ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জিয়ার আবেগ কি শেষ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি ২০২০ রবিবার, ০৩:৩৫ পিএম
জিয়ার আবেগ কি শেষ?

পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি এগিয়েছে দুটো আবেগের ওপর ভর করে। এর একটা হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে আবেগ। আর অন্যটি জিয়াউর রহমানের আবেগ। জিয়ার আবেগের ওপর ভিত্তি করেই বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্ত ভিত্তি পেয়েছে, দু’বার দেশের ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপির সেই প্রাণভোমরার আজ ৮৪তম জন্মদিন। অথচ নিজেদের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুতে বিএনপিতে নেই তেমন কোনো কর্মসূচী। আজ সকালে দায়সারাভাবে জিয়ার মাজার জিয়ারত করেছেন দলের নেতা-কর্মীরা। ব্যাস এতটুকুই। কর্মসূচীহীন, নিস্তরঙ্গভাবেই পালিত হচ্ছে জিয়ার জন্মদিন। বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যেও তেমন কোন কর্মসূচী দেখা যায়নি আজ। পত্র-পত্রিকা কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও একেবারেই গুরুত্ব পাচ্ছে না জিয়ার জন্মদিনের প্রসঙ্গ। তাহলে কি জিয়ার আবেগের মৃত্যু হলো?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আবেগ কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না জিয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন জিয়া। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করেন। ৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেই হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমান পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তা আজ প্রমাণিত। এই হত্যাকান্ডের পরই জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের উন্মেষ ঘটে। ৭ নভেম্বর তথাকথিত বিপ্লবের পর তিনি প্রথমে উপপ্রধান সামরিক শাসক হন। এরপর জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। বিচারপতি সায়েমকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যদিও এই দলটি ১৯ দফার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদীর মূল বিষয়টি ছিল আওয়ামী লীগ বিরোধীতা করা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত ধারাতে অগ্রসর হওয়া। জিয়াউর রহমান তার দল গঠনের পরপরই জামাতের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন, যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন, স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদর, আল শামস বাহিনীকে পুনর্বাসিত করে। এজন্যই বিএনপিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রবল আধিপত্য লক্ষণীয়।

জিয়াউর রহমান যে প্রধানমন্ত্রী করেন শাহ আজিজুর রহমানকে তিনিও একজন স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন। নিজের এই অপকর্মগুলো ধামাচাপা দিতে জিয়া রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোকে খুব ভালোভাবে ব্যবহার করেছিলেন। অনেকেই মনে করেন এই প্রচারণার কারণেই মানুষের মধ্যে জিয়ার জন্য আবেগ তৈরি হয়েছিল। কোনো আদর্শের কারণে এই আবেগ গড়ে ওঠে নি।

বিশ্লেষকদের একটা অংশ মনে করেন, জিয়ার রাজনীতিতে আদর্শের কোনো জায়গা ছিল না। যেটা ছিল সেটা হচ্ছে ঠকবাজি আর প্রচারণার কলা কৌশল। মূলত এ কারণেই আজ জিয়ার আবেগের মৃত্যু ঘটেছে।

অন্যদিকে জিয়ার আবেগের ওপর ভর করে যে দলটি চলছিল সেটারও নিভু নিভু অবস্থা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। ‘১৮র নির্বাচনে বিএনপি তার সর্বকালের সেরা পরাজয়কে বরণ করে নিয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখন জেলে। জিয়াউর রহমানের পূত্র তারেক জিয়া দুটি মামলায় দণ্ডিত হয়ে লন্ডনে পলাতক। গত দুই দশকে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনটা হয়েছে সেটা হলো মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে একটা দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। মানুষ স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল বদরদের বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে মোটামুটি একটি ঐক্যমতে পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিকভাবেই জিয়ার রাজনীতির সমাধি ঘটেছে। আর তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগেরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি