ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১৩ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সেই তুমি পাথরেও ফুল যে ফোটাও

হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ রবিবার, ০৬:০১ পিএম
সেই তুমি পাথরেও ফুল যে ফোটাও

বাংলা গানের প্রবাদতুল্য গীতিকার শ্রদ্ধেয় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ``মঙ্গল দীপজ্বেলে অন্ধকারে---বিখ্যাত গানের বাণী থেকে লেখার শিরোনামটি ধার করা হলো। ঢাকা থেকে দুবাই যাচ্ছিলাম। উদ্দেশ্য আসন্ন দুবাই এক্সপো-২০২০ এতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, প্যাভিলিয়ন ব্যবস্হাপনা স্বচক্ষে অবলোকন, কমার্সিয়াল কাউন্সিলর ও দুবাই কনস্যুলেট জেনারেল অফিসে সভা ইত্যাদি প্রস্তুতিমূলক কাজ।

উল্লেখ করা যায়, করোনা বিশ্বের বেহাল অবস্থার কারনেই এক্সপো ০১ অক্টোবর ২০২১ থেকে শুরু হচ্ছে। সীটে বসেই এদিক ওদিক তাকাই- কিন্তু যাত্রী কোথায়? এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাসে আমরা চারজন। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী`র উপদেষ্টা ড.তৌফিক এলাহি চৌধূরী স্যারের সাথে দু`জন এ-ই। একপর্যায়ে একজন এয়ার ক্রুকে জিজ্ঞেস করি আজ তোমাদের প্যাসেন্জার কতজন? জানায় ১২৫ জনের মত হবে অর্থাৎ পঞ্চাশ শতাংশেরও কম। করোনা পরিস্থিতি, এমিরেটসের বিধি-নিষেধ, পিসিআর/ এন্টিজেন টেস্ট জটিলতা এসবই মূল কারণ।  আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে ছিল। তবু চার ঘন্টার একটু বেশি সময় লাগে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছাতে। যদিও করোনাবিশ্বে এ বিমান বন্দরের চিত্র অনেকটা অচেনা মনে হলো। 

২) সরকারের সচিব হিসেবে এই প্রথম দেশের বাইরে যাওয়া। চাকরির সমাপনী বেলার ঘন্টাধ্বনিতে  পররাষ্ট্রে এ সফর। আমার কুটনৈতিক পাসপোর্টেও প্রথম স্পর্শ। ধারণা ছিল দাগবিহীন অবস্থায়ই এটা চাকরি অন্তে সরকারের জিম্মায় জমা দিয়ে যাব। আমার প্রয়াত স্ত্রী জেবু এমনটাই ভবিষ্যত বাণী করেছিল। বহুদিন পর বিদেশের মাটিতে এসে তাঁকে খুব মিস করছি। ভাবছি, এরি মধ্যে কতবার তার ফোন কল হত। খাওয়া, থাকা, হোটেল কামরার বর্ণনা আরও কতকিছু। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্পাউস হিসেবে তার হাতে  লাল পাসপোর্টটি হস্তান্তর করার সময় তাৎক্ষণিক মন্তব্য ছিল, "করোনা নাকি বাংলাদেশেও চলে আসছে। কয়েক বছর নাকি থাকবে। তোমার চাকরিকালীন এটা মনে হয় ব্যবহারের সুযোগ পাবোনা"। তার কথাই সত্যি হলো, নিষ্ঠুর অদৃশ্য করোনাতেই সে জুন মাসে আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেয়। তবুও মনে হয়, আমার চারপাশ ঘিরে এখনো শুধু ওরই বিচরণ। 

৩) এক পলক তাকালেই দুবাই একটি ছোট্ট দেশ। বলা যায়, UAE`র একটি প্রদেশ বা  আরব আমিরাতের আধুনিকতম ও পর্যটন নগরী। এদের  এমিরেটস এয়ারলাইন্স পৃথিবীর আকাশেও একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে চলেছে। কঠোর আইন-শৃঙ্খলা, নিপুণ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, আকাশচুম্বী অট্রালিকা, স্থাপত্যের অভাবনীয় সৌন্দর্য, দৃষ্টিনন্দন বৈদ্যুতিক কারুকার্য  বলতে গেলে গোটা বিশ্বকেই মোহাচ্ছন্নতায় ফেলে দিয়েছে এখানকার পরম্পরার সরকার ব্যবস্হা। তবে আমিরাতের বৃহত্তম শহরের নামই দুবাই। যার আয়তন ৪,১১৪ বর্গ কিঃ মিঃ। জনসংখ্যা ৩৫ লাখের কাছাকাছি হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত পরম রাজতন্ত্রের কাঠামোতে গড়ে উঠা এক সরকার ব্যবস্হার মূর্তমান প্রতীক এটি। ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের হিসেবে আমাদের বাংলাদেশের সাথে মিল আছে। আমিরাতের আয়তন প্রায় ৮৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৬৮ হাজার মার্কিন ডলার। দুবাইসহ সাতটি আমিরাতে আজমান, আল ফুজাইরা,শারজাহ্, রাআস আল খাইমা, উম্ম আল ক্বাইওয়াইন। এদের রাজধানী আবুধাবি। সব মিলিয়ে জনসংখ্যা এক কোটির মত। এতে ভারতীয়,পাকিস্তানি ও বাংলাদেশীয়দের প্রাধান্য লক্ষ্যনীয়। মোট জনসংখ্যার ১২% আদি আমিরাতের বাসিন্দা এবং ৮৮ ভাগ বহিঃবিশ্বের। এ ১২% জনই ৮৮ ভাগকে প্রযুক্তির নির্ভরতায় সুচারু ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। একে অদৃশ্য সুশাসনও (invisible Governance) বলা যায়। কোথাও কেউ নেই অথচ সর্বত্র বিরাজমান। ভাষা আরবী ও মুদ্রা দিরহাম। এক দিরহাম সমান ০.২৭ মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশী ২৩ টাকার কাছাকাছি। 

৪) দুবাই শহরে ঘুরতে গিয়ে বিচিত্র জিনিস দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। বুর্জ আল্ খলিফার আকাশ ছোঁয়া ইমারত শৈলী শুধু নয় এর আলোকসম্পাতের অনন্য  অপরূপ নান্দনিকতা সারা দুনিয়ার পর্যটকদের নিয়ত আকৃষ্ট করে চলেছে। বুর্জ আল আরব নামের সাত তারকা হোটেলের নির্মানকৌশলেও সবার মাঝে  অনাবিল মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। ম্যারিনা সৈকতের দৃশ্য চোখে পড়ার মতন। ডেজার্ট সাফারিতে প্রচুর বিদেশি প্রতিদিন গাড়ি চড়ে আনন্দ উপভোগ করছে। সাম্প্রতিককালে তৈরি দুবাই গেইট ইতোমধ্যে সর্ব্বোচ্চ নয়নাভিরাম ও ব্যয়বহুল গেইট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মহিষের শিং এর আদলে অসাধারণ নক্সায় তৈরি হয়েছে দুবাই ফিউসার মিউজিয়াম। প্রচন্ড উত্তাপ আর ধূলিকণার ভেতর থেকে যেন প্রতিমুহূর্তে অঙ্কুরিত হয়ে হাজার হাজার বহুতল ভবনের মিছিলে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে এ শহর। বৃষ্টিহীন জনপদের মাটি ভেদ করে উঠে আসে রাশি রাশি তেলের স্রোতধারা। তাই প্রতিটা বৃক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে কৃত্রিম করুণাধারা। তবুও খেজুরের শাখা প্রশাখাগুলো বিবর্ণ বদনে পথচারীদের কাছে যেন বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। পাথর আর বালির মরুপথের বাঁকে চোখে পড়ে এক টুকরো সবুজে ঝরে পড়ছে কাঠ গোলাপের পাপড়ি। ভাবছিলাম, আমাদের এত সবুজের সমারোহ যেখানে মেঘ না চাইতেই অনবরত বৃষ্টি। অথচ অনেক কিছুই নেই আমাদের। তবে আমরাও একদিন। 

৫) দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে দুবাইয়ে  দুটো হাসপাতালে যাই। দুবাই `আমেরিকান হসপিটাল` এবং `সৌদি-জার্মান হসপিটাল`। দুটো হসপিটালই অভাবনীয় ব্যবস্হাপনায় পরিচালিত। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচ্ছন্নতা বিশ্বমান সম্পন্ন। কোভিড-১৯ মোকাবেলায়ও এরা দারুণ সফল। আমেরিকান হসপিটালটি গত ২৫ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আমিরাত এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষের সেবায় নিয়োজিত থেকে সুনাম কুড়িয়ে চলেছে। সেখানকার মিসরীয় ENT Specialist  Dr. Aiham Alshawwa এর সাথে কথা বলে মনে হয়েছে প্রকৃত অর্থে একজন চিকিৎসক। রোগীকে রিসিভ করতে দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়ে। মনে হলো রোগীর সময়ই তাদের সময়। পরদিন সাক্ষাৎ করি জর্ডানের Specialist Oral Surgery dept. Dr. Tareq Gharaibeh এর সঙ্গে। অসাধারণ তাঁর কথা ও রোগীর মনোবল বৃদ্ধি করার কৌশল। আমাকে কিছু পরামর্শ দিয়ে একমাসের ব্যবধানে পুনঃ সাক্ষাতের ব্যবস্হা করলেন।

প্রথমদিন দ্বিতীয় প্রহরে সাক্ষাৎ করি সৌদি-জার্মান হসপিটালের Cardiologist Dr. Fuad Hakeem Fcps, Lahore, Pakistan এর সাথে। বয়সে তরুণ তবে দারুণ পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করে জনপ্রিয় তিনি। দীর্ঘ সময় শুনলেন। দুয়েকটা সাধারণ ঔষধ লিখে দিলেন। নিয়মিত ব্যয়াম ও পরিমিত আহার বিষয়ক পরামর্শ। যা-ই বলুক, আত্মবিশ্বাসী করে তোলার চমৎকার আর্ট তারা আয়ত্ত করেছে ধৈর্য, মানবতা ও সংবেদনশীলতার  সঙ্গে। কেবল এ একটি জায়গায় আমরা এখনো বেশ পিছিয়ে।

৬) এক্সপো ২০২০ ভেনু এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে বিমোহিত হয়েছি আমরা সবাই। পৃথিবীর ১৯২ রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকার সারিবদ্ধ মিছিলে আমাদের গাঢ় সবুজের বুকে লাল সূর্যকে খোঁজে পেয়ে গর্ববোধ করেছি। আমাদের প্যাভিলিয়নের ভেতরটায়  LED`র ব্যবহার ও  event management এর নিরলস প্রচেষ্টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এর ম্যুরালসহ একখন্ড অখণ্ড বাংলাদেশের উদ্ভাসন হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।