ঢাকা, শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

জাহাঙ্গীরের পাল্লা ভারী, হাল ছাড়েনি হাসান

শতাব্দী আলম
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৮ শনিবার, ০৩:২৭ পিএম
জাহাঙ্গীরের পাল্লা ভারী, হাল ছাড়েনি হাসান

নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে গাজীপুর সিটিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ প্রচার প্রচারণা চলছে। সবারই প্রত্যাশা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। আর মাত্র কয়েকদিন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মানুষের মুখে মুখে জয়-পরাজয় নিয়ে মতামত প্রকাশ পাচ্ছে। কথায় বলে মানুষের মুখেই জয়। ভোটারের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে জাহাঙ্গীরের পাল্লা ভারী। তবে হাসান সরকার হাল ছেড়ে দেননি। এটা নির্বাচনের সৌন্দর্য। একপক্ষ বিজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ছুটে বেড়াবে। আর পিছিয়ে থেকেও প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে। শুধুমাত্র গুটিকয়েক ভোটারের আলোচনা বিবেচনা দিয়ে পাল্লা ভারী মন্তব্য করছি না। কিছু পরিসংখ্যান এবং মাঠ পর্যালোচনাও এর স্বপক্ষে কথা বলে। 

গাজীপুর সিটি নির্বাচন জমে উঠেছে। তবে অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম যোজন যোজন এগিয়ে। বয়সে তরুণ হলেও জাহাঙ্গীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে নির্বাচনী মাঠ দক্ষতার সাথে সামলে নৌকার আয়ত্বে নিয়েছেন। আর বক্তৃতা বিবৃতিতে তিনি বরাবরই জাত রাজনীতিক। মহানগরীকে নিয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ইতমধ্যেই সাধারণ ভোটাররা গ্রহণ করেছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত তদারকিতে আওয়ামী লীগ যেকোনো সময়ের চাইতে ঐক্যবদ্ধ। বিএনপি প্রার্থী যতই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে গলা ফাটান না কেন। তার অতীত ডিগবাজি মার্কা রাজনীতি আর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে ভোটাররা কমই আগ্রহ দেখাচ্ছে। সবশেষ ঈদুল ফিতরের দিন হাসান সরকার টঙ্গী ভরানে বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী নুর মোহাম্মদের জানাজা নামাজে দুই ব্যক্তির কাঁধে ভর করে শরিক হন। আর বক্তব্যে নিজেও স্বীকার করেন অসুস্থতার কারনে গত সপ্তাহেই ডাঃ নাজিম আহমেদের স্ত্রীর জানাজায় শরিক হতে পারেননি। জড়াগ্রস্থ প্রার্থী হাসান সরকার বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে দিশেহারা বিএনপির প্রতীকিরুপ। যে রাজনীতি কেবল লিখিত বক্তব্য, লন্ডন-বাংলা স্কাইপি আর গোল টেবিলে সীমাবদ্ধ। আরও একটি জায়গায় গাজীপুর সিটির দুই মেয়র প্রার্থী হাসান-জাহাঙ্গীর আর আওয়ামী লীগ-বিএনপি পরম্পরা ধারন করছেন। হাসান সরকারের ভাই নুরুল ইসলাম সরকার হত্যা মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে ফাঁসি কাষ্ঠে আছেন। আর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় কারারুদ্ধ এবং ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দূর্নীতির দন্ড মাথায় দেশান্তরী। রাজধানীর অতি সন্নিকটে গাজীপুর সিটির ভোটারদের এসব বিষয় ভাল করেই জানা আছে। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে থাকা শেখ হাসিনা বিশ্ব মানবতার জননী হিসাবে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। শেখ হাসিনার তত্বাবধানে তরুণ জাহাঙ্গীর একজন দানবীর এবং জনদরদী হিসাবে গাজীপুরে সুপরিচিত। তাই এটা বলা অতুক্তি হবে না দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দলীয় তুলনাতে জাহাঙ্গীরই যোগ্য প্রার্থী। জাহাঙ্গীরই অধিক জনপ্রিয় এবং ভোটারের প্রথম পছন্দ।  

ভোটের পরিসংখ্যানেও জাহাঙ্গীরের পাল্লা ভারী। তাছাড়া যদি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করি সেখানেও জাহাঙ্গীর এগিয়ে। হাসান উদ্দিন সরকার কখনোই সরাসরি ভোটে জিতেননি। তিনি সাংসদ প্রার্থী হিসাবে সাম্প্রতিক ৩টি জাতীয় নির্বাচন ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তৃতীয় হয়েছেন। ২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জাহাঙ্গীর বিপুল ভোটের ব্যবধানে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

আগামী ২৬ জুন নির্বাচনে প্রায় সারে ১১ লাখ ভোটার। বাসিন্দা প্রায় ৩৫ লাখ। কি এদের পরিচয় ? অথবা গাজীপুর সিটিতে কোন শিবিরের কি পরিমাণ ভোট এটাও হিসাব করা যেতে পারে। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি কাষ্টিং ভোটের শতকরা ৩০ থেকে ৩৩ ভাগ ভোট পেয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি ৪০ ভাগ ভোট পায়। তবে ২০০৮ সালে ভোট কমে ৩৩ ভাগ হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট ১৯৯১ সালের ৩০ ভাগ থেকে বেড়ে ২০০৮ সালে ৪৯ ভাগ হয়েছে। সারাদেশের প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভোট বাড়েনি। আবার শরিকদল জামায়াত ১৯৯১ সালে প্রায় সারে ৭ ভাগ ভোট পেয়েছে। সেখানে ২০০৮ সালে পেয়েছে সারে ৪ ভাগ। পক্ষান্তরে মহাজোট সরিক জাতীয় পার্টির ভোট খুব বেশী হেরফের হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে পপুলার ভোট আওয়ামী লীগ দিন দিন বাড়িয়েছে। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের শক্তঘাটি এ কথা সর্বজনবিদীত। তারপরও প্রশ্ন আসতে পারে ২০১৩ সালের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থি কেন পরাজিত হলো। জাতীয় নির্বাচনের পর পর হওয়ায় ভাসমান ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে তখন আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী বিরুপ মনোভাব ছিল। তাছাড়া শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত প্রার্থীতা নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত হীনতাও পরজিত হবার কারন। ইসলামী মনোভাবাপন্ন সকল দলই আওয়ামী বিরোধী শিবিরে কাজ করেছে। এবারের চিত্র একদমই আলাদা। আওয়ামী লীগের রির্জাভ ভোটতো আছেই। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ শতভাগ রির্জাব ভোটই কাষ্টিং করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সাথে যোগ হয়েছে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে ইসলামী মনোভাবাপন্ন একটি শক্তিশালী অংশ। রমজান উপলক্ষে শতাধিক ইফতার মাহফিল করেছে আওয়ামী লীগ। সেখানে প্রতিটি মসজিদ ও মাদ্রাসার ইমাম প্রকাশ্যেই জাহাঙ্গীরের প্রতি সন্তুষ্টি ও সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ইমাম সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের দল, গাজীপুরে অবস্থিত অন্য জেলার বিভিন্ন সমিতি যেমন- ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা সমিতির সব সদস্যই প্রকাশ্যে নৌকাকে সমর্থন দিয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারী সেবা সংস্থা (ব্র্যাক, প্রশিকা, আশা) ও জাহাঙ্গীরের সমর্থক। জাতীয় পার্টি ও মহাজোট শরিকরাও ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছে। জাহাঙ্গীরের শক্তির যায়গাই হচ্ছে তরুণ ভোটার। সাথে আছে সোয়া লাখ নতুন ভোটার। এখন নৌকার ৬ লাখ ব্যাচ গাজীপুরের মানুষের গলায় ঝুলছে। এরা সবাই নৌকার সৈনিক। মোট ভোটের অর্ধেকই নারী ভোটার। তরুণ এবং বাস্তবমুখি জাহাঙ্গীর নারীদের খুব সহজেই আকর্ষণ করতে পারে। তাদের সাথে কথা বলে বুঝা গেছে ভোটের বেলায় তরুণ এবং নারীদের অধিকাংশ ভোটই জাহাঙ্গীরের বাক্সে যাবে। সমাজের মাইনরিটি বা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের দাবি মহানগরীতে তাদের সোয়া লাখ ভোট। এর শতভাগই নৌকার সমর্থক। জোয়ার যেদিকে ভাসমান ভোট সেদিকেই থাকে। গাজীপুর সিটিতে ভাসমান ভোটার মানে হচ্ছে কারখানার শ্রমিক এবং চাকুরী ও ব্যবসা সূত্রে বসবাসরত জনগোষ্ঠি। এসব ভোটার অনেক কিছু বিবেচনা করে ভোট দেয়। প্রার্থীর শক্তি সামর্থ, সরকার ঘেষা, বিত্ত-বৈভব এবং সহজে কাছে পাওয়া এসব হিসাব নিকাশ থাকে। জাহাঙ্গীর প্রতিটি ক্ষেত্রেই হাসানের চাইতে ভাল। আবার কর্মস্থলের মালিক পক্ষের নির্দেশেও এই সব শ্রমিকরা প্রভাবিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ দলমত নির্বিশেষে জাহাঙ্গীরকে সমর্থন দিয়েছে। প্রতিটি কারখানায় মালিক পক্ষ শ্রমিকদের নৌকায় ভোট দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রিয় পাঠক সর্বশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রতিদিনই বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী জাহাঙ্গীরের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন। সকল শ্রেনীর মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে জাহাঙ্গীর আলম এবং নৌকা মার্কা। এত কিছু বিচার বিশ্লেষণে এনে বলার সাহস করেছি জাহাঙ্গীরের পাল্লা ভারী।

প্রিয় নগরবাসী ভোট আপনার পবিত্র আমানত। সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন হয়ত। যে কারনে বাতাসে কানাঘুষা। জাহাঙ্গীরই মেয়র হচ্ছেন। যা কিছু রটে তার কিছু ঘটেও। মহানগরীর ৫৭ টি ওয়ার্ড ঘুরে এমনই মনে হয়েছে। জাহাঙ্গীরের ও মনে রাখতে হবে অনেক প্রত্যাসা নিয়ে জনসাধারন তার পাশে দাড়িয়েছে। আপনি যে পরিকল্পিত নগরীর চিত্র মানসপটে ফুটিয়ে তুলেছেন। তা বাস্তবায়ন করা আপনারই দায়িত্ব। নগরীর ৩৫ লাখ বাসিন্দাই আপনার স্বপ্নের বেড়াজালে আবদ্ধ। জনসাধারনের এবং  আপনার সদিচ্ছার জয় হোক। এই প্রত্যাশা।  

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক