্দা-চেয়ার-টেবিল-আলনা সবই আছে। শুধু আমার মা নাই! মা নাই?  সত্যি নাই? টেবিলে মা`র কোরান শরীফ, দোয়ার বই, তসবিহ, চশমা। বুকটা শূন্য মরুভূমির মতন হুহু করে উঠল। ভারি বোমা বর্ষণের মতন দুমড়েমুচড়ে, চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল পাঁজর। পাগলের মতন ক্ষিপ্র হাতে মা`র তসবিহটা তুলে নিয়ে চুমু খেলাম। বুকের ভেতর চেপে ধরে ডুঁকরে কেঁদে উঠলাম, মা, মাগো বলে। মা`র স্পর্শ, ঘ্রাণ লেগে থাকা বিছানায় ঢলে পড়লাম। গড়িয়ে গড়িয়ে মা`কে না পাওয়া শিশুর মতন অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলাম। সারাটা দুপুর মা`র কোল-বালিশটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে মা`র অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করলাম। বিকেলে উঠে মা`র দোয়ার বইটা হাতে নিয়ে খুলে দেখি, বিভিন্ন পৃষ্ঠার ভেতরে ছোট ছোট টুকরো কাগজে মা`র নিজের হাতে লেখা কতগুলো দোয়া, কিছু নাম এবং মোবাইল নম্বর লেখা কিন্তু তাদের আমি চিনি না। একটি চিরকুট আমাকে চমকে দিল। মা লিখেছে- 
একটি ফুলের দুটি নাম হয় না
একটি গোলাপ দুটি হয় না।"

কী আশ্চর্য! মা কি কবিতা লিখেছে? নাকি অন্য কিছু? কি এর মাজেজা? জ্ঞান হওয়ার পর থেকে শুনেছি মা`র সঙ্গে জিন আছে। এমনকি দেখেছি অনেক কিছু। জিন এলে মা লম্বা ঘোমটা দিয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে সুর করে কোরানের আয়াত মুখস্থ পাঠ করত। সবাইকে আল্লাহর পথে আসার পরামর্শ দিত। একদম শুদ্ধ ভাষায় কথা বলত। ছোট বড় সবাইকে `আপনি` বলত। জিন চলে যাওয়ার সময় সজোরে মাথা দোলাতে দোলাতে মা জায়নামাজে লুটিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে যেত। ছোটবেলায় বিশ্বাস করতাম, সত্যি মা`র সঙ্গে জিন আছে। বড় হয়ে বুঝতাম, মা`র কোনো মানসিক চাপ থেকে এমন হতো। 

কদম ফুলের মতন কোমল আমার মা, অতি পর্দানশীন, ধার্মিক, পরহেজগার, শুদ্ধাচারিণী, সারাক্ষণ অজু করে থাকত। এমনকি তাঁর পাশ দিয়ে কুকুর হেঁটে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে অজু করত। ঝড়, বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, মহাবিপদ, অসুখবিসুখে শুধু জ্ঞান হারানো ছাড়া কোনোদিনও নামাজ ক্বাজা করত না। মধ্যরাতে তাহাজ্জুদ, ভোররাতে ইশরাক, সকালে চাশত, মাগরিবের পর আওয়াবিনসহ কত রকমের যে নামাজ মা পড়ত! আর মানুষকে হেদায়েত করত, সত্যের পথে ন্যায়ের পথে চলতে, হালাল রুজি আর সৎ জীবন যাপন করতে। মা`র চলে যাওয়ার ২ মাস পূর্ণ হলো আজ ১৭ জুন ২০২১। কিন্তু মা যেন আছে সারাদিন, সারাক্ষণ আমার সঙ্গেই। একটি মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারিনি মা`র মুখ। সেই নিষ্পাপ প্রাণমন জুড়ানো মোহনীয়া হাসি! মধুময় কথা বলা। সুশোভন ওঠা-বসা-হাঁটা-চলা-খাওয়া-ঘুমানো-নামাজপড়া-কোরান-তেলওয়াত-তসবিহগোনা। সারাক্ষণ চোখে চোখে ভাসে। আমার সমগ্র চেতনা জুড়ে প্রতিমুহূর্তে প্রবল হয়ে ওঠে কেবলি মায়ের উপস্থিতি। না মা, তুমি আমাকে ছেড়ে কিছুতেই চলে যেতে পারো না। তুমি আছ। থাকবে আমার রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায়। হৃদস্পন্দনে। প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে। ঘুমে-জাগরণে। স্বপ্ন- কল্পনায়। সুখে-দুখে। বিপদে-আসানে। আনন্দ- বেদনায়। জীবন যতদিন ততদিন তুমি। আয়ু যতদিন ততদিন তুমি। আমার শব্দ যতদিন ততদিন তুমি। আমার কবিতা যতদিন ততদিন তুমি। আমার সৃষ্টি যতদিন ততদিন তুমি। কোথাও তোমাকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কোথাও তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না মা। আমার দুখিনী মা। মাগো, আমার গর্ভধারিণী, সুনিপুণ সৃষ্টি-নন্দিনী, প্রসবিনী। আমার অস্তিত্বের প্রগাঢ় প্রতিমা। তুমি ছাড়া আর কিছুই বড় নয় এই নশ্বর পৃথিবীর!