ঢাকা, রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

স্বাধীনতার অনার্জিত স্বপ্নগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৬:০০ পিএম
স্বাধীনতার অনার্জিত স্বপ্নগুলো

বাংলাদেশের অর্জন আজ সারাবিশ্বের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ শুধু প্রতিষ্ঠিতই নয়, বাংলাদেশ আজ সফল দেশের গল্পও। বাংলাদেশের সাফল্য আজ সারাবিশ্বের রোল মডেল। কিন্তু তারপরেও আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, ৩০ লক্ষ শহীদ যে কারণে জীবন উৎসর্গ করেছিল, ২ লক্ষ মা-বোন তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছিল- সেই স্বাধীনতার অনেকগুলো লক্ষ্যই আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। এখনো আমাদের অনার্জিত স্বপ্নগুলো আমাদের স্বাধীনতার সুফলকে পৌঁছে দিতে পারেনি সবার জন্য। আমরা স্বাধীনতার সাফল্যগাঁথা যখন আলোচনা করি, বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে যখন আলোচনা করি তখন আমাদের ব্যর্থতাগুলো নিয়েও আলোচনা করা দরকার। যে অনার্জিত স্বপ্নগুলো আমরা আজও পূরণ করতে পারিনি, যে স্বপ্নগুলো থেকে আমরা বহুদূর বিচ্যুত হয়েছি- সেগুলোর কয়েকটি এরকম-

বৈষম্য বেড়েছে

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন একটা বাংলাদেশ। বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈষম্য। ধনী-গরিবের বৈষম্য বাংলাদেশের জন্য েএকটা বড় পীড়াদায়ক ঘটনা। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর আমাদের বৈষম্য না কমে বরং বেড়েছে।

দুর্নীতি বেড়েছে

বঙ্গবন্ধু সবসময় ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তিনি একাধিক বক্তৃতায় দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে দুর্নীতিকে মুক্তির জন্য ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সবসময় বলতেন, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। স্বাধীন দেশে দুর্নীতি চলবে না। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর এ কথা বলা যেতেই পারে যে আমরা এই দুর্নীতিবন্ধের স্বপ্ন থেকে আমরা অনেক দূরে। বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত তো হয়ই নি, কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি আরও বেড়েছে। দুর্নীতি আমাদের উন্নয়ন আর ভালো কাজের মুখে কালিমা লেপন করে দিয়েছে।

ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চারটি স্তম্ভ ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। যদিও বাংলাদেশ এখন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের একটি প্রতিচিত্র, সারাবিশ্বে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবেই চিহ্নিত। ৭২ এর সংবিধানে যে ধর্ম নিরপেক্ষতা রচিত হয়েছিল, তা আমরা রক্ষা করতে পারিনি। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর আমাদের সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে কেটে ফেলা হয়। এরপর ৭২ এর সংবিধান পুনরাত্থাপিত হলেও এখনো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এখনো সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত নই।

উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধ রাজনীতি

বাংলাদেশে এখনো উগ্র মৌলবাদী এবং সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনীতি রয়েছে। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি চেতনা ছিল উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক কোনো রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবো না। আমাদের ৭২ এর সংবিধানে ঘোষিত ছিল যে, ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে না। সেভাবেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৭৫ িএর ১৫ আগস্টের পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আবার শুরু হয়েছে। ৪৮ বছর পর আমরা যদি দেখি বাংলাদেশে শতাধিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এখনো বিদ্যমান। যে রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের স্বাধীনতার মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ঐক্যমতের গণতন্ত্র

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য ছিল যে, একটা ঐক্যমতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সব রাজনৈতিক দল যে মতাদর্শেরই হোক না কেন, মৌলিক জাতীয়তা ও গণতন্ত্রের বিষয়ে একমত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর আমরা দেখি অনেক রাজনৈতিক দলই এখনো বাংলাদেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ থেকে এখনো অনেক দূরে। গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা এবং শিষ্টাচার আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সৌহার্দ্য, পরমত সহিষ্ণুতার এখনো অভাব রয়েছে। এবং এখনো এই অসহিষ্ণুতা কমছে না, বাড়ছেই। এটাও আমাদের স্বাধীনতার আরেকটি অনার্জিত স্বপ্ন।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া দেশ। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে একটি সফল দেশ। কিন্তু আমাদের অনার্জিত স্বপ্নগুলো যদি আমরা পূরণ করতে না পারি, স্বাধীনতার সুফল যদি আমরা না পাই তাহলে সেই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না।