ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১৩ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাদেশের সমকালীন জীবনে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন

ড. ডি. এম. ফিরোজ শাহ্
প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার, ০৮:০৪ এএম
বাংলাদেশের সমকালীন জীবনে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন

১. ভূমিকা
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখন শুধু একটি নাম নয়- তিনি একটি মহীরুহ প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছেন। নিজের একটি পরিচয় অতিক্রম করছেন অন্য পরিচয় দ্বারা। শুরুতে তিনি রাজনীতিবিদ থেকে রাষ্ট্রনায়ক পরিচয়ে পরিচিত হলেও এখন তিনি লেখক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, ভ্রমণবিশারদ, দিনপঞ্জিলিপিকার, সমাজসংস্কারক এবং শিক্ষাবিদ। তিনি চিরসংগ্রামী, চিরবিপ্লবী। তিনি রাজনীতির কবি। তাঁর রাজাসন পাতা বাঙালি জাতির হৃদয়মূলে। তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্ব, দুঃখী মানুষের কষ্ট বোঝার মত মমতামাখানো মন, বাঙালির অধিকার আদায়ে ক্লান্তিহীন কঠোর কন্ঠস্বর- বাংলা ও বাঙালির পরম পাথেয়। ‘বঙ্গবন্ধু’ এই অপরূপ অভিধায় তাঁেকে আর আটকে রাখা সম্ভব নয়-তিনি ‘বিশ্ববন্ধু’ উপাধীতে উন্নীত হয়েছেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে তার প্রধান পরিচয় হলেও সময়ের পরিক্রমায় ‘শিক্ষাবিদ’ হিসেব তিনি একটি নতুন পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাগ্র ৫৫ বছর আয়ুস্কালের একজন মানুষ তাঁর এক চতুর্থাংশ সময় কাটিয়েছেন জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তবে জেলখানায় তিনি অলস সময় কাটাননি। তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুর ইসলাম, প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাস ও বিশ্ব সাহিত্যও শ্রেষ্ঠ বই পাঠ করতেন। তিনি ডায়েরীতে জীবন কথা লিখেছেন, রোজনামচা লিখেছেন,আকাশের দিকে তাকিয়ে দেশ-মাটি-মানুষ নিয়ে ভেবেছেন। তার এসব ভাবনাগুলোই তার শিক্ষাদর্শন নামে খ্যাত। একজন এমন একজন নেতার একটি বিশেষ দর্শন অর্থাৎ তাঁর শিক্ষাদর্শন নিয়ে আলোচনা করতে পারা অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।

২. শিক্ষা ও শিক্ষাদর্শন
শিক্ষা প্রত্যয়টিকে বহুভাবে ব্যাখ্যা করা য দেশ-সমাজ-সময় ভেদে শিক্ষার কনসেপ্ট পরিবর্তিত হয়। শিক্ষা হচ্ছে প্রাষীরূপে জন্মনেয়া মানুষকে যৌক্তিক ও মানবিক মানুষ বানানো। যেকোন প্রাণী জীনের মাধ্যমে জন্মগতভাবে প্রাপ্ত বৈশিষ্টাবলি সারাজীবন বহন করে, এজন্য তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাগে না। কিন্তু মানুষ তা নয়। পরিবর্তিত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সমাজ, দেশ, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি তার উপর নিত্য প্রভাব ফেলে। মানব সমাজে সর্বদা চলে লোভ-লাভ-ক্ষমতার লড়াই। এজন্য তাদেরকে শিখতে হয়, নিতে হয় প্রশিক্ষণ।

একাডেমিকভাবে, শিক্ষা হচ্ছে মানুষের শৈশবকাল থেকে পূর্ণবয়স্ক স্তর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন একটি প্রক্রিয়া। শিক্ষা বলতে কোনো নতুন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা অর্জন করা বুঝায়। রেমন্ট (Raymont) তাঁর Principles of Education গ্রন্থে বলেছেন, “শিক্ষা হচ্ছে মানুষের শৈশবকাল থেকে পূর্ণবয়স্ক স্তর পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন বিকাশের একটি প্রক্রিয়া।” এ প্রক্রিয়ায় মানুষ তার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের সাথে সাথে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। শিক্ষাবিদ ম্যাকেঞ্জি (Mackenzie) শিক্ষার ব্যাপক অর্থে বলেছেন,‘শিক্ষা হচ্ছে একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া, জীবনের সব রকম অভিজ্ঞতাই এই শিক্ষাদানের ব্যাপারে সহায়তা করে।’ আবার শিক্ষাবিদ হোয়াইটহেডের (Whitehead) মতে, ‘শিক্ষার একটি মাত্র বিষয় আছে এবং সেটি হলো সর্বতোভাবে বিকশিত জীবন।’ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, খেলাধুলা, ভাব বিনিময়, আদানপ্রদান, সাফল্য, ব্যর্থতা, হতাশা প্রভৃতির মাধ্যমে মানুষ সততই শিক্ষা লাভ করছে।

আবার উইকিপিডিয়ার মতে- Education is the process of facilitating learning, or the acquisition of knowledge, skills, values, morals, beliefs, and habits. 
শিক্ষা হচ্ছে ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, সামাজিক আধ্যাত্মিক অর্থাৎ সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সাধনের নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। 
শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে।

অন্যদিকে, মূলদর্শনের একটি শাখা শিক্ষাদর্শন। অর্থাৎ দর্শন হতেই শিক্ষা দর্শনের সৃষ্টি। দর্শনের কাজ প্রধানত বিজ্ঞানভিত্তিক। আর শিক্ষাদর্শন এমন একটি বিষয় যা জ্ঞানের বিভিন্ন দিক, বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা, যা শিক্ষার সাথে জড়িত তা নিয়ে আলোচনা করে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক বাস্তববাদী ও প্রয়োগবাদী দার্শনিক জন ডিউই বলেন, ``A philosophy of education is based upon a philosophy of experience.` অর্থাৎ শিক্ষা দর্শনের ভিত্তি হচ্ছে অভিজ্ঞতার দর্শন। শিক্ষার স্বরূপ, জ্ঞানগত বিষয় হিসেবে শিক্ষার প্রকৃতি নির্ধারণ, শিক্ষার লক্ষ নির্ধারণ এবং শিক্ষার সমস্যাসমূহ নিরসনের যৌক্তিক কাঠামো সংক্রান্ত বিদ্যাই শিক্ষাদর্শন। এ ক্ষেত্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না, বরং বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে’।

শিক্ষাদর্শন একটি সামগ্রিক দর্শন যা শিক্ষাকে সুশৃঙ্খল ও সুস্থির অভিমুখী করে তোলে। বাংলাদেশে প্রচলিত প্রধান শিক্ষাদর্শন হলো- ভাববাদ বা আদর্শবাদ (Idealism), বাস্তববাদ (Realism), প্রয়োগবাদ (Pragmatism), প্রকৃতিবাদ (Naturalism)। শিক্ষা ও শিক্ষাদর্শন নিয়ে উল্লিখিত একাডেমিক বিশ্লেষণ বিবেচনায় নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর শিক্ষাদর্শনের আলোচনা করা হলো।

৩. বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের ভিত্তি
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃত জাতীয়তাবাদী নেতা যিনি এদেশের জলবায়ু, প্রকৃতি, মাটি-মানুষ, ভাষা-পোশাক, খাদ্য ইত্যকার সবকিছু মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। আর তাঁর ভিতরে এর বীজ বুনেছিলেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও তাঁর শিক্ষকগণ। বঙ্গবন্ধুর জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী শিক্ষকগণ হলেন- মো. সাখাওয়াত উল্লাহ, কাজী আব্দুল হামিদ, রসরঞ্জন, মনোরঞ্জন বাবু, ড. ইৎরাত হোসেন জুবেরী, প্রফেসর সাইদুর রহমান, প্রফেসর নারায়ণ বাবু, প্রফেসর তাহির জামিল, প্রফেসর নাজির আহমেদ প্রমূখজন।

অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষক বা গুরু ছিলেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান, যার একটি মূল্যবান বাক্য- Sincerity of purpose and honesty of purpose’ তিনি আজীবন মনে রেখেছেন। এছাড়া তাঁর স্ত্রী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শের-এ-বাংলা একে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রমূখজন তাঁর রাজনৈতিক মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাছাড়াও বিভিন্ন লেখকদের লেখাও বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি সে সময়ের বিশ্বসাহিত্যের অনেক বই নিয়মিত পাঠ করতেন বিধায় দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন-‘আমি দক্ষিণপন্থীও নই, বামপন্থীও নই। আমি দেশবাসীর স্বার্থের পক্ষে।’ অর্থাৎ মানুষের স্বার্থই তাঁর শিক্ষাদর্শনের মূল কথা।

৪. বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের মূলসূও ও সমকালীনতা
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষাদর্শনের মূল কথা হলো মানব কল্যাণ। এজন্য তিনি মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, মানবিকতা, সত্যবাদিতা, সৌজন্যতা, আত্নসচেতনতা ও আত্নমূল্যায়ন, মহানুভবতা, শ্রদ্ধাবোধ,অন্যদের অবদানের স্বীকৃতি, পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা এবং পরিবেশ সচেতনতা ইত্যাদি গুণাবলী থাকা প্রয়োজন বলে মনে করতেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-বঙ্গবন্ধু কী দার্শনিক বা শিক্ষাদার্শনিক? মনীষী সক্রেটিস বলেছেন-‘যারা সত্য দর্শনে আগ্রহী তারাই দার্শনিক।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সারা জীবনই সত্যানুসন্ধানী ছিলেন। মিথ্যাকে জীবনে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। কোন সিদ্ধান্ত ভূল হলে অকপটে স্বীকার করেছেন। দেশ-জাতি-মানুষ নিয়ে স্বপ্ন বুনেছেন। তাদের একক ভূখন্ড, পরিচয়, ভবিষৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন, এ বিচারে তিনি কী দার্শনিক নন? দার্শনিকরা তত্ত্ব প্রদান করেন, আর তিনি শুধু তত্ত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হননি, সেগুলোর বাস্তবায়নও করেছেন।

ড. ডি. এম. ফিরোজ শাহ, তাঁর রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন’ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের বহুমাত্রিকতা’ শিরোনামে যে বিষয়গুলো চিহিৃত করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তার নির্নয়করা বিষয়গুলো হলো- পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের প্রতি ভালোবাসা; বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন: ভদ্রতা ও সৌজন্য শিক্ষা, মানুষের প্রতি মমতা ও শিক্ষা, শিক্ষা ও আত্নমূল্যায়ন, ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন: মানুষের প্রসঙ্গে, শিক্ষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর অনুরাগ, পুস্তকের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা, বঙ্গবন্ধু ও পরিবেশ শিক্ষা, মানুষকে মূল্যায়ন, বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা ও রসবোধ, নেতার গুণাবলী: অন্যদের স্বীকৃতি, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল এবং শিক্ষা ও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্নজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, তাঁর রচিত ৫ টি প্রবন্ধ, বক্তৃতা-বিবৃতি ইত্যাদি থেকে শিক্ষামূলক বাছাই কথা করে সেগুলোর সাথে প্রখ্যাত দার্শনিকদের প্রদত্ত তত্ত্বেও সাথে যাচাই করে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের নির্ভরযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও কালোতীর্ণতা প্রমাণ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষাদর্শনের মূলসূরকে নিম্নরুপভাবে চিহিৃত করা যায়-
ক) মাতৃভাষা ও বাংলাভাষার প্রতি সুদৃঢ় অবস্থান
খ) শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মূল্যায়ন
গ) প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও বাধ্যতামূলক করা
ঘ) জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন
ঙ) সংবিধানে শিক্ষা সংক্রান্ত ধারা সংযোজন
চ) শিক্ষার গতিধারা নির্ধারণ
ছ) গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিতা ও গঠনমূলক শিক্ষার প্রবর্তন
জ) শিক্ষা ও সমাজকে দুর্নীতিমুক্তকরণ
ঝ) মানবিক শিক্ষধারার সূচনা
ঞ) যুগোপযোগী ও আধুনিক শিক্ষার 
ট) শিক্ষায় বিনিয়োগকে পুঁজি মনে করা
ঠ) শিক্ষাকে সুসংহত করার জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
ড) বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করানো
ঢ) অসাম্প্রদায়িক শিক্ষার ভিত্তি গড়া

ক) মাতৃভাষা ও বাংলাভাষার প্রতি সুদৃঢ় অবস্থান
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন খাঁটি বাঙালি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি যার ছিল অগাধ আস্থা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। এ জন্য তিনি বাংলাভাষা আন্দোলনের জন্য জেল খেটেছেন, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষায় সংসদ বিবরণী প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করেছেন। তাঁর জীবনে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে বক্তৃতা করেননি। জাতিসংঘে বাংলাভাষায় বক্তৃতা করে এরম র্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। তাঁর একটি বানি থেকেই এর প্রমাণ মেলে-
‘যে বাংলার মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে বাংলার মানুষকে আমি এত ভালোবাসি,যত দূরেই যেখানেই আমি থাকি না কেন, একটি মুহূর্তের জন্য তাহাদের কথা আমি ভুলতে পারি না।’
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে তার দেওয়া ভাষনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও টান ষ্পস্ট হয়েছে। যেমন-
 ‘একটি জাতিকে পঙ্গু ও পদানত করে রাখার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করা।’
 ‘যে কোন জাতি তার মাতৃভাষাকে ভালোবাসে। মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতিই কোন কালে সহ্য করে নাই।’
 ‘পাঞ্জাবের লোকেরা পাঞ্জাবি ভাষা বলে, সিন্ধুর লোকেরা সিন্ধি ভাষায় কথা বলে, সীমান্ত প্রদেশের লোকেরা পশতু ভাষায় কথা বলে, বেলুচরা বেলুচি ভাষায় কথা বলে। উর্দু পাকিস্তানের কোন প্রদেশের ভাষা নয়। তবুও যদি পশ্চিম পাকিস্তানের ভায়েরা উর্দু ভাষার জন্য দাবি করে, আমরা আপত্তি করব কেন? যারা উর্দু ভাষা সমর্থন করে তাদের একমাত্র যুক্তি হলো উর্দু ‘ইসলামিক ভাষা’। উর্দু কি করে যে ইসলামিক ভাষা হলো আমরা বুঝতে পারলাম না।’

খ) শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মূল্যায়ন
তাঁর সময়ে তিনি শিক্ষাবিদদের যথার্থ সম্মান দিয়ে উপযুক্ত পদে পদায়ন করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনে শিক্ষাবিদরা থাকবেন এটা শিক্ষাবিদরা প্রত্যাশা করেন। তিনি এ প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। স্বাধীনতার পরে ক্ষমতায় বসেই ১৯৭২ সালের ১ অক্টোবর প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. এআর মল্লিককে (আজিজুর রহমান মল্লিক) শিক্ষাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। জনাব এআর মল্লিক ১১ মার্চ ১৯৭৩ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩, অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শিক্ষাসচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৮ জানুয়ারি ১৯৭৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তা ছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্বশাসন প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা তাঁর শিক্ষাদর্শনেরই প্রতিফলন।

এক জনসভায় শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন-, ‘ছেলেদের মানুষ করতে হবে। ফেল করানোতে আপনাদের তেমন বাহাদুরি নাই, পাস করালেই বাহাদুরি আছে।’ এ কথায় শিক্ষকদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু কি প্রত্যাশা করেন তা প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর শিক্ষাদর্শন আপামর মানুষের শিক্ষা ও উন্নয়নের দর্শন। তিনি বড় তাত্ত্বিকদের মত পান্ডিত্যপূর্ণ কোন কথা বলেননি, যা করা সম্ভব বা করা সহজ তাই তিনি সহজ ভাষায় নিজের মত করে বলেছে। এক্ষেত্রে তিনি বাস্তববাদী ও প্রয়োগবাদী দর্শনদলের অন্তর্গত।

গ) প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও বাধ্যতামূলক করা
তাঁর শাসনামলে (১৯৭২-১৯৭৫) ২৫,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ও এর শিক্ষকদের চাকরী সরকারিকরণ করেন। এ ছাড়াও নতুন ১২,০০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করে সংবিধানে অনুচ্ছেদ যুক্ত করেছেন। তাঁর এ সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে এবং স্বাক্ষরতার হার বর্তমানে (২০২১ সালে) প্রায় ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

ঘ) জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন
বঙ্গবন্ধু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনার কমিটি করেই ক্ষান্ত হননি, ২৬ জুলাই ১৯৭২ দেশবরেণ্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু এ কমিশনের কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। তিনি কমিশনকে-‘বর্তমান শিক্ষার নানাবিধ অভাব ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণ, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠুজাতি গঠনে নির্দেশ দান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথ নির্দেশ দেবার নির্দেশনা দেন।’ ১৯৭৪ সালের মে মাসে কমিশন তাদেও রিপোর্ট জমা দেন।

ঙ) সংবিধানে শিক্ষা সংক্রান্ত ধারা সংযোজন
১৯৭২ সারের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাাদেশের মাটিতে পা রাখেন। কালবিলম্ব না করে তিনি নেমে পড়েন দেশ গড়ার কাজে। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর করেন। প্রণীত সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-
‘ রাষ্ট্র। (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য,
(খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই পরিচয় সিদ্ধ করিবার উদ্দেশে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য,
(গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’

চ) শিক্ষার গতিধারা নির্ধারণ
স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষার ধরণ ও গতিধারা কেমন হবে তা ১৯৭৪ সালের জাতীয় শিক্ষা কমিশনে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। এরপরও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বক্তৃতায় শিক্ষার ধরণ ও গতিধারা সম্পর্কে বলেন-
‘আমি চাই কৃষি কলেজ,কৃষি স্কুল,ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল,কলেজ ও স্কুল,যাতে সত্যিকারের মানুষ পয়দা হয়। বুনিয়াদি শিক্ষা নিলে কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারবে। কেরানী পয়দা করেই একবার ইংরেজ শেষ করে দিয়ে গেছে দেশটা। তোমাদের মানুষ হতে হবে ভাইরা আমার।’

ছ) গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিতা ও গঠনমূলক শিক্ষার প্রবর্তন
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন তাত্ত্বিক হিসেবে তার শিক্ষাদর্শন প্রদান করেননি-তিনি জনমানুষের মাঝে থেকে শিক্ষাদর্শনের অনুশীলন করেছেন। তাঁর দর্শন ছিল গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক। এ জন্য অতি সহজেই বলতে পারেন-
 ‘আত্মসমালোচনা করুন, আত্মশুদ্ধি করুন। তাহলেই হবেন মানুষ।’
 ‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমাকে সমালোচনা করতে আমি তাদের অনুমতি দিয়েছি। সমালোচনার ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই। কেননা, আমি জনগণকে ভালোবাসি, জনগণও আমাকে ভালোবাসে।’
 ‘আমি সৎ সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আমি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী।’
 ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনও যদি হয় সে, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’
জ) শিক্ষা ও সমাজকে দুর্নীতিমুক্তকরণ
পাকিস্তান আমলে রাজনীতি করতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন উন্নয়নের প্রধান শত্রু দুর্নীতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ও দুর্নীতিকে সংঞ্জায়িত করে বলেন-
 ‘শুধু নিজেরা ঘুষ খাওয়াই করাপশন নয়। করান্ট পিপলকে সাহায্য করাও কিন্তু করাপশন। নেপোটিজমও কিন্তু এ টাইপ অব করাপশন।’
 ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড এগেইনেস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না এবং সেই সিস্টেমই পরিবর্তন করতে হবে। ঘুণে ধরা সিস্টেম দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যায় না। এই সিস্টেমই হলো করাপশনের পয়দা। এই সিস্টেম করাপশন পয়দা করে এবং করাপশন চলে।’
 ‘যে ফাঁকি দেয় সে দুর্নীতিবাজ। যে ঘুষ খায় সে দুর্নীতিবাজ। যে স্মাগলিং করে সে দুর্নীতবাজ। যে ব্লাকমার্কেটিং করে সে দুর্নীতিবাজ। যে হোর্ড করে সে দুর্নীতিবাজ। যারা কর্তব্যপালন করে না তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে তারাও দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে তারাও দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে।’
ঘুষ ও দুর্নীতি বন্দ না হওয়ায় একসময় তাঁর কন্ঠে অসহায়ত্ব ফুটে উঠে। তিনি আক্ষেপ কওে বলেন-
‘করাপশন বন্ধ কর, আল্লাহর দোহাই, করাপশন বন্ধ করার চেষ্টা কর। তোমাদের ইচ্ছে মতো দেওয়া হয়েছে। তোমরা পারবে।’

ঝ) মানবিক শিক্ষাধারার সূচনা
শিক্ষাদর্শনের অন্যতম মূলসুর মানবিক শিক্ষার প্রয়োগ। মানবিকতা ছাড়া শিক্ষা অসম্পূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানীদের অন্যায়-অনায্য কাজকর্ম দেখে বাংলাদেশে মানবিক শিক্ষাধারার সূচনা করতে চেয়েছেন। এজন্য তিনি বলেন-
 ‘সোনার বাংলা গড়ে তুলতে আত্মোৎসর্গ করুন।’
 ‘পাপ আর পুণ্য পাশাপাশি চলতে পারে না।’
 ‘দুনিয়ার নিয়মই ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসতে হয়। এবং সে ভালোবাসা সিনসিয়ারলি হওয়া দরকার। তার মধ্যে যেন কোনো খুঁত না থাকে।’

ঞ) যুগোপযোগী ও আধুনিক শিক্ষার ধারণা
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক অনেক আধৃনিক একজন মানুষ। তাঁর পোশাক, চলন-বলন, চিন্তাচেতনার মধ্যে এর প্রকাশ ঘটেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তার প্রমান পাওয়া যায়। তিনি সংবিধানের মাধ্যমে এর প্রমান রেখেছেন- ‘ রাষ্ট্র... (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই পরিচয় সিদ্ধ করিবার উদ্দেশে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
‘সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য’ বাক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমাজ পরিবর্তনশীল, সেই পরিবর্তনকে ধারণ করে শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা জরুরী যে কাজটি বর্তমান সরকার করছে শিক্ষায় প্রক্তুক্তি ব্যবহার করে। শিক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-
‘সমৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছার সংক্ষিপ্ত কোনো সড়ক নেই। ইন্সিত সমৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সমাজের প্রতি স্তরের মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।’

ট) শিক্ষায় বিনিয়োগকে পুঁজি মনে করা
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষাক্ষেত্রে তার কার্যক্রম দেখে। তিনি শিক্ষায় জিডিপির ৪% বরাদ্দ করা করেন। এ ছাড়া তিনি প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদান করেন।

ঠ) শিক্ষাকে সুসংহত করার জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাকে সুসংহত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা স্বায়ত্বশাসন দিয়ে অ্যাক্ট ও অর্ডার জারিকরণ, প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারকরণ, ইসলামী ফাউন্ডেশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন।

ড) বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করানো
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বিশ্বব্যাপি বাংলাভাষাকে পরিচিতি করানো। এজন্য তিনি ১৯৭৪ সালে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন আয়োজন করেন। এখানে বিশ্বের নামী-দামী শিক্ষাবিদ সাহিত্যকদের আমন্ত্রণ জানানো হয় যাদের মাধ্যমে বিশ্বে বাংলা ভাষার পরিচিতি পায়। অন্যদিকে তিনি ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাভাষায় বক্তৃতা করে বিশ্বে নজীর স্থাপন করেন।

ঢ) অসাম্প্রদায়িক শিক্ষার ভিত্তি গড়া
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। সারা জীবন তিনি মাটি ও মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করেছেন। তাঁর অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ দিয়েছেন কথা ও কাজে। তাঁর ২/১ টি বানি উদ্ধৃত করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। যেমন-
 ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।’
 ‘আমাদের বাঙালিদের মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান, আর একটা হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে।’

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষা সংক্রান্ত ধারা যোগ করে তিনি এর প্রমাণ দিয়েছেন। এছাড়া অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তাঁর মন্তব্য এখনও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন-
‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানদের ধর্মপালন করবে। হিন্দু তার ধর্মপালন করবে। খ্রিস্টান তার ধর্মপালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আলবদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া চলবে না।’

৫. উপসংহার 
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের মে মাসের ৩ তারিখের কোন এক সময় বিশেষ কোন মানসিক পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যক্তিগত নোটখাতায় লিখেন-,‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’

‘সমগ্র মানবজাতি নিয়ে যিনি ভাবেন এবং বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত ও নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা’ যিনি বলতে পারেন তাঁর শিক্ষাদর্শন তো শুধু বাংলাদেশ নয়-সারা বিশ্বের জন্য অনুসরণীয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, দল ও শাসন নিয়ে কারো ভিন্নমত থাকতে পারে তবে শিক্ষাদর্শন মানব জাতির জন্য এক অমূল্য সম্পদ। শিক্ষাদর্শনের বিশেষত্ব হলো এটা জীবনানুশীলন দ্বারা অর্জিত-গবেষণা দ্বারা প্রাপ্ত নয়। বর্তমান বিশ্বে একটি আলোচিত শিখন দর্শন হলো ডেভিড কব (David Kolb) এর অভিজ্ঞতাবাদ (Experiential Learning) যা বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনে পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা বাংলাদেশে প্রথম শিক্ষা কমিশন যারা ভারতে ১ মাস সফর করে, প্রায় দুইবছর কাজ করে, বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও পেশাজীবিদের সাথে কথা বলে ১৯৭৪ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর নিকট রিপোর্ট জমা দেন। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় পরিচালিত কমিশন যে রিপোর্ট প্রদান করেন তাতে ৩৬টি অধ্যায় ও ৮টি পরিশিষ্ট রয়েছে যার প্রথম অধ্যায়ে শিক্ষার লক্ষ ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো- দেশপ্রেম ও সুনাগরিকত্ব, মানবতা ও বিশ্ব-নাগরিকত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রুপান্তরের হাতিয়ার রুপে শিক্ষা, প্রয়োগমুখী অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনুকূল শিক্ষা, কায়িক শ্রমের মর্যাদা, বহুমুখী শিক্ষা ধারার প্রবর্তন, নেতৃত্ব ও সংগঠনের গুণাবলী, সৃজনশীলতা ও গবেষণা এবং শিক্ষানীতিকে গতিশীল করা। বঙ্গবন্ধু মানুষের কল্যাণের জন্য যে শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন তা প্রকাশিত হয়েছে শিক্ষার লক্ষ ও উদ্দেশ্যের ১.৩ ধারায়। এতে বলা হয়েছে- ‘জাতীয় কল্যাণের স্বার্থে শোষণহীন নূতন সমাজ সৃষ্টির মহৎ প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ বিশ্বের সকল সংগ্রামী মানুষের প্রতি বন্ধুত্ব ও একতার হস্ত প্রসারিত করতে হবে। মানুষে মানুষে মৈত্রী, সৌহার্দ ও প্রীতি এবং মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে।’

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর শিক্ষাদর্শন মানুষ, মানবাধিকার, বিশ্বশান্তি ও সকল প্রাণীর সহঅবস্থান এবং কল্যাণের দর্শন। তিনি কোন ঘোরপ্যাাঁচ না করে সহজে বলেন- ‘সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়।’
‘ধ্বংস নয় সৃষ্টি, যুদ্ধ নয় শান্তি।’ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো বর্তমান বিশ্বে শান্তির প্রত্যাশায় যুদ্ধ চলছে যা একটি পরিহাস মাত্র। সেক্ষত্রে বিশ্বব্যাপি বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের প্রয়োগ হতে পারে শান্তি, মানবতা ও বৈশ্বিক মৈত্রির এক মহৌষধ। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর আমা ও ক্ষোভের কথা বলেন-
‘সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়াতে খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজেকে এরা চেনে না। যারা যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না, ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।’

উল্লিখিত আলোচনা ও তথ্য বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে এটাই বলা যায়, বাংলাদেশের সমকালীন জীবনে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক।