ঢাকা, রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী
প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২১ রবিবার, ০২:০১ পিএম
বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

মানুষ কখনো তার সাথীকে ভুলে যায় না। বিশেষ করে সেই সাথী যদি হয় তার স্থায়ী বন্ধু। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে আমরা ভারতকে আমাদের স্থায়ী বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা আমাদের সেই বিবেচনা থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা একচুলও বিচ্যুত হননি।  একারণেই ভারত যখন যেটা যুক্তিপূর্ণ আবদান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে করেছেন তিনি সেটি রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একজন বন্ধু যদি একজন জন্য করবে আরেকজন বন্ধু যদি তার বিপদে তাকে মনে রাখবে না সেটি হচ্ছে সেই দুই বন্ধুর গল্পের মতো। যখন তারা দুই বন্ধু এক বাগানে গল্প করছিল, তখন সেখানে একটি ভাল্লুক আসে। এক বন্ধু গাছে উঠতে পারে, সে উঠে গেলো। আরেক বন্ধু মরার মতো শুয়ে থাকলো। তারপরে যখন ভাল্লুক চলে গেলো গাছের বন্ধু নিচে এসে তার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলো যে, তোমার কানে কানে ভাল্লুক কি বলল। নিচে শুয়ে থাকা বন্ধু বলল, "বিপদেই বন্ধুকে চেনা যায়"।

ভারত আমাদের সাময়িক বিপদে ফেলেছে কিন্তু এমন বিপদ যে বিপদে জনগণ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ভুল বোঝার প্রচুর সম্ভাবনা আছে। তারা যখন হঠাৎ করে আমাদের পেঁয়াজ দেওয়া বন্ধ করে দিল এবং সেই অবস্থা কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা তার বুদ্ধিমত্তা, তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকার কারণে সেই অবস্থা থেকে তিনি উতরে গেছেন। এরপরে দেখা গেলো যে, ভারত থেকে সেরাম ইনস্টিটিউট টাকা নিয়ে আমাদের ভ্যাকসিন দিল না। যুক্তি দেখালো আমাদের করোনা পরিস্তিতি খুব খারাপ। এ কথা ঠিক যে, ভারতের তখন করোনা পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল। তবে তার মধ্য থেকে আমাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য মাত্র ২০-২২ লাখ ডোজ দেওয়া ভারতের কাছে উপহার হিসেবেও কোনাে ক্ষতির কাজ ছিল না। কিন্তু ভারত সেটা করে নি।

শুধু তাই নয়, আমি ইতিমধ্যে সেরাম ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন মাধ্যমে আমার সঙ্গে যাদের যোগাযোগ আছে তাদের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছি যে, এখন যে পরিমাণ কোভিশিল্ড টিকা ভারত উৎপন্ন করছে এবং ভারত এখন যে পরিমাণ ভ্যাকসিন রোল আউট করছে সেখানে সমস্ত কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন প্রয়োজন হচ্ছে না। কারণ তারা বিভিন্ন ভ্যাকসিন দিচ্ছেন। এই কারণে সেখান থেকে বাংলাদেশের কেনা ভ্যাকসিন অর্থাৎ এক বন্ধুকে বিশ্বাস করে আরেক বন্ধু যে ভ্যকসিন কিনেছিল, সেটা তারা দিচ্ছে না। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে যে, ভারত আস্তে আস্তে আমাদের বন্ধুত্ব থেকে সরে যেতে চাচ্ছে। ভারতের মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারতের কোনো প্রতিবেশির সাথেই তারা বন্ধুত্ব স্থায়ীভাবে রাখতে সক্ষম হচ্ছে না।

তারা আমাদেরকে দেখা যাচ্ছে যে, পানির জন্য যে ব্যবহারটা করেছে তার সমাধানকল্পে আমাদের ইতিমধ্যে চীনের সহায়তায় আমরা তিস্তা নদীতে জলাধার নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চলেছি এবং আশা করি আমরা এতে সমর্থ হবো। ভারতের মনে রাখতে হবে যে, সাময়িকভাবে আমাদের প্রতি যে শত্রুভাবাপন্ন ব্যবহার করলো এর কিন্তু মূল্য দিতে হবে। কেননা কখনোই এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে প্রয়োজনের সময় সাহায্য না করলে আরেক বন্ধু তাকে সাহায্য করবেই এটি আশা করা সঠিক নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান আমরা ভুলিনি। কিন্তু আমরা যে ভারতকে কি দিয়েছি স্বাধীনতার ৫০ বছরে ভারত কি তা একবারও হিসাব করছে না। 

তারা মনে হচ্ছে যেনো ভারতের গরুর প্রতি যেটুকু যত্নশীল, আমাদের দেশের মানুষের প্রতি সেটুকু নয়। আমরা দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে না পারার ফলে আমরা যেরকম লজ্জিত হচ্ছি মানুষের কাছে তাদের কাছে সেটাও কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না। এতে করেই প্রমাণিত হয় যে, ভারত আমাদের বন্ধুত্ব চায় না। ভারতের অনেক বিজ্ঞ লোক আছেন, যারা পরীক্ষা করে দেখুন যে বাংলাদেশ ছাড়া এই অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়া তাদের কোনো পরীক্ষিত বন্ধু আছে কিনা।  আমরা যেটুকু রাজনীতি বুঝি তাতে আমরা বিশ্বাস করি আমরা ছাড়া তাদের কোনো বন্ধু সেরকভাবে আর নাই এবং তারা আমাদেরকে নিজেরাই তাদের বন্ধুত্বের খাতা থেকে নাম কেটে দিচ্ছে। আমাদের যদি নাম কেটেই দেয় তাহলে তো স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে আমাদের আর সেই নির্ভরযোগ্য বন্ধুত্ব আর থাকলো না। 

দুই ধরনের বন্ধুত্ব হয়। একটি হলো, মৌখিক তথাকথিত বন্ধুত্ব। আরেকটি হলো বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুত্ব। ভারত এখন আমাদের বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু সে কথা বললে সত্যই অপরাধ হবে। ভারতকে চিন্তুা করতে হবে যে, তারা বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাসযোগ্য এবং স্থায়ী বন্ধুত্ব চায় কিনা। যদি চায়, আমি যেহেতু জেনে বলছি, আমি বিএমআরসি`র চেয়ারম্যান হিসেবে আমার এই সব সয়েন্টিফিক খবরগুলি জানতে হয় তাই জেনেছি, তারা অবিলম্বে যেকোনো আকারেই হোক আমাদেরকে দেওয়া শুরু করতে পারে। যদি তারা সেটা শুরু না করে তাহলে আমরা বুঝে নেবো যে, ভারতের ওপরে কোনো ব্যাপারেই বিশ্বাস করা যাবে না। 

ভারতবাসী যেনো ভুলে না যায় যে, যখন দেশ স্বাধীন হয়, ইংরেজদের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালে, তখন ভারতের অনেক অসুবিধা ছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী নেহেরু দেশকে সেল্ফ সাফিসিয়েন্ট করার জন্য দেশবাসীকে অনেক কষ্ট দিয়েও তারা টেকনোলজিকে উন্নত করেছিল। টেকনোলজিক্যাল এই উন্নতি করতে গিয়ে তারা সমরাস্ত্রের দিকে নজর দেয়নি দেখে যখন চীনের সাথে তাদের যুদ্ধ হয় তখন দেখা যায় ভারত চীন থেকে অনেক নিচে অবস্থান করছে। আমরা অবশ্যই আল্লাহ`র মর্জি প্রত্যকটি ব্যাপারে সেল্ফ সাফিসিয়েন্ট হওয়ার জন্য আমাদের একজন শেখ হাসিনা আছেন। যে রাষ্ট্রনায়ক প্রতিটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন। তিনি অবশ্যই এই সাময়িক অসুবিধা দূর করতে সক্ষম হবেন। সর্বোচ্চ আমাদের হয়ত জুলাই মাসের অর্ধেক পর্যন্ত বিভিন্ন রকমের জোড়াতালি দিয়ে চলতে হবে। তারপর থেকে আমরা ভ্যাকসিনে অবস্থার উন্নতি করতে পারবো।

যদি কেউ দোষ বলে, তাহলে বলবো আমাদের দোষ হয়েছে সেটি হচ্ছে, ভারতকে আমরা নির্ভরযোগ্য বন্ধু মনে করেছি। আমাদের ভারতকে বন্ধু ভাবায় দোষ ছিল না কিন্তু নির্ভরযোগ্য বন্ধু ভাবাটা বোধহয় ভুল ছিল। ভারত যেমন তাদের স্বার্থের জন্য আমাদেরকে বন্ধু ভাবে, আমাদেরও তাদেরকে স্বার্থের ওপরে বন্ধু এখন থেকে ভাবা শুরু করবো। তাই ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এখনো তাদের সরকারকে গরুর দিকে নজর না দিয়ে মানুষের দিকে নজর দেওয়ার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি এবং আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, না হলে তারা যেরকমভাবে স্বার্থের জন্য বন্ধুত্ব রক্ষা করে, আমাদেরও বন্ধুত্ব ভারতের সাথে ও স্বার্থের জন্যই হবে। ভারত যে বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু ছিল সেটা ভারতই নষ্ট করলো। এর সব দায় দায়িত্ব ভারতকেই নিতে হবে।