ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

কেমন আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বুধবার, ০৪:২১ পিএম
কেমন আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান?

রাজধানী শহর ঢাকায় নাগরিকদের বিনোদনের জন্য যতগুলো পার্ক আছে তার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি। ইতিহাস-ঐতিহ্যের জ্বলন্ত সাক্ষী আর গাছ-পালা বেষ্টিত এই নগর উদ্যানে। প্রতিদিন কম করে হলেও দশ হাজার দর্শনার্থী আসেন এখানে ঘুরতে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণী আর শিশুদের সংখ্যা বেশি হলেও নানা বয়সী মানুষই এখানে আসেন। ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে হয় কয়েক গুন। আজ মঙ্গলবার আশুরার সরকারী ছুটিতে দুপুরের পর থেকেই বাড়তে থাকে দর্শনার্থীর সংখ্যা। অবকাশ বা সুস্থ্য বিনোদনের জন্যে আসা এসব দর্শনার্থীরা কি সন্তুষ্টি নিয়ে ঘরে ফিরতে পারছেন পার্ক দর্শণ শেষে? 

সরেজমিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, টিএসসি এলাকা হয়ে উদ্যানের ভেতরে ঢোকার আগেই চোখে পড়ে মূল ফটকের দুই পাশে অস্থায়ী ভাতের হোটেলসহ চা, সিগারেট ও ভাঁজা-পোড়ার দোকান। এসব দোকান মাড়িয়ে উদ্যানের ভেতর প্রবেশ করাই যেন ছোট-খাট একটা যুদ্ধের সমান। ভেতরে ঢুকলেই বাতাসের সাথে নাকে এসে লাগবে দুর্গন্ধ। ডান পাশ ধরে হাটতে থাকলে কিছু দূর পরেই চোখে পড়বে মুক্তমঞ্চ। সেখানে দিন রাত মানুষ থাকে। মুক্ত মঞ্চের ভেতরে এসে দাড়াতেই নাকে লাগবে গাঁজার গন্ধ। বিভিন্ন দলে দলে ভাগ হয়ে সেখানে গাজা সেবন করছেন অনেকেই। এর মধ্যে এক দম্পতি তাদের ছোট্ট সন্তানকে ঘুরতে নিয়ে এসে সেখানে ঢুকে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতেই পড়লেন বলে মনে হয়।

শুধু মুক্তমঞ্চের ভেতরে নয় বাহিরেও চলে অবাধে গাঁজা সেবন এবং সেখানে খুচরা গাঁজা বিক্রিও করা হচ্ছে দায়িত্বরত আনসার ও পুলিশের চোখ ফাঁকি। খোজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে এক সময় প্রকাশ্যেই গাঁজা বিক্রি করত মালতি নামে এক মহিলা। গাঁজা বিক্রির অপরাধে তাকে বেশ কয়েকবার জেলও খাটতে হয়েছে। জেল থেকে বেড়িয়ে এসে কিছুদিন ভালো ছিলেন তারপর আবার গাঁজা বিক্রি করেছেন।

এছাড়া কালী মন্দিরের পেছনটায়ও নিয়মিত নেশার আসর বসাসহ সংঘটিত হয় নানা অনৈতিক কর্মকান্ড। উদ্যানের ভ্রাম্যমান চা বিক্রেতা শরিফের সাথে কথা বলে জানা যায়, সন্ধ্যা সাতটার পরে এখানে কোন দর্শনার্থী থাকা নিষেধ। তাই সন্ধ্যা হতে হতেই এই  জায়গা খালি হয়ে যায়। তখন এক নতুন রুপে আবির্ভাব হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। শরীফ আরো জানান, সন্ধ্যার পরে কালী মন্দিরের  পেছনে পতিতা নারীদের আনাগোনা শুরু হয় এবং খদ্দের পেলে সেখানেই করেন তারা অনৈতিক কর্মকান্ড।

এদিকে উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, একুশে বই মেলার সময় অস্থায়ীভাবে তৈরী করা টয়লেটগুলো এখনো সেখানে রয়ে গেছে, নিয়ে যাওয়া হয়েছে শুধু টিনের কাঠামো। বাকি রিঙ, স্ল্যাব আর গর্ত রয়ে গেছে সেভাবেই। সেসব গর্তে দিনে এক-দুইজন দর্শনার্থী পড়ে আহত হন বা শুকনো মল গায়ে মেখে যাওয়ায় পড়েন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।

হাটতে হাটতে যখন আপনি শিখা চিরন্তনের সামনে  গিয়ে পৌছুবেন ঠিক তার আগে বাম পাশে রাধাচূড়া,কৃষ্ণচূড়াসহ জারুল গাছের ছায়া বেষ্টিত বিশাল জায়গা চোখে পড়বে। সেসব গাছ থেকে নাম জানা,অজানা অনেক পাখির ডাক আপনাকে মুগ্ধ করবে। কিন্তু সেই  ছায়া ঘেড়া নীবির পরিবেশে আপনি গিয়ে বসতে পারবেন না। ছায়া ঘেড়া সম্পুর্ন জায়গা জুরে ছোট ছোট ঢিবির মতো করে ফেলে রাখা হয়েছে লাল মাটি। ছায়া ঘেরা ওই জায়গার আগে আছে একটা বিশাল খাল। যেটায় ফেলা হয় ময়লা আর সারা দিন আগুন লাগিয়ে রাখা হয়। ময়লা পচা ও পোড়ার গন্ধে মাঝে মাঝে ওই খালের পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। এবার ডান পাশে নজর দিলেই চোখে পড়বে অনেক বড় কিন্তু অগভীর পুকুর। সেই পুকুরের মাঝে সুউচ্চ গ্ল্যাস টাওয়ার। ওই গ্ল্যাস টাওয়ারকে বলা হয় স্বাধীনতা স্তম্ভ। ঠিক এই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এই স্মৃতি স্তম্ভ্য ঘিরে যে লেক করা হয়েছে সেটিতে দর্শনার্থীদের ফেলানো বিভিন্ন ময়লা পরিবেশ দূষণ করছে। স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশেই রয়েছে স্বাধীনতা জাদুঘর। খুব অল্প মূল্যে সেখান টিকেট সংগ্রহে জেনে আসা যায় দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আদি-অন্ত।

শিখা চিরন্তন এলাকাটা বেশ পরিপাটি মনে হলেও তার পাশের টিলাতেই বসে নিয়মিত মাদকের আড্ডা। চোখে পরে পার্কে ঘুরতে আসা অনেকের উপরেই হিজড়ারা চালায় চাঁদাবাজি। ঘুরতে আসা প্রেমিক যুগল থেকে শুরু করে বিবাহিত দম্পতিরাও বাদ যায় না এদের হাত থেকে। পার্কে ঘুরতে আসা নব্য বিবাহিত আদনান-অন্তরা দম্পতি জানান, হিজড়াদের কারণে অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মাঝে মধ্যেই। তারা অনেক টাকা দাবি করে বসে। না দিলে, বিভিন্নভাবে হেনস্থা করে। এরা একটা উৎপাতে পরিনত হয়েছে। 

উদ্যানে সার্বক্ষনিক বেশ কিছু পুলিশ ও আনসার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। এসব অনিয়ম ও দুর্ভোগ নিয়ে কথা হয় দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্যের সাথে। তিনি বলেন, আগের থেকে উদ্যানের পরিবেশ অনেক ভাল এখন। পরিবেশগত সমস্যার ব্যপারটায় আমরা  কিছু করতে পারবো না। তবে, মাদক বিক্রির ব্যাপারটা আমাদের চোখে পড়ে না। চোখে পড়লে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অবৈধভাবে বসা খাবার হোটেল ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এসব দোকান বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অনুমতি নিয়ে বসানো হয়। মাস বা সপ্তাহে তাদের দেওয়া হয় নির্দিষ্ট পরিমান টাকা। তারাই প্রসাশনসহ অন্যান্যদের ম্যানেজ করে রাখে। এই জন্য কোন ঝামেলা হয় না।

বাংলা ইনসাইডার