ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ছাদে চিৎ করে শুইয়ে ফেলানো হয় প্রথম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০১৯ সোমবার, ০৯:১০ পিএম
ছাদে চিৎ করে শুইয়ে ফেলানো হয় প্রথম

মোট ৫ জন ছিলো নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকারীদের দলে। বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে বলে রাফিকে ছাদে আনা হয়। সেখানে পাঁচজন মিলে তাকে ছাদে চিৎ করে শুইয়ে ফেলে। তার পরনের ওড়নাটি দুভাগ করে বেঁধে ফেলে হাত-পা। এরপর এক লিটার কেরোসিন নুসরাতের গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢালা হয়। ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পায়ে। আগুন যখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে হত্যাকারীরা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য দিয়েছে হত্যাকারী দলের সদস্য শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম।

ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ১১ ঘণ্টা ধরে ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে ওই দিনের ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়।

গ্রেপ্তার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে দেখা করতে চার এপ্রিল যারা কারাগারে গিয়েছিল এই হত্যাকারীরা। তখনই কেস উঠিয়ে নিবে, প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন।

কারাগার থেকে ফেরার পর ওই দিন রাত সাড়ে নয়টায় মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে শামীম, নুর উদ্দিন, মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের প্রধান আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন সভা করেন। সেখানে কে বোরকা আনবে, কে কেরোসিন তেল আনবে, কে কোথায় থাকবে সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় অধ্যক্ষের জেঠাসের (স্ত্রীর বড় বোন) মেয়ে উম্মে সুলতানা পপিকে দিয়ে নুসরাতকে কি বলে ডাকা হবে।

আন্দোলন ও বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম তাদের দশ হাজার টাকা এবং এক শিক্ষক পাঁচ হাজার টাকা দেন। এর মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা তিনি নূর উদ্দিনকে দেন। আর তিনটি বোরকা কেনার জন্য তার চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে ও ওই মাদ্রাসার ছাত্রীকে দেন দুই হাজার টাকা।

ঘটনার দিন এক লিটার কেরোসিন কিনে ‘ডাবল পলিথিনে’ করে নিয়ে আসা হয়। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ও মাদ্রাসা ছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২০) ও জাবেদ হোসেন (১৯) সাইক্লোন সেন্টারের (মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবন) নিচ তলার শ্রেণিকক্ষে বসে।

আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত পাঁচজনের প্রত্যেকেই বোরকা এবং নেকাব ছাড়াও হাত ও পায়ে মোজা লাগিয়ে নিয়েছিল।

সকাল পৌনে নয়টার দিকে নুসরাতকে ডাকতে যান উম্মে সুলতানা। তখন তারা নিচের শ্রেণিকক্ষ থেকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষে এসে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণ পর উম্মে সুলতানা ও ইসরাত ছাদে উঠে।

পপি নুসরাতকে ছাদে নিয়ে এসে প্রথমে বলে মামলা তুলে নিতে। ইসরাত তখন জবাবে বলেছিলেন, ‘মামলা উঠাব না। আমার গায়ে কেন হাত দিল। ওস্তাদ তো ওস্তাদ। আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব।’

এই অবস্থায় শাহাদাত পেছন থেকে হাত ধরে। পপি পা ধরে মেঝেতে শুইয়ে ফেলে। মেঝেতে শুইয়ে ফেলার পর জোবায়ের নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলেন। জাবেদ তখন নুসরাতের সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেন। এরপর শাহাদাতের চোখের ইশারায় জোবায়ের তার পকেট থেকে ম্যাচ বের করে কাঠি জালিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন। অন্যরা নিচে চলে যায়। ছাত্রী দুজন পরীক্ষা দিতে চলে যায়।

পা থেকে আগুন ধরানোয় প্রথমে নুসরাতের পায়ের বাঁধন খোলে। এরপর আগুন যখন ওপরে উঠে তার হাতের বাঁধন খুলে তখনই তিনি উঠে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। নুসরাতের মুখ শাহাদাত চেপে ধরায় সেখানে আর কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি।


বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ