ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ৫ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

স্মৃতির পাতায় অমলিন কবি শামসুর রাহমান

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার, ১২:৪৭ পিএম
স্মৃতির পাতায় অমলিন কবি শামসুর রাহমান

‘বৃক্ষের নিকটে গিয়ে বলি, দয়াবান বৃক্ষ তুমি একটি কবিতা দিতে পারো’- তিনি এমন কবিতা চেয়েছেন বৃক্ষের কাছে, জরাজীর্ণ দেয়াল এবং কোনো এক নাম না জানা বৃদ্ধের সম্মুখে, তাঁরই ‘একটি কবিতার জন্য’ কবিতায়। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান। এই কবিতাই তাকে অনেককিছু দিয়েছে। খ্যাতি, সম্মান আর ভালোবাসায় আজও বার বার সিক্ত হন এই কবিতার রাজপুত্র। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় তাঁরই কলমে উঠে এসেছে অসংখ্য কালজয়ী কবিতা।

তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি যতোটা বড়, লেখার ব্যাপ্তিও ততো বেশি। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর জন্মানো এই কবি ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ, জীবদ্দশায় এই তিন শাসনকালই দেখেছেন। ব্রিটিশ আর পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন এই কবি। সেই শাসন শেষে পাওয়া নিজের দেশমাতৃকার অনিয়মের বিরুদ্ধেও লিখে গেছেন শামসুর রাহমান।

শামসুর রাহমান আমৃত্যু কাব্য সাধনায় নিবেদিত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের কবিতাঙ্গনে দীর্ঘকাল প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০০৭ সালে মারা যাওয়ার পরও বাংলা কবিতাঙ্গনে তাঁর প্রভাব কমেনি। বরং যতই তাঁর কবিতা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, পর্যালোচনা হচ্ছে ততই তাঁর কবিত্ব শক্তির গভীরতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।

সমাজ তাকে ‘নাগরিক কবি’ অভিহিত করলেও তিনি মূলত জীবনবাদী লেখক। তাঁর লেখায় ছিল চিন্তার অপার স্বাধীনতা। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে পছন্দ করতেন। আর এজন্য প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ভয়-ভীতিও তাকে কখনো পিছু হটাতে পারেনি। তাই তিনি পেয়েছেন অকুতোভয় উপাধি। যা তাকে আমাদের অনুপ্রেরণার পাত্রে পরিণত করেছে।

শামসুর রাহমান লেখায় অনেক বিষয় উঠে এসেছে। তবে শহরে বেড়ে ওঠার কারণে সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে আমাদের নগরজীবন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। সেই সময়ে তাঁর লেখায় ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, সমকালীন রাজনীতি সবই উঠে আসতো। আমরা সাধারণ জনগণ শামসুর রাহমানের নাম শুনলেই তাঁর কিছু অতি পরিচিত কবিতার কথা চোখের সামনে ফুটে ওঠে। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’, ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা দুটো আজীবন অমর থাকার মতো কবিতা। অবাক করার মতো বিষয় হলো তিনি একসঙ্গে বসেই এ দুটি কবিতা লিখেছেন। একসঙ্গে একই বিষয় নিয়ে দুটো কবিতা লেখা, আর সেগুলো তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার নজির বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে খুব কমই আছে।

কবি হিসেবেই শামসুর রাহমান বেশি সফল। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনাকে সম্প্রসারিত করতে তিনি যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। পেশায় সাংবাদিক থাকায় সারাদেশের সমকালীন জীবন সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল যা তাঁর লেখাতেও ফুটে উঠেছে।

মাত্র আঠারো বছর বয়সে তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু। তখন পাকিস্তানের শাসনে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের শাসনের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্ত করতে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় সেই গণ-অভ্যুত্থানে মৃত্যুবরণ করেন আসাদ। তাকে স্মরণ করে শামসুর রাহমান লেখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি।

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের

জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট

উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়

একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগুলো ধারাবাহিকথাবেই তাঁর কবিতায় এসেছে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনি লিখেছেন, গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে লিখেছেন, শোষক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, আর মুক্তিযুদ্ধ তো আছেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কবিতার উপজীব্য হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধিতায়ও তিনি থেমে থাকেননি। ইতিহাসের পাশাপাশি মিল্পের কদর করতেও তিনি ভোলেননি। আবার রাজনীতির পীড়নে অনাহারী মানুষগুলোকেও তিনি লেখায় এনেছেন। শামসুর রাহমানের কবিতায় সুখ-দুঃখের অনুভূতি ছিল, দুঃখবোধও ছিল।

তিনি অসংখ্য নন্দিত কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘কখনো আমার মাকে’, ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দি শিবির থেকে’, ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘কবিতার সঙ্গে গেরস্তালি’, ‘মাতাল ঋত্বিক’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ প্রভৃতি। আর ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতাটির কথা আলাদাভাবে তো বলতেই হয়। কান নিয়েছে চিলে কবিতাটি শোনেননি, এমন লোক খুব কমই আছে।

স্বীকৃতি সম্মাননাও পেয়েছেন অনেক। আদমজী পুরস্কার (১৯৬৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৭৭)সহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন এ কালজয়ী কবি। তাঁর ৯০তম জন্মদিনে তাকে আমরা বিনম্র শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তাঁর লেখার প্রতিটি কথা আজও মনে ধ্বনিত হতে থাকে। তিনি যেমন ‘তিনি এসেছেন ফিরে’ কবিতায় লিখেছিলেন ‘এখন তো তিনি নেই, তবু সেই ধ্বনি আজ শুধু তাঁরই কথা বলে।’

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ