ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এখনো শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র চলছে!

সৈয়দ বোরহান কবীর
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২১ শনিবার, ১০:০০ এএম
এখনো শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র চলছে!

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই। মাঝরাত থেকেই অঝর ধারায় বৃষ্টি। প্রকৃতি যেন কান্নায় কাতর। ১৫ জুলাই সন্ধ্যার পরই ধানমন্ডির সড়কগুলোয় ব্যারিকেড দেওয়া শুরু হয়। রাতেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। ভোররাতে বুটের আওয়াজে জেগে ওঠে ‘সুধা সদন’। বাড়ির মালিক পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া অসুস্থ। এর মধ্যেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করতে আসে যৌথ বাহিনী। শেখ হাসিনা ছিলেন ভয়হীন, স্বাভাবিক। গ্রেফতার প্রক্রিয়া শেষ করে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়। সকাল ৮টারও আগে মহানগর হাকিম কামরুন্নাহারের আদালতে হাজির করা হয় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে। ১৩ জুন ঢাকার গুলশান থানায় ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীর করা একটি তথাকথিত চাঁদাবাজির মামলা দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে জাতীয় সংসদে হুইপদের জন্য নির্ধারিত একটি বাসায় রাখা হয়। সরকার ওই বাড়িটিকে সাবজেল ঘোষণা করে। এখানেই দীর্ঘ ১১ মাস কাটান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। ২০০৮ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনা কারামুক্ত হন। গতকাল (শুক্রবার) তাঁর কারাবরণের ১৪ বছর পূর্তি হলো। ১৪ বছর পর ওই ঘটনার স্মৃতি সামনে এলো কিছু প্রশ্ন নিয়ে। কিছু প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি, কিছু জানি না। কেন সেদিন শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল? দুর্নীতির জন্য নাকি বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার জন্য? ওই সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যারা মামলা করেন তার দুজনই (আজম জে চৌধুরী এবং নূর আলী) পরে স্বীকার করেন চাঁদাবাজির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তৎকালীন অনির্বাচিত সরকারের চাপে এ মামলা করা হয়েছিল। পরে সর্বোচ্চ আদালত এ মামলাগুলো খারিজ করে দেয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর চরম প্রতিপক্ষও তাঁকে দুর্নীতিবাজ বলতে পারেনি। সাধারণ মানুষও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সততা নিয়ে নিশ্চিত। তাহলে এটা বলতেই হয়, ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর গ্রেফতার স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া ছিল না। একটি রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের প্রয়াশ। এ চেষ্টা শুরু হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের আগেই। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপির মরিয়া চেষ্টার পরিণাম ছিল ওয়ান-ইলেভেন। ২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনে বিপুল ভোটে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি-জামায়াত জোট। এরপর শুরু হয় হাওয়া ভবন ও জঙ্গিবাদীদের যুগপৎ তাণ্ডব। একদিকে লুটপাট, অন্যদিকে বাংলা ভাইদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান। একদিকে দুর্নীতিবাজদের উল্লাসনৃত্য, অন্যদিকে সারা দেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার। জনজীবন হয়ে ওঠে অস্থির। বিএনপি বুঝতে পারে জনগণের ভোটে তাদের বিজয় অসম্ভব। তাই ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নীলনকশা তৈরি হয়। বিচারপতি কে এম হাসান যেন প্রধান বিচারপতি থেকে অবসরের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন তা নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধন করা হয়। নির্বাচন কমিশনকে বানানো হয় ভাঁড়দের আড্ডাখানা। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার তালিকাভুক্ত করা হয়। প্রশাসনে দলীয় অনুগত, দলবাজদের তিন স্তরে সাজানো হয়। নয়জনকে ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান করা হয় জেনারেল মইন উ আহমেদকে। কিন্তু বেহুলার নিñিদ্র বাসরঘরে যেমন সাপ ঢুকেছিল তেমনি খালেদা জিয়ার সাজানো বাগান তছনছ হয়ে যায় ওয়ান-ইলেভেনের ঝড়ে। বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী ও সুশীলদের একটি বড় অংশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপছন্দ করেন। এর প্রধান কারণ গণতন্ত্র থাকলে এদের কদর থাকে না। এজন্য এই সুশীলরা সব সময় অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক এবং অবৈধ সরকার ক্ষমতা দখল করলে উল্লাসে ফেটে পড়েন। এ সময় তাদের কদরও বাড়ে। নানা পদে এরা অলঙ্কৃত হন। ২০০৬ সাল থেকেই সুশীলরা সুযোগ খুঁজতে থাকেন ক্ষমতা দখলের। ইয়াজ উদ্দিনের তামাশার নির্বাচন নিয়ে গোঁয়ার্তুমি সেই সুযোগ সামনে এনে দেয়। ওয়ান-ইলেভেন কেবল সুশীলদের পরিকল্পনা নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রভাবশালীরা এতে সায় দেয়। দেশের কিছু আমলা, সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি নীলনকশা বাস্তবায়নে নিবেদিত হয়ে কাজ করেন। ওয়ান-ইলেভেনের মূল পরিকল্পনা ছিল সুশীল নিয়ন্ত্রিত একটি সরকার অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকবে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয় তা এক-এগারোর যৌক্তিক পটভূমি তৈরি করে। তাই সেনাসমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন গঠিত হয় তখন সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সুশীল আমলা-বিদেশিরাও খুশি হয়। তারা নিশ্চিত হয়েছিল অন্তত কয়েক বছর কেউ নির্বাচন নিয়ে কথা বলবে না। এ সময়ের মধ্যে তারা দেশকে রাজনীতিশূন্য করবে।

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় ‘বিরাজনীতিকরণ’ বহুল চর্চিত একটি বিষয়। উচ্চাভিলাষী কিছু মহল, পদলেহী কিছু বুদ্ধিজীবী ক্ষমতা দখলের জন্য বিরাজনীতিকরণ ফরমুলা ব্যবহার করে। আর এ ফরমুলা বাস্তবায়নের সহজতম উপায়টি হলো রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন। ওয়ান-ইলেভেনের আগেই সে প্রক্রিয়ার নীরব বাস্তবায়ন শুরু হয়। ওয়ান-ইলেভেনের পর এ প্রক্রিয়াই যেন মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন শুরু হয়। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো রাজনীতিবিদদের নিয়ে চানাচুর মুখরোচক চটুল খবর প্রকাশ করতে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্রটি প্রয়োগ করা হয় ২০০৭ সালের ১১ জুন। ওই দিন সে সময় দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী বাংলা দৈনিকের সম্পাদক স্বনামে প্রথম পৃষ্ঠায় এক মন্তব্য প্রতিবেদন লেখেন। ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে’ শিরোনামে ওই মন্তব্য প্রতিবেদনে লেখা হয়- ‘আমরাও একইভাবে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে বলতে পারি, গত ১৬ বছরে আপনাদের দুজনের ক্ষমতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির অনেক অত্যাচার দেশবাসী নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে। দয়া করে আপনারা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।’ তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এ দৈনিকটির মন্তব্য প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এজেন্ডা পরিষ্কার হয়ে যায়। শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া সে সময় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতা। তাঁদের বিপুল জনসমর্থন। কাজেই তাঁদের সরিয়ে দিতে পারলেই নির্বাচন গণতন্ত্র ইত্যাদি থেকে আপাতত জনগণকে দূরে রাখা যায়। বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে অবশ্য ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারের খুব একটা সমস্যা হয়নি। তিনি দেশের চেয়ে দল, দলের চেয়ে পরিবার এবং পরিবারের চেয়ে তাঁর দুই সন্তানকে ভালোবাসেন। তাঁর দুই সন্তানের সীমাহীন দুর্নীতিকে প্রবল মাতৃস্নেহে ‘দুষ্টুমি’ বলেই মনে করেন। তাই তাঁর দুই ছেলের বিনিময়ে বেগম জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব শুধু নয় রাজনীতি ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু সুশীল নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরাজনীতিকরণ এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাই বাংলাদেশে প্রথম রাজনীতিবিদ যিনি এক-এগারো সরকারের দুরভিসন্ধি বুঝতে পারেন। তিনিই প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অযথা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নির্বাচন দিতে বলেন। এ সময় ঘরে-বাইরে তুমুল প্রতিরোধের মুখে পড়েন শেখ হাসিনা। দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা শেখ হাসিনার দ্রুত নির্বাচনের দাবিকে অযৌক্তিক বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। কিন্তু ১৯৮১ সাল থেকে শেখ হাসিনার রাজনীতি কৌশলে অকপটে স্পষ্ট কথা বলার অভ্যাসটা ছিল। একসময় যাকে মনে করা হতো তাঁর রাজনীতির জন্য নেতিবাচক, পরে সেই স্পষ্টবাদিতাই তাঁর রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৮১ সাল থেকেই দলে এবং দলের বাইরে প্রতিকূল স্রোতে সাঁতার কেটেই তিনি আজকের জায়গায় এসেছেন। তাই প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই শেখ হাসিনা গণতন্ত্র এবং নির্বাচনের দাবি উচ্চারণ করতে থাকেন। রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রথম উদ্যোগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেয় ২০০৭-এর মার্চে। সে সময় শেখ হাসিনা তাঁর ছেলে ও মেয়েকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র যান। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁর দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এটি দেশে-বিদেশে ধিকৃত এবং সমালোচিত হয়। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কাছে পরাজিত হয় ড. ফখরুদ্দীনের সরকার। শেখ হাসিনা লড়াই করেই দেশে ফেরেন। তখনই বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার লোকজন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উদ্ভট মামলা করার চেষ্টা চালান। আমি ১৬ জুলাইকে দেখি গণতন্ত্র, নির্বাচনের সঙ্গে বিরাজনীতিকরণের প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হিসেবে। ১৬ জুলাই স্পষ্ট হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে মাইনাস টু নয়, মাইনাস ওয়ান ফরমুলা বাস্তবায়ন করতে চায়। ১৬ জুলাই পরিষ্কার হয়ে যায় শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই অনির্বাচিত সরকার অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্ষমতায় থাকতে পারবে। যা খুশি তা করতে পারবে। শেখ হাসিনাকে যদি গ্রেফতার করার পর রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া যেত তাহলে হয়তো বাংলাদেশে বহুদিন আর গণতন্ত্র, নির্বাচন হতো না। রাজনীতিবিদরা থাকতেন নক্ষত্রের দূরত্বে। কিন্তু ১১ মাসের যুদ্ধে শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত জয়ী হন। তিনি মুক্ত হন। ২০০৮-এর নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয় তাঁর নেতৃত্বে মহাজোট। টানা ১২ বছরের বেশি সময় দেশ পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা।

কিন্তু ১৪ বছর পর আজকের পরিস্থিতি যদি আমরা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে কি আমরা বলতে পারব বিরাজনীতিকরণ নেই? ওয়ান-ইলেভেনের লক্ষ্য অর্জনের নিবিড় চেষ্টা এখনো চলছে না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কি রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে, তাঁর বিশ্বস্ত ও কাজের মানুষদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার নিঃশব্দ প্রয়াশ চলছে না? ১৬ জুলাই শেখ হাসিনা গ্রেফতারের পর যাঁরা তাঁর জন্য তাঁর পক্ষে বিভিন্নভাবে কাজ করেন তাঁরা এখন কোথায়? জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাহারা খাতুন, এইচ টি ইমাম নেই। যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদেরও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার এক প্রাণান্ত চেষ্টা আমরা দেখি। বেগম মতিয়া চৌধুরী না আছেন সরকারে না দলে। ড. গওহর রিজভী যেন থেকেও নেই। সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী কোথাও নেই। তাহলে শেখ হাসিনার পাশে কারা? এরা কি প্রধানমন্ত্রীকে রাজনীতিমুক্ত করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন?

অনুজপ্রতিম শাবান মাহমুদ এখন দিল্লিতে। বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেস মিনিস্টার। ওয়ান-ইলেভেনে শাবান দ্বারে দ্বারে ঘুরত। সবার কাছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর পক্ষে যুক্তিপূর্ণ লেখার অনুরোধ করত। সে সময় শেখ হাসিনার পক্ষের কলমযোদ্ধারা আজ কোথায়? তাদের খবর কি কেউ রাখে? এখন প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া এসব সংবাদকর্মী কি শেখ হাসিনার পক্ষে এক লাইন সে সময় লিখেছিলেন? ভবিষ্যতে লেখার যোগ্যতা এবং মানসিকতা কি তাদের আছে?

আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর গ্রেফতারের সময় তাঁর প্রধান শক্তি ছিল তৃণমূল। সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগের মতো তরুণ প্রাণে ভরপুর সহযোগী সংগঠন। এরাই সংস্কারপন্থিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সংস্কারপন্থিদের এক উঠতি নেতাকে ধোলাই দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ এক অভিন্ন সত্তা। এ তৃণমূলের জন্যই আওয়ামী লীগ সেই কঠিন সময়ে বিভক্ত হয়নি। সংস্কারপন্থিরা পিছু হটতে বাধ্য হন। এখন আওয়ামী লীগের তৃণমূল কোথায়? হাইব্রিড আর অনুপ্রবেশকারীরাই যেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের হর্তাকর্তা। ত্যাগী-পরীক্ষিত কর্মীরা যেন দুর্ভাগা। তাদের খবর কে নেয়? আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যতবার বলছেন দলের ভিতর সুবিধাবাদী, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে হবে ততবার যেন এক অশুভ শক্তি তাদের শক্তিশালী করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। আওয়ামী লীগের বদলে এখন এমপি লীগের রাজত্ব। সেদিন দেখলাম আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এক এমপিকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন। ওই এমপি দলের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় পকেট কমিটি করেছেন। মির্জা আজম সাহসী, দলের জন্য অন্তঃপ্রাণ, তাই তিনি চিঠি দিয়ে ওইসব কমিটি বিলুপ্ত করেছেন। ওই এমপি জীবনেও আওয়ামী লীগ করেননি। ছাত্রজীবনে জাসদ করেছেন। ওয়ান-ইলেভেনে পুলিশের সর্বোচ্চ পদে ছিলেন। ভাগ্যবান ব্যক্তি। দলের আদর্শের প্রতি এতটুকু অনুগত না থেকে তিনি এমপি হয়েছেন। এখন বিকল্প আওয়ামী লীগ গড়েছেন তাঁর নির্বাচনী এলাকায়। জাহাঙ্গীর কবির নানক, বাহাউদ্দিন নাছিমের মতো পোড় খাওয়া, নির্যাতিত-নিপীড়িতরা সংসদে নেই। গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, হঠাৎ বনে যাওয়া বড়লোকেরা সংসদে বসেছেন। সংসদে বসে তাঁরা তাঁদের নিত্যনতুন ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছেন। তাতেও আমি শঙ্কিত হতাম না। কিন্তু এ নব্য উড়ে এসে জুড়ে বসা আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হওয়া ব্যক্তিরাই এখন প্রকাশ্যে বিকল্প আওয়ামী লীগ বানাচ্ছেন। এরা কি কোনো দুঃসময়ে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াবেন? ছাত্রলীগ, যুবলীগের চরিত্রহনন করতে করতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে এ সংগঠন দুটোর কর্মীরা এখন কিছু করতেই ভয় পান। ছাত্রলীগের কর্মীরা যখন ধান কাটেন তখন তা গুরুত্বপূর্ণ খবর হয় না। ছাত্রলীগের কর্মীরা যখন ত্রাণ দেন তখন কেউ বলে না ‘খুব ভালো কাজ’। কিন্তু একদা ছাত্রলীগ করতেন কিংবা ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়ে কেউ একটা অপকর্ম করলেই তাকে ছাত্রলীগের নেতা বানিয়ে দেওয়া হয়। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তার অপকর্মের ফিরিস্তি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর যুবলীগকে তো ‘ক্যাসিনো লীগ’-এর তকমা দিয়ে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনে শেখ হাসিনার পক্ষে যে ব্যক্তিরা কাজ করেন তাঁদের বড় অংশ আজ ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়েছেন। আর তৃণমূল আজ বিভক্ত। তাহলে শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়াবে কে? এই আমলারা? ভাড়াটে এমপিরা? নাকি এরাই ঘরের শত্রু বিভীষণ। নিশ্চিত করে বলছি, এঁরা একজনও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর জন্য দাঁড়াবেন না। বরং এঁদের কেউ কেউ হয়তো আজম জে চৌধুরী কিংবা নূর আলীর মতো ভয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেবেন। অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক। ওয়ান-ইলেভেনে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর নেতৃত্বে শেখ হাসিনার চিকিৎসক টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন। প্রায়ই তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি সব সময় একটি কথা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আমাদের আর কোনো আস্থার জায়গা নেই। তাঁকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে কি না আমার সন্দেহ হয়।’ যখন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ধসে পড়ে। যখন দেখি সমন্বয়হীন উদ্ভট লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। যখন দেখি হতাশ তৃণমূলের কর্মীটি উদ্বিগ্ন। ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর হাত হারানো কর্মীটি আক্ষেপে বলেন, ‘এবার কিছু হলে আর বাঁচতে পারব না’। যখন হাইব্রিড এমপি এলাকায় গিয়ে জাতির পিতার নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেন না। তখন মনে হয় শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার চক্রান্তটা তাহলে এখনো চলছে। সেই চক্রান্তের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে সর্বত্র। ক্রমে মাইনাস ফরমুলার উত্তরাধিকারীরাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে। আর শেখ হাসিনার পক্ষের শক্তিগুলোকে নিঃশেষিত করার কাজটা যেন চলছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
ইমেইল : poriprekkhit@yahoo.com
সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন