ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

করোনা নিয়ে পথহারা বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ মে ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৬:০০ পিএম
করোনা নিয়ে পথহারা বাংলাদেশ

বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করার পথ হারিয়ে ফেলেছে। করোনার পিক সিজনেও বাংলাদেশের নেই কোনো এক্সিট প্ল্যান। কেউ জানে না বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে, কতদিনে করোনার সংক্রমণ চূড়ান্ত পর্যায়ে যাবে, কখন করোনা সংক্রমণ কমবে এবং এই কমার পর জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আশু করণীয় কী।

করোনা নিয়ে আমরা যা কিছু করছি সব অনুমান নির্ভর, অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বহীন এবং শুধুমাত্র কিছু সংখ্যাতত্ত্বের পরিসংখ্যান ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি আমাদের জন্য ভয়াবহ আতঙ্কের। করোনার ৭৫তম দিন আজ আমরা অতিবাহিত করলাম। এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো দিক নির্দেশনা যে আমরা কী করবো। স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ১৪ হাজার ১১৪ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে ২৮ হাজার ৫১১ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জনের ১৩ জন মানুষ করোনায় আক্রান্ত। আর বাংলাদেশে এখন মৃত্যুর সংখ্যাও ৪০০ পেরিয়ে গেছে। আর সুস্থ হয়েছে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসেব মতে ৫ হাজার ৬০২ জন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য যে সংকটগুলো দেখা দিয়েছে এবং বাংলাদেশ যে দিক নির্দেশনাহীন তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা হলো-

১. কোনও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্ষেপণ নেই

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ কতদূর যাবে বা কোথায় যাবে এটি নিয়ে কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্ষেপণ নেই। আমরা শুধুমাত্র প্রতিদিনের তথ্যগুলো দিচ্ছি, যোগফল ঘোষণা করছি। শতকরা হিসেব ঘোষণা করছি। কিন্তু প্রত্যেকটি দেশে করোনার যখন পিক সিজন গেছে, তখন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্ষেপণ হয়েছে। যেখান থেকে তারা বুঝতে পেরেছে যে কখন করোনা সংক্রমণ আস্তে আস্তে কমে যাবে। সে অনুযায়ী তারা একটা এক্সিট প্ল্যান দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম কোনো প্রক্ষেপণ নেই। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৮জন বিশেষজ্ঞ দিয়ে একটি প্রক্ষেপণ পত্র তৈরি করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে, ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত বাংলাদেশে সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু এটিকে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো প্রক্ষেপণ নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ৫০ হাজার এবং ১ লাখের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তবে কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে, বাংলাদেশে যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট ধরনের লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্ব মানা না হবে, ততদিন পর্যন্ত এ ধরনের প্রক্ষেপণ করা সম্ভব না। কাজেই বাংলাদেশে করোনার ভবিষ্যৎ কী এবং কোন পথে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমরা পথহারা।

২. চিকিৎসা নিয়ে পথহারা

বাংলাদেশে যে যার মতো করে করোনার চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করছে। এমনকি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করোনার মহৌষধ বলে কেউ কেউ প্রচার করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি বলে দেয়নি এবং এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু মুনাফালোভী কিছু কিছু ওষুধ কোম্পানি অন্য ওষুধকে করোনার ওষুধ বলে ঢাক ঢোল পিটিয়ে অনুষ্ঠান করছে। যে ওষুধটি শুধুমাত্র করোনার কিছু কিছু উপসর্গ দূর করতে পারে, সেই ওষুধকেও করোনার ওষুধ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্লাজমা থেরাপির কথা বলা হচ্ছে। অথচ সেটা নিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো সুসংবাদ নেই, কারণ বিপুল সংখ্যক রোগীকে প্লাজমা থেরাপি দেওয়াটা করটুকু সম্ভবপর হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের করোনা চিকিৎসার যে প্রটোকল তা এখনও নির্দিষ্ট নয়, বরং বিভিন্ন দেশ যা যা অনুসরণ করছে তার সবগুলো নিয়েই বাংলাদেশ একটা খিচুরি পাকানোর চেষ্টা করছে। এটাও হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কাজেই চিকিৎসার দিক থেকেও বাংলাদেশ পথহারা।

৩. পরিকল্পনাহীন করোনা চিকিৎসা

বাংলাদেশে করোনা চিকিৎসার প্রথম দিকে শুধু সরকারি হাসপাতালগুলোতেই চিকিৎসা দেওয়া হতো। এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক ধরনের জগাখিচুরি তৈরি হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যারা অন্য চিকিৎসা নেন, তারা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও করোনা ইউনিট করার ফলে সেখানেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে। পুরো ব্যাপারটাই একটা গোলকধাঁধার মতো অবস্থা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সম্ভবত জানে না যে তারা কী করছে এবং কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এরকম সবক্ষেত্রেই একটা অস্পষ্টতা, এক ধরনের ব্যাখ্যাহীনতা এবং অনিশ্চয়তা। যার ফলে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পিত বিন্যাস নেই, যে করোনা কতদিন থাকবে, কবে করোনা যাবে এবং আমরা কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবো। কিংবা করোনা পরিস্থিতি কি আরও ভয়াবহ হয়ে যাবে? হঠাৎ করে কি আমাদের ইতালি বা স্পেনের মতো মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাবে? আমাদের বাংলাদেশে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি হবে? নাকি আমরা দীর্ঘমেয়াদী করোনার সঙ্গে বসবাস করতে থাকবো? জনস্বাস্থ্যের জন্য এসব উত্তরগুলো জানা জরুরী। আমাদের মানসিক সুস্থতার জন্যেও, এমনকি অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আমাদের এগিয়ে চলার জন্যেও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা দরকার। কিন্তু আমরা করোনা নিয়ে এখন পর্যন্ত পথহারা। আমরা জানি না আমাদের গন্তব্য কোথায়।