ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ৩ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

গাজীপুর সিটির ভোটের হিসাব নিকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০১৮ সোমবার, ০১:৪০ পিএম
গাজীপুর সিটির ভোটের হিসাব নিকাশ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুরের ভোট কাল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা নিজ দলের প্রার্থীকে জেতাতে মরিয়া হয়ে ভোটের প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে গাজীপুর সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায় এখানে ভোটের ক্ষেত্রেও নানা বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে। নতুন ও তরুণ ভোটার, শ্রমিক, বস্তির, বহিরাগত, আঞ্চলিক ভোটার, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমর্থন, প্রার্থীর দলীয় ও ব্যক্তিগত ইমেজ, সরকারি দল, জামাত ও বিভিন্ন ইসলামি দলের ভোট, সংখ্যালঘুদের ভোটসহ নানা বিষয় জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমর্থন: কল-কারখানা ও শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত গাজীপুরের সকল নির্বাচনে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমর্থন বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে। গাজীপুরের রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানান যায়, এখানকার শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সমর্থন যেকোনো নির্বাচনে ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে।

শ্রমজীবী ভোটার: গাজীপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় চাকরির সুবাদে অন্যান্য জেলার বহু লোকজন এ জেলায় এসে স্থায়ী বসবাস করছেন। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মোট ১১ লাখ ৩৭ হাজার ১১২ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় এক চতুর্থাংশই শ্রমিক। গাজীপুরের নির্বাচনে ভোটের হিসেবে যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায় পোশাক শিল্প শ্রমিকদের। সে কারণেই উভয় দলের প্রার্থীদের কাছে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পাচ্ছে কর্মজীবী ভোটারদের সুযোগ সুবিধার বিষয়। 

আঞ্চলিক ভোটার: আঞ্চলিক ভোটারের আধিপত্য কম নয় গাজীপুরে। আঞ্চলিক ভোটারদের মধ্যে বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীর মানুষই বেশি গাজীপুরে। বৃহত্তর ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা সমিতি রয়েছে এখানে। এই সমিতিগুলো ভোটের ক্ষেত্রে ভালোই আধিপত্য রাখে। সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল প্রার্থীই এই সমিতিগুলোর সমর্থন আদায়ে যথেষ্ট তৎপরতা দেখাচ্ছে।

ক্ষমতাসীন দল: গতবারের গাজীপুরে সিটি নির্বাচনে গাজীপুরবাসী অধ্যাপক মান্নানকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিল। মান্নান মেয়র নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কার্যত গাজীপুরের তেমন কোন উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায় নাই। ইতিমধ্যে গাজীপুরবাসী বুঝতে শিখেছে যে, উন্নয়ন করতে হলে অবশ্যই ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিকেই নির্বাচিত করতে হবে।

জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামি দল: গাজীপুরের নির্বাচনে জামাত, অন্যান্য ইসলামী দলগুলো ভোটের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। এখানে জামায়াত এবং হেফাজতের নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। গতবারের সিটি নির্বাচনে জামায়াত, হেফাজত ও অন্যান্য ইসলামি সমমনা দলগুলোর ভোট মান্নানের বিজয়ী হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। সে কারণেই কারণে নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম হেফাজতের আমির আল্লামা শফীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোয়া নিয়েছেন।

স্থানীয় নেতাদের ব্যক্তিগত ইমেজ: গাজীপুরে স্থানীয় নেতাদের ভোটের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায়। গাজীপুরের নানা শ্রেণী প্রেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের মহানগর সভাপতি মো. আজমত উল্লাহ খানের ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে তাঁর নিজস্ব একটা ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার শ্রমিকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। হাসান উদ্দিন সরকারের শ্রমিকদের মধ্যে অনেক ভোট রয়েছে। গাজীপুরে গতবারের মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নানের এলাকায় শিক্ষাবিদ হিসেবে যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে মান্নান গাজীপুরে রাজনীতিতে আলোচিত ও জনপ্রিয় একটি নাম। গাজীপুরে ভোটের হিসাবে অধ্যাপক মান্নান একটি বড় ফ্যাক্টর। গাজীপুরের রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় নামটি হচ্ছে আহসান উল্লাহ মাস্টার। আততায়ী গুলীতে আহসান উল্লাহ মাস্টার শহীদ হলেও গাজীপুরের এখনও তাঁর কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষী রয়ে গেছে। আহসান উল্লাহ মাস্টারের সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভোট যেকোনো নির্বাচনে ভোটের ফলাফল বদলে দিতে পারে।  

সংখ্যালঘুদের ভোট: সংখ্যালঘুদের ভোট গাজীপুর সিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম আরও একটি বড় বিষয়। জানা যায় গাজীপুর সিটিতে সংখ্যালঘুদের ভোট আছে প্রায় সোয়া লাখের উপরে। যেকোনো নির্বাচনে সবসময় সংখ্যালঘুদের ভোট আওয়ামী লীগের পক্ষেই থাকত। কিন্তু বিগত নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল বেশি। অবশ্য ইতিমধ্যে মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনও জানিয়েছেন গাজীপুরের সংখ্যালঘুদের সংগঠনগুলোর একাংশের নেতাকর্মী। আসন্ন সিটি নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট পেতে মরীয়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী।

জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত ইমেজ: আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তাঁকে অন্যান্য মেয়র প্রার্থী থেকে অনেক বেশি এগিয়ে রেখেছে। জাহাঙ্গীর আলম শিক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম তিতুমীরের কাছ থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীর শিক্ষা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এ যাবৎ ২৩ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীকে সহায়তা করা হয়েছে। গাজীপুরের অনেক স্কুল কলেজ ও বিদ্যালয়ের বিতরণ করা হয়েছে। গাজীপুর মহাসড়কে যানজট নিরসনে ৩২০ জন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও গাজীপুরের অনেক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের কাছে এলাকার কেউ সাহায্য-সহযোগিতা চেয়ে কোনদিন খালি হাঁতে ফিরে আসে নাই। নির্বাচনে ভোটের ক্ষেত্রেও তাঁর এইসব উন্নয়নমূলক কাজ যথেষ্ট প্রভাব থাকবে বলেই ভাবা হচ্ছে। 

গাজীপুরে ভোট গ্রহণ হতে সামান্য কিছু সময় বাকি। কথায় বলে ভোটের ক্ষেত্রে বাপকেও বিশ্বাস করা কষ্টকর। তাই যতই হিসাব নিকাশ করা হোক না কেন ভোটের দিনে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভোটার। সকল জল্পনা কল্পনা শেষে কে হাসবে বিজয়ের হাসি তার জন্যে আমাদের ভোট গণনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

বাংলা ইনসাইডার/আরকে/জেডএ