ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের পিছনের ইতিহাসও পরবর্তী প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন

ডঃ মোঃ আওলাদ হোসেন
প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ বৃহস্পতিবার, ১০:০২ এএম
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের পিছনের ইতিহাসও পরবর্তী প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেও ক্ষমতা হাতে পাননি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জনমত তৈরি  করে ১৯৭১ সাল ২৫ মার্চ দিবাগত রাতের মধ্য প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বস্তরের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। বাংলার দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়। মেহেরপুরের মুজিবনগরে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। এই সরকারের নেতৃবৃন্দও ভারতে গমন করেন এবং সেখান থেকে নেতৃবৃন্দ সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১৯৭১-এ ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। কোন ব্যক্তির বাঁশির হুইসেলে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি।

ভারত সরকার প্রায় এক কোটি লোকের আহার, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ সবই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুত রেখেছিল। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে মহান স্বাধীনতা অর্জিত হলেও এর পেছনেও অনেক ঘটনা রয়েছে, কিছু ইতিহাস রয়েছে যা নতুন প্রজন্মকে জানানো উচিত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিভিন্ন দেশ ও ব্যক্তির অবদান অনস্বীকার্য। তন্মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভ এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সারাবিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন । এরকমই একটি ঘটনা বর্নিত আছে আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের জীবনীতে।

নভেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী হোয়াইট হাউসে পরস্পর মুখোমুখি বসে  পাকিস্তানের বর্বর বাহিনী দ্বারা বাংলাদেশে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে কথা বলছিলেন। প্রত্যুত্তরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বলেছিলেন, ‘ভারত যদি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায়, আমেরিকা তার ফাঁদ বন্ধ রাখবে না। ভারতকে উচিত শিক্ষা পেতে হবে’। (If India pokes its nose in Pakistan, US will not keep its trap shut. India will be taught a lesson`- Richard Nixon.)

আমেরিকার হুমকিকে তোয়াক্কা না করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী জবাবে বলেছিলেন, ‘ ভারত আমেরিকাকে বন্ধু মনে করে, প্রভু নয়। ভারত নিজের ভাগ্য নিজেই রচনা করতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রত্যেকের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয় তা আমরা জানি এবং সচেতন‘। (`India regards America as a friend, Not a boss. India is capable of writing its own destiny. We know and are aware how to deal with each one according to circumstances` -Indira Gandhi.)

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে বসে চোখের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখে এই সঠিক শব্দগুলি প্রকাশ করেছেন। সেটা ছিল এমন একটি ঐতিহাসিক দিন, যেদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এর উপস্থিতিতে হোয়াট হাউসে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভারত-আমেরিকা যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন বাতিল করেছিলেন এবং যিনি তার নিজস্ব ব্যতিক্রমধর্মী বিশেষ স্টাইলে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেছিলেন।

আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়ার পথে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি মনে করেন না যে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাথে আপনার আরও সহিষ্ণুতা দেখানো উচিত ছিল?’

উত্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ধন্যবাদ মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার মূল্যবান পরামর্শের জন্য। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের মেরুদন্ড সোজা রয়েছে এবং এই সকল ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ মোকাবেলা করতে আমাদের যথেষ্ট ইচ্ছা শক্তি ও রিসোর্স রয়েছে। আমরা প্রমাণ করবো, হাজার মাইল দূর থেকে কোন শক্তি একটি জাতিকে শাসন ও নিয়ন্ত্রন করার দিন শেষ‘।‘।(`Thank you, Mr. Secretary, for your valuable suggestion. Being a developing country, we have our backbones straight  & enough will and resources to fight all atrocities. We shall prove that days are gone when a power can rule and often control any nation from thousands of miles away”.-Indira Gandhi.)

ইন্দিরা গান্ধীকে বহনকারী এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং উড়োজাহাজটি দিল্লীর পানাম বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করা মাত্র ভারতের তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আসতে বললেন। বাজপেয়ী আসলেন, এক ঘন্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর বাজপেয়ীকে ব্যস্ত মনে হচ্ছিল। পরবর্তিতে জানা গেছে যে, বাজপেয়ী জাতিসংঘে ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

বিবিসির সাংবাদিক ডোনাল্ড পল বাজপেয়ীর কাছে একটি প্রশ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, "ইন্দিরা জি আপনাকে একজন কট্টর সমালোচক বলে মনে করেন। তা সত্ত্বেও, আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি জাতিসংঘে বর্তমান সরকারের পক্ষে আপনার গলা (আওয়াজ) চেঁচিয়ে উঠবেন? "

উত্তরে বাজপেয়ী বলেছিলেন, ‘গোলাপ বাগানের সৌন্দর্য বর্ধন করে। পদ্মফুলও তাই করে। বাগানের প্রতিটি ফুল ধারনা করে সে নিজেই খুব সুন্দর। কিন্তু বাগান যখন বিপদাপন্ন হয়, এটা কোন গোপনীয় বিষয় নয় যে, তখন প্রত্যেকের দ্বায়িত্ব নিজ নিজ সৌন্দর্য রক্ষা করা। আমি আজ এসেছি বাগান রক্ষা করতে। এটাই ভারতের গণতন্ত্র’।

এই বৈঠকের ফলশ্রুতিতে আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে বাংলাদেশের নিরীহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করার জন্য পাকিস্তানের বর্বর বাহিনীকে ২৭০টি অত্যাধুনিক ট্যাংক পাঠালেন। বিশ্ব মিডিয়ায় বার্তা দিলেন, এই ট্যাংকগুলো বিশেষ কারিগরী ক্ষমতায় তৈরী করা হয়েছে, যে কারণে এগুলো ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এই বার্তায় এটা বুঝতে বাকি রইলো না যে, এটা ছিল অবশিষ্ট বিশ্বের কাছে সতর্ক বার্তা, যাতে কোন দেশ ভারতকে সহায়তা না করে।

আমেরিকা এখানেই থেমে থাকেনি, আমেরিকার একমাত্র জ্বালানী কোম্পানি ‘বার্মা-শেল’ কে বলা হলো ভারতে জ্বালানী সরবরাহ না করার জন্য। এরপরে ভারতের ইতিহাস ছিল কেবল রুখে দাঁড়ানোর বিষয়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দীপক কুটনীতি (incisive diplomacy) দিয়ে ঐ মূহুর্তে ইউক্রেন থেকে তৈল আমদানি নিশ্চিত করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়েছিল। মাত্র ১ দিনের যুদ্ধে আমেরিকার পাঠানো বেশীরভাগ ট্যাংক ধ্বংস হয়েছিল। ধ্বংস করা এই ট্যাংকগুলো ভারতের বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যালে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে ডিসপ্লে করে রাখা হয়েছে।

রাজস্থানের গরম মরুভূমি এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে আমেরিকার অহংকার পদদমিত হয়েছিল।

পরবর্তি ১৮ দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানের ৯৩,০০০ প্রশিক্ষিত সৈনিক বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে মাথানত করেছিল, আত্মসমর্পণ করেছিল।

বাঙালি জাতির বিজয় সূচিত হওয়ার পর পাকিস্তানের লাহোর কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পেয়েছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্যও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আমাদের বর্তমান প্রজন্মের সঠিক ইতিহাস জানা উচিৎ। এ জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে এ সকল অজানা তথ্য সংগ্রহ করে কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।