ইনসাইড থট

একাত্তরের ক্ষতচিহ্ন এবং চীনের ক্ষমা চাওয়ার যৌক্তিকতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১:০৮ পিএম, ২৭ অক্টোবর, ২০২১


Thumbnail

একাত্তরের ক্ষতচিহ্ন স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও দগদগে ঘা হয়ে বিরাজ করছে। এবারে ২০২১ সালের দুর্গাপূজার সময় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং তাদের অনুসারীদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের দিকে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আর সেসময় পাকিস্তানী সেনারা চীনের সরবরাহকৃত বুলেট দিয়ে বাঙালিদের হত্যা করেছে। এই পরিস্থিতিতে চীন যখন তার সব ঋতুর বন্ধু পাকিস্তানের উপর ভর করে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করতে চাইছে তখন এ ব্যাপারে দ্বিতীয়বার চিন্তা তথা বাংলাদেশের নিকট চীনের ক্ষমা চাওয়ার যৌক্তিকতা এই লেখায় তুলে ধরা হচ্ছে। 

ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে চীনের নেক্ড়ে-যোদ্ধা কূটনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় তার বন্ধু খুঁজে বেড়াচ্ছে। চীন এক্ষেত্রে তার সব ঋতুর বন্ধু পাকিস্তান, নতুন দোসর নেপাল, ঋণফাঁদে বন্দী শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে সেদেশও চীনের ক্ষমতার অধীনে চলে গিয়েছে। যদিও তালেবান শাসিত বর্তমান আফগানিস্তান সরকারি পর্যায়ে ভারতের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চাইছে। দৃশ্যত বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য চীন উদ্গ্রীব হয়ে আছে। 

উন্নয়ন অংশীদার চীন

সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল হত্যাকারী এবং হত্যার শিকারে পরিণত হওয়া দু’টি রাজনৈতিক সত্ত্বার মধ্যকার মিথ্ষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। হত্যাকারী পাকিস্তান বাহিনী বাঙালিদের চীনা বুলেট দিয়েই হত্যা করেছিল। চীনের বিরোধীতা সত্ত্বেও ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি চীন। বঙ্গবন্ধু চীনের সাথে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চীন তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরেই কেবল চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর এবং ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক পালাবদলের প্রেক্ষপটে বাংলাদেশ সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চীনের সাথে অংশীদারিত্ব শুরু করে। খালেদা জিয়ার ইসলামপন্থী শাসনামলে ভারতীয় প্রভাবমুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে চীনের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করে। যা উভয় দেশের জন্য সম্প্রসারিত কৌশলগত লাভ ছিল। চীন ও পাকিস্তান তখন (১৯৯১-১৯৯৬) বাংলাদেশে সর্বাধিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী ছিল। জতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের জন্য এগুলো প্রয়োজন হয়েছিল। চীন-পাকিস্তান অক্ষ শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেশের রাজনীতি, আমলাতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের গভীরে প্রবেশ করেছিল। 

পরবর্তী বছরগুলোতে, বাংলাদেশে মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসাবে আবির্ভূত হয়। এই সাথে আনন্দে বিগলিত হয়ে কিছু রাজনীতিক কিংকং-এর মত লাফাতে শুরু করে। সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী পরপর চতুর্থবারের মত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন যে চীনের সাথে বহুকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপারে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত তৃতীয় বিশে^র কয়েকটি দেশে ঋণ-ফাঁদে ধরা খাওয়া সম্পর্কে বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর প্রতি বাংলাদেশের নেতাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। যা ঘটেছে তা হলো মেগা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগকৃত বিশাল অঙ্কের টাকা এসব দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঋণের ফাঁদে বন্দী হওয়া সরকারগুলোকে ঋণমুক্ত করার জন্য চীন মেরিটাইম বন্দর এবং অন্যান্য ফ্যাসিলিটিজগুলো ৯৯ বছরের লিজ নিয়েছে। এভাবেই কাহিনীটির পরিসমাপ্তি ঘটে!

বাংলাদেশের গণহত্যায় চীনের সক্রিয় সহযোগিতা

১৯৭১ সালের পাকিস্তানের জল্লাদ সেনাবহিনী ও তাদের ইসলামী মিলিশিয়া যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে গণহত্যা ও ধর্ষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাকিস্তান তখন বাঙালিদের দমনের জন্য সীমাহীন সামরিক সরঞ্জাম এবং রাজনৈতিক মদদ লাভ করেছে। পাকিস্তানী সংবাদ মাধ্যমের মত চীনা গণ মাধ্যমও তখন বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানী বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার ব্যাপারে নীরব থেকেছে। বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানীদের দ্বারা পরিচালিত গণহত্যার জন্য প্রয়োজনীয় গুলি-গোলা ও অস্ত্র সরবরাহের জন্য চীনের উচিৎ দায়িত্ব স্বীকার করে নিয়ে ক্ষমা চাওয়া। গণহত্যার প্রতিটি শিকারের জন্য রাওয়ালপিন্ডির যুদ্ধবাজদের নিকট উপহার হিসাবে ’মেইড ইন চায়না’ লেখা বুলেট সরবরাহ করত চীন। এই বুলেটগুলো স্বাধীন বাংলাদেশ যারা চাইতেন তাদের হত্যার জন্য ব্যবহার করা হতো। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্ব জনমত চীন উপেক্ষা করে চলত। জীবন বাঁচানোর জন্য যে এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের কান্না এবং দুর্বিসহ অবস্থার কথা চীনের কানে তখন পৌঁছায় নাই। বিশে^র অনেক দেশে এক কোটি লোকসংখ্যাও নাই। অপরপক্ষে, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে চীনা-পন্থী বামপন্থী রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মওলানা ভাসানী বাংলাদেশকে সমর্থন করার জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে অনুরোধ করলেও তারা এর কোন উত্তর দেয় নাই। এর পরিবর্তে, চীন অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহ বৃদ্ধি করেছে। স্বাধীনতা লাভের পর চীন সদ্যজাত স্বাধীন বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে হয়রানি করা অব্যাহত রেখেছে। 

স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা সর্বশেষ দেশ চীন

১৯৭২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, গ্রেট ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং আরও অনেক দেশ একটির পর একটি করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সমস্যা শুরু হয় যখন ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য বাংলাদেশ আবেদন করে তখন। বাংলাদেশের যখন আন্তর্জাতিক খাদ্য সাহায্য এবং পুনর্বাসনের জন্য বাজেট প্রয়োজন ছিল তখন চীন স্বতস্ফূর্তভাবে দুইবার জাতিসংঘে বাংলাদেশে সদস্যপদের বিরোধীতা করেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে চীন কর্তৃক বাংলাদেশের আবেদনের বিরোধীতা করার কারণ ভারতের হাতে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী এবং বেসামরিক ব্যক্তিবর্গেও প্রত্যাবর্তণ বাস্তবায়ন না হওয়া। নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানকে ভালো রাখার উদ্দেশ্যেই চীন এই কাজটি করেছে। এশীয় মহীরুহ চীনা তৎপরতায় সামনে টিকে থাকা এবং দেশের কূটনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (এন এ এম), কমনওয়েলথ এবং ইসলামী সম্মেলন সংস্থা(ওআইসি)য় যোগদান করেন। যা বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করে।

ওআইসি সম্মেলনের আগে ইসলামী নেতাদের চাপে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এমনকি পাকিস্তান কর্তৃক স্বীকৃতি দেয়ার পরেও চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নাই। সেসময় বাংলাদেশে সক্রিয় চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো চীনা কমিউনিস্ট পার্টিও আশীর্বাদ লাভ করত। কয়েকটি ভাগে বিভক্ত বামপন্থী দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশকে বাতিল করতে চেয়েছিল, ভারতপন্থী বলে নিন্দা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরোধীতা করেছিল।চীনাপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকত এবং তাদের দলগুলোর নামের আগে ইচ্ছাকৃতভাবে “পূর্ব পাকিস্তান“  “পূর্ব বাংলা“ শব্দবন্ধগুলো ব্যবহার করত। অবাক করার কোন বিষয় নয় যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর চরম বামপন্থী দলগুলো মাটির নীচ থেকে তাদের মাথা উঁচু করে এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মদতে সশস্ত্র যুদ্ধ বাতিল করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর “আমার দেখা নয়াচীন“ এ লিখেছেন যে তিনি দু’বার চীন সফর করেছিলেন। প্রথম ১৯৫২ সালে এবং পরে ১৯৫৭ সালে। তাঁর এই সফরের সময় তিনি মাও জে দং, জৌ এন লাই প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য তাঁর অনুরোধে চীন সম্মত হবে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থন আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক চ্যানেল উন্মুক্ত করেছিলেন। বেইজিংয়ে সেসময় পাকিস্তানের ঝানু কূটনীতিক (১৯৬৯-১৯৭২), পুরাতন ঢাকার নবাব বংশের সদস্য খাজা মোহাম্মদ কায়সারকে তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। 

রাষ্ট্রদূত কায়সারকে চীনা প্রধানমন্ত্রী জৌ এন লাই এই মর্মে অবহিত করেন যে তিনি তাঁর অসুবিধাটা বোঝেন। যা হোক, কায়সার ১৯৮৪ সালে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে বেইজিংয়ে ফিরে আসেন। সাংবাদিক ও কবি ফয়েজ আহমদকেও বঙ্গবন্ধু চীনে পাঠিয়েছিলেন। ১৯৬০এর দিকে রেডিও বেইজিং এর বাংলা সার্ভিসে ফয়েজ যখন কাজ করতেন তখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টিও উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল। ১৯৬৬-১৯৬৯ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর সাথে ফয়েজ-এর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। তখনই চীনা রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ফয়েজএর ঘনিষ্ঠতার কথা বঙ্গবন্ধু জানতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমত ফয়েজ হংকং হয়ে বেইজিং যান এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টিও জ্যেষ্ঠ্য নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি বেইজিং থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসেন। চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মিশনগুলো একের পর এক ব্যর্থ হবার পরেও বঙ্গবন্ধু আশা ছাড়েন নাই। শেষ পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তবে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধু সরকার থাকতে নয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী অভ্যুত্থানের নেতাদের সরকারের শাসনকে চীন স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীন হবার চার বছর এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। খুনি মোশতাকের নেতৃত্বে খুনি সেনা কর্মকর্তারা ৮৪ দিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছে। এসময় তারা চার জাতীয় নেতাকেও কারা অভ্যন্তরে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশের রক্তাক্ত অভ্যুদয়ের সময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গণ-বিরোধী নীতি, পাকিস্তান কর্তৃক গণহত্যা অভিযান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে চীনা বুলেট ও সামরিক সরঞ্জাম যোগান দেয়ার জন্য চীনের উচিৎ ক্ষমা চাওয়া। বঙ্গবন্ধুকে হয়রানি করার জন্যও চীনের ক্ষমা চাওয়া যৌক্তিক। 
 

লেখক: ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও কিছু আত্মজিজ্ঞাসা!

প্রকাশ: ০৮:৩২ এএম, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail

১০ই জানুয়ারি ১৯৭২। বেলা আড়াইটা। আকাশে ঝকঝকে রোদ। কমেট বিমানের চাকা স্পর্শ করল তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে। উপচে পড়া ভিড় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য। তারপর সেখান থেকে সরাসরি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। মঞ্চহীন ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিন স্বাধীন দেশের লাখ লাখ মানুষের সামনে উচ্চারণ করলেন দেশ-মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কথা, অঙ্গীকারের কথা। তখনও মাথার উপর ছিল রোদের ঝলকানি। সেদিন তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন এই বলে - “…তোমরা আমার লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, মা-বোনদের বেইজ্জত করেছ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছ, কোটি লোককে ভিটেছাড়া করে ভারতে যেতে বাধ্য করেছ- তারপরেও মনের মধ্যে তোমাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পুষে রাখতে চাই না। তোমরা স্বাধীন থাকো, আমাদের স্বাধীনভাবে থাকতে দাও। তোমাদের সঙ্গে সব চুকে বুকে গেছে।…“

শুধুমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এই উচ্চারণকে যদি বিশ্লেষণ করা যায় যেখানে জড়িয়ে রয়েছে এদেশের প্রতি তার অগাধ প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ আর ক্ষমা করে দেবার মত মহান সাহসিকতা ও উদারতার বহিঃপ্রকাশ। অথচ এই মহামানব কেই একদিন চলে যেতে হল ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে সিঁড়ির উপর পড়ে থাকল তার রক্তে ভেজা নিস্তার দেহ। কালো ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে একটি লাল সবুজের সোনার বাংলার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিল ঘাতকেরা ভেবেছিল তাকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে তার সেই স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করবে! সেদিন তারা এতোটুকু ভাবেনি হয়তো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার স্বপ্ন কে হত্যা করা যায় না! কখনো সম্ভব নয়!

এই আগস্ট বাঙালিদের কাছে শোকের একটি মাস। আবার অন্যভাবে বলতে গেলে আত্মিক উপলব্ধির একটি মাস। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমরা হারিয়েছি জাতির পিতাকে। আমরা সেই সাথে হারিয়েছি বঙ্গমাতাকে, ছোট্ট রাসেলকে। হারিয়েছি বঙ্গবন্ধুর পুত্র-পুত্রবধূ ও তার নিকট আত্মীয় স্বজনকে। তাই এই মাসটি আমাদের আত্মিক উপলব্ধির একটি মাস। কারণ প্রতি বছর এই মাসটি আসলে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অন্তরাত্মাকে প্রশ্ন করলে সে প্রশ্ন বারেবারে প্রতিধ্বনিত হয়। বাঙালী হিসেবে স্বার্থপরতার কথা, বিশ্বাসঘাতকতার কথা! আমাদের উপলব্ধি করতে শেখায় জাতি হিসেবে আমরা কত অকৃতজ্ঞ! সেদিন জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেও ঘাতকদের মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা হয়নি। তাদের হাত এতোটুকু কাঁপেনি। সেদিন তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ভেবেছিল বাংলাদেশকে হত্যা করবে! তবে তারা ভুলে গিয়েছিল একজন বঙ্গবন্ধুকে হয়তো বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করা যায়, পৃথিবী থেকে সরানো যায় কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দেশপ্রেম, চিন্তা-চেতনা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে কোটি বঙ্গবন্ধুর জন্ম দেয়। যারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে তাদের ভালোবাসা, সংকল্প আর আশা দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় তার দেখানো মতাদর্শে। তাই বঙ্গবন্ধুর কখনো মৃত্যু হয় না, বেঁচে থাকে জন্ম-জন্মান্তর।

পৃথিবীতে এমন নজির খুব একটা নেই বললেই চলে। স্বাধীনতা-পরবর্তী অত্যন্ত অল্প সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছিলেন দেশের পুনর্গঠনে, সার্বিক টেকসই উন্নয়নে - আমরা যদি শুধুমাত্র তার সেই সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনাগুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারি এখনও আমরা দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হব। যার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই হাঁটছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশের কোন মানুষ কখনো আশ্রয়হীন থাকবে না। স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশের যেখানে গ্রামীণ অর্থনীতি হবে সুদৃঢ়। স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রত্যেকটি মানুষ হবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রখর, স্বতন্ত্র এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন তার দেশের প্রত্যেকটি মানুষ খাবার পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে। তার ভাষায় “এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই পথ চলছেন বাংলার মানুষের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। তিনি সেখানে যুক্ত করছেন নতুন মাত্রা।

তবে কথা থেকে যায় আসলে আমরা সবাই কি সত্যিই তার সাফল্যের জয়গান গাইছি সঠিক সুরে? কিংবা সাফল্য গুলোকে ম্রিয়মান করার জন্য অন্য কোনো অশুভ পদক্ষেপ নিচ্ছি কিনা? কারণ এই আগস্ট আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আগেই বলেছি আত্মোপলব্ধি-পরমাত্মার উপলব্ধি এর কথা। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের জাল কিন্তু ঘর থেকেই শুরু হয়েছিল। এ কথা আমাদের মোটেও ভুলে গেলে চলবেনা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সমূলে ধ্বংস করার পাঁয়তারা কিন্তু তার অতি কাছের মানুষেরাই করেছিল যা ইতিহাসের সাক্ষী। যদি প্রশ্ন করা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রধান অর্জন কি? এক কথায় উত্তর মিলবে “স্বাধীন বাংলাদেশ”। যেখানে যুক্ত রয়েছে মানুষের জীবনের গল্প, শহীদের গল্প, ভাষার গল্প, প্রতিটি রক্তকণা গল্প! অথচ আজ স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা খুঁজে পাই বৈপরীত্য! আমরা খুঁজে পাই সেই সকল স্বার্থপরতার আর অকৃতজ্ঞতার হাতছানি। যারা আজও সোনার বাংলা গঠনে জননেত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যকে রুখে দিতে চায়!

ইতিমধ্যে আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষদের আশ্রয়ন প্রকল্পের নির্মাণ ত্রুটির কথা, বারে বারে পদ্মা সেতুর একই পিলারে আঘাত আনার কথা, নামে-বেনামে ভুঁইফোড় সংগঠনের জেগে ওঠার কথা, করোনাকালীন সময়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অসাধু কর্মতৎপরতার কথা সহ অনেক খবর। সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যারা মনেপ্রাণে ধারণ করে তারা কখনোই এ ধরনের সাফল্যকে ম্রিয়মাণ হতে দেবে না। আমরা জানি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন না। দেশকে সোনার বাংলা গঠনকল্পে দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে, দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি সর্বদা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাহলে এই দায়টা কার? জাতি হিসেবে এ লজ্জা কি আমাদের নয়? যে চরম অবহেলা জনিত কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাণপণ প্রচেষ্টা এবং স্বপ্নপূরণের পথে বাধার সৃষ্টি হয় সে গুলোকে যদি সঠিক সময়ে সঠিক পন্থায় পর্যবেক্ষণ এবং চিহ্নিত না করা হয় তাহলে সকল প্রাপ্তি ম্রিয়মান হয়ে যাবে দিনশেষে। আর জাতি হিসেবে এটি হবে আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতার। যে ব্যর্থতাগুলো হয়তো সামনে চরম বিপদ ডেকে আনবে! যার জন্য এখন থেকেই আমাদের সচেষ্ট এবং সদা জাগ্রত থাকতে হবে।

লেখার শেষাংশে মনে করতে চাই মানুষকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু একদিন বলেছিলেন “…মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে।…” তিনি আরও বলেছিলেন “…আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালবাসি, সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশী ভালবাসি।…” আমরা কি সত্যি তার সেই ভালোবাসার মূল্য দিতে পেরেছি কিংবা এখনো পারছি? প্রশ্ন থেকে যায় মনে! আর এই প্রশ্নটির সামনে হয়তো একদিন আমাদের সবাইকে দাঁড়াতেই হবে!


বঙ্গবন্ধু   সোহরাওয়ার্দী উদ্যান  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আপনারাই সপরিবারে জাতির পিতার হত্যাকারী এবং শেখ হাসিনার হত্যাচেষ্টাকারী

প্রকাশ: ০৮:৩০ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বিএনপি এবং বিএনপির বুদ্ধিজীবীরা সাম্প্রতিক সময়ে যে বক্তব্য দিচ্ছে, তাতে মনে হয় তারা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নয়, বরং তারা রাষ্ট্রবিরোধী নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তারা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে, এই বিষয়টিকে তারা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দিবে। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী শাহদীন মালিক কয়েকদিন পূর্বে এক টেলিভশন টকশোতে বলেছেন, অসুস্থ অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে আওয়ামী লীগকে এর জন্য চরম মুল্য দিতে হবে। এই ধরণের বক্তব্য কতটা ভয়ঙ্কর সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিএনপি এবং তার তথাকথিত সুশীলরা আজ মানবতার কথা বলছে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে  মায়াকান্না করছে। অথচ দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার প্রতি সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সর্বোচ্চ আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তাকে মুক্ত করে গুলশানে নিজের বাড়ীতে থাকতে দিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া তার নিজের পছন্দমতো আন্তর্জাতিক মানের অভিজাত হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

পৃথিবীর খুব কম দেশেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি এই ধরণের মানবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। অথচ বিএনপি এবং তার মিত্রদের মুখে এই সম্পর্কে কোন বক্তব্য নেই। শেখ হাসিনার প্রতি তাদের কোন কৃতজ্ঞতাবোধ তো নেই-ই, বরং তারা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বারংবার মিথ্যাচার ও বিষোদ্গার করছে। তারা যে মানবিকতার কথা বলছে, তারা কী ভুলে গেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাই প্রতিপক্ষের প্রতি মানবিকতা দেখিয়েছেন। কিন্তু প্রতিপক্ষরা সেই মানবিকতা কখনও দেখায়নি। বরং তারাই জাতির পিতাকে সপরিবারে তাঁর নিষ্পাপ শিশুসহ হত্যা করেছিল। শেখ হাসিনাকে একুশে আগস্টে হত্যা করতে বিশেষ গ্রেনেড অপারেশন চালিয়েছিল। পৃথিবীর কোন দেশেই রাজনৈতিক কোন পরিবারের উপর এই রকমের নির্মমতা দেখা যায়নি।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জিয়াই বঙ্গবন্ধু হত্যার মাস্টারমাইন্ড। ১৯৭৬ সালে স্বঘোষিত খুনীরাই বিদেশে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এটি স্বীকার করেছিল। জিয়াই খুনীদের সবাইকে বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসে চাকুরী দিয়েছিলো। জিয়াই ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জাতির পিতার হত্যার বিচার রুদ্ধকারী অসভ্য আইন ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স কে বৈধতা দেয়া সহ ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিয়েছিলো। একই ধারাবাহিকতায় তার স্ত্রী খালেদা জিয়া সরাসরি বিভিন্নভাবে খুনিদের পৃষ্টপোষকতা করে আসছিলো। আওয়ামী লীগ সহ এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের দাবি সত্ত্বেও খালেদা জিয়া জাতির পিতার হত্যার বিচার রুদ্ধকারী আইন ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করেনি। খালেদা জিয়া জাতির পিতার এক খুনিকে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতাও বানিয়েছিলো। একুশে আগস্টে শেখ হাসিনার মৃত্যু একেবারে অবধারিত ছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেদিন তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

এতো কিছুর পরও শেখ হাসিনা তাঁর সর্বোচ্চ আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করেছেন। এই রকম মানবিক আচরণ পৃথিবীর  ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। আমি নিশ্চিত, আজ খালেদা জিয়ার মতো শেখ হাসিনার অবস্থা হলে খালেদা জিয়া কোনোভাবেই শেখ হাসিনার প্রতি কোন মানবিক আচরণ করতেন না। একুশে আগস্ট এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে এটি সহজেই বুঝা যায়।

আজ যারা মানবিকতার কথা বলছেন, তারা কী ১৫ আগস্টে সপরিবারে জাতির পিতার হত্যার বিচার চেয়েছিলেন কোনদিন ? তারা কী ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করার কথা বলেছিলেন কখনো ? শেখ হাসিনার চাওয়া ছিল খুব সামান্য - পিতা, মাতা, পরিবারের সবার হত্যার বিচার -যেটা ছিল তাঁর অধিকার। আপনারা তাঁকে সেই অধিকার টুকুও দেননি। এটা শুধু শেখ হাসিনার অধিকার ছিল না, সমগ্র জাতির অধিকার ছিল। জাতিকেও আপনারা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসার পর জাতির পিতার বিচার শুরু হয়েছিল। ২০০১ এর পর খালেদা জিয়ার সরকারের সময় এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হয়। 

অন্যদিকে, জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা সহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার উপর এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার বিচার নিয়ে খালেদা জিয়া কতোই না নাটক করলো। খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে বলা হলো, শেখ হাসিনা নিজেই তাঁর  ভ্যানিটি ব্যাগে এই গ্রেনেড নিয়ে এসেছিলেন হামলা চালানোর জন্য। বিচারের ক্ষেত্রে জজ মিয়া নাটক সাজানো হলো। পরবর্তীকালে বিচারে প্রমানিত হলো, খালেদা সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা এই গ্রেনেড হামলায় যুক্ত ছিল।

শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের উপর এতো নির্মমতা, বর্বরতা  এবং অন্যায় আচণের পরও বঙ্গবন্ধু কন্যা দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে তাঁর সর্বোচ্চ আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে মুক্ত করেছেন। থাকতে দিয়েছেন অভিজাত এলাকায় নিজের বাসভবনে। চিকিৎসা নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি হাসপাতালে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি এরকম মহানুভব মানবিক আচরণ সমকালীন পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়। মানবাধিকার চর্চায় পশ্চিমা বিশ্বের যে সকল দেশ শীর্ষস্থানে, সেই সকল দেশেও এই রকমের মানবিকতার নজির বিরল। 

একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, বিএনপি এবং তাদের তথাকথিত সুশীল ব্যক্তিরা খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে যেভাবে রাজনীতি করছে, তাতে বুঝা যায় আইনের শাসনের প্রতি তাদের কোন সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ নেই। যারা প্রকৃত অর্থে আইনের শাসনে বিশ্বাসী, দণ্ডপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তির পক্ষে বিদেশে চিকিৎসার দাবি  নিয়ে  তারা কখনো রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না । এই ধরণের দাবি সংবিধানের লংঘন। সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী এই ধরণের দাবি আইনের শাসনের পরিপন্থী।

এদেশে উল্লেখযোগ্য সংখক মানুষ কারাগারে রয়েছে। তাদের কয়জনের ভাগ্য হয়েছে সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় দণ্ড স্থগিত করে জেলখানা থেকে মুক্তি লাভ । তাদের সবাই এদেশেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের কেও তো বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার জন্য দাবি করে না। চিকিৎসাধীন অনেক মানুষ এদেশে মৃত্যুবরণ করছে। এছাড়া বিগত দুই বছরে এদেশে উল্লেখযোগ্য মানুষ করোনা মহামারীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক না ? তারা কি মানুষ না ? এদেশের সকল মানুষের কথা না ভেবে শুধুমাত্র নিজেদের নেত্রীর বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে আজ বিএনপি যেভাবে হৈচৈ করছে, সেটি দেশপ্রেমিক কোন রাজনৈতিক দলের আচরণ হতে পারে না। এই আচরণ দেশের প্রতিটি মানুষের মানবিক মর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা, অসম্মান। এই আচরণ এদেশে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের প্রতি চরম অবজ্ঞা। বিএনপির এই আচরণ আইনের শাসনের মূলমন্ত্র সমতার নীতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সাংঘর্ষিক।

আওয়ামী লীগ   বিএনপি  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জনগণকে শান্ত হওয়ার এবং আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করছেন


Thumbnail

ওমিক্রনে কেবল স্পাইক প্রোটিনে 30 টিরও বেশি মিউটেশন রয়েছে, করোনাভাইরাসের অংশ যা এটিকে মানব কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২১)। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজিস্ট দীপ্তি ভট্টাচার্য বলেন, যদিও ভাইরাসের মিউটেশন গুলি সম্পর্কিত, এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ইমিউন সিস্টেম বহুস্তরীয় (multi-layers), এবং ভ্যাকসিন থেকে সুরক্ষা এবং গুরুতর রোগের বিরুদ্ধে পূর্ব সংক্রমণ সম্ভবত এখনও নতুন রূপের বিরুদ্ধে ধরে রাখবে।

তীব্রতা সম্পর্কে, এটি পরিষ্কার নয় যে ওমিক্রন অন্যান্য বৈচিত্র্যের তুলনায় আরও গুরুতর রোগ সৃষ্টি করে কিনা। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাথমিক তথ্য তের মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে যে সংক্রামিত মানুষের সামগ্রিক ক্রমবর্ধমান সংখ্যা প্রতিফলিত হতে পারে, কেবল মাত্র ওমিক্রন ভেরিয়েন্টে সংক্রামিত ব্যক্তিদের নয়।।

এই নতুন ভেরিয়েন্টের আচরণ এখনও স্পষ্ট। কেউ কেউ দাবি করেছেন যে ওমিক্রন সংক্রমণের বৃদ্ধির হার, যা এর রূপান্তরযোগ্যতাপ্রতিফলিত করে, ডেন্টা ভেরিয়েন্টের চেয়ে ও বেশি হতে পারে। এই "বৃদ্ধির হারের সুবিধা" এখনও প্রমাণিত হয়নি তবে এটি সম্পর্কিত।

ওমিক্রন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও যার মধ্যে রয়েছে এটি মৃদু না গুরুতর রোগের কারণ ? বিশ্বের দেশগুলি এর বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে ছুটে এসেছে সীমান্ত বন্ধ এবং ভ্রমণ বিধিনিষেধ যা মহামারীর প্রথম দিকের দিনগুলির কথা স্মরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মঙ্গলবার সতর্ক করে দিয়েছে যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ওমিক্রন স্ট্রেন ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেবে না; এটি জীবন এবং জীবিকার উপর একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়। উপরন্তু, এটি মহামারীর সময় বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য প্রচেষ্টাকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করতে পারে যখন দেশগুলির এপিডেমিওলজিক্যাল এবং সিকোয়েন্সিং ডেটা রিপোর্ট এবং শেয়ার করার প্রয়োজন হয়।

অস্ট্রেলীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় সেনানায়েকে বলেন, "যদি ওমিক্রন আরও সংক্রামক হয়, কিন্তু সব বয়সের গ্রুপে কম গুরুতর (severe) হয়, দুর্বল জনসংখ্যা এবং টিকাদেওয়া জনসংখ্যা, তাহলে এটি অগত্যা খারাপ পরিস্থিতি হবে না। অবশ্যই আবার ঝুঁকি হ'ল যদি এটি বিশ্বজুড়ে টিকাহীন অঞ্চলে ধরে রাখে এবং প্রচুর সংক্রমণ উৎপন্ন করে তারপরে এটি একটি নতুন, আরও বিপজ্জনক রূপের জন্য একটি ঝুঁকি হবে।

বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে, যা গুরুত্বপূর্ণ তা হ'ল বিশ্বের জনসংখ্যার আরও বেশি টিকা দেওয়া। এই মুহুর্তে, দেশে দেশে ভ্যাকসিন অ্যাক্সেসের মধ্যে এখনও একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত ভাইরাসটি কম ভ্যাকসিনের হার যুক্ত জায়গায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হবে, এটি বিকশিত হতে চলেছে। এবং শেষ পর্যন্ত এটি সবাইকে প্রভাবিত করবে।

হয়েল ইন্সটিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের পরিচালক সাদ ওমার বলেছেন, মহামারীর কয়েকটি রুপোনি আস্তরণের মধ্যে একটি হল জিনোমিক এপিডেমিওলজির ব্যাপক সম্প্রসারণ। তার মানে বিজ্ঞানীরা পূর্ব গবেষণা থেকে জানেন যে কোন মিউটেশনগুলি ভাইরাসের কোন বৈশিষ্ট্যগুলি পরিবর্তন করবে। এছাড়াও অনেক ভাল পরীক্ষা এবং নজরদারি, এবং বিশ্বব্যাপী ডেটা শেয়ারিং আছে। এবং ভ্যাকসিন নির্মাতারা প্রস্তুত এবং পিভট করতে সক্ষম। মডার্না ইতিমধ্যে তার বর্তমান ভ্যাকসিন এবং ওমিক্রনের বিরুদ্ধে বুস্টারের নতুন সংস্করণ পরীক্ষা করার পরিকল্পনা ঘোষণা করছে।

ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের একজন বিবর্তনীয় ভাইরোলজিস্ট জেসি বলুমের মতে, আমরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও জানতে পারব যে এই রূপটি আসলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে কি না। তাই তিনি আপাতত শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

একটি চলমান গবেষণায় পাওয়া গেছে (ডাঃ জুলিয়েট পুলিয়াম, প্রধান গবেষক, স্টেলেনবোশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ আফ্রিকান সেন্টার ফর এপিডেমিওলজিক্যাল মডেলিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস) :

We find evidence of increased reinfection risk associated with emergence of the Omicron variant, suggesting evasion of immunity from prior infection. (আমরা #Omicron ভেরিয়েন্টের উত্থানের সাথে সম্পর্কিত বর্ধিত পুনসংক্রমণ ঝুঁকির প্রমাণ পাই, যা পূর্ব সংক্রমণ থেকে অনাক্রম্যতা ফাঁকি দেওয়ার পরামর্শ দেয়)।


এই ফলাফলগুলি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার প্রভাব রয়েছে যা পূর্ববর্তী সংক্রমণ থেকে অনাক্রম্যতার উচ্চ হার এবং ভ্যাকসিন গ্রহণের নিম্ন মাত্রা (টিকাকরণের হার)। আমরা জিতব। বিজ্ঞান কোভিড ১৯ ভাইরাসকে পরাজিত করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ওমিক্রন সম্পর্কে বিশ্বাস করেন: আমরা ভাইরাস নিয়ে আমাদের কাজ শেষ করিনি। এবং ভাইরাসটিও আমাদের সাথে তার কাজ শেষ করেনি। আলফা এবং ডেল্টা ভেরিয়েন্টসম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি স্পষ্ট করে যে তাৎক্ষণিক পরিমাপ দেরিতে প্রতিক্রিয়ার চেয়ে অনেক ভাল। এটা দেখা যেতে পারে যে এটি কোনও বড় হুমকি নয়, তবে তাড়াতাড়ি কাজ না করার পরিণতি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। একই সময়ে, আমাদের সঠিকভাবে স্বীকার করা উচিত যে এই গল্পের প্রকৃত নায়ক, বতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা যারা দ্রুত তথ্য একত্রিত করেছেন, অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন এবং তাদের ফলাফল সম্পর্কে উন্মুক্ত এবং স্বচ্ছ ছিলেন (ASEAN Post, December 03, 202131)

ডাঃ তারেক এম হোসেন, গ্লোবাল পাবলিক হেলথ এক্সপার্ট, প্রাক্তন জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

যুব রাজনীতির আইকন শহীদ শেখ ফজলুল হক মণি

প্রকাশ: ০১:০০ পিএম, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail

শেখ ফজলুল হক মণি বাংলাদেশের মহান ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িয়ে থাকা এক সংগ্রামী মানুষের নাম। তাঁর হাত ধরেই রোপিত হয়েছিল এই দেশে যুব রাজনীতির বীজ। এই প্রজন্মের অনেকের কাছেই তাঁর নামটি আজ অজানা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ইতিহাস থেকে যেভাবে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে, তারই ধারাবাহিকতার শিকার যুব রাজনীতির অহংকার শেখ মণি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যুব সমাজকে কর্মক্ষম সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে যুব সমাজের ওপরই সবচেয়ে ভরসা বেশি ছিলো বঙ্গবন্ধুর। তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণে মণির মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এমন সম্ভাবনাকে, যা সমাজের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং তাদের মুখের ও চোখের ভাষা বুঝতে পারবে। ১৯৭২ সালে ১১ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন শেখ ফজলুল হক মণি। দায়িত্ব গ্রহণ করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের।

যুব সমাজকে সুসংগঠিত করে আদর্শিক নেতৃত্ব প্রদানে বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও বিশ্বাসের পরিপূর্ণ মর্যাদা রাখেন শেখ ফজলুল হক মণি। দক্ষতা, সততা, আন্তরিকতা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি পরিণত হন যুব সমাজের আইকনে, আর তাঁর হাতে গড়া আওয়ামী যুবলীগ পরিণত হয় এদেশের  যুব সমাজের ভালোবাসা ও প্রাণের সংগঠনে।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও অধিকার আন্দোলনের নক্ষত্র, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাঙালি, জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের সৃজনশীল যুবনেতা, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শেখ ফজলুল হক মণি ১৯৩৯ সালের ৪ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহাসিক শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম শেখ নুরুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি। মা শেখ আছিয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর বড় বোন।

ঢাকার নবকুমার ইনিস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার পাশ করেন শেখ ফজলুল হক মণি। ১৯৫৮ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায়। ১৯৬০ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে লাভ করেন বিএ ডিগ্রী। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন প্রতিভাবান এই তরুণ। ষাটের দশকে সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন শেখ ফজলুল হক মণি। ১৯৬০-৬৩ সাাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরূদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় গ্রেফতার হন এবং ৬ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর আবদুল মোনেম খানের কাছ থেকে সনদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে, সমাবর্তন বর্জন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এ কারণে তাঁর ডিগ্রী প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে মামলায় জিতে ডিগ্রী ফেরত পান শেখ ফজুলল হক মণি। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন এবং দেড় বছর কারাভোগ করেন এই সাহসী তরুণ। শেখ মণির জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও অর্জন ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফার পক্ষে হরতাল সফল করা। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। আন্দোলনকে বেগবান ও মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে হরতাল সফলের আর কোনো বিকল্প ছিল না মুক্তিকামী বাঙালির কাছে। তখন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকদের হরতালের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ করেন তরুণ সমাজের এই আইকন। এই হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে নতুন করে জাগরণ ও প্রেরণার সৃষ্টি হয় বাঙালির মনে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা পালনের দায়ে তাঁর বিরূদ্ধে হুলিয়া জারি হয় এবং তিনি গ্রেফতার হন। একই সময়ে নানা অভিযোগে আরো ৮ টি মামলার আসামি করা হয় শেখ ফজলুল হক মণিকে। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের সময় মুক্তি দেয়া হয় তাঁকে।

রাজনীতিতে অত্যন্ত নির্লোভ ছিলেন তিনি। নিজে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের কর্মসূচি প্রণয়নের অন্যতম প্রণেতা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী শেখ মণি সত্তরের নির্বাচনী কর্মসূচিতে পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশকে ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন, ব্যাংক বীমা ও ভারী শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য, পাট ও তুলা ব্যবসা জাতীয়করণ, পূর্ব পাকিস্তানের জায়গিরদারি, জমিদারী ও সর্দারী প্রথার উচ্ছেদ, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ, শ্রমিকদের ভারী শিল্পের শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার ও বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন সাধারণ জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেন। নিষ্পেষিত, অধিকার বঞ্চিত মুক্তিকামী বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু যে দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়েছেন তার ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামে অন্যন্য ভূমিকা রেখেছেন শেখ ফজলুল হক মণি। তিনি ছিলেন মুজিববাহিনীর অধিনায়ক, মুুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। শেখ ফজলুল হক মণি শুধু রাজনীতিতে নয়, তাঁর সুনাম জড়িয়ে আছে এদেশের সাহিত্য জগতে। গণসচেতনতার আলো ছড়িয়েছেন তিনি সাংবাদিকতার মহান পেশাতেও। বহুল প্রচারিত ও পাঠক সমাদৃত দৈনিক বাংলার বাণী, ইংরেজী দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস ও বিনোদন ম্যাগাজিন সিনেমার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শেখ ফজলুল হক মণির লেখা "অবাঞ্ছিতা" উপন্যাস ব্যাপক পাঠক সমাদৃত তৎকালীন সময়ে।
 
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার রাতে ঘাতকদের নিষ্ঠুরতার শিকার হন  স্ত্রীসহ বাঙালির যুব সমাজের আইকন। মহান স্রষ্টার অশেষ কৃপায় প্রাণে বেঁচে যান তাঁর দুই শিশুপুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস। শেখ মণির সুযোগ্য সন্তান শেখ পরশ আজ তাঁর পিতার হাতে গড়া যুব সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান। আরেক ছেলে শেখ তাপস নান্দনিক ঢাকা নগরী গড়ে নতোলার স্বপ্নচারী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।

পিতার মতোই নির্লোভ, সাহসী ও কর্মদক্ষতার সাক্ষর রেখে চলেছেনে শেখ মণির দুই পুত্র। সততার পথে, চেতনার পথে অবিচল থেকে এগিয়ে চলছেন তাঁরা। শেখ পরশ ও শেখ তাপসের মাঝে এদেশের যুব সমাজ খুঁজে পায় তাদের আইকন শেখ ফজলুল হক মণিকে। তিনি বেঁচে থাকুক তারুণ্য, মেধা ও মননে দেশপ্রেমের আইকন হিসেবে যুব সমাজের মণিকোঠায়। বিনম্র শ্রদ্ধা তাঁর স্মৃতির প্রতি।

শেখ মণি   বাংলাদেশ   বঙ্গবন্ধু   ছাত্র আন্দোলন   যুব রাজনীতি  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

নদী, নৌকা, নারী ও বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail

‘ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে

বলো কোথায় তোমার দেশ, তোমার নেই কি চলার শেষ...’

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এই গানটি বাংলা সঙ্গীতের এক ধ্রুপদী সৃষ্টি। নদীর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অতি নিবিড়। এদেশের মানুষের জীবন-যাপন প্রণালী, অর্থনীতি-সংস্কৃতির উন্নয়ন আবার ক্ষেত্র বিশেষে ধ্বংস, সবকিছুর সাথে রয়েছে নদী। আলোচ্য প্রবন্ধে শিরোনাম দেখে অনেকে চমকিত হতে পারেন যে, নদী, নৌকা, নারীর সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক কোথায় বা এদের মধ্যে অ্যালাইনমেন্ট হলো কী করে?

নদী, নৌকা ও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের একটি সিম্বল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ মানেই হলো নদীর দেশ, যাকে এক কথায় বলা হয় নদীমাতৃক দেশ (riverine country) । সমাস বিশ্লেষণে বলা হয় ‘নদী মাতা যাহার’ অর্থাৎ বাংলাদেশে নদীকে মায়ের মত দেখা হয়, মান্য করা হয়, শ্রদ্ধা পোষণ করা হয়। একটা সময়ে বাংলাদেশে বার’শ-র অধিক নদী ছিল, কমে কমে এখন তা ২০০ এর অধিক দাঁড়িয়েছে যার মধ্যে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী, যার ৫২টির উপর ভারত বাধ নির্মাণ করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বাইগর নদীর তীরবর্তী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়াশোনা ও রাজনীতি উপলক্ষে গোপালগঞ্জ থেকে মাদারীপুর, ফরিদপুর, খুলনা-বরিশাল-নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চাঁদপুর রাজশাহী-সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ গিয়েছেন। রাজনীতির প্রচারে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সারা পূর্ব বাংলা চষে বেরিয়েছেন। তাঁর ওই ভ্রমণ পথের বড় অংশ ছিল নদী পথ। মধুমতি, আড়িয়াল খাঁ, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কীর্তণখোলা-তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, ইছামতি, কালি গঙ্গা, তিস্তা, ছোট যমুনা, বড়াল, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ অসংখ্য নদী পথে তিনি দিনের পর দিন লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা, মহাজনী নৌকা, এক মালাইয়া নৌকা, ছোট কোষায় দিনের পর দিন পার করেছেন। ছোট ডিঙিতে সাদা চাদর বিছিয়ে রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করেছেন। কখনো একা একা একমালাইয়া নৌকার সামনের দিকে বসে মুখে এডিনমোরের তামাক দিয়ে বানানো সিগারেটে টান দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে তাঁর জীবন কথা ভেবেছেন, আবার কখনো নৌকায় বসে আব্বাস উদ্দিনের গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন, আব্বাস উদ্দিনের সংগীত মূল্যায়ন করেছেন নিম্নরুপে-‘নদীতে বসে আব্বাস উদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তার নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গান গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তার গান শুনছে।’

নদীবক্ষে ডাকাতের কবলে পড়লে ডাকাতরা তাঁর নাম শুনে সালাম দিয়ে চলে গেছে। আবার এমন হয়েছে তিনি গোপালগঞ্জ থেকে স্টিমার ঢাকা আসছেন পরিবারের সাথে দেখা করতে, চাঁদপুরে পাশ দিয়ে অন্য স্টিমারে করে বেগম মুজিব গোপালগঞ্জ ছুটে গেছেন, দুটি স্টিমার ক্রস করেছেন কিন্তু নিজেরা তা জানেননি। তাই বাংলাদেশের নদী সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ভালো করে চেনেন ও জানেন। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি দেখলেন পঞ্চাশ ও ষাট দশকের নদী আর নেই, গত ২০/২৫ বছরে নদীগুলো যেন শীর্ষ হয়ে যাচ্ছে। ১৯৭২ সালে দেশের দায়িত্ব নিয়ে সাতটি ড্রেজার সংগ্রহ করে শুরু করেন নদীর সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ যা আজও বহাল রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর সাথে নদীর নিবিড় সর্ম্পক নির্ণয় করে কবি ও লেখক অন্নদাশংকর রায় (১৯০৪-২০০২) যে কবিতা লিখেছেন তা আাজও অমর হয়ে আছে-

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা

গৌরী মেঘনা বহমান

ততকাল রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।...’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে শ্লোগানটি এ দেশের সকল স্তরের মানুষকে এক করে দিয়েছিল তাও নদীকেন্দ্রিক। সে সময় সকল মানুষের মুখে ছিল একই কথা-‘ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। অর্থাৎ যেভাবেই বলি না কেন, নদীর সাথে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

আমেরিকা প্রবাসী লেখক আদনান জিল্লুর মোর্শেদ তার  Bangabandhu and the Bengal Delta প্রবন্ধে নদীর সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক বিশেলষণ করে লিখেছেন-, ‘ Once Bangabandhu recalled his experience of a boat odyssey on the Madhumati river: "the people of this riverine country would never find it difficult to fall asleep on a boat." This simple but profound statement encapsulates his perception of an organic, harmonious bonding of Bengal's people with its riverine character, an existential philosophy that would slowly but steadily lay the foundation of his political philosophy of justice, coexistence, and sacrifice’s (Bangabandhu and the Bengal Delta, Adnan Zillur Morshed, The Daily Star, Mar 20, 2020) 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নদী প্রীতি নিয়ে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন দারুন এক ছড়া লিখেছেন। ছড়াটি নিম্নরুপ-

‘ কান পেতে শোনো এই বাংলার মাটি বায়ু নদী সরোবর

জপিতেছে নাম করিয়া প্রণাম মুজিবর আহা মুজিবর।’

নৌকা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাহন নৌকাকে তিনি নির্বাচনী প্রতীকরূপে গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়। নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে নৌকাকে বেছে নেয়ার কারণ হলো জনমানুষের পালস্ তিনি বুঝতেন। সে সময় বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ছিল খুব সাদাসিধে এবং অনাড়ম্বর। অর্থনীতি ও যাতায়াতের প্রধান মাধ্য- বাহক ছিল নৌকা। পেশাজীবীরা নৌকাকে তাই ভক্তি শ্রদ্ধা করে; এসব দিক বিবেচনায় নিয়েই তিনি নৌকাকে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক করেন। এর ফল পাওয়া যায় ১৯৫৪ এবং ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ১৯৭০ এর নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট প্রদান করে। তারা প্রার্থীকে চিনেন নি, অনেকে তাদের নামও জানতেন না। তারা ভোট দিয়েছেন ‘শেখের বেটা’কে কেউ ‘বঙ্গবন্ধুকে’, আর সকলের প্রতীক হল নৌকা। এসময় প্রার্থীর চেয়ে প্রতীক বড় হয়ে যায়। নৌকার কাণ্ডারী বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালে উত্তাল আন্দোলন সৃষ্টি করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে পদত্যাগ হতে বাধ্য করেন, যার মাল্লা ছিল এদেশের আপামর জনগণ। তাই নৌকা থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্ন করার কোন সুযোগ নেই। একবিংশ শতাব্দীর শেষে এসেও এ স্রোতধারা বহমান।

প্রবন্ধের তৃতীয় প্রত্যয় নারী অংশটি চট করে দৃষ্টিকটু বা অন্যরকম মনে হতে পারে; কিন্তু আলোচনার গভীরে প্রবেশ করলে শিরোনামের মর্মার্থ বোঝা যাবে আশা করি। প্রতিজন মানুষ গঠনের পেছনে কারো না কারো অবদান থাকে। কোন মহাপুরুষের জীবনী কাউকে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি আছেন কোন মানুষ যেমন পিতা-মাতা, শিক্ষা বা ধর্ম গুরু বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যারা জীবন গড়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুর জীবন গড়ায়, জীবনে চলায় এবং দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে তিনজন নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এরা হলেন তাঁর মা মোসাম্মৎ সাহেরা খাতুন, স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেনু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রাথমিক ভিত গড়ে দিয়েছেন তাঁর উদারনৈতিক পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা মোসাম্মৎ সায়েরা খাতুন। মোছাম্মৎ সাহেরা খাতুন ছিলেন সন্তান অন্তঃপ্রাণ একজন মহীয়সী নারী। তিনি স্বামী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজনকে আগলে রেখেছেন। আমৃত্যু তাঁর নয়নের মনি খোকাকে তিনি প্রাণাধিক ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। তিনি খোকার বৈশিষ্ট্য ও মনের কথা জানতেন, তাই স্কুল থেকে ফেরার পথে কাউকে গায়ের চাদর কিংবা ছাতা দান করলেও তিনি এজন্য খোকাকে বকা দেন নি, পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছেন। খোকা তার বন্ধুদের বাসায় নিয়ে আসতে পারে ভেবে তিনি বাড়তি ভাত-তরকারি রান্না করে রাখতেন, গরুর দুধ জাল দিয়ে রাখতেন, আত্মীয়-স্বজনকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, অকাতরে দান করতেন গরিব-দুঃখীদের। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছার পিতা-মাতা শিশুকালে মারা গেলে তিনি তাকে মাতৃস্নেহে পরম মমতায় বড় করেছেন, বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সাথীরূপে তৈরি করেছিলেন। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এ সকল মানবিক গুণাবলি বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনে প্রয়োগ করেছেন। আলোচিত নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছার সাথে ১৯৩৮ সালে মুজিবের যখন বিয়ে হয় বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন ১৮ আর রেনুর বয়স মাত্র ০৮ বছর। আরো পরে তারা সংসার শুরু করেন এবং ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট একত্রে শাহাদাত বরণ করেন।

বেগম মুজিব ছিলেন মায়াবী ধরনের একজন মহীয়সী নারী। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বরং উৎসাহ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতায় পড়াশোনা ও রাজনীতি করতেন তার জমানো টাকা তুলে দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। তিনি গোপালগঞ্জে থাকা অবস্থায় তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সেবা করতেন। ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর ঢাকায় তারা সংসার শুরু করলেও তা রাজনৈতিক কারণে নিরবিচ্ছিন্ন হয়নি। স্বল্প দাম্পত্য জীবনের প্রায় ১১ বছর বঙ্গবন্ধু কারাগারে কাটিয়েছেন। এ সময় পাকিস্তানী শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাঁচটি সন্তান নিয়ে সংসার চালানো, তাদের লেখাপড়া করানো, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা, কারাগারে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করেছেন। এ সময় তিনি পার্টি ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।


বঙ্গবন্ধুর প্রতি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা দুরূহ। তবুও প্রধান অবদানসমূহ হল-

১. বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্তভাবে রাজনীতি করতে দেয়া ও অনুপ্রাণিত করা;

২. সব সময় নিজ তহবিলের জমানো অর্থ বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করা;

৩. বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সংসারের হাল ধরা, সন্তানদের পড়ালেখা করিয়ে মানুষ করা;

৪. বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে খাদ্য, ঔষধ ও নানা প্রকার বই সরবরাহ করা; 

৫. পার্টির গোপন খবর বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দেয়া ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পার্টিকে হস্তান্তর করা;

৬. কারাগারের অলস সময় কাজে লাগিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লিখতে বঙ্গবন্ধুকে উৎসাহিত করা। ‘বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী’ বলে বঙ্গবন্ধুকে এ কাজে খাতা কলম সরবরাহ করা;

৭. ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময় প্যারোলে মুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেয়ার ব্যাপারে চিরকুট পাঠিয়ে নিষেধ করা। ফলে বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি পেয়ে ওই বৈঠকে যোগদান করেন।

৮. ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বে বঙ্গবন্ধুকে সঠিক নির্দেশনা দেয়া- ‘কারো কথা শুনবা না, দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলবা না, তোমার মনে যা আসে তাই বলবা।’ বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ এ অলিখিত যে কাব্যিক ভাষণ দেন তা আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম ইউনেস্কো যাকে the Memory of the World International Register, a list of world's important documentary heritage ঘোষণা করেছে। 

৯. নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের সময় অসহনীয় মানসিক যাতনা সহ্য করে সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে বেঁচে থাকা, বঙ্গবন্ধুর রক্ত ধারাকে রক্ষা করা;

১০. স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ একজন সাধারণ ও চিরন্তন বাঙালি নারী, স্ত্রী, মা হয়ে সংসার সামলে স্বামীকে সুখী করার চিরন্তন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা এবং ‘জীবনে মরণে দোঁহে’ মন্ত্র নিয়ে তাঁর সাথে পরপারে গমন করা ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনঘনিষ্ঠ তৃতীয় নারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দুজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে ভারত দ্রুত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করে। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনীতিক সমর্থন আদায়- সব কিছুতেই ছিল ইন্দিরা গান্ধীর অসামান্য অবদান। বহির্বিশ্বে মুজিব-ইন্দিরা ভাই-বোন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা দুটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তাদের সম্পর্ক‚কূটনৈতিক সীমারেখা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে পৌঁছে ছিল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছেন বলেই বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসে স্বাধীন হয়েছে এবং স্বাধীনতা লাভের এক মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলায় পা রেখেছেন। 

বঙ্গবন্ধু একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। তিনি ভালোবাসতেন প্রকৃতি-নদী-বাংলার শস্য শ্যামলরূপ আর সরল জনগণকে। তার বিয়োগান্তক মৃত্যু হলেও তিনি ভাগ্যবান এই অর্থে যে, তিনি অনেক মহান ব্যক্তির স্নেহ-সান্নিধ্য ভালোবাসা পেয়েছেন, তাদের কাছ থেকে অর্জিত মানবিক গুণাবলি তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বানিয়েছে। কাজেই আবহ বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ নদী ও নৌকার সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আর পুরুষের জীবনে নারীর অবদান নিয়ে শ্রেষ্ঠ মন্তব্য করেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম যা দিয়ে এ লেখা শেষ করবো। তিনি লিখেছেন-

‘ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

কাজেই নদী, নৌকা, নারী ও বঙ্গবন্ধু চারটি প্রত্যয়ের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আমাদের সর্বদা অনুপ্রাণিত করে, যা করবে অনন্তকাল। গাজী আজিজুর রহমান তাঁর ‘ বঙ্গবন্ধু’র ভ্রমণ পদচিহ্ন’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করে লিখেছেন-, ‘তিনি ছিলেন বাঙালির চলার নদী, নৌকা, ওড়ার আকাশ, ধাবমান মেঘ, বলাকা বসিধ। বাঙালির চলা, চঞ্চলতা, গতিশীলতা, গতিশক্তি ও গতায়তির নাম শেখ মুজিবর রহমান।’


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন