ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

হাসপাতালে ফোন করে তারেক বলেছিলো ‘আহতদের যেন মেরে ফেলা হয়’

নাজমুল হাসান সাগর
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০১৯ বুধবার, ০৯:২৪ পিএম
হাসপাতালে ফোন করে তারেক বলেছিলো ‘আহতদের যেন মেরে ফেলা হয়’

‘সেদিন যখন রমনার ভেতর থেকে গ্রেনেড এসে পড়লো আমাদের সভাস্থলে তখন আমি বসে ছিলাম আইভি আপারা যে পাশে বসেছিলো তার পেছনে। আপাকে লক্ষ্য করে ছোড়া গ্রেনেডটা এসে যখন সমাবেশ স্থলে পড়েছে তখন সমাবেশ স্থল সভা-সমিতির যায়গা ছিলো না। এখানে তখন রক্তের বন্যা বইতে শুরু করেছে। সারা এলাকা জুড়ে মৃত্যুর আহাজারি,চোখের সামনে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি মানুষ। আইভি আপা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পরেও যেভাবে চোখ খুলে তাকিয়ে ছিলেন সেটা দেখে আমার মনে হয়েছে আপা জীবনের শেষ সময়টা পর্যন্ত খোলা চোখে এত বড় নির্মমতা দেখে গেছেন।’

কথাগুলো বলছিলেন ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড হামলায় আহত মাহমুদা মনোয়ার। তিনি সেদিনের বর্ননা দিয়ে বলেন, ‘আমারো শরীরে স্প্রিন্টার লেগেছে তিন জায়গায়, আমি রক্তাক্ত অবস্থায় খুঁজে বেড়িয়েছি আমার ছেলেকে। খুঁজতে খুঁজতে তাকে আমি পাই চানখার পুলে। আমি নিজে চিকিৎসা নিতে ডিএমসি(ঢাকা মেডিকেল কলেজ) যাচ্ছিলাম সে সময়। যাওয়ার পথে চোখে পড়ে আমার ছেলেকে পুলিশ ধরে বেদম মারছে। তাকে মার থেকে বাঁচাতে আমি ছেলের উপর শুয়ে পড়ি শরীরে স্প্রিন্টারের ব্যাথাসহ। কিভাবে কিভাবে যেন পুলিশের হাত থেকে ছেলেকে উদ্ধার করে নিয়ে ডিএমসি তে যাই চিকিৎসা নিতে। সেখানে ডাক্তাররা আমাকে আর আমার ছেলেকে ভর্তি নেবে না। অনেক অনুরোধ করার পরে তারা ভর্তি নিলেও কোন ধরনের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছিলো না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।’

তিনি বলতে থাকেন,‘তবুও আমি আর আমার ছেলেসহ আমাদের মতো অনেকেই সেখানে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলাম। আর কোথায় যাবো সে সময় আর ভেবে পাচ্ছিলাম না। এর মধ্যেই আমরা খবর পাই তারেক জিয়া হাসপাতালে ফোন দিয়ে বলেছে গ্রেনেড হামলায় যারা আহত হয়ে এখানে ভর্তি আছে তাদের সবাইকে যেন মেরে ফেলা হয়। এরা বেঁচে থাকলে সাক্ষী দেবে আদালতে। এই খবর শোনার পরে আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আধমরা জীবন বাঁচানোর জন্যে আমি আর আমার ছেলে হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে আসি। এসে অনেক আকুতি মিনতি করে একটা ভ্যানের ব্যবস্থা করে সেটা নিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যাই এবং গোপনে চিকিৎসা নেই।’

কথা বলতে বলতে স্মৃতি হাতরে তিনি আরো জানান, ‘একটা দেশের নেতাকে বিশ বার মেরে ফেলার জন্যে হামলা করা হয়েছে। একবারের সাক্ষী আমি নিজে। শুধু যে হামলাই করা হয়েছিলো বিষয়টা তেমন না হামলার পরে আহত নেতাকর্মীদের পুলিশ দিয়ে বেদম প্রহার করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছিলো। একবার ভাবুন শরীরে অসংখ্য স্প্রিন্টার নিয়ে একটা মানুষ মৃত্যু যন্ত্রণায় ভুগছে সেই সময় পুলিশ এসে তাকে সমাবেশ স্থল ত্যাগ করার জন্যে মারধর করছে। এর থেকে নির্মম দৃশ্য আর কি হতে পারে?’ প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, ‘আমার সারা শরীরে এখনো নয়টি স্প্রিন্টার আছে যেগুলো সময় অসময়ে যে পরিমান যন্ত্রণা দেয় তার থেকে বেশি যন্ত্রণা দেয় সেদিন আহত অবস্থায় যাদের পুলিশ মেরেছে তাদের আহাজারির কথা মনে হলে।’ এটুকু বলেই ডুকরে কাঁদতে থাকেন মাহমুদা। চোখে থাকা চশমার ফাঁক দিয়ে তার কান্নার জল বুকে এসে মিশে যায় কিন্তু এই জলে তার অন্তর জ্বালা বা দহন নেভে না বরং বাড়ে হাজার গুন। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে দোষী ব্যক্তিদের নিয়ে কিছু বলার আছে কি না? উত্তরে তিনি বলেন,‘এই ঘটনার মূল হোতা হলো খালেদা আর তারেক জিয়া। তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এই হামলা চালানো হয়েছিলো সেটা এখন আইনি ভাবে প্রমাণিত। আমি এবং আমাদের সেদিন যারা আহত ও নিহত হয়েছে তাদের সবার পক্ষ্য থেকে দাবি জানাই খালেদা-তারেকের যেন ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।’

বাংলা ইনসাইডার