ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

কারো নিয়ন্ত্রণে নেই বেসরকারি হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২০ মঙ্গলবার, ০৮:০০ পিএম
কারো নিয়ন্ত্রণে নেই বেসরকারি হাসপাতাল

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। করোনা সঙ্কটের শুরু থেকেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকদের নিয়ন্ত্রণহীন এবং অযৌক্তিক আচরণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল এবং এখন তাঁদের স্বেচ্ছাচারিতা লাগামহীন হয়ে গেছে। যেন তাঁদের কেউ দেখার নেই, তাঁরা জবাবদিহিতার আওতার মধ্যেই নেই। বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই সকল ধরণের চিকিৎসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কোন কোন হাসপাতাল সেবা প্রদান শুরু করলেও অধিকাংশ মানুষ সেই সময় থেকে কার্যত চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় রয়েছে। এরপর যখন সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলো যে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা করতে হবে, তখন অনেকগুলো বেসরকারি হাসপাতাল এই কাজ শুরু করলেও সেই ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক ত্রুটি এবং অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকগুলো হাসপাতাল সরকারের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে আবার রোগীদের কাছ থেকেও টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া কোভিড এবং নন কোভিড রোগীদের আলাদা চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও ইউনাইটেড হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল কোভিড এবং নন কোভিড রোগীদের একাকার করে চিকিৎসা দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জবাবদিহিতা ছিলনা দীর্ঘদিন ধরেই। এখন করোনাকালে তাঁদের যে আচরণ এবং অর্থলিপ্সা চরমভাবে প্রকাশিত হয়েছে, একারণে অবিলম্বে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে যে সকল অব্যবস্থাপনা এবং স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাঁর মধ্যে রয়েছে-

১. কোভিড-নন কোভিড আলাদা ব্যবস্থা নেই

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ চিকিৎসা প্রদান সংক্রান্ত এক পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। সেই পরিপত্রে বলা হয়েছিল যে, পঞ্চাশ বেডের উর্ধ্ব বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কোভিড-১৯ এবং নন কোভিড রোগীদের আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে। কিন্তু ইউনাইটেড হাসপাতালের সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল গেটেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে সেখানে যাওয়া ডায়ালাইসিসের রোগীসহ অন্যান্য রোগীরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। ইউনাইটেড হাসপাতালে কিছুদিন আগেই পাঁচজন মারা গেল, সেই মৃত্যুর তদন্ত রিপোর্ট এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি, তদন্তের ব্যাপারেও কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

২. পৃথক সিসিইউ নেই

অধিকাংশ হাসপাতালগুলোতে করোনা আক্রান্ত রোগী যখন খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছে তখনই সিসিইউ-তে নেওয়ার দরকার হচ্ছে, কিন্তু সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে যে, অনেকগুলো হাসপাতালেই কোভিড এবং নন কোভিড রোগীদের জন্য পৃথক সিসিইউ নেই। ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলো মৃত্যুকূপে পরিণত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

৩. ইচ্ছেমতো বিল নেওয়া

করোনার সংক্রমণের পর এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো যেন এক করোনা ব্যবসা শুরু করেছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে লাগামহীন বিল নেওয়া হচ্ছে, এখানে কোন জবাবদিহিতা নেই এবং কত বিল নেওয়া হবে সেই সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা না থাকার ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে যেভাবে পারছে করোনা চিকিৎসার বিল হাঁকছে। এই ব্যাপারে একজন চিকিৎসক বলেছেন যে, ডেঙ্গু টেস্টের সময় সরকার যেমন একটি নির্দিষ্ট ফি ধার্য করে দিয়েছিল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উপর নজরদারি রেখেছিল, এবার করোনায় তা না থাকার ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলো যার কাছ থেকে যেভাবে পারছে মাছের বাজারের মতো অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এটাই একটি জবাবদিহিতাবিহীন অরাজকর অবস্থা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকরা।

৪. গুরুতর অসুস্থ হলেই চিকিৎসা দিচ্ছে না

গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরছে এমন খবর প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে এবং হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে, আইসিইউ বেড খালি নেই, বিছানা খালি নেই ইত্যাদি কথা বলে রোগীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এরকম রোগী ফেরত পাঠানো একটি চরম অনৈতিক কাজ বলে মনে করছেন শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকরা। কিন্তু নীতি-নৈতিকতার কথা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকরা কবে বুঝেছিলেন?

৫. চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা চরম ঝুঁকিতে

বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে সত্যি, কিন্তু হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ পিপিই বা চিকিৎসা উপকরণ দরকার, সেই পর্যাপ্ত উপকরণ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি অনেকগুলো হাসপাতালে বেতন-ভাতা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর এইকারণেই শেষ পর্যন্ত চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। যারা বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়মিত এখনো জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে যাচ্ছেন, সেই স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে তাঁরা ঝুঁকির মধ্যেই বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অবিলম্বে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত এবং এসমস্ত অরাজকতার লাগাম টেনে ধরা দরকার। নাহলে পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়ে যেতে পারে।