ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

২১ আগস্টে নিহত প্রতিবন্ধী সন্তানের মায়ের আহাজারি

নাজমুল হাসান সাগর
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০১৯ বুধবার, ০৯:৫৭ পিএম
২১ আগস্টে নিহত প্রতিবন্ধী সন্তানের মায়ের আহাজারি

আজ ২১ শে আগস্ট, ২০০৪ সালের আজকের এই দিনে এদেশের মাটিতে একটি রাজনৈতিক দল ও সেই দলের প্রধানকে স্বমুলে ধ্বংস করার জন্যে ঘটানো হয়েছিলো স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভয়াবহ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ। এই দিনটিতে হরকাতুল জিহাদ নামে একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর আর্জেস গ্রেনেড হামলায় ঘটনা স্থলেই নিহত হয়েছিল ২৩ জন এবং পরে আরো একজনসহ মোট ২৪ জন। আহতও হয়েছিল কয়েক শতাধিকের বেশি মানুষ। আওয়ামী লীগ ও দলের প্রধানকে চিরতরে শেষ করে দেবার লক্ষ্যে করা এই হামলায় আহত ও নিহতদের স্মরণে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলটির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে একত্রে হয় বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও হামলার ঘটনায় আহত অনেক মানুষ। পার্টি অফিসের মুল দরজার পাশে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ বেদী, সেই বেদীতে দল ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে অর্পণ করা হয়েছে পুষ্পার্ঘ্য।

যখন সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যে হুড়োহুড়ি চলছে তাঁর সামনেই একটি ফুল গাছের নিচে স্বজল নয়নে দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। ঘন্টা খানেক তাকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌতুহল জাগে তাঁর প্রতি। এগিয়ে গিয়ে আলাপের অনুরোধ জানালে সায় দেন তিনি। নিজের নাম জানান পীরজান বেওয়া। আলাপে আলাপে তিনি জানান, সেই যৌবন বয়সে কোলে করে এক শিশু সন্তান নিয়ে ভোলার কোন এক নদী অঞ্চল থেকে জীবনের তাগিদে ঢাকায় এসেছিলেন স্বামীর হাত ধরে। লঞ্চ ঘাট থেকে নেমে এসে বসেন এই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায়। তারপর থেকে এখানেই তাদের ঘর সংসার। কোলের প্রতিবন্ধী ছেলে জাকির বড় হতে থাকে, স্বামী অন্য কোথাও কাজ করে যা পান তাই দিয়ে এখানকার ফুটপাতে তাদের দিন চলে যায় ভালো ভাবেই। এর মধ্যে আরো এক ছেলে ও মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন পীরজান।

একদিন হুট করে স্বামীটা মারা যান তারপর তিন সন্তান নিয়ে অস্থায়ী সংসার সমুদ্রের অতলে সাঁতরাতে থাকেন। স্বামী হারানোর পরে এই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস এলাকাতেই তিনি তাঁর জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। জীবিকা বলতে নামাজ শিক্ষা বই বিক্রি করেন তিনি।

প্রতিদিনের মতো ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্টে সমাবেশ স্থলে সে তাঁর প্রতিবন্ধী সন্তান জাকিরকে পার্টি অফিসের ডান পাশে বসিয়ে রেখে নামাজ শিক্ষা বই বিক্রি করছিলেন তিনি। হঠাৎ করে বিকট শব্দে তাঁর কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার যোগার। চোখ ফিরিয়ে দেখেন লোকে লোকারণ্য সমাবেশ স্থল ছেড়ে যে যেভাবে পারছে রেখে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। কারো কারো শরীর রক্তে ভেজা, কেউ রাস্তার উপরে আধমরা হয়ে পড়ে আছে আবার কেউ রক্তমাখা শরীরে অসহ্য ব্যথায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তখন তাঁর মনে পরে ছেলে জাকিরের কথা। দৌড়ে যায় ছেলে জাকিরকে যেখানে বসিয়ে রেখে এসেছিলেন সেই স্থানে। গিয়ে দেখেন সেখানে কেউ নাই, মনটা অজানা আর অনিশ্চিত আশঙ্কায় হাহাকার করে উঠে তাঁর। খোঁজাখুঁজির পর রক্তাক্ত অবস্থায় তার ছেলে জাকিরকে পান পীরজান বেগম। ছেলেকে নিয়ে যে হাসপাতালে যাবেন তিনি সেই অবস্থায় নেই। চারিদিকে পুলিশ ঘিরে রেখেছে কোয়াও দিয়ে বের হওয়ার অবস্থা নাই। চোখের সামনে দেখছেন আহত ব্যক্তিদের পর্যন্ত পুলিশ ধরে ধরে মারছেন। চিকিৎসা নিতে হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়ার উপায় নাই। তাঁর ভাষ্যমতে কোন রকম লুকিয়ে লুকিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করান তিনি। হাসপালে গিয়ে আবিষ্কার করেন তারও কপালে দুইটি স্প্রিন্টার বিঁধেছে। মা ও ছেলে একই সাথে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন এবং চিকিৎসার তিন দিনের মাথায় ছেলেটি মারা যায় তাঁর।

এতটুকু বলেই একেবারে থেমে যান তিনি তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা। নীরবতা ভেঙ্গে আবার বলতে শুরু করেন, আমাগো কোন দলীয় পরিচয় আছিলো না বইলা হাসপাতালে ভর্তি নিছে ওরা কিন্তু চিকিৎসা করে নাই ঠিক মতো। ভর্তি থাকা অবস্থায় দেখছি এহানকার কতো ভাই আর আপারে যে ফিরায়া দিছে হাসপাতাল থাইকা। বাবা আমি আমার পোলাডার মুখ দাফনের আগে একবার দেখতেও পারি নাই। আমি ঢাকায় আইছিলাম দুঃখ নিয়া, আমার জীবনে আর দুঃখ পিছ ছাড়লো না। বাকি দুই পোলা আর মাইয়া এতিম খানায় মানুষ হইতাছে একটু আধটু পড়া লেহাও করে। তারা আমারে এইহান থাইকা অন্য যায়গায় নিয়া যাইতে চায়। আমি রাজি হই না, আমি আমার বাবা জাকিরের স্মৃতি খুইজা বেড়াই। এহানে যহন অনেক মানুষজন আসে তহন আমার মনে ওয় আমার বাবা জাকির আমারে মা কইরা ডাক দিবো। আমি দৌড় দিয়া গিয়া আমার আমার অচল পোলাডারে বুকে জড়াইয়া ধরমু। যতদিন বাইচ্চা আছি আমি এহানেইউ থাকতে চাই, এহানেই আমি মরতে চাই যেহানে আমি আমার অচল পোলাডারে হারাইছি।

জিজ্ঞেস করা হয় তাঁর কোন চাওয়া আছে না কি বর্তমান সরকারের কাছে। তিনি বলেন,আমার কিছু চাওয়ার নাই। আমার তো কোন কিছুতেই মন ভরবো না । ভালো লাগবো যদি জীবদ্দশায় খালেদা আর তারেকের ফাঁসি দেইহা যাইতে পারি। কথাগুলো বলতে বলতে অঝড়ে কাঁদতে থাকেন তিনি আর শাড়ির আঁচলে মুছতে থাকেন কান্নার জল। পীরজান বেওয়ার ঘটনাটা গল্পের মতো মনে হওয়ায় সন্দেহ কাজ করতেছিলো মনে। সেই সন্দেহ মনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারেনি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এই আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে যারা নিয়মিত যাওয়া আসা করেন কিংবা সব স্তরের নেতা কর্মীরাও পীরজান বেওয়াকে চেনেন এবং তাঁর জীবনের এই ঘটনার ব্যাপারেও জানেন।

বাংলা ইনসাইডার