ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিরক্ত খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২০ বুধবার, ০৪:৩০ পিএম
বিরক্ত খালেদা জিয়া

বিকেল ৪ টা ১৮ মিনিটে বিএসএমএমইউ থেকে বের হলেন খালেদা জিয়া। তিনি তার ভাইয়ের গাড়ীতে উঠেন। তার ভাই সাঈদ ইস্কান্দারই গাড়ীর ড্রাইভার ছিলেন। এ সময় কোন নেতাকর্মী সঙ্গে ছিলেন না। মির্জা ফখরুল ইসলাম এ সময় সবাইকে সরানোর কাজ করছিলেন। এ সময় নেতাকর্মীরা তার গাড়ি ঘিরে ধরে। অনেক চেষ্টার পর তিনি বের হতে পেরেছেন। খালেদা জিয়া গাড়িতে ঢুকে কোন কথাও বলছিলেন না। এমনকি তিনি যে হাত নাড়িয়ে নেতাকর্মীদের অভিবাধন গ্রহণ করেন, সেটাও আজ করেননি। তার চোখে মুখে তখন বিরক্তির ছাপই দেখা গেছে।

সরকারের দেওয়া শর্তের ভিত্তিতে মুক্তি পেলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ বুধবার (২৫ মার্চ) আড়াইটার দিকে বিএসএমএমইউতে কারা কর্মকর্তা চিঠি নিয়ে যান। পরে তিনি মুক্তি পান।

বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব আব্দুস সাত্তার বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, বেলা তিনটা পাঁচ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে মুক্তি দেওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপির মহাসচিব তাকে গ্রহণ করেন। বিএনপি মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা এসময় মাইক নিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন আপনারা চলে যান। বাধ্য করবেন না অন্য ব্যবস্থা নিতে। এ সময় ঘার ধাক্কা দিতেও দেখা যায় মহাসচিবকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজ উদ্যোগে মুক্তি পেলেন খালেদা জিয়া। নির্বাহী আদেশে তিনি ছয় মাসের জন্য মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। বিএনপি দফায় দফায় ব্যর্থ হয়েছেন তাকে মুক্ত করার। এরপর সরকারের সঙ্গে নানা দেন দরবার করলেও মুক্তি মেলেননি খালেদা জিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেন সেই ঘোষণার আগে নেতারা কিছুই জানতেন না। সবাই চমকে গিয়েছে। সরকার পুরো আইনী প্রকিয়াতেই মুক্তি দিচ্ছেন খালেদা জিয়াকে। মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছে তাকে। তিনি বাসায় বসে চিকিৎসা করবেন ও বিদেশ যেতে পারবেন না।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিতে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বের হওয়ার আগে কয়েকটি ব্যাগে তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়েছেন পরিবারের সঙ্গে আসা গৃহকর্মীরা। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেখান থেকে গত বছর ১ এপ্রিল তাকে নিয়ে আসা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। দীর্ঘ ২ বছর ১ মাস ১৬ দিন পর আবার সেই ফিরোজায় উঠতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

২ বছর ১ মাস পর আবার সেই বাড়িতেই উঠতে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এতদিন ওই বাড়িতে গৃহকর্মী ছাড়া আর কেউ বসবাস করেননি। তবে তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলী রহমান সিঁথি মাঝে মধ্যে লন্ডন থেকে ঢাকায় এলে উঠতেন ওই বাড়িতে।

গতকাল মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে (করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট) সরকার তার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশ যেতে পারবেন না, এমন শর্তে এই সাজা স্থগিত থাকবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে সেখানে বিএনপি প্রধানের কারামুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। সর্বশেষ তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যায়। ফাইলে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেয়ায় মুক্তি পেলেন খালেদা জিয়া।

প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। রায় ঘোষণার পর খালেদাকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাখা হয়। এরপর ৩০ অক্টোবর এই মামলায় আপিলে তার আরও পাঁচ বছরের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট।

একই বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন একই আদালত। রায়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড ছাড়াও খালেদা জিয়াকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

পরে কারান্তরীণ অবস্থায়ই চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে নেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে তাকে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়। এভাবে কয়েক দফায় তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এবং হাসপাতাল থেকে কারাগারে নেয়া হয়। সবশেষ গত বছরের ১ এপ্রিল তাকে তৃতীয় দফায় হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের ৬২১ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন।

মামলা দু’টি ষড়যন্ত্রমূলক বলার পাশাপাশি বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এক্ষেত্রে তারা আদালতেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বরাবরই বিফল হতে হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বকে।