ঢাকা, বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ২ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভারতীয় সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ রবিবার, ০৫:০৭ পিএম
ভারতীয় সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

আবারও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মাটিকে তিনি প্রতিবেশী দেশে জঙ্গি হামলার ঘাঁটি হতে দেবেন না। ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম টাইমস নাউ-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, অন্য দেশে হামলায় মদদ দিলে নিজের দেশও আক্রান্ত হতে পারে।

শনিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করাই তার সরকারের অগ্রাধিকার। টাইমস নাউ-এর সাংবাদিক সৃঞ্জয় চৌধুরীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আঞ্চলিক সহযোগিতা, তিস্তার পানি বণ্টন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও নিজের অবস্থান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে কোনও ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ঘাঁটি না থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান সাংবাদিক সঞ্জয়। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কোনভাবেই চাই না, আমাদের দেশের মাটিকে ব্যবহার করে অন্য কোনও প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাসী হামলা হোক। সে কারণেই দেশে সন্ত্রাসবাদী কোনও ঘাঁটি আছে কিনা, কিংবা অন্য কোনও তৎপরতা চলছে কিনা; আমরা সবসময় তা খেয়াল করি। তেমন কিছুর খোঁজ পেলে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিই। এটা আমাদের খুব স্পষ্ট অবস্থান।’

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, কেন আমরা আমাদের দেশের মাটিকে সন্ত্রাসী তৎপরতায় ব্যবহৃত হতে দেব?’ `আপনি যদি অন্য কোনও দেশে সন্ত্রাসী তৎপরতায় মদদ দেন, তো একদিন আপনার দেশই ভোগান্তির শিকার হবে। মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে অস্ত্র চোরাচালানের দৃষ্টান্ত টেনে বলেন, আমাদের দেশ একসময় অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ ভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন সেটা আমরা হতে দেব? যদি দিই, একদিন আমার দেশের মানুষও ভোগান্তির শিকার হবে। কারণ, কোনও না কোনভাবে দেশের কিছু মানুষ ওই তৎপরতায় উৎসাহিত হবে।’ শান্তি আর উন্নয়নকে তার সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তি ছাড়া উন্নয়ন হবে না। আমি তাই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করি। অর্থনৈতিক উন্নয়নই আমাদের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক সৃঞ্জয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে যে সংকটগুলো তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, তার অনেকগুলোই পাকিস্তানের সৃষ্টি করা। সে সময় ২০১৬ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনও জঙ্গি হামলা না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনও দেশ নাই, কোনও সীমানা নাই। নিজের পরিবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, তিনি আর তার বোন শেখ রেহানা ছাড়া পরিবারের বাকি সব সদস্য ৭৫’এর ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ৬ বছর পরে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে নিজেও বারবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় তার সমাবেশস্থলে বোমা পুঁতে রাখা এবং ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

২০১৬ সালে পাকিস্তানের সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ ধরে সাংবাদিক সঞ্জয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ভারতের আগে আপনি অনুধাবন করেছেন, সার্ক সম্মেলনে যাওয়া যথাযথ নয়। জবাবে শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশের সিদ্ধান্তটি একান্তই নিজেদের। বলেন, প্রতিবেশিদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক সব সময়ই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত আঞ্চলিক সহযোগিতা। তবে প্রত্যেক দেশেরই তাদের নিজ নিজ ভূমিকার পেছনে নিজস্ব কারণ থাকে। হুম, আমি স্বীকার করছি, আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, মানুষ মারার চেষ্টা হয়েছে। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা দেখা গেছে। তবে আমরা যেটা করেছি, তা হলো আমরা একে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি, কমিয়ে আনতে পেরেছি। তবে পাকিস্তানের চিত্র দেখেন আপনি.।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের অক্টোবরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সার্ক সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে বাংলাদেশের অবস্থান জানিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, `বাংলাদেশ মনে করে সার্ক অঞ্চলের চলমান পরিস্থিতি আপাতত সম্মেলনের জন্য সহায়ক নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বাংলাদেশের কাছে সুনির্দিষ্ট সংবেদনশীলতার প্রশ্ন, যেখানে পাকিস্তান আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে। বিষয়টি তারা তাদের পার্লামেন্টেও তুলেছে। তারা অবাঞ্ছিত কিছু মন্তব্যের মাধ্যমে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ শুরু করে। এতে আমরা আহত হয়েছি, যেহেতু বিষয়টি আমাদের অভ্যন্তরীণ। নিজেদের দেশের অভ্যন্তরেই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, এতে তাদের মাথাব্যথার কিছু নেই। পাকিস্তানের এই আচরণের ফলে তাদের সঙ্গে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যও আমার ওপর অনেক চাপ রয়েছে। কিন্তু আমি বলেছি, সম্পর্ক থাকবে। তবে সমস্যাগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে আমাদের।

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক একান্তই তাদের দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। আমি এর মধ্যে ঢুকতে চাই না, কোনও মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমি মনে করি, মানুষের কথা ভাবতে হবে আমাদের। সাধারণ মানুষের কথা। তাদের জীবনযাপন কেমন, তারা কী চিন্তা করছে, তারা কী করে একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারে।

সার্কের সাফল্য প্রশ্নে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সাফল্য আসবে তখন, যখন একটি দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি বলেন, আমাদের এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে যে কোনও দেশ অন্য কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তেক্ষপ করবে না। সেটা নিশ্চিত হলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। হস্তক্ষেপ ঘটলে বন্ধুত্ব সম্ভব না।সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারও তিস্তা সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তার দলের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসতে না পারলে `উঠতে থাকা` বাংলাদেশ `পড়ে` যেতে পারে। আবার নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।



বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ/এমআর