ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

দয়া করে অ-কার্যকর লকডাউনের নীতি আর নয়

অধ্যাপক ডাঃ কাজী মনিরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২১ মঙ্গলবার, ১০:০০ এএম
দয়া করে অ-কার্যকর লকডাউনের নীতি আর নয়
আমি নিয়মিত ল্যানসেট এবং দ্য নেচার সহ পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধগুলি পড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংবাদপত্র, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, রেকর্ডকৃত বাংলাদেশ টিভি সংবাদ এবং টক শো পড়ি এবং দেখি। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে ইদানিং কালের প্রকাশিত কিছু নিবন্ধ আমাকে এই সংক্ষিপ্ত মতামত লিখতে আগ্রহী করেছে। অন্যদিন আমি প্রথম আলোর আনিসুল হকের একটি লেখা “কোরনা পরিস্তিতি নিয়ে আশার গল্প, শিক্ষার গল্প” পড়লাম এবং একই কাগজে লেখা “যেভাবে করোনা সংক্রমণ কমিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ” আনোয়ার হোসেনের লেখা এবং “এই সব ‘লকডাউনের’ অর্থ কী?” এ কে এম জাকারিয়ার লেখা আর “ এখন বিধিনিষেদ সফল হওয়া সম্ভব নয়” ডা: সৈয়দ আবদুল হামিদের সাক্ষাৎকার পড়লাম। মি: জাকারিয়া তার প্রবন্ধটিতে “আল্লার কসম গেটলক সিটিং সার্ভিস” লেখাটি পড়ে আমারও ভালো লেগেছে। যা আমরা আমাদের বাংলাদেশে লকডাউনের তৃতীয় সংস্করণের সাথে তুলনা করতে পারি, এবং আমরা বলতে পারি “আল্লার কসম এইবার এটি সবচেয়ে কঠোর লকডাউন”। আমি বাংলা ইনসাইডারে লেখা “কাল থেকে আবার হ-য-ব-র-ল লকডাউন” এবং বিডি নিউজ ২৪ বা জনকন্ঠ বা বাংলাদেশের প্রতিদিন পড়েছি এবং সময় বা ৭১ টিভির সংবাদ দেখেছি। সমস্ত কাগজপত্র এবং টিভি সাধারণ জনগণকে সময়মত সঠিক তথ্য জানানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ কেউ আবার আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। যেমন তানজিল রিমন priyo.com এর প্রবন্ধ “ভয়াবহ পরিবেশের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ?” পড়ে তাই মনে হতে পারে। আমি পড়লাম প্রয়োগযোগ্য বা কার্যকরী কোনো প্রমাণ না দেখিয়ে তথাকথিত “আল্লার কসম লকডাউন” এর মেয়াদ আবার বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে ডিজিএইচএস!
 
আসুন এটি সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার জার্নালটিতে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে (১৬ই নভেম্বর ২০২০) ২২৬ দেশের ৬০৬৮টি পৃথক অ-ফার্মাসিউটিক্যাল হস্তক্ষেপের (Non Pharmaceutical Intervention, NPI এনপিআই) যেমন লক লকডাউন, মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, স্কুল বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিবর্তনের সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদির কার্যকারিতা মূল্যায়ন। পূর্বের জাতীয় লকডাউনের কার্যকারিতা সম্পর্কে পরিসংখ্যানগত গবেষণাগুলি মিশ্র সিদ্ধান্তে এসেছিল সেই মুল্যায়নে। জাতীয় লকডাউন একাধিক এনপিআইকে অন্তর্ভুক্ত করে (উদাহরণস্বরূপ, স্থল, সমুদ্র ও আকাশ সীমানা বন্ধ করা, স্কুল বন্ধ করা, অপরিহার্য দোকানপাট বন্ধ করা, ঘরের বাহিরে মানব চলাচল এবং যে কোন জমায়েত নিষিদ্ধ করা এবং নার্সিং হোম পরিদর্শন নিষিদ্ধ করা, অফিস আদালত এবং ব্যবসার শিল্পগুলো বন্ধ করা) যা ভিন্ন দেশগুলিতে ভিন্ন ভাবে ইতিমধ্যে কিছু অংশে গৃহীত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন জাতীয় লকডাউন জারি করেছে। কিছু দেশ কঠোর ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে, সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে এবং কিছু দেশ লকডাউনের উপাদান বা লকডাউনের ছোট প্যাকেজ ব্যবহার করেছে। এই উপসংহারটি একটি প্রাথমিক ভাবে দেওয়া জাতীয় লকডাউনের কার্যকারিতা উড়িয়ে দেয় না (যা বাংলাদেশ ২০২০ সালের মার্চ মাসে কিছুটা সফলভাবে এবং সঠিকভাবে আরোপিত হয়েছিল) কিন্তু পরামর্শ দেয় যে এই ধরনের ব্যবস্থাগুলির ছোট প্যাকেজের একটি উপযুক্ত সংমিশ্রণ (ক্রম এবং বাস্তবায়নের সময়) কার্যকারিতার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ লকডাউনের বিকল্প হতে পারে যা সমাজ, অর্থনীতি, মানবিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এবং পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে না। দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য সফল সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য আর্থিক সহায়তাও অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। অতএব, এই ধরনের ব্যবস্থাগুলি কেবল আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত করে না বরং জনস্বাস্থ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, সব শ্রেণীর মানুষের কোভিড পরীক্ষা করা সহজতর করা বা কোভিড রোগের কারনে স্ব-বিচ্ছিন্ন করার সময় তাদের চাকরি হারানোর ভয় বা বেতনের কিছু ভাগ না পাওয়ার ভয় দুর করার ফলে জনগনের সহযোগিতা বৃদ্ধি করে কোভিড সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। স্বতন্ত্র এনপিআইগুলির কার্যকারিতা ক্ষমতায় থাকা সরকারের দক্ষতা ও কার্যকারিতা এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপট দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। এই স্থানীয় প্রেক্ষাপট গুলো হল মহামারীর পর্যায়, আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য এবং অন্তর্ভুক্ত পূর্বে বাস্তবায়িত অন্যান্য এনপিআই কার্যকারিতার এবং বজায় রাখার সক্ষমতার অতীত ইতিহাস। সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে বেশিরভাগ জনসমাবেশের জায়গা বন্ধ করা এবং সীমাবদ্ধ করা যেখানে মানুষ ছোট বা বড় সংখ্যায় বেশি সময় ধরে জড়ো হয় (বার, স্কুল, অভ্যন্তরীণ বা বহিরঙ্গন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সমাবেশ, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান ইত্যাদি)। স্থল সীমান্তের বিধিনিষেধ আরোপ করা, দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সরকারি সহায়তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিবর্তনের সামাজিক যোগাযোগ জনসাধারণকে স্বাস্থ্য পরামর্শ মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এই ব্যবস্থাগুলি ব্যক্তি এবং পারিবারিক জীবনে কম অনুপ্রবেশকারী এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে খুব বেশী প্রভাবিত করে না। কম কঠোর ব্যবস্থাগুলি জনসংখ্যার কাছ থেকে আরও ভাল সম্মতি জোগাতে পারে এবং জনসাধারণ তা মেনে চলতে আগ্রহি হতে পারে। সংক্ষেপে, স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সম্পূর্ণ কঠোর লকডাউন কার্যকর বা পরামর্শযোগ্য নয়। মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা জাল নিশ্চিত করার সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত গনজমায়েতে নিষেধাজ্ঞার মতো কিছু সাধারণত বাস্তবায়নযোগ্য অ-ফার্মাসিউটিক্যাল হস্তক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করুন যা জনসংখ্যার বেশিরভাগ দ্বারা কার্যকর এবং গ্রহণযোগ্য।
 
বাংলাদেশের স্থানীয় প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন এবং বিবেচনা না করে যখন ডিজিএইচএস অ-প্রয়োগযোগ্য “আল্লার কসম” লোকডাউন আরও এক্সটেনশনের অনুরোধ করে, তখন আমি আরও অবাক হই।
 
আসুন আনসুল হক এবং আনোয়ার হোসেনের প্রবন্ধে ফিরে আসি যেখানে তারা পরোক্ষভাবে ভারত এবং চাঁপাই নোবাবগঞ্জে সংক্রমণ হ্রাস বা বন্ধ করতে লকডাউন সমর্থন করার চেষ্টা করছিল। এটা কি সত্যি?
 
বাংলাদেশের মতো, ভারতে সবচেয়ে কঠোর লকডাউনের পরে বিজয়ের আগাম ঘোষণা এবং পরবর্তীকালে বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশ এবং গঙ্গায় বিশাল হিন্দু উৎসবের ফলে আমরা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ব্যাপক বৃদ্ধি দেখতে শুরু করি। এই বিপর্যয় বন্ধ করতে তখন কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য কর্তৃপক্ষকে স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার দেয়। কিছু কিছু রাজ্য যখন দ্রুত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে তখন স্থানীয় লকডাউন আরোপ করে। কয়েক সপ্তাহ পরে আমরা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কম পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি। কেন সংক্রমণ কমে আসলো, এটি লকডাউন বা অল্প কিছু লকডাউনের উপাদানগুলির জন্য যেমন সমস্ত অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত জমায়েত নিষিদ্ধ করা এবং সীমানা বন্ধ করা অথবা (যা আনসুল হক এবং আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেননি) ততক্ষণে জনসংখ্যার অধিকাংশ সংক্রামিত হয়েছে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে সে কারণেই। ICMR- এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যদিও টিকা কভারেজ এখনও খুব কম, তবুও ৬ বছরের উপরে বয়সের ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৭.৭% সংক্রমিত হয়েছে  এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। ইদানিং কালের উচ্চ সংক্রমণের কারনে মাত্র কয়েক মাস আগের থেকে এটি নাটকীয় ভাবে বেড়েছে। ৮৫% স্বাস্থ্যকর্মীদের শরীর ইতিমধ্যে সংক্রমিত হওয়ার জ্ন্য অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছে। শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি (৬ থেকে ১৭বছর বয়সী) সিরো-পজিটিভ হয়েছে। রোগ-বিস্তার গ্রামীণ এবং শহরাঞ্চলে একই রকম পাওয়া গিয়েছে। যদিও ৪০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ এবং সংক্রমণের মুখোমুখি। সুতরাং, আমাদের উপসংহারে যাওয়া উচিত নয় যে লকডাউন ভারতে সংক্রমণ কমিয়ে এনেছে।
 
চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে তাকানো যাক। ভারতে ২০২১ সালের এপ্রিলের শুরু থেকে, সংক্রামিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। ৫ই মে ভারতে সর্বাধিক সংখ্যক লোক ৪১২,৬১৪ জন কোভিড -১৯ এ সনাক্ত হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ১৪ই মে সরকার সর্বাধিক সংখ্যক ৪৯৬৭ জনকে কোভিড -১৯ এর কারণে মারা গেছে বলে জানিয়েছে। চাপাইনবাবগঞ্জ একটি জেলা যেখানে প্রায় ২০০০০০০ বাসিন্দা বসবাস করে এবং ভারতের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। মানুষ প্রতিদিন সীমাহীন সীমান্ত অতিক্রম করে। অনেক বাংলাদেশি ভারত থেকে ফিরে আসছিল। তবুও, আমরা এপ্রিল বা মে মাসের শুরুত স্থল সীমানা বন্ধ করিনি। ডেলটা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে এবং ২৫শে মে সময় টিভি সংবাদ অনুসারে পরীক্ষার জন্য আসা সকলের মধ্য ৬০% সংক্রমণের হার পাওয়া যায়। এর অর্থ ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ইতিমধ্যে ভালভাবে শুরু হয়েছিল। ২৫শে মে যখন সীমান্ত বন্ধ করা এবং লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল সেই সময়কালে এবং পরের সপ্তাহ ধরে ব্যাপক সংক্রমণ চলছিল এবং সংক্রমণ কমানোর সেসময়ের লকডাউন তখন খুব কার্যকর কৌশল হতে পারে না। সুসংবাদ হল ১২ জুলাই পরীক্ষার জন্য যারা এসেছিল তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার ১২% এ নেমে এসেছিল। প্রশ্ন হল এটাকি লকডাউনের কারণে হয়েছে? অথবা গণসমাবেশ বন্ধ করা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইতিমধ্যে সংক্রমিত হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে তার কারনে হয়েছে? সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া আসুন পরম কোন সিদ্ধান্তে না আসি। আমরা স্থানীয় এপিডেমিওলজির উপর ভিত্তি করে পরামর্শ দিয়েছিলাম, সময়মতো এলাকাভিত্তিক লকডাউন যদি তাড়াতাড়ি করা হয় তাহলে হয়ত সেই কৌশল উপকারী হতে পারে। চাঁপাই নবাবগঞ্জে তা সময়মত করা হয়নি এবং ব্যাপক ক্ষতি ইতিমধ্যে ঘটেছে।
 
অন্যদিকে, সুইডেন যে দেশ লকডাউনের নিয়ম অনুসরণ করেনি এবং ব্যাপকভাবে লোকডাউন চাপেয়ে দেয়নি কিন্তু নির্ভরশীল বা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের উপর নির্ভর করে স্বাস্থ্য পরামর্শ, মুখোশ, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, যতদূর সম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করা সহ ৫০ জনের উপরের কোন সমাবেশ হতে দেয়নি। কঠোর লকডাউন আরোপ করতে অস্বীকার করার জন্য মিডিয়া কর্তৃক নিন্দিত হলেও সুইডেনের সম্পূর্ণ লকডাউন না দেওয়া, স্বাস্থ্য সংকটের কম অনুপ্রবেশমূলক পন্থা অবলম্বন করা ফল দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, সুইডেনে অন্যান্য নর্ডিক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি মৃত্যু এবং সংক্রমণ ছিল এবং ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। ৩১শে জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী কোভিডের কারণে মৃত্যু এখন শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি ঘুরছে। আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) থেকে সদ্য প্রকাশিত তথ্য যা ডেল্টা স্ট্রেনকে আরও সংক্রমণযোগ্য এবং সম্ভাব্যভাবে আরও গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে বলে প্রকাশ করে। প্রতিক্রিয়ায় মন্তব্য প্রকাশ করে সুইডেনের প্রধান মহামারী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডার্স টেগনেল শুক্রবার বলেছিলেন যে ডেল্টা সম্পর্কে "আমরা অনেক কিছুই জানি না" এবং করোনাভাইরাস এই স্ট্রেন সম্পর্কে "সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত" আঁকার ধারন করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে ডেলটা বৈচিত্রটি সুইডেনে "বেশ কিছু সময়ের জন্য" প্রচলিত ছিল, কিন্তু তা সুইডেনে সামান্য প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে নার্সিং হোমের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে।
 
কিছু বিশেষজ্ঞ পোশাক কারখানা, অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প খোলার বিপক্ষে। আমি জানতে চাই যে তারা কোন প্রমাণের ভিত্তিতে এটা বলছে? আমি কোনও গবেষণার ফলাফল বা প্রমাণ দেখিনি যা প্রমান করে যে সেই শিল্পগুলি সংক্রমণের হটস্পট এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিক সংক্রামিত হয়েছে এবং সংক্রমণের উচ্চ সংখ্যার কারণে কিছু শিল্পের বন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বলেন “বিধিনিষেধের সফলতা নির্ভর করে স্থান, কাল ও পাত্রের ওপর। উন্নত বিশ্বের সমাজ-সংস্কৃতিতে বিধিনিষেধ সফল করা অনেক সহজ। যেমন ধরুন পাব, নাইট ক্লাব ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখলেই বিধিনিষেধ অনেকটা সফল হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা তো ভিন্ন। আর এটা না বুঝে বিধিনিষেধ দিলে তা তো সফল হওয়ার কথা নয়। আগেও বলেছি, দীর্ঘ মেয়াদে বিধিনিষেধ সফল করার সক্ষমতা সাধারণ মানুষ কিংবা বড়-ছোট কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেরই নেই। তৈরি পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিমুখী খাত তো আরও স্পর্শকাতর, কেননা একবার বাজার হারালে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে তা ফিরে পাওয়া খুবই কঠিন। প্রথম দিকে অনেক দেশ বিধিনিষেধের মাধ্যমে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখন বিধিনিষেধ সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কেন বিধিনিষেধকেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেব?” গত কয়েক মাস ধরে ঐ কথাগুলো আমি এবং বাংলাইনসাডার বার বার বলেছি, দুর্ভাগ্য আমরা মনে করি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা না তা শুনছেন বা কোন মুল্য দিচ্ছেন।
 
মনে হচ্ছে বিশেষজ্ঞরা কেবল আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারেন। আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে আমরা কোন পৃথিবীতে বাস করছি? আমরা জানি যদি পোশাক শিল্প খোলা হয়, তাহলে চাকরি হারানোর ভয়ে বা মালিকদের হুমকির কারণে শ্রমিকরা যেভাবেই হোক ফিরে আসবে। তাহলে, কেন সেই বিশেষজ্ঞরা এবং আমলারা ন্যূনতম বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করে, পোশাক কারখানা খোলার ঘোষণা দেয়ার আগে সমস্ত পরিবহনের মাধ্যমকে কাজ করার অনুমতি দিলেন না, যেমনটি গত ঈদের সময় শিথিল করা হয়েছিল! কেন আমরা আবার সর্বনাশ ঘটতে দিলাম! ডেল্টা সংক্রমণ ইংল্যান্ডে বিপর্যয় ঘটাচ্ছিল কিন্তু সবকিছু খোলার পরেও কেন সংক্রমণ নেমে আসছে? আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। প্রাথমিক লকডাউনটি হয়তো কার্যকরী ছিল কিন্তু দু:খিত এটি আর কাজ করবে না, তবুও উচ্চস্বরের কিছু বিশেষজ্ঞরা এর জন্য চিৎকার করে বারবার চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। যান চলাচল বন্ধ করে রেখে পোশাক কারখানা খোলার ঘোষণা দিয়ে আবার, আমরা সুপার স্প্রেডার ইভেন্টটি হতে দিয়েছি, ক্ষতি হয়েছে। এটা আমাকে একটা কৌতুকের কথা মনে করিয়ে দেয়, “আপনি যখন ঘরের দরজা খোলা রেখে ঘুমাচ্ছেন চোর তখন আপনার ঘরে প্রবেশ করে ডাকাতি করছে, তখন তাহলে দরজা শক্ত করে লক করে কি লাভ”!! দয়া করে বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স নিয়ে এয়ারকন রুমে বসে অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করবেন না।
 
মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা; টেস্টিং এবং বিচ্ছিন্নতা সুবিধা (বিশেষ করে সমস্ত শিল্প এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে) প্রদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমস্ত অভ্যন্তরীণ এবং বাইরে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা; ভবিষ্যতে এখনও কিছু সময়ের জন্য ভারত এবং মিয়ানমার স্থল সীমানা কঠোরভাবে বন্ধ রাখা; উন্নত, এবং পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত বাড়ি এবং হাসপাতালের যত্ন উন্নত করা; এবং কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল, এবং শিল্প প্রাঙ্গন সহ সম্ভাব্য প্রতিটি পথ ব্যবহার করে দৈনিক টিকা দেওয়া মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এখন দরকার। দয়া করে আর স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করবেন না, যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে এটি খুলুন।
 
বাংলা ইনসাইডারে লেখা “অতিকথন আর সমন্বয়হীনতায় সমালোচিত সরকার” এবং “আর মানুষকে কষ্ট দেবেন না প্লিজ” প্রবন্ধ দুটি পড়ে সর্বশেষে বলতে চাই, এখন যখন আমাদের গর্বের সাথে বলা উচিত, খুনিরা আমাদের জাতির পিতাকে নির্মম ভাবে হত্যার পরও, যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সর্ব ক্ষেএে আমাদের অসাধারণ সাফল্য অনেক দেশকে ঈর্ষান্বিত করে। আমাদের এটা নিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু স্বাস্থ্য নেতাদের চরম ব্যর্থতার কারণে, সমন্বয়ের ব্যর্থতা এবং কিছু সরকারী দলের নেতার আলগা কথা বলার কারণে সকল সেক্টরে আমাদের অসাধারণ সাফল্যগুলির কথা না বলে, তাদের ব্যর্থতার কথা উচ্চস্বরে বলে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধের মানুষগুলো এটা উপভোগ করছে। এটা বন্ধ করতে হবে। সৌভাগ্যবশত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কারণে আমাদের এখন পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন রয়েছে এবং আমরা আর লকডাউন না দিয়ে, সর্বনিম্ন জীবন ও জীবিকার ক্ষতি স্বীকার করে এই মহামারীটি কাটিয়ে উঠব।