এডিটর’স মাইন্ড

হেরে যাবে বাংলাদেশ?

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২৩ অক্টোবর, ২০২১


Thumbnail

টি-২০ বিশ্বকাপ চলছে। এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেন গ্রুপ পর্বে খেলবে এ নিয়ে আমাদের প্রচণ্ড অভিমান। উদ্বোধনী খেলা দেখতে বসলাম আয়োজন করে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চড়ালাম। স্কটল্যান্ডকে কত সহজে হারাবে, সেটাই যেন খেলা দেখার মূল উপলক্ষ। কিন্তু কী আশ্চর্য। বাংলাদেশ হেরে গেল। মন খারাপ করেই পরের ম্যাচ দেখতে বসলাম। এবার প্রতিপক্ষ ওমান। সে খেলায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিতল। খেলা এমনই। কখনো কোনো দল জিতবে, কখনো হারবে। একটি রাষ্ট্রেরও উত্থান-পতন হয়। সুসময়-দুঃসময় আসে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন তার লক্ষ্যচ্যুত হয়, যখন আদর্শচ্যুত হয় তখন সেই রাষ্ট্র চিরস্থায়ীভাবে হেরে যায়। ‘বাংলাদেশ’ নামের রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে মৌলিক লক্ষ্য এবং আদর্শ নিয়ে তার অন্যতম হলো ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। কিন্তু গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে যা ঘটেছে তাতে অনেকের প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি তার লক্ষ্যে আছে? নাকি আদর্শচ্যুত বাংলাদেশ হেরে যাচ্ছে? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এ জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা। সারা জীবন তিনি ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তা তাঁর লেখা এবং বক্তব্যেই পাওয়া যায়।

‘এ দেশে ইসলাম, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবই থাকবে এবং বাংলাদেশও থাকবে। হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর গত এক দশক যে অত্যাচার হয়েছে তারও অবসান হবে।’ (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭০। সূত্র : শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম, আতিউর রহমান। পৃষ্ঠা : ২১৯)

‘জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে, কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি তারা করতে দিবে না...’ (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২৫৮) ।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতার এ দুটি উক্তিই আমাদের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট বলে দেয়। এক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান। আমরা সবাই বাঙালি।’ এ অমর স্লোগান বুকে ধারণ করেই ৩০ লাখ বাঙালি জীবন দিয়েছিল। ৩ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতেই হয়- সেই বাংলাদেশ কি আমরা পেয়েছি? এ রাষ্ট্র কি সবার? বাংলাদেশ কি পথভ্রষ্ট? আমরা কি হেরে যাচ্ছি? ১৩ অক্টোবর থেকে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালীতে যা ঘটল, তা কি আমাদের বাংলাদেশ? মুহুর্তে কিছু মানুষের সব লুট হলো, পুড়ে ছাই হয়ে গেল ভালোবাসার ঠিকানা। সন্ত্রাসের তাণ্ডবে পালিয়ে গেল মানবতা। কিছু মানুষ অনুভব করল এ রাষ্ট্রে তারা অনাহুত, নিরাপত্তাহীন। তাদের পাশে কেউ নেই। এ রকম একটি ঘটনা যতটা না দুঃখজনক তার চেয়েও দুর্ভাগ্যজনক হলো ঘটনা-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। বিশ্বে সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা দেখি নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য থাকে। কিন্তু সংকটে এবং মৌলিক প্রশ্নে, দেশের স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়। ভারতে তীব্র বিভাজনের রাজনীতিতেও বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রশ্নে সব দল একাট্টা। নিউজিল্যান্ডে উগ্রবাদী সন্ত্রাসবাদ, সেখানকার রাজনৈতিক বিভেদকে উপড়ে ফেলে। ব্রিটেনে এমপির মৃত্যু সব মত ও পক্ষের পার্থক্য মুছে ফেলে। কিন্তু সংকটে বাংলাদেশ এক হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক দল একই সুরে কথা বলতে পারে না। হোক না তা রোহিঙ্গা ইস্যু, করোনা মোকাবিলা কিংবা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। দেশে কোনো অস্থিতিশীল, জনগণের স্বার্থহানিকর উত্তেজনা সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক বিভক্তির কদর্য, কুৎসিত রূপ যেন আরও বীভৎস রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বিভাজন দেখা যায় সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে। যে ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে উপড়ে দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি তাকে আবার নতুন করে লালন করার এক অদ্ভুত প্রবণতা আমাদের রাজনীতিতে দৃশ্যমান। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো সাম্প্রদায়িকতা যেন রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ ঘায়েলের এক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় থেকে সাম্প্রদায়িকতার যে তাণ্ডব বাংলাদেশ দেখল, সেখানে রাজনীতিবিদদের সহানুভূতির চেয়ে প্রতিপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক বিদঘুটে প্রবণতা দগদগে ঘায়ের মতো দৃশ্যমান। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ব্লেইম গেইমে যেন ধর্মান্ধ দুর্বৃত্তরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

ঘটনার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে মন্ত্রী-উপমন্ত্রী, নেতা-পাতিনেতা সবাই হইহই করে উঠলেন। সবার আঙুল বিএনপির দিকে। বলা হলো, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিএনপি-জামায়াতের মদদে এসব ঘটানো হয়েছে। যে বিএনপি নিজেদের নেতাকে মুক্ত করার জন্য একটি আন্দোলন করতে পারে না সেই বিএনপি এমন সুচারুভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করতে সক্ষম? আমরা যদি তর্কের খাতিরেও ধরে নিই এটা ‘বিএনপির ষড়যন্ত্র’, তা হলে প্রশ্ন আসে সরকার কী করল? সরকার নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করল? ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে, মাইকিং করে, সমাবেশের মাধ্যমে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখল কেন? একটি রাষ্ট্রে সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায় এড়ানো কি যাবে? যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিদের গোপন পরিকল্পনার খবর পেয়ে মুহুর্তেই আস্তানা ঘিরে ফেলে, ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘অপরাধী’কে অসম্ভব দক্ষতায় গ্রেফতার করে  সেই চৌকস, দক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানল না, কিছুই বুঝল না। কী করে সম্ভব? বাংলাদেশে সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন মহল থেকে নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল দুর্গাপূজায় নাশকতার কোনো শঙ্কা নেই। তাহলে এটি কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা? কুমিল্লার ঘটনার পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিল এর জেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সে শঙ্কাই সত্য পরিণত হলো। প্রশ্ন উঠতেই পারে এ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী প্রস্তুতি নিয়েছিল? প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা বাদই দিলাম, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ কী দায়িত্ব পালন করছে? দেশে এখন আওয়ামী লীগের অভাব নেই। ইউনিয়ন নির্বাচন থেকে সংসদ উপনির্বাচন সর্বত্র প্রার্থীর ছড়াছড়ি। কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, রংপুরে এত আওয়ামী লীগ কোথায় গেল? কোথাও তো রাজনৈতিক প্রতিরোধ দেখলাম না। রাজনৈতিক প্রতিরোধ পরের কথা, ঘটনার পর দুর্গত এলাকায় ছুটে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের আড়ষ্টতা! কেন? ১৩ বছর আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ হেফাজতের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলে। আওয়ামী লীগে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীরা বাসা বাধে। এবার দেখলাম নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িত দুজন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পর্যন্ত পেয়েছেন। তবে আশার কথা হলো, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনোনয়ন বাতিল করেছেন। শুধু নাসিরনগর কেন, দেশের বহু স্থানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের পুনরুত্থান ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর উদ্যোগে এ-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারাই বলেছেন, তৃণমূল থেকে অর্থের বিনিময়ে এসব নাম পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভিতরই এখন সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ, মৌলবাদের ভূত ঢুকে গেছে। যে শর্ষে দিয়ে ভূত তাড়াবে সেই শর্ষের মধ্যেই ভূত। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নামে স্লোগান দিয়ে চাটুকাররা গলা ফাটিয়ে ফেলে। কিন্তু তাঁর নির্দেশগুলো আওয়ামী লীগের কজন জানে?

শেখ হাসিনা বারবার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আর এ নির্দেশ শুনে কিছু কিছু আওয়ামী লীগ নেতা দ্বিগুণ উৎসাহে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের আওয়ামী লীগে ঢোকাচ্ছেন। তাদের পদ দিচ্ছেন, মনোনয়ন দিচ্ছেন। ফলে জাতির পিতা সারা জীবন যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের জন্য লড়াই করলেন সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আজ আওয়ামী লীগে বিলীনপ্রায়। আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা মুখে বলেন কিন্তু বাস্তবে কজন তা মানেন। এ রকম সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সহিংসতায় বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আর্তমানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এর কিছু নিদর্শন আমরা পাই। ভারত বিভক্তির পর কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। সে দাঙ্গায় বঙ্গবন্ধু কী করেছিলেন একটু দেখে নেওয়া যাক-

‘কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়।... লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে রিফিউজিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দোতলায় মেয়েরা, আর নিচে পুরুষ। কর্মীদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমাকেও মাঝে মাঝে ডিউটি করতে হয়। মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু-এক জায়গায় উদ্ধার করতে গিয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদের উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৬৬)। জাতির পিতা শিখিয়েছেন রাজনীতি মানে শুধু প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়। রাজনীতি মানে মানুষের সেবা। দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন এ কাজটি করেছেন। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগের কজন সে পথে হাঁটেন? একটা করে ঘটনা ঘটছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের কথার খই ফুটছে। দুর্গত মানুষের পাশে ছুটে যাওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করেন এ ঘটনার দায় কোনোভাবে বিএনপির ঘাড়ে চাপাতে পারলেই হলো, ব্যস। বিএনপিকে আরও সহজেই ঘায়েল করা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতার এ প্রবণতা অগ্রহণযোগ্য এবং দায় এড়ানোর কৌশল। এসব ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতের কেউ জড়িত থাকতেই পারে। সেটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা দেখবে। কিন্তু সরকার হিসেবে অবশ্যই আওয়ামী লীগকেই এর দায় নিতে হবে। জনগণের জানমালের হেফাজতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এটা ষড়যন্ত্র বলে পার পাওয়া যাবে না। যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা সরকারের কাজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে- ১৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তারপরও কেন সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত সাপ ছোবল মারল। আওয়ামী লীগ কি তাহলে জাতির পিতার আদর্শের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে পারেনি? আওয়ামী লীগ কি তাহলে ক্ষমতায় থাকার জন্য দুধকলা দিয়ে ধর্মান্ধ মৌলবাদের সাপ পুষছে?

কুমিল্লার ঘটনার পর থেকেই বিএনপি নেতারা উল্লসিত। তাদের উল্লাস এখন আর চাপা থাকছে না। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তা আজকাল অসংলগ্ন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অমার্জিত। তাদের কথা শুনে মনে পড়ে সেই অক্ষম, অযোগ্য ব্যক্তিদের যারা কিছু করতে না পেরে খিস্তি করেন। বিএনপি নেতাদের কথা শুনলে মনে হয় সাম্প্রদায়িকতার কার্ড নিয়ে তারা আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে ফেলেছেন। বিএনপি নেতাদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ নেই, সহানুভূতি নেই। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপাতে বিএনপির সর্বাত্মক চেষ্টা। বিএনপির একজন নেতাও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াননি। অবশ্য এ ব্যাপারে বিএনপি খুব স্পষ্ট এবং রাখঢাকহীন। কারণ সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখার মাধ্যমেই বিএনপি বিকশিত হয়েছে। জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ উপড়ে ফেলেছিলেন। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ফ্যাসিস্ট শক্তি জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনরুত্থিত করেছিলেন। রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে বের করে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। জিয়ার সময় এ রাষ্ট্রে দুই শ্রেণির নাগরিক ব্যবস্থা তৈরি হয়। মুসলমানরা প্রথম শ্রেণির নাগরিক, অন্যরা দ্বিতীয় শ্রেণির। জিয়া সর্বত্র সমঅধিকারের বদলে সংখ্যালঘুদের জন্য সীমিত কোটার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। আজ বাংলাদেশে যে ধর্মান্ধ মৌলবাদের দাপট তার স্রষ্টা জিয়াউর রহমান। বিএনপি একে লালন করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। এখনো বিএনপি ও জামায়াতের লিভ-টুগেদার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রধান বিষফোঁড়া। বিএনপির মতো মূলধারার জনপ্রিয় দল মৌলবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন করার কারণেই এখনো সাম্প্রদায়িকতা ফণা তুলে আছে। বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে লালন করেছে। বিএনপিই যুদ্ধাপরাধী নরঘাতক মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে শহীদের রক্তে ভেজা জাতীয় পতাকা উপহার দিয়েছে। বিএনপি বাংলা ভাই, জেএমবি সৃষ্টি করেছে। উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে বিএনপি সব সময় স্বাগত জানায়। প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক আহ্লাদে সেই ধারণাটি আরও প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপি মনে করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি। মানুষ যত উগ্র মৌলবাদকে আলিঙ্গন করবে, বিএনপি তত হৃষ্টপুষ্ট হবে- এটা বিএনপির অনেকের বিশ্বাস। তাই কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও রংপুরের ঘটনায় বিএনপি নেতারা যেন ‘হারানো যৌবন’ ফিরে পাচ্ছেন। এ ঘটনায় তারা আওয়ামী লীগকে নকআউট করেছেন! জয়ের আনন্দে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্যের মতো প্রলাপ বকছেন। অথচ এইট দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হলে বিএনপি এসব ঘটনার নির্মোহ, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করতে পারত। ঘটনাস্থলে মানবিক সহায়তার হাত বাড়াতে পারত। কিন্তু এসব না করে বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপাতে ব্যস্ত। এর ফলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দোষারোপের রাজনীতি চলছে। কথার তুফান মেইলে জাতি দিশাহারা। এর মধ্যে খবর পাওয়া গেল কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখা ব্যক্তি ইকবাল হোসেন (৩৫)। একজন মুসলমান। তার মানে কী? কোনো হিন্দু ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করেনি। একজন মুসলমান এ অপকর্ম করেছে। তার লক্ষ্য ছিল অশান্তি সৃষ্টি। ইকবালের রাজনৈতিক পরিচয় কী তা আমরা এখনো জানি না। আমি জানতে আগ্রহী নই। তিনি একজন অমানুষ। মানুষরূপী পশু, দানব। এসব সহিংসতার কারণ এই জানোয়াররা। সাম্প্রদায়িক এ বীভৎস খেলায় এরাই আসল খেলোয়াড়। এরা কার পক্ষে? আওয়ামী লীগ না বিএনপি- সে প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে এরা বাংলাদেশের বিপক্ষে।

টি-২০ বিশ্বকাপ দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। খেলায় হারলে ঘুরে দাঁড়ানো যায় সহজে। বাংলাদেশ তা বারবার প্রমাণ করেছে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন সংকটও কাটিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু আদর্শ হারালে ঘুরে দাঁড়ানো যায় না। বাংলাদেশ যদি আদর্শচ্যুত হয় তাহলে আমাদের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়। আমরা হেরে যাই। সাম্প্রদায়িকতার এই তীব্র লেলিহান শিখায় আমরাও কি পুড়ে যাচ্ছি? বাংলাদেশ কি হেরে যাচ্ছে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email : poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী, জয়তু শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ১০:১২ পিএম, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail

ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা জয়তু শেখ হাসিনা। আপনি আবারো প্রমাণ করলেন আপনি ন্যায়ের পক্ষে, আপনি সত্যের পক্ষে। অন্যায়কারী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, যত দম্ভই দেখাক না কেন তিনি যে পদে যে জায়গায় থাকুক না কেন তাকে আপনি ক্ষমা করেন না। আপনি প্রমাণ করলেন, আপনি সবসময় জনগণের পক্ষে। আপনি প্রমাণ করলেন যে, আপনি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না কোন কিছুর বিনিময়। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান গত কিছুদিন ধরে যে কাণ্ডকীর্তি করছিল তাতে ডা. মুরাদ কতটুকু লজ্জিত হয়েছে জানিনা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিটি মানুষ লজ্জায় কুণ্ঠিত হয়েছেন। আমরা নিজেরাও সব সময় বলাবলি করেছি এ লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়। ডা. মুরাদ হাসান আওয়ামী লীগের এমপি, তিনি তথ্য প্রতিমন্ত্রী। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কখনো কুৎসিত, নোংরা, অশালীন আচরণ করতে পারে না। তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করার করার ক্ষেত্রে অবশ্যই শালীনতা বজায় রাখবেন। এটি জাতির পিতার শিক্ষা, এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা। কিন্তু ডা. মুরাদ কোন শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা জানি না। নর্দমার দুর্গন্ধের চেয়েও দুর্গন্ধযুক্ত তার প্রতিটি শব্দ বাক্য জাতিকে হজম করতে হয়েছে এবং সেই সমস্ত বক্তব্যগুলো দেয়ার পর তিনি স্পর্ধা দেখিয়েছেন, বলেছেন সবকিছু নাকি প্রধানমন্ত্রী জানে। এভাবে প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গানো যে কতবড় ধৃষ্টতা, কত বড় অপরাধ তা কি তিনি জানেন?

অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় পদক্ষেপ নিলেন, সঠিক সময়ে নিলেন, যথাসময়ে নিলেন। এটিই শেখ হাসিনার বৈশিষ্ট্য। একজন নারী সম্পর্কে যে কটূক্তি করেছেন তা অমার্জনীয় এবং ঘৃণিত। এই ধরনের নোংরা লোকরা কিভাবে রাজনীতিতে থাকে তা আমাদের বোধগম্য নয়। সর্বশেষ একজন চিত্রনায়িকার সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় ডা. মুরাদ যে ভাষায় কথা বলেছেন তা আমাদেরকে হতবাক করে দিয়েছে। এত নিম্নমানের রুচিহীন মানুষ যদি রাজনীতিতে আসে তাহলে রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের শেষ আস্থাটুকু নষ্ট হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সংকটে দূরদর্শী, সাহসী এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবারও তা প্রমাণ করলেন। প্রধানমন্ত্রী ডা. মুরাদকে মন্ত্রিসভা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে, যারাই সীমা লঙ্ঘন করবে তাদেরকে একই রকম পরিণতি ভোগ করতে হবে।

এর আগে তিনি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করেছেন এবং পরবর্তীতে মেয়র পদ থেকেও তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট বার্তা। কিন্তু এই বার্তা ডা. মুরাদের মতো অর্ধশিক্ষিত, উন্মাদরা জানেনা। আর জানার জন্যই তারা অসভ্য, নোংরা ভাষায় কথা বলে। ডা. মুরাদ সম্পর্কে আজ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন যে, তিনি ছাত্রদল করতেন। ডা. মুরাদ এখন পর্যন্ত এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। আমরা বিভিন্ন সময়ে শুনে আসছি আওয়ামী লীগে হাইব্রিড এবং অনুপ্রবেশকারীদের আনাগোনা। তাহলে কি মুরাদ সেই অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড। আমরা আশা করবো, ডা. মুরাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ব্যবস্থা নিয়েছেন সেই ব্যবস্থা থেকে আওয়ামী লীগ শিখবে। শেখ হাসিনা একা কাজ করে যাবেন, আর আওয়ামী লীগের নেতারা সমস্ত আবর্জনা ছড়িয়ে দিবেন, বাংলাদেশের যে অগ্রগতি উন্নয়ন ম্লান হয়ে যাবে কিছু অর্বাচীনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তায়, এটা হতে পারে না। আর এটা হতে পারে না জন্যই প্রধানমন্ত্রী এরকম একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে সিদ্ধান্তকে আমরা টুপি খোলা অভিনন্দন জানাতে পারি। এই সিদ্ধান্ত নারী স্বাধীনতার পক্ষের জয়, এই সিদ্ধান্ত সুস্থ চিন্তাধারার মানুষের জয়, এই সিদ্ধান্ত প্রতিটি বাঙালির অভিপ্রায়ের প্রকাশ। ধন্যবাদ শেখ হাসিনা, ধন্যবাদ আপনাকে।

প্রধানমন্ত্রী   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সুসময়ের চাটুকাররা দুঃসময়ে থাকে না

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail

৪ ডিসেম্বর ১৯৯০। সন্ধ্যা থেকেই টেলিভিশনে ঘোষণা করা হচ্ছিল রাতে উপরাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হবে। দেশজুড়ে তীব্র উত্তেজনা। উত্তাল জনতা। এরশাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই কিছুই। দিনভর মিছিল, স্লোগানে প্রকম্পিত রাজপথ। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে এরশাদের মন্ত্রী-এমপিদের গণপ্রতিরোধ। দেশে এক আন্দোলন উৎসবের আমেজ। এরশাদ কীভাবে পদত্যাগ করবেন, কীভাবে নির্দলীয় ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হবেন এ নিয়ে নানা আলোচনায় ভরপুর দেশ। তখন দেশে একটাই টেলিভিশন- বিটিভি। একটাই বেতার- রেডিও বাংলাদেশ। বিবিসি শুনি, গোল হয়ে অনেকজন একসঙ্গে। এর মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কী বলবেন তা শোনার জন্য আমরা সবাই উদ্গ্রীব। এরশাদ সাক্ষাৎকার দিলেন কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে। তার হাসির মধ্যে কতটা সততা আর কতটা শঠতা তা সব সময়ই এক রহস্য। ব্যারিস্টার মওদুদ সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কীভাবে বিরোধী দলের দাবি মেটানো সম্ভব তার ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। এরশাদ ছুটিতে যাবেন, তিনি (ব্যারিস্টার মওদুদ) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হবেন। বিরোধী দলের পছন্দের ব্যক্তিকে উপরাষ্ট্রপতি বানাবেন। সংবিধান, আইনের কী চুলচেরা বিশ্লেষণ! এর মধ্যেই টেলিভিশনে স্ক্রল প্রচারিত হলো- হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মুহূর্তে উৎসবের নগরীতে পরিণত হলো গোটা ঢাকা, সারা দেশ। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই রাস্তায় নেমে এলেন। এ যেন এক বিজয় উৎসব। মানুষের বাধভাঙা উচ্ছ্বাস। ৫ ডিসেম্বর তিন জোটের বৈঠক হলো ধানমন্ডিতে প্রয়াত বাকশাল নেতা মহিউদ্দিন আহমদের বাড়িতে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিন জোটের নেতারা একমত হলেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঘোষণা করলেন, প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান।

অনেকেই বলেন, ৪ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা ছিল একটি কৌশল। এরশাদ ভেবেছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে বিভক্ত বিরোধী জোটগুলো ব্যর্থ হবে। এরশাদ আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু সবকিছু ঘটে গেল মুহূর্তেই। কোনো জটিলতা ছাড়াই। অবশ্য সমস্যা আরও ছিল। বেঁকে বসলেন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর চাকরির মেয়াদ আরও কয়েক বছর ছিল। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতির পদ ছেড়ে এ দায়িত্ব নিতে তিনি ছিলেন দ্বিধান্বিত। এ সময় সংকট সমাধানে এগিয়ে এলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই প্রথম বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে ফোন করলেন। জাতির প্রয়োজনে তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণে অনুরোধ জানালেন। তাঁর স্বপদে ফেরার বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করলেন। মূলত শেখ হাসিনার অনুরোধেই দ্রুত রাজি হলেন সাহাবুদ্দীন আহমদ।

৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হলো। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ হলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করলেন এরশাদের ঘনিষ্ঠতম আমলা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম কে আনোয়ার। এরশাদের রাজত্বে সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ক্ষমতার দাপট ছিল অকল্পনীয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে এরশাদ মন্ত্রীদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতেন। আমলাদের ফ্লোর দিয়ে গভীর মনোযোগে তাদের কথা শুনতেন। এরশাদের জমানায় অনেক মন্ত্রী টেলিভিশন বা পত্রিকায় খবর দেখে অনেক সরকারি সিদ্ধান্ত জানতেন। আমলারাই তার বিশ্বস্ত ছিল। এরশাদ নয় বছর দেশ চালিয়েছেন সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ওপর নির্ভর করে। বিদায়ের আগে এরশাদ সেনাপ্রধান নূরউদ্দীন খানের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু এরশাদের নিজের লোক সেনাপ্রধানও জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সরি স্যার’। অনুগত, চাটুকার আমলারাই ছিল এরশাদের বিশ্বস্ত। রাজনীতিবিদদের এরশাদ সন্দেহের চোখে দেখতেন, বিশ্বাস করতেন না। শুধু তাই নয়, এরশাদের জমানা নিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বইয়ে জানা যায় তিনি রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিগ্রস্ত এবং মূর্খ মনে করতেন।

এরশাদ আমলের শেষ দিকের ছবিগুলো দেখলে দেখা যায়, এম কে আনোয়ার এবং আমলারা যেন ছায়ার মতো। যেখানেই এরশাদ সেখানেই আমলারা। কিন্তু এরশাদের পতনের এক মাসের মধ্যেই তিনি সটকে পড়লেন। প্রথমে আওয়ামী লীগের দরজায় টোকা দিলেন। বলে রাখা ভালো, এরশাদের পতনের আগেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল ও জাসদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ দল কয়েক দফা বৈঠক করেছিল। আগামীর সরকার কেমন হবে এ নিয়ে এক রূপরেখাও প্রণয়ন করেছিল। একে বলা হয় ‘তিন জোটের রূপরেখা’। সিপিবি কার্যালয়ে চূড়ান্ত হয়েছিল এ ঐতিহাসিক দলিলটি। সংসদীয় গণতন্ত্র, বেতার-টেলিভশনের স্বায়ত্তশাসন, সব কালাকানুন বাতিলসহ বিভিন্ন অঙ্গীকার ছিল এ রূপরেখায়। তিন জোটের রূপরেখায় বলা হয়েছিল, স্বৈরাচার এরশাদের সহযোগী কাউকে তিন জোটের কেউ কোনো দলে নেবে না। এরশাদের পতনের পর সম্মিলিত ছাত্রঐক্য এরশাদের দালালদের তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকায় আমলাদের মধ্যে প্রথম নামটা ছিল এম কে আনোয়ারের। এরশাদের পতনের এক মাসের মধ্যে এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলী- কেতাদুরস্ত এ দুই আমলা উল্টে গেলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তিন জোটের রূপরেখাকে সম্মান জানিয়ে তাদের পত্রপাঠ বিদায় করে দিলেন। কিন্তু এরশাদের সুসময়ের চাটুকার এ দুই আমলা অবলীলায় ঝাঁকের কইয়ের মতো মিশে গেলেন বিএনপিতে। কোথায় অঙ্গীকার, কোথায় তিন জোট। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জয়ী হওয়ার পর এটাই ছিল প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। সে প্রসঙ্গ নিয়ে এ লেখায় আলোচনা করব না।

এরশাদের প্রিয় পাত্র, সুসময়ে এরশাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী দুই আমলা দুঃসময়ে এক মুহূর্তের জন্যও এরশাদের পাশে থাকলেন না। এরশাদের চরম বিপদে এতটুকু সহানুভূতি দেখালেন না। তখন নির্বাচন আইনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। এখন যেমন অবসরের পর তিন বছর পর্যন্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন করতে পারেন না। সে সময় তেমনটি ছিল না। এম কে আনোয়ার ও কেরামত আলী দুজনই বিএনপির টিকিট পেলেন। ’৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি সবাইকে চমকে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকারও গঠন করল। এরশাদের দুই দোসর গণতান্ত্রিক সরকারে মন্ত্রী হয়ে গেলেন। সত্যি বিস্ময়কর। এরশাদ বিদায়ের আগে যেসব আমলাকে নিয়ে থাকতেন তারা কেউ এরশাদের পাশে দাঁড়াননি। মুহূর্তে তারা নিরপেক্ষ হয়ে যান।

উপেক্ষিত মিজানুর রহমান চৌধুরী এরশাদের জাতীয় পার্টিকে আগলে রেখেছিলেন। ‘স্বৈরাচার এরশাদ’কে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদই। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সুসময়ে এরশাদের জন্য কী না করতেন। এরশাদের মায়ের মৃত্যুর পর তার কান্না দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। কার মা মারা গেলেন- এরশাদের না শাহ মোয়াজ্জেমের? এরশাদকে খুশি করতে কি কুৎসিত, অরুচিকর, কদর্য কথাবার্তা বলতেন শাহ মোয়াজ্জেম। ‘দুই নারী মিলিত হলে কিছুই উৎপাদন হয় না’, কিংবা ‘পদত্যাগপত্র কি জিরো পয়েন্টে দিয়ে আসব?’ এ ধরনের অসৌজন্যমূলক ও অশালীন বক্তব্যের জন্যই আলোচিত হতেন তিনি। (ভাগ্যিস তখন এসব ফেসবুক, ইউটিউব ছিল না, তাহলে এসব কথা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যেত) সেই শাহ মোয়াজ্জেম কিন্তু এরশাদের দুঃসহ যাত্রার সঙ্গী হননি বেশি দিন। সুযোগ পেয়েই জার্সি বদল করেন। এখন মেয়াদোত্তীর্ণ নেতা হিসেবে বিএনপিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছেন। ব্যারিস্টার মওদুদও দুর্দিনে এরশাদের সঙ্গে বেশি দিন থাকেননি। এরশাদ যখন চরম আইনি সংকটে তখন তিনি বিএনপি-জামায়াত সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে জাতিকে জ্ঞান দিয়েছেন। এরশাদের চাটুকারদের খুব কমই আছেন এখন জাতীয় পার্টিতে। এটাই বোধহয় নিয়ম। যুগে যুগে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের এক ক্লান্তিহীন সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকেও ঘিরে ফেলেছিল চাটুকাররা। খুনি মোশতাক ও খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর চারপাশে গিজগিজ করত। তাজউদ্দীন আহমদরা দূরে সরে গিয়েছিলেন। বাকি ইতিহাস কারও অজানা নয়। বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিলেন ফরাসউদ্দিন আহমেদ। ১৪ আগস্ট গণভবনে ফরাসউদ্দিন আহমেদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন ফরাসউদ্দিন। ওই অনুষ্ঠানে জাতির পিতা ছিলেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে তোফায়েল আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ৩২ নম্বরে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ফরাসউদ্দিন কিছুই করেননি। বরং খুনি মোশতাকের অনাপত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন এইচ টি ইমাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনিই খুনি মোশতাকের অবৈধ মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

জিয়া ক্ষমতায় থাকার জন্য কী না করেছেন। তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। বেছে বেছে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের হত্যা করেছেন। সেনাপ্রধান হিসেবে বেছে নিয়েছেন এরশাদকে। প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মতে, এরশাদের চাটুকারিতায় মুগ্ধ হয়েই জেনারেল শওকত, জেনারেল মঞ্জুরের মতো মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন পাকিস্তান-প্রত্যাগত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। ফল সবাই জানেন। জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর তার চারপাশের চাটুকাররাই এরশাদকে ক্ষমতায় আনার পথ তৈরি করেছিলেন।

বেগম জিয়ার চারপাশে ছায়ার মতো থাকতেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। ফালুর রাজনৈতিক পরিচয় বেগম জিয়ার দান। আজ বেগম জিয়া অসুস্থ। আর ফালু দূরদেশে বিত্তের বৈভবে দিন কাটাচ্ছেন। বেগম জিয়ারও আমলাপ্রীতি কম ছিল না। দুই মেয়াদেই ড. কামাল সিদ্দিকী ছিলেন বেগম জিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত আমলা। প্রধানমন্ত্রীর সচিব, মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব হয়েছিলেন একদা চৈনিক এই আমলা। ক্ষমতায় পালাবদল হতেই পালিয়ে গেলেন। বেগম জিয়ার দুঃসময়ে তার টিকিটিও কেউ পায়নি। এখন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। খাচ্ছেন, দাচ্ছেন, চকচক ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছেন। বেগম জিয়ার জেল, অসুখ তাকে কি বিচলিত করে?

হারিছ চৌধুরীর কথা মনে আছে? কী ক্ষমতাবান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তার ভয়ে ব্যবসায়ীরা তটস্থ থাকতেন। ওয়ান-ইলেভেনে বেগম জিয়াকে ফেলে পালিয়ে গেলেন। শোনা যায়, এখন অবৈধ অর্থে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন।

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনলেন শেখ হাসিনা। ’৯০-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ছুটে গেলেন জাতির পিতার দুই বোন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন। শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি পদটিকে নিরপেক্ষ একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে যে সম্মান ও মর্যাদা শেখ হাসিনা দিয়েছেন তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি অনন্য উদাহরণ। কিন্তু বিচারপতি সাহাবুদ্দীন দুঃসময়ে শেখ হাসিনার পাশে থাকেননি। এমনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরও তাঁকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতেও শুনিনি। আওয়ামী লীগ সরকারে যেসব আমলার বাড়বাড়ন্ত ছিল বিএনপি আমলে তাদের অনেকের আসল চেহারা প্রকাশ হয়।

বাংলাদেশে ক্ষমতা বলয়ে সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করে সুবিধাবাদী চক্র। সুসময়ের এই অতিভক্তরা দুঃসময়ে থাকে না। আওয়ামী লীগ টানা ১৩ বছর ক্ষমতায়। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের নেতৃত্ব দেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের আজকের এ সুসময়ের প্রধান সেনাপতি তিনিই। আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাতির পিতার আদর্শে উজ্জীবিত ভয়ডরহীন বিপুল কর্মী। যারা লোভহীন, ত্যাগী। যাঁরা শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায় জীবন-যৌবন উৎসর্গ করেছেন। ’৭৫-পরবর্তী সময়ে এঁরা জেল খেটেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। অনেকে পিতা হারিয়েছেন, ভাই হারিয়েছেন। মাঝেমধ্যে এঁদের জীবনকাহিনি শুনলে চমকে উঠি। দুঃসময়ের এই কর্মীরা কিংবা সেই পরিবারগুলো কি আওয়ামী লীগের মূলধারায় আছে? নাকি আওয়ামী লীগ দখল করে নিয়েছে সুবিধাবাদী চাটুকাররা? আজ দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ টইটম্বুর। এত আওয়ামী লীগ এলো কোত্থেকে? দুঃসময়ে এরা কই ছিল? আবার খারাপ সময়ে এরা কই থাকবে? কোনো দিন রাজপথে মিছিল না করে, জেল-জুলুম-নির্যাতন না সয়ে যে ব্যক্তিটি এখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, সে দুঃসময়ে কোথায় থাকবে, কানাডা না মার্কিন মুলুকে?

বাংলাদেশে ইউপি নির্বাচনে নৌকার মাঝি হয়েছেন যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সন্তানরা। নৌকার টিকিট পেয়ে তারা এখন ভেংচি কাটছেন। জিয়ার সাফারি পরা ব্যক্তি এখন মুজিবকোট পরেন। আয়নায় তার চেহারা দেখে নিজেই হয়তো লজ্জা পান। এত চাটুকার, এত মতলববাজ এখন আওয়ামী লীগে যে আসল-নকল খুঁজে বের করাই দায়। দুঃসময়ের কাণ্ডারিরা এখন যেন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। কঠিন সময়ের বন্ধুরা সুসময়ে যখন দূরে সরে যায়, তখন তা দুঃসময়ের আগমনি বার্তা শোনায়। এখন ভুঁইফোঁড় রাজনীতিবিদ, আদর্শহীন সুযোগসন্ধানী আমলা ও মতলববাজ চক্র চাটুকারিতার মেলা বসিয়েছে, দুঃসময়ে তারা থাকবে না। সুসময়ের চাটুকাররা দুঃসময়ে পালায়। এরা দেশের জন্য ভাবে না, দলের জন্য ভাবে না, নেতার কথা চিন্তা করে না। আজ এরা যা কিছু করে সব নিজেদের জন্য। সুসময়ের চাটুকাররা স্মার্ট। এরা তৈলমর্দনে অসাধারণ। এরা ন্যায়-অন্যায় বোঝে না। পরিণতির কথা ভাবে না। এরা সাহস করে সত্য কথা বলে না। বাস্তবতা আড়াল করে এরা সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতে চায়। একটা রঙিন ফ্রেমে বাস্তবতাকে স্বপ্নলোকের মেকি আবরণ দিতে চায়। এদের উপদ্রব সুসময়ে বাড়ে। যখন আওয়ামী লীগের সুসময়ে অতিথি পাখির ভিড় তখন প্রশাসনে নব্য আওয়ামী লীগের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারের চারপাশে শুধু সুবিধাবাদী, ধূর্তদের আনাগোনা। সব দেখে-শুনে চোখ বন্ধ করি। মস্তিষ্কে মুকুল দত্তের লেখা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানটি বেজে ওঠে- ‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও... ভুলো না তাকে ডেকে নিতে...’।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ইঞ্জিন আছে, বগি কোথায়?


Thumbnail

বাংলাদেশে এখন মিডিয়ার অনেক বিস্তৃতি হয়েছে। যদিও সম্প্রতিকালে লক্ষ্য করা গেছে যে, অনলাইন পত্র-পত্রিকা দিন দিন মোটামুটিভাবে একটি গতি পেয়েছে। যার ফলে প্রিন্টিং মিডিয়ার চেয়ে অনলাইন মিডিয়া গুলো বেশি জনপ্রিয়। তার কারণ  হচ্ছে তারা যে কোন ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে সেটিকে পাঠকের কাছে হাজির করতে পারে।  এসবের একটি  নেগেটিভ সাইডও আছে। সেটি হলো মিডিয়ার এত বেশি হওয়ার ফলে মিডিয়া অনেক সময় সংবাদ খুঁজে পায় না। হয়তো একই সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়াতে অনেক সময় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখতে বাধ্য হয়। তবে মিডিয়াকে সংবাদের খোরাক যোগাতে সাহায্য করছে নতুন নতুন সৃষ্ট রাজনৈতিক দল। তারা প্রথমে একটি প্রেস কনফারেন্স করে। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে একটি কমিটি করে। হয়তো সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, এই এক-দুইজনকে লোকে চিনে।তবে আর কাউকে চিনে না। আমরা একটি দল বলতে বুঝি, দলটিতে একজন নেতা থাকতে হবে আর তার সমর্থক থাকতে হবে। কিন্তু একের পর এক যেসব নতুন দলের কথা বর্তমানে মিডিয়ার মাধ্যমেও আমরা জানতে পারছি তাদের সমর্থক কিন্তু খুব একটা নাই দেশে। যার ফলে তারা কোন একটা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না। এটা-ওটা কথা বলে। এবং আমার ধারণা, অধিকাংশ নতুন নতুন যে রাজনৈতিক দলগুলো হয়েছে তারা যদি এদেশের পার্লামেন্টারি ইলেকশনে অংশ নেয় তবে ৩০০-৫০০ ভোটের বেশি পাবে না। আমি এখানকার নেতাদের বলতে চাই, ট্রেনে ইঞ্জিন থাকে এবং ইঞ্জিনের সাথে অনেক বগি থাকে। ইঞ্জিন সমস্ত বগিগুলোকে টেনে নেয়। বগিতে থাকে অনেক লোক জন অথবা মালামাল। অর্থাৎ, বগি টানার জন্য ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয়। এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইঞ্জিনই। ইঞ্জিন যেদিকে যাবে বগি সেদিকে যাবে। আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইঞ্জিন দেখতে পাচ্ছি প্রায়শই , কিন্তু বগি দেখতে পাচ্ছি না। অর্থাৎ তাদের সমর্থক নাই। এর ফলে যা হচ্ছে তা হলো তারা বিনা কারণে রাস্তা দখল করে রাখছে। আমি একটি উদাহরণ দেই- আজকাল যদি কেউ নতুন পত্রিকা বের করতে যায় তাহলে সে দেখবে যে সে যে নামে পত্রিকা খুলতে চায়, সে খুঁজে বের করে দেখবে কেউ না কেউ ওই পত্রিকাটির নামটি আগেই রেজিস্ট্রেশন করেছে। এবং সকলেই জানে, আমার আর নতুন করে বলার নেই। কোনো না কোনোভাবে মেকানিজম করে ওই নামটা রেখে দিয়েছে। তারপর তারা এটা বিক্রি করে। এখনকার কিছু জনপ্রিয় পত্রিকাও এইভাবে এই নাম কিনে নিয়ে তারা পত্রিকাকে জনপ্রিয় করেছে। তার আগে পত্রিকাগুলো নামও কেউ জানতো না।

আমাদের দেশে শেষ পর্যন্ত কি এই রাজনৈতিক ইঞ্জিন, অর্থাৎ যে নেতারা রাজনৈতিক দল করছে তারাও কি ওই  সকল তথাকথিত পত্রিকার মতো নাম বিক্রি করেই চলবে কিনা, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একসময়, দেখা যাবে এটিই বাস্তবভিত্তিক হবে। দেখা যাবে  প্রথমে দুই-একজন নামকরা লোকরা দলে ঢুকবে। তারপর অরিজিনাল লোকদের বের করে দেবে তারা। তবে সেই লক্ষণও আপাতত নাই। কারণ হচ্ছে এই যে, যারা সত্যিকারভাবে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, যারা মাঠে যেতে পারে সেরকম কোনো রাজনৈতিক দল হচ্ছে না। একটি উদাহরণ দেওয়া চলে যে, যতগুলি সম্প্রতিকালে গত কয়েক মাসে এমনকি এই করোনাটা যখন কমে যায়, তখনও কোনো রাজনৈতিক দল কিন্তু ঢাকার বাহিরে প্রেস কনফারেন্স ছাড়া কোন মাঠে ময়দানে যেয়ে এমনকি বিভাগীয় শহরেও এখন পর্যন্ত কোনো একটি সভা করে নাই। অর্থাৎ আমার মনে হচ্ছে এরা ঐ যে তথাকথিত পত্রিকায় নাম করে বিক্রি করবে। সেটাই তাদের উদ্দেশ্য কিনা এটাও একটি প্রশ্ন। কারণ এদের দ্বারা আর যাই হোক, এদেশের মানুষের কোন মঙ্গল হবে না। রাজনীতির কোনো মঙ্গল হবে না। কারণ যে রকম ট্রেন বগি ছাড়া শুধু ইঞ্জিন দিয়ে কোনদিন ট্রেন লাইনে যেমন চলতে পারে না, তাকে অবশ্যই বগি ব্যবহার করতে হবে। ঠিক তেমনিভাবে একের পর এক এই ইঞ্জিন সৃষ্টি করার যে প্রবণতা আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে এটি অর্থহীন। আমার মতে, বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক দল রেজিস্ট্রেশন করার যে সিস্টেম আছে তাদেরকে খুব শক্তভাবে এটা বলা উচিত যে কিভাবে তারা করবে এবং সেটাকে বাস্তবায়িত করবে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে এটাকে যাদের করার কথা তারা সেই ভাবে সিরিয়াসলি করে না। কারণ তাদের অনেকেই মনে করে যে বাংলাদেশে এখন বিনোদনের সুযোগ খুব কম। সুতরাং এই ধরনের ইঞ্জিন তৈরির ফলে তারা অনেক বিনোদনমূলক কথাবার্তা পায়। এটা একটা বিনোদনের মাধ্যম হয়ে গেছে। আগে ছিল সিনেমা-নাটক। এখন আমরা গ্রামের মানুষেরা, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরা যাত্রা দেখতাম। যাত্রা তখন খুবই জনপ্রিয় ছিলো। এখন যাত্রাটা নাই। আমার মনে হচ্ছে যাত্রার আধুনিক ভার্সনই হচ্ছে এই তথাকথিত ইঞ্জিল ওয়ালা রাজনৈতিক দল। তারা যাত্রার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কথাবার্তাই বলবে। এতে আসলে দেশের কোন মঙ্গল হবে না। আমি মনে করি এতে ভবিষ্যতে দেশের বরং ক্ষতি হবে। অনেক ছেলে মেয়েদের উস্কে দিয়ে তারা দেশে একটি স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করছে। যেখানে আমরা উন্নতির শিখরে যাচ্ছি সেটা বাধাগ্রস্ত করতে পারবে এবং এই বাধাগ্রস্ত করার জন্য যে নুতন নুতন বগি ছাড়া ইঞ্জিন তৈরি হচ্ছে সেটাকেও মনে করি।

রাজনীতি অবশ্যই একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কারণ অসাংবিধানিক পথে যারাই ক্ষমতায় এসেছে বিশেষ করে আমাদের দেশের ১৯৭৫ সালে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পরে। সেই সকল রাজনৈতিক দলগুলি সত্যিকারভাবে রাজনীতিকে প্রপারলি এগিয়ে নিতে পারেনি। তারা বরং পিছিয়ে দিয়েছে দেশকে। এরপরে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক একটি ধারা নিলেন। এখন রাজনৈতিক দল থাকবে। কিন্তু আমার মতে আইন করে করা কাজটা সঠিক হবেনা। কিন্তু যে ভাবে রাজনৈতিক দল করতে হবে সেই ব্যাপারে একটা অবশ্যই সঠিক আইন থাকবে এবং সেই আইন দ্বারা এই তথাকথিত সেই গ্রামের যাত্রা গান অথবা আগে ঢাকায় এখন কিছুটা কমেছে, কর্নারে কর্নারে পান-বিড়ির দোকান এভাবে রাজনৈতিক দল করে লাভ কোন দেশেই হয়নি, হবেও না এবং বিশ্বের কোথাও নাই। যদি রাজনৈতিক দলের সংখ্যার দিক দিয়ে কোনো নোবেল দেওয়া হয় তবে বাংলাদেশ অবশ্যই পেতো।

কারণ এত বেশি পরিমাণ রাজনৈতিক দল আছে, আর এসব রাজনৈতিক দলকে আমি আজকের লেখায় নাম দিয়েছি ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনে থামাতে হবে, থামিয়ে আমাদের সঠিক পথে, সঠিক রাজনীতিকে আনতে হবে। যখন ছাত্ররা তাদের যুক্তিপূর্ণ আন্দোলনে যায় তখন এই তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলোর এদের নিজস্ব সমর্থক না থাকায় তারা পিছন থেকে কিছু খরচ করে ওদের উসকে দেয়। একটি সুষ্ঠু রাজনীতি তার সুষ্ঠু পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি সঠিকভাবে রাখতে হয় তাহলে আমাদের সমাজের এবং রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতে হবে এবং সরকারি দল থেকে বিরোধী দল সকলে মিলেই এটায় যদি হাত দেয়া না হয় তাহলে আমাদের পরিশেষে মারাত্মক ক্ষতি হবে। আমরা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজাতি, এবার করোনাতে আমরা আমাদের অনেক গুণী জনকে হারিয়েছি। এমনকি দু-তিন দিন আগে রফিকুল ইসলাম সাহেবও চলে গেলেন। এখন যদি আমরা কোথাও একজন বিজ্ঞ লোককে এমনকি সিম্বোলিক অর্থেও তাকে প্রধান অতিথি করে বা বিশেষ বক্তা করে আনতে চাই সেরকম লোকের অভাব হয়েছে। এই অভাবের কারণ হচ্ছে যে লোকজন বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে এবং রাজনীতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক লোক আসা খুব বেশি প্রয়োজন। বুদ্ধিবৃত্তিক লোক তখনই আসবে যখন রাজনীতিকে একটি সুস্থ ধারার সুস্থ পথে নেওয়া যাবে। সেই কারণের জন্য আমাদের এই বিজয়ের মাস শুরু হয়েছে। আমরা বিজয়ের মাসে এই একের পর এক ইঞ্জিন তৈরি বন্ধ করে যেন সঠিক রাজনীতির পথে এগোতে পারি সে ব্যাপারে সকলের সজাগ হওয়া এবং একে একটি রূপ দান করা আমাদের অত্যন্ত জরুরী।

এবার আমদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী পালনের বছরে আমাদের সকলের বিবেককে জিজ্ঞাসা করে একটি প্রতিজ্ঞা করা উচিৎ যেনো আমরা দেশের গণতন্ত্রকে স্থায়ীরূপ দিব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকারে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়ে এবং সেটাকে সফল করে জাতির পিতার প্রতি সত্যিকারে সম্মান দেখাবো। সম্মান দেখাবো আমাদের স্বাধীনতাকে, যে স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, সংগ্রাম করে আমরা লাভ করেছি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং যারা বয়সের কারণে তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি অনেকে তখন জন্ম গ্রহণ করেনি তাদের সকলকেই সঠিকভাবে আমরা শিক্ষিত করব। সেই শিক্ষিত দুইটি ভাবে করতে হবে, একটি হচ্ছে কনভেনশনাল, যা স্কুল-কলেজের মাধ্যমে করা হয়। আর অন্যটি হচ্ছে নন-কনভেনশনাল, যেটা আগে বিভিন্ন এরিয়া থেকে লাইব্রেরি পাওয়া যেতো। সেখান থেকে বই এনে মানুষ পড়তো, সেসব লাইব্রেরি একটি প্রতিষ্ঠান আর এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে এভাবে আবার প্রয়োজনে সরকারি অনুদান দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। যেমন প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে অনেকে নিজে থেকেই বঙ্গবন্ধুকন্যা বা মুজিব কন্যার নাম দিয়ে তারা করা শুরু করেছে। একইসাথে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে একটি লাইব্রেরী থাকা উচিত এবং এই লাইব্রেরীতে যেরকম উদাহরণ হিসেবে বলি নিজের মেডিকেল কলেজেরই শুধু টেকনিক্যাল সাবজেক্ট নয়। পড়তে হবে কবিতা, ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়ে।  তাহলে শুধু চিকিৎসক শুধু তার টেকনিক্যাল জ্ঞানই সম্ববৃদ্ধ হবে না সাথে একজন চিকিৎসক সত্যিকারে মানুষ হয়েও উঠতে পারবে।

জাতির পিতার বদৌলতে যে স্বাধীন দেশ পেয়েছি এবং যেটি সঠিক পথে পরিচালনা করছেন তার কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তাকে আরও সঠিক রূপ দেওয়ার জন্য আমাদের এখন শিক্ষাঙ্গন থেকে প্রতিটি জায়গায় হাত দিতে হবে। যেমন লাইব্রেরী কথা বললাম তেমনি লাইব্রেরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনেক ভালো ভালো জিনিস আমাদের ছিল। তখনকার দিনে মানুষ এত শিক্ষিত ছিল না অথচ পুঁথিপড়া হতো তাতেও কিন্তু লোকজন শোনার জন্য আগ্রহ পোষণ করতো, কিছু শিখতো। যেটাই শিখুক মানুষ কিন্তু পুঁথির  দারাও কিন্তু শিখেছে। আমরা কেন তার থেকে সরে যেয়ে খালি ইঞ্জিন তৈরির দিকেই হাত দিচ্ছি। সুতরাং আসুন আমরা সকলে মিলে বগি ছাড়া আর ইঞ্জিন তৈরি না করে সত্যিকারে বাংলাদেশে গড়ে তুলি।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রাধান্য পাবে মানুষ


Thumbnail

করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে আসায় মহামারি-উত্তর বাস্তবতা চোখের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে সমঝোতা ও ব্যবস্থাপনার একটি ক্রমঅগ্রসরমান রূপ ফুটে উঠেছে, যা কি না বিকাশমান বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত্তি।

অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মন্দার পর আসে চাঙ্গাভাব। ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, অর্থনৈতিক উৎপাদন ও কার্যক্রম চাঙ্গা হচ্ছে ক্রমশ। নজিরবিহীন মাত্রা ও জটিলতার এক টিকাদান কর্মসূচি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। রেকর্ড কম সময়ে তা বিপন্নতার মাত্রা কমিয়েছে। বলা যায়, স্বাভাবিকতায় ফিরে এসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মঞ্চটা এখন তৈরি।

এ কারণে এটি ভারতের জন্য এক সুযোগের মুহূর্ত। এই ক্রান্তিলগ্নে ভারত যেসব সিদ্ধান্ত নেবে তা থেকেই ইঙ্গিত মিলবে, অধিকতর সুন্দর এক ভবিষ্যৎ কোথায় নিহিত বলে মনে করছে দেশটি।

করোনাভাইরাস মহামারি দেখিয়েছে, বর্তমানের চেয়ে কম তো নয়ই, বরং আমাদের দরকার আরো আন্ত সংযুক্ত একটি বিশ্ব। অভিন্ন সমস্যাগুলোর অবশ্যই অভিন্ন সমাধান থাকা দরকার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত কয়েক মাস ধরে জি-৭, জি-২০, কপ-২৬, প্রথম কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন কাউন্সিলে মহামারি-পরবর্তী বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার রূপকল্প তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চের মাধ্যমে একগুচ্ছ কৌশল এবং লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, যা ভারতের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোকে সবার জন্য ভালো এক আগামীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করবে। ভারত জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রদানে ভূমিকা রেখেছে। উন্নয়নমূলক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য আমরা দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছি।

সাম্প্রতিকতম ঘটনায় গ্লাসগোতে কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘পঞ্চামৃতের’ মাধ্যমে ভারতের জলবায়ু ভাবনার রূপরেখা দিয়েছেন। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের অজীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা ৫০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করা এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে শক্তির চাহিদার ৫০ শতাংশ পূরণ করার পথ ত্বরান্বিত করবে। পাশাপাশি ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ এক বিলিয়ন টন হ্রাস ও কার্বনের তীব্রতা ৪৫ শতাংশের নিচে আনা হবে। আর কার্বন নিঃসরণ ২০৭০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’তে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়ন এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও তাদের তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ভারতের সূচনা করা দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স এবং কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং অভিযোজন প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই সংস্থাগুলোর অধীন বৈশ্বিক পর্যায়ে আন্ত সংযুক্ত সৌরশক্তি অবকাঠামোর জন্য ‘এক সূর্য, এক বিশ্ব, এক গ্রিড’ এবং উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ প্রতিরোধী অবকাঠামোর জন্য ‘ঘাতসহ দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য অবকাঠামো’ কর্মসূচি চালু করেছেন।

ভারত জাতীয় হাইড্রোজেন মিশনের অধীনে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন ও রপ্তানির এক বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ারও চেষ্টা করছে। জলবায়ু পরিবর্তন সংকট মোকাবেলার লক্ষ্যে টেকসই জীবনাচরণের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি যে বক্তব্য দিয়েছেন, রোমে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে তা প্রশংসিত হয়। তিনি ‘লাইফ’ (Life) নামে এক শব্দের এক বিশ্ব আন্দোলনেরও প্রস্তাব করেছেন। এর মূল বিষয় হচ্ছে, পরিবেশ অনুকূল জীবনধারা। টেকসই জীবনধারার ব্যাপারে ভারতের নিজস্ব উদাহরণ বৈশ্বিকভাবে গ্রহণ করা গেলে তা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার লড়াইকে আমূল বদলে দেবে।

করোনা মহামারি সরবরাহ চেইনকে ঝুঁকিমুক্ত ও আরো স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের সরবরাহ চেইন উন্নত করার জন্য তিনটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন : বিশ্বস্ত উৎস, স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়সীমা।

‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান’ কর্মসূচি স্থিতিস্থাপকতা এবং নির্ভরযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে। এটি ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

এটি আর্থিক সহায়তা, তারল্য সরবরাহ, শিল্পের জন্য আর্থিক সহায়তা, ব্যবসা করার পদ্ধতি আরো সহজ করা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর নীতি কাঠামোরই একটি অংশ।

একটি উৎপাদনসংক্রান্ত বিশেষ প্রণোদনা স্কিম বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। এটি দেশীয় উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় সক্ষম ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং পারমাণবিক শক্তির মতো এত দিনের নিয়ন্ত্রিত খাতগুলোতে বেসরকারি অংশগ্রহণের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় একুশ শতকের উপযোগী কর্মশক্তি গড়ে তোলা ও ভারতকে বৈশ্বিক শিক্ষা ও দক্ষতা তৈরির কেন্দ্রে পরিণত করার কাঠামো তৈরি হচ্ছে।

ভারত তার অবকাঠামোর উন্নতিতেও বিশাল সরকারি বিনিয়োগ করছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘গতি শক্তি’ কর্মসূচি (মাল্টিমোডাল সংযোগ বিষয়ক জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান) সারা দেশকে সংযুক্ত করবে। এটি সংযোগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি আনার পাশাপাশি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষকে এক ছাতার নিচে আনবে।

ভৌত অবকাঠামোর উন্নতির পাশাপাশি থাকবে ডিজিটাল সংযুক্তি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ইমিউনাইজেশনের মতো উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে এসডিজি লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি ‘জন ধন’ ও আধারের মতো বিশ্বেও বৃহত্তম বায়োমেট্রিক কর্মসূচি সরাসরি সহায়তার অর্থ সরবরাহকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে নিয়েছে। এটি এখন অর্থ-প্রযুক্তিগত বিপ্লবে গতি সঞ্চার করছে। জয় জীবন ও আয়ুষ্মান ভারত সবাইকে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মাধ্যমে জীবনকে বদলে দিচ্ছে।

এসডিজি-৩-এর আওতায় আমাদের ওপর সব বয়সের সবার স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সারা বিশ্বের জন্য ‘এক পৃথিবী, এক স্বাস্থ্য’ বিষয়ে সামগ্রিক রূপকল্প তুলে ধরেন।

করোনাভাইরাস মহামারি আন্তর্জাতিক কর্মপ্রক্রিয়াকে ডিজিটাল পরিসরে নিয়ে গেছে। দক্ষ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টিকাদান কর্মসূচির পোর্টাল কোউইন থেকে শুরু করে ডিজিটাল ভারত উদ্যোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রমাণ করছে ভারত নিজেকে অনেকটাই ডিজিটাল করে নিয়েছে।

জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ভারত অনেক উন্নয়নমূলক সমস্যার জন্য উপযুক্ত সমাধানগুলো তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এ দেশ উন্নয়নের এক প্রমাণস্থল। ভারতের সাউথ-সাউথ উন্নয়ন সহযোগিতার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকে তারা অনেক ধারণা দিয়ে সহায়তা দিতে পারবে। এর আগে জি-৭ সম্মেলনে তিনি বলেন, ভারতের তৈরি ওপেন সোর্স ডিজিটাল সলিউশনগুলো সবাইকে উপকৃত করবে।

করোনা মহামারির অন্ধকারতম দিনগুলোতেও ভারত ভুলে যায়নি যে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ। সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ভারত দেড় শতাধিক দেশে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। এর বিনিময়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে সবার সমর্থনও পেয়েছে ভারত।

নিজ দেশে সফল টিকাকরণ অভিযান চলমান অবস্থায় ভারত তার প্রতিবেশী এবং অংশীদারদের কাছে আবার টিকা রপ্তানি শুরু করেছে। এগুলোসহ আরো অনেক উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে অন্যতম এবং গঠনমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সে হবে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা, যা নিছক অর্থনীতির সীমা ছাড়িয়ে মানুষ ও তার মঙ্গলকেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে দেখবে।

লেখক : ভারতের পররাষ্ট্রসচিব



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

রাজনীতির জোয়ার-ভাটা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

আজ ২৭ নভেম্বর। শহীদ ডা. মিলন দিবস। ১৯৯০ সালের এই দিনটিতে হালকা শীত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বসে অনার্স ফাইনালের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সবকিছু স্বাভাবিক, শান্ত। আচমকা কয়েকটি গুলির শব্দ। কৌতূহলী হয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরোলাম। এরপর আবার কয়েকটি  গুলি। হঠাৎ আতঙ্ক। ইতস্তত ছোটাছুটি। মিনিট কয়েক গোলাগুলির পর শুরু হলো মিছিল। কেউ ঠিকঠাক মতো বলতে পারছে না। ঘটনা টিএসসি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝামাঝি রাস্তাজুড়ে। খানিক পরই ‘ধর ধর’ চিৎকার। তারপর  মিছিল। মুহূর্তেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ল বিক্ষোভ। মিছিল করতে করতেই জানলাম বিএমএর (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) দুই নেতা ডা. মিলন ও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন রিকশায় করে যাচ্ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের সশস্ত্র ক্যাডাররা গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হন ডা. মিলন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। ডা. মিলনের মৃত্যু যেন স্ফুলিঙ্গের মতো আন্দোলন ছড়িয়ে দেয় সারা ঢাকায়, সারা দেশে। এক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, বন্ধ হয় দোকানপাট। অফিস-আদালত থেকে মানুষ বেরিয়ে আসে। প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ঘোষণা করেন। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল রাজধানী। ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’। এই একটি স্লোগান সর্বত্র। এরশাদ কি তখনো জানতেন তার শাসনকালের আয়ু আর মাত্র সাত দিন? ২৬ নভেম্বর এরশাদের একান্ত অনুগত মন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন মুন্সীগঞ্জের এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘দেশে বিরোধী দল বলে কিছু নেই। এরশাদ আরও ১০ বছর ক্ষমতায় থাকবেন’।  ডা. মিলনের মৃত্যু এক লহমায় সবকিছু বদলে দেয়। ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়। ২৭ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অচল ছিল। অনেক নাটক হয়েছে পর্দার আড়ালে। কিন্তু এমন আচমকা আন্দোলনে এরশাদের নয় বছরের সাজানো বাগান ভেঙে যাবে তা কেউই ভাবতে পারেনি। এটাই হলো বাংলাদেশ। এ হলো জোয়ার-ভাটার দেশ। সকালে নদীর ঘাটে যেখানে নৌকা ভেড়াবেন, দুপুরে দেখবেন ভাটার টানে সে নৌকা চলে গেছে বহুদূর। দুপুরে নদীর বিরান বালু সন্ধ্যায় জোয়ারে স্রোতের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী যেমন এ দেশে সকাল-বিকাল রূপ পাল্টায়, এ দেশের মানুষের মনও ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যায়। ষড়ঋতুর এই দেশে কখন যে মানুষ আবেগে কান্না করে আর কখন যে রুদ্ররোষে সবকিছু তছনছ করে কেউ জানে না। অনিশ্চয়তা এবং নাটকীয়তাই এ দেশের রাজনীতির চরিত্র। এর প্রধান কারণ হলো জনগণের আবেগ। এ দেশের জনগণ যেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। যে কোনো সময় ঘটতে পারে বিস্ফোরণ। কখন যে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠবে কেউ জানে না।

এরশাদের পতনের পর সবাই জানত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের আশপাশে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতারা মন্ত্রিত্বের দফতর ভাগ-বাটোয়ারায় মশগুল। কিন্তু ওই নির্বাচনের ফলাফল হলো অন্যরকম। এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগের কজন নেতা ভেবেছিলেন তাঁরা নির্বাচনে হেরে যাবেন? বিএনপি জয়ী হলো ’৯১-এর নির্বাচনে। বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন। তখন কি বেগম জিয়া জানতেন ২০২১ বাংলাদেশে আসবে? তখন কি বেগম জিয়া জানতেন তাঁকে এরশাদের চেয়েও করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাঁর শয্যাপাশে থাকবে না তাঁর পুত্র, পুত্রবধূরা। তিনি কি জানতেন তাঁর দলের নেতারা তাঁর জন্য কিছুই করবেন না। শুধু তামাশা দেখবেন?

এরশাদের পতনের পর বেগম জিয়া সুযোগ পেয়েছিলেন গণতন্ত্র, সুশাসন এগিয়ে নেওয়ার। রক্তাক্ত রাজনীতির কবর রচনার। প্রতিহিংসার রাজনীতি উপড়ে ফেলার। বেগম জিয়া যদি তাঁর ভবিষ্যৎ পরিণতি আঁচ করতেন তাহলে হয়তো তিনি রাজনীতির নতুন যুগের সূচনা করতেন। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতেন। মাগুরা, মিরপুরের উপনির্বাচনে কারচুপি করতেন না।

’৯১-এর নির্বাচনের পর বাংলাদেশে কজন ভেবেছিল শেখ হাসিনা ১৮ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করবেন। ’৯১-এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই বলতে শুনেছি, শেখ হাসিনা থাকলে আওয়ামী লীগ চিরকাল বিরোধী দলেই থাকবে। আজ যাঁরা শেখ হাসিনাকে অজস্র উপাধিতে ভূষিত করেন তাঁরাই সেদিন শেখ হাসিনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ’৯৬-এ  আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার চেহারা সুরত পাল্টে গেল। আওয়ামী লীগের অনেকে এমন আচরণ করলেন যে আর কোনো দিন তাঁরা বিরোধী দলে যাবেন না। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনের ফল হলো উল্টো। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের উত্থান ঘটল। যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে বিএনপি ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে মনোযোগী হলো। জনগণের ভোট নয়, অন্য কৌশলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক আত্মঘাতী খেলায় মেতে উঠল। সে সময় বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে যেসব মন্তব্য করেছিলেন, তা যদি তাঁরা এখন পড়েন তাহলে নিজেরাই লজ্জা পাবেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আসার জন্য ৪২ বছর অপেক্ষা করতে হবে’। বেগম জিয়ার চেয়ে এক কাঠি সরস ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক জিয়া। তৃণমূলের এক কর্মী সমাবেশে তারেক জিয়া বলেছিলেন, ‘অক্টোবর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কবর রচিত হয়েছে। এখন এর জানাজা পড়াতে হবে।’ বিএনপি-জামায়াত সরকারের মন্ত্রীদের মন্তব্য ছিল আরও কুৎসিত, অরুচিকর।

বিএনপি আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য কী না করেছে? প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়িয়ে বিধান সংশোধন করেছে। নিশ্চিত হতে চেয়েছে বিচারপতি কে এম হাসানই যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হন। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার করেছে। নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে আজ্ঞাবহদের দিয়ে। আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। জজ মিয়ার নাটক সাজিয়েছে। সারা দেশে নির্বিচারে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করেছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হবিগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হলেন। হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনলে তাঁর প্রাণটা হয়তো বাঁচত। কিন্তু তাঁকে হেলিকপ্টার দেওয়া হয়নি। বেগম জিয়া যদি জানতেন তাঁর জীবনে এমন দিন আসবে, তাহলে হয়তো সেদিন তিনি এমনটা করতেন না। গাজীপুরের জনপ্রিয় নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টারকে গুলি করা হলো। টঙ্গীতে রাস্তা অবরোধ করে রাখা হলো। মুমূর্ষু রক্তাক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ঢাকায় আনতে বিলম্ব হলো দুই ঘণ্টা। বেগম জিয়া যদি ঘুণাক্ষরেও তাঁর ভবিষ্যৎ জানতেন তাহলে নিশ্চিত তিনি এ রকম অমানবিক কাণ্ড হতে দিতেন না। ক্ষমতা নিশ্চিত করতে বেগম জিয়া মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। কিন্তু সেই মইন উ আহমেদই বেগম জিয়ার গোটা পরিবারকে জেলের ভাত খাওয়ালেন! আওয়ামী লীগ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে বলে ২০০১ সালে বিএনপির যেসব নেতা উল্লাসনৃত্য করেছিলেন তাঁরাই এখন ফেরারি। এমনটাই বাংলাদেশ।

মাঝেমধ্যে মনে হয়- মানুষ যদি তার ভবিষ্যৎ দেখতে পেত তাহলে এ হানাহানি, প্রতিহিংসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ অনেকখানি কমে যেত। মানুষ যদি তার ভবিষ্যৎ জানত তাহলে হয়তো ক্ষমতালিপ্সা, দুর্নীতি, মিথ্যাচার অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু আবার অন্যভাবে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, মানুষের পরিণতি তার কাজেরই ফল। মানুষ যা করে তা-ই তার ভবিষ্যতের পথরেখা তৈরি করে। আজ আপনি যা করবেন আগামীকাল তার ফলই আপনি ভোগ করবেন। কেউ তার কাজের ফলাফল দেখে যায়, কেউ দেখে না।

জিয়া যদি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল না করতেন। খুনি মোশতাকের সঙ্গে হাত না মেলাতেন। নির্মমভাবে তাহেরকে ফাঁসিতে না ঝোলাতেন (অথবা হত্যা না করতেন)। তাহলে আজ হয়তো তিনি এভাবে ইতিহাসে ধিকৃত হতেন না।

এরশাদ যদি তাঁর ওয়াদা রক্ষা করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যেতেন তাহলে এ দেশের ইতিহাস অন্য রকম হতো।

বেগম জিয়া যদি জানতেন এ দেশে তাঁর ও তাঁর পুত্রের বিচার হবে। দুর্নীতির মামলায় তাঁকে জেল খাটতে হবে। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতেও তাঁকে শেখ হাসিনার করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে তাহলে ১০ বছরের ক্ষমতায় তিনি অন্যরকম হতেন। অনেক মানবিক, সহানুভূতিশীল হতেন। যারা ক্ষমতায় গেলে ভবিষ্যতের কথা ভাবে না বেগম জিয়া তাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। তাই সুসময়ে মানুষকে শান্ত থাকতে হয়। ক্ষমতাবান মানুষকে হতে হয় সংযত। কাউকে ছোট করতে হয় না। মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয়। ইতিহাসের পাতায় পাতায় আমরা দেখি যারা উদ্যত হয়েছেন, মানুষকে অসম্মান করেছেন, জনগণকে অবজ্ঞা করেছেন তাঁরা এর পরিণতি ভোগ করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৭২ বছরের পুরনো দল। যুগে যুগে এ দলের নেতা-কর্মীরা নিগৃহীত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। আর সে কারণেই বোধহয় আওয়ামী লীগকেই এ দেশের মানুষ প্রাণভরে দিয়েছে। দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগ। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায়। এ সৌভাগ্য অন্য কোনো রাজনৈতিক দল পায়নি। তাই আওয়ামী লীগকে এ দেশের মানুষ অনেক দায়িত্বশীল, মানবিক ও সংযত দেখতে চায়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি যা করেছে আওয়ামী লীগ তা করবে না, এটাই মানুষ প্রত্যাশা করে। কিন্তু ইদানীং আওয়ামী লীগের কারও কারও কথা এবং কাজ অযাচিত অহমিকায় ভরপুর। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার কথাবার্তা, আচার-আচরণে মনে হয় আওয়ামী লীগের আগে দেশে কেউ ছিল না, আওয়ামী লীগের পরেও কেউ থাকবে না। আওয়ামী লীগ আজন্ম ক্ষমতায় থাকবে এমন অবাস্তব চিন্তার প্রকাশ্য রূপ দেখা যায় আওয়ামী লীগের কারও কারও মধ্যে। আওয়ামী লীগে অনেক রথী-মহারথী তৈরি হয়েছেন ইদানীং। এঁদের বেসামাল কাজ ও কথাবার্তায় বিস্মিত জনগণ। কেউ কেউ যেন গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের কথাই ধরা যাক। সরকারের কেউ কেউ যেন চাইছেন শিক্ষার্থীরা খেপে উঠুক। আন্দোলনে ঝাঁপ দিক। সারা জীবন দেখে এলাম শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে হাফ ভাড়া। এখন কেন এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা অবরোধ করতে হবে? এটা তো সহজেই সমাধান করা যায়। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে আন্দোলন করছেন। দায়িত্বশীলরা তামাশা দেখছেন। ভাবখানা এই- কর দেখি কত দিন আন্দোলন করতে পারিস। জিনিসপত্রের দাম হু-হু করে বাড়ছে। এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই। গণপরিবহনে চলছে নৈরাজ্য, দেখার কেউ নেই। সারা দেশে খুনোখুনি শুরু হয়েছে, বন্ধের আন্তরিক উদ্যোগ নেই। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কিছু নেতা জনগণকে শাসাচ্ছেন।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেশের বেশ কয়েক জায়গায় আধা-পাতি নেতা জনগণকে হুমকি দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, ‘নৌকায় ভোট না দিলে কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই’। যে দলটি জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এত রক্ত দিল, এত আন্দোলন করল সেই দলের সিকি-আধুলি নেতারা এ করম অর্বাচীনের মতো কথা বলেন কীভাবে? আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার আচার-আচরণে মনে হয় ভোট লাগবে না, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা মূল্যহীন। সেদিন এক নেতা বললেন, ‘আওয়ামী লীগকে কেউ ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে না’। ওই নেতার কথার প্রতিফলন দেখা যায় বাস্তবে। আওয়ামী লীগের অনেকেই এখন মনোনয়ন পেতে যত কসরত করেন, ভোট পেতে তা করেন না। দলের মনোনয়ন পেলেই হলো, এমন একটি রোগ আওয়ামী লীগে ভয়াবহভাবে সংক্রমিত হচ্ছে। মনোনয়ন পেয়ে প্রশাসন ম্যানেজ করে বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি হওয়ার ব্যাধিতে আক্রান্ত আওয়ামী লীগ। যে দলের মহান নেতা জনগণকে সম্মান করতেন সবচেয়ে বেশি। যে দলের বর্তমান নেতা জনগণের কল্যাণে সবকিছু উৎসর্গ করেছেন সেই দলের খুচরা-পাতি নেতারা কথায় কথায় জনগণকে পিটিয়ে শায়েস্তা করতে চান।

একটু মিলিয়ে দেখুন ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতারা যে ধারায় আওয়ামী লীগকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন, এখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা সেই একই ভাষায় কথা বলেন। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ জনগণকে পিষে ফেলতেও চান। ভয় দেখান। চোখ রাঙান। সদ্যবহিষ্কৃত গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের এক অডিও শুনলাম। এভাবে জনগণকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতা করতে পারেন, ভাবতে শিউরে উঠি। আওয়ামী লীগের অনেকে গত ১৩ বছরে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছেন। গাড়ি হয়েছে, বাড়ি হয়েছে, বিদেশে টাকার খনিও হয়েছে। এঁরা আওয়ামী লীগের অতীত জানেন না। আওয়ামী লীগের ত্যাগের ইতিহাস জানেন না। গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগের একটি অংশের বিস্ময়কর পরিবর্তন হয়েছে। এঁরা নিজেদের জনগণের সেবক ভাবেন না, জনগণের প্রভু ভাবেন। আওয়ামী লীগে কেউ কেউ মনে করেন তারাই শুধু প্রথম শ্রেণির নাগরিক, বাকিরা ক্রীতদাস। আওয়ামী লীগে কারও কারও ধারণা- ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর মতো বারবার তাঁরা বিপুলভাবে বিজয়ী হতেই থাকবেন। জনগণ বুড়ো আঙুল চুষবে। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এই আওয়ামী লীগাররা জানেন না এ দেশটা জোয়ার-ভাটার। এ দেশের নদ-নদীর মতোই মানুষের মন। এক নিমেষেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। এরশাদ ’৯০-এর নভেম্বরে জানতেন না ডিসেম্বরে তাঁর ভাগ্যে কী ঘটবে। ২০০৬-এর ডিসেম্বরে বেগম জিয়া জানতেন না ২০০৭-এর জানুয়ারিতে তাঁর জন্য দীর্ঘ অন্ধকার টানেল অপেক্ষা করছে। আওয়ামী লীগ কি জানে কাল কী ঘটবে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন