ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রবিবার, ০৬:৫০ পিএম
‘নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই’

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের জনগণ সঙ্গে থাকলে নির্বাচন হবে। ইলেকশন ঠেকানোর মতো কারও কোনো শক্তি নেই। এই দেশটা আমার বাবা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। সে কারণে এ দেশের মানুষের জন্য কাজ এবং উন্নয়ন করা দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে আমি মনে করি।’  

আজ রোববার বিকেলে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। সম্প্রতি নেপালে অনুষ্ঠিত সাত দেশের জোট ‘বিমসটেক’ চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন বিষয়ে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। বিকেল সোয়া ৪ টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শুরু করেন।

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ১০০ বছরে কোন পর্যায়ে যাবে সেই পরিকল্পনা চলছে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, ড. কামালরা আদৌ নির্বাচন চায় কী না সেটাই প্রশ্ন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ড. কামালকে আইনমন্ত্রী বানিয়েছেন। পরে তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচিত হয়েছেন ড. কামাল। তিনিই আবার সংবিধানের এই নিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেন। নিজেই প্রণেতা দাবি করে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন।

বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পর আমি যখন তাঁর বাসায় গেলাম দেখতে, তারা কি করলো? আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো, ভেতরে ঢুকতে দিলো না। সেই দিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর তাদের সঙ্গে আমি বসবো না, তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হবে না। আপনারা যে যা-ই বলেন না কেন, ক্ষমতায় থাকি আর না থাকি, তাতে কিছুই আসে যায় না। আমার একটা আত্মসম্মানবোধ আছে।’

নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বিএনপি হুঙ্কার দিচ্ছে তাঁরা নির্বাচন করবে না। এটা তাদের দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এটা তাদের দলের সিদ্ধান্ত। আমাদের কি করার আছে? তাঁরা যদি মনে করে নির্বাচন করবে না, তাহলে করবে না। এখানে তো আমাদের বাধা দেওয়ারও কিছু নেই বা দাওয়াত দেওয়ারও কিছু নেই।’

ড. কামাল-বদরুদ্দোজাদের জাতীয় ঐক্যর প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান শেখ হাসিনা। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পার্টি দুইটি। আওয়ামী লীগ ও এন্টি আওয়ামী লীগ। এন্টি আওয়ামী লীগের কোথাও যাওয়ার তো জায়গা লাগবে।’

জোটে থাকা আ স ম আব্দুর রব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একসময় জাসদ নেতা আ স ম আব্দুর রব ছাত্রলীগ করতে এসেছিলেন। অনেকেই তাঁর মতো আওয়ামী লীগে যুক্ত হয়েছে। আবার চলে গেছেন। সুবিধা নিয়েছেb। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে মন্তব্য করেন ‘অসময়ে নীরব, সুসময়ে সরব, আ.স.ম আব্দুর রব।’

মাহমুদুর রহমান মান্নার জোটে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাহমুদুর রহমান মান্না এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। এর আগে তিনি সব সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছেন। আমাদের বিরুদ্ধে লিখেই তিনি অভ্যস্ত। এবার তাঁকে বললাম আপনার লেখার হাত অনেকে ভালো, আপনিতো সবসময় আমাদের বিরুদ্ধে লিখেন। এবার একটু আমাদের পক্ষে লেখেন। একথা শুনেই মান্না জুড়ে দেয় কান্না।’ 

বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘হেনরি কিসিঞ্জার মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একটি তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হবে। সে বাংলাদেশ এখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। অনেক দেশ আমাদের কাছে এমন উন্নয়নের কারণ কি, ম্যাজিক কি, জানতে চান। আমি বলি ম্যাজিক একটাই দেশের মানুষকে ভালবাসতে হবে এবং দেশের উন্নয়েন কাজ করতে হবে। এটাই আমাদের ম্যাজিক।’

ইভিএম নিয়ে বিরোধীতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ব্যালটে ভোট হলে কারচুপির সুযোগ পায় তারা। নানা কারচুপির পদ্ধতি তাদের জানা। সেখানে ইভিএম হলে তো তাঁরা কারচুপি করতে পারবে না। তাই ইভিএমন বিরোধীতা। তবে এটিই শেষ কথা নয়। সমস্যা হলে এর সমাধানও হবে। ইভিএম নিয়ে আসার জন্য আমি সবসময় পক্ষেই ছিলাম, এখনো আছি। তবে এটাও ঠিক এটা তাড়াহুড়ো করে চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। কারণ একটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার আছে।’

মিডিয়ায় বিএনপিকে হাইলাইট দেওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বেসরকারি টেলিভিশনের লাইসেন্স আমি প্রদান করেছি, তারপরেও আমি থাকি তিন নম্বর স্থানে। কিন্তু বিএনপি বিরোধীদলেও নাই, সরকারেও নাই, তাঁরা কোনো স্থানে না থাকার পরেও তারাই এক নম্বর স্থানে থাকে। তারাই মিডিয়ার কাছে অগ্রাধিকার পায়। মিডিয়ার কাছে বিএনপি’ই ফেবারিট।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের কারাগারে থাকা এবং মামলা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, এই মামলা কোর্টে ১০ বছর চলেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনকে আদালতে ১৫৪ বার আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি হাজির হননি। অন্য কেউ যদি এত বার আদালতকে অগ্রাগ্য করতো তাহলে আপনারা (মিডিয়া) কী লিখতেন। কিন্তু কিছু লোকের দোষ দেখা হয় না। আর আমাদের পান থেকে চুন খসলেই হাউমাউ শুরু হয়। আমরা যদি এই মামলায় হস্তক্ষেপ করতাম তাহলে কি এত সময় লাগতো?’

সংবাদ সম্মেলনের একটি পর্যায়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খান প্রধানমন্ত্রীকে নিজের পরিচয় দেওয়ার সময় বলেন, ‘আমি আমাদের নতুন সময়ের সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান।’ পত্রিকাটি নতুন বলেও উল্লেখ করেন নাইমুল ইসলাম খান। এসময় অডিটোরিয়ামে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। নাইমুল ইসলাম খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনি বিএনপি আন্দোলন করে না কেন প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু আপনার সমর্থন ছাড়া তো বিএনপি আন্দোলন করতে পারবে না।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকারের পদত্যাগ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা কিন্তু সব ধরণের ব্যবস্থাই জাতীয় নির্বাচনে একবার না একবার অনুশীলন করে দেখেছি যে কোনটাই কাজে লাগে না। আমরা যদি এখন ক্ষমতা থেকে সরে দাড়াই তাহলে সমস্যা হল যারা একবার ক্ষমতায় বসে, তারাতো আর চেয়ার ছাড়তে চায় না। আমরা মার্শাল ল দেখেছি আবার কেয়ার টেকার সরকারও দেখেছি। যার ফলে উচ্চ আদালত একটা রায় দেয় এদেশে কখনই অনির্বাচিত কোনো সরকার ক্ষমতায় আসতে পারবে ন। ভারতীয় পার্লামেন্ট, বৃটিশ পার্লামেন্টে সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই নির্বাচন হয়। শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচন দিলে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হয়।’

রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএমসটেক সম্মেলনের সময় মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের উইন মিন্তের সঙ্গে তাঁর অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। মিয়ানমার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সঙ্গে যে সমঝোতা চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে সে অনুযায়ী কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁদের কাছে মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক এমন ৩০০০ জনের তালিকা আছে। এদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।’

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভুয়া ছবি ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমার মুক্তি যুদ্ধের ছবি ব্যবহার করে জঘন্য কাজ করেছে। তবে বাংলাদেশেও এই ঘটনা বহুবার ঘটেছে। আপনারা দেখেছেন, মক্কা শরীফের মানববন্ধন করার ছবি তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৩, ১০১৪, ২০১৫ সালে দেখেছেন, বিভিন্ন ছবি বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি-জামাত এগুলো করেছে। মিয়ানমারও এমন কাজ করেছে। এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। মিয়ানমার কি তাহলে জামাত-বিএনপির কাছ থেকে এগুলো শিখেছে? এছাড়া মিয়ানমার এটা একটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ করেছে। সব থেকে বড় কথা হলো, তাঁরা নিজেরাই, নিজেদের সন্মান নষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাঁরা নিজেদের অবস্থান নিজেরাই খারাপ করেছে।’ 

গত বৃহস্পতিবার বিমসটেক চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে নেপাল যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঐদিন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। সম্মেলন চলাকালে শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং ভূটানের প্রধান উপদেষ্টা দাশো সেরিং ওয়াংচুক এর সঙ্গে বৈঠক করেন। শুক্রবার তিনি দেশে ফিরে আসেন।

প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফিরে এসে সে বিষয়ে দেশবাসীকে অবহিত করার জন্য সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর আজকের এই সংবাদ সম্মেলন।

বাংলা ইনসাইডার/আরকে/জেডএ