ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

ডিআইজি মিজানের গোয়েন্দাকাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ১২:৩০ পিএম
ডিআইজি মিজানের গোয়েন্দাকাহিনী

দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতিবাজ ধরার জন্য ফাঁদ পাতে বিভিন্ন সময়ে। সেই ফাঁদে পা দিয়ে অনেকবার অনেক রাঘববোয়াল দুর্নীতিবাজরা ধরাও পড়েছে। সেই তথ্য কমবেশি আমাদের জানা। কিন্তু দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ডিআইজি মিজান ঘটিয়েছেন অন্য ঘটনা। তিনি নিজেই দুর্নীতি দমন কমিশনের বিরুদ্ধে একটি ফাঁদ পেতেছিলেন। এর সঙ্গে শুধু ডিআইজি মিজান একা নয়, পুলিশের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাও এই পরিকল্পনার অংশীদার ছিলেন। দুর্নীতি দমন কমিশন যখন তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অর্থের জন্য তদন্তের ঘোষণা দেয়, তখনই এই গোয়েন্দাকাহিনীর খেলাটি খেলতে নামেন।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ডিআইজি মিজানের দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালককে ঘুষ দেওয়া এবং এই ঘুষের অডিও প্রকাশ নিয়ে যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হচ্ছে- তা একেবারেই পরিকল্পিত ছিল। এই পরিকল্পনার নেপথ্যের কাহিনী যেকোনো গোয়েন্দা গল্পকেও হার মানায়।

বাংলা ইনসাইডারের অনুসন্ধানে এ সম্পর্কিত চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে যে, ডিআইজি মিজান পরিকল্পিতভাবে দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসিরের ওপর ফাঁদ পেতেছিল এবং গোয়েন্দাগিরি করেছিল। যখন ডিআইজি মিজানকে দুর্নীতি দমন কমিশন তার জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত সম্পদের তদন্তের ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই মিজান অন্যান্য সিনিয়র কর্মকর্তাদের দারস্থ হন। তিনি তাদের বিস্তারিত বলেন িএভাবে যে, দুদক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে হয়রানির জন্য এমসব করছে। তিনি নিশ্চিত যে তার কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হবে। তখন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন যে এরকম যদি হয় তাহলে তারা সর্বক্ষণ মিজানের পাশে থাকবে।

সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে ডিআইজি মিজান প্রথমে খন্দকার এনামুল বাসিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথম পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে মিজান বুঝতে পারেন যে বাছিরের মতলব ভালো নয়, বাছির হয়ত তার কাছে অর্থকড়িও চাইতে পারে। এরপরে মিজান একটি লিখিত চিঠির মাধ্যমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান যে দুদক তদন্তের নামে তাকে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করছে এবং তার কাছে অন্যায্যভাবে অর্থ দাবি করছে। তারপর তিনি পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাকে বলেন যে দুদকের এই বিষয়টির মুখোশ উন্মোচন করতে চান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলে সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুখোশ উন্মোচনের অনুমতি দেয়।

এরপর শুরু হয় আসল খেলা। মিজান সরাসরি বাসিরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তখন তিনি এটাও বলেন যে এই নাম্বারে কথা বলা নিরাপদ নয়। তখন তার ড্রাইভার হৃদয়ের কাছ থেকে ভোটার আইডি কার্ড নেন, শান্তিনগরের একটি দোকান থেকে একটি স্যামসাং মোবাইল এবং একটি সিমকার্ড কিনে দেন। ঐ সিম এবং মোবাইল দুটোর ভাউচার দুটোই মিজান সংগ্রহ করে রাখেন। মজার ব্যাপার হলো, ভাউচারে লেখাই আছে যে খন্দকার এনামুল বাসির দুটো জিনিসই কেনেন তার ড্রাইভারের নামে! তথ্য ঘুরে যায় এখানেও।

পরে তিনি সংশ্লিষ্ট মোবাইল কোম্পানিকে একটি চিঠি দেন যে তাকে কেউ এই নাম্বার থেকে ব্লাকমেইল করতে পারে, তাই ব্লাকমেইলকারীর পরিচয় উন্মোচনের জন্য তিনি ঐ মোবাইল অপারেটরের সাহায্য চান। দুটো নাম্বারের সমস্ত কল রেকর্ড করার জন্য অনুরোধ করেন। সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মোবাইল অপারেটরকে সব কল রেকর্ড করার অনুমতিও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মোবাইল কোম্পানিকে চিঠি দেওয়ার দিনেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে বলেন যে, তাকে ফাঁসানোর জন্য দুদকের একজন কর্মকর্তা চেষ্টা করছেন। এ ব্যাপারে তথ্য প্রমাণের জন্য তিনি কলরেকর্ড করতে চান। সেটার অনুমতিও তাকে দেওয়া হয়। বাসির এরপর মিজানের কাছে টাকা চায়। তখন তিনি তার প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তিনি টাকা উত্তোলনের জন্য একটি চিঠি অনুমতি প্রার্থনা করেন এবং সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে দুদক কর্মকর্তাকে ঘুষ প্রদানের জন্য এই টাকা দিতে হবে।

মজার ব্যাপার হলো, প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তাকে অগ্রিম গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় টাকার জন্য তিনি তার দুই আত্মীয়ের কাছে যান। তিনশো টাকার দলিলের মাধ্যমে তিনি দুই আত্মীয়ের কাছ থেকেই টাকা নেন। সেই দলিলে তিনি উল্লেখ করেন যে, দুদক কর্মকর্তাকে ঘুষ প্রদানের জন্য তার ঋণ প্রয়োজন। এই ঋণ তিনি কবে পরিশোধ করতে পারবেন তা তিনি জানেন না। শুধু তাই নয়, দুই দফা টাকা যে বাসিরকে দেওয়া হয়, সেই টাকা হস্তান্তরের ভিডিও রেকর্ডও তিনি সংগ্রহ করে রেখেছেন, যেই টাকাগুলো দেওয়া হয়েছে তার নম্বরগুলোও তিনি তার কাছে রেখেছেন। এছাড়া সব অডিও টেপ তো রেখেছেনই।

জানা গেছে যে মিজান এখন তার সব তথ্যপ্রমাণগুলো পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করবেন, ন্যায় বিচার চাইবেন। অন্যদিকে একজন দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে দুদকের চৌকশ কর্মকর্তাকে ফাঁসালো সেটা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মধ্যেও নতুন করে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ