ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

লাল, হলুদ ও সবুজ অঞ্চলঃ আরেক বিভ্রান্তি?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২০ মঙ্গলবার, ০৮:৫৯ পিএম
লাল, হলুদ ও সবুজ অঞ্চলঃ আরেক বিভ্রান্তি?

করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা বিবেচনা করে করোনা সংক্রমিত এলাকাগুলোকে তিনটি জোনে ভাগ করার ব্যাপারে সরকার কাজ করছে বলে জানা গেছে। গতকাল মন্ত্রীপরিষদের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিবেচনায় দেশের ৬৪ টি জেলাকে তিনটি ভাগে ভাগ করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বলা হয়েছে যে, লাল, হলুদ এবং সবুজ- এই তিনভাগে ভাগ করা হবে এলাকাগুলোকে। সবথেকে সংক্রমিত এলাকাগুলোকে লাল বা রেড জোন, অপেক্ষাকৃত কম সংক্রমিত এলাকাগুলোকে হলুদ জোন এবং সংক্রমণ নেই যেখানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যাবে সেখানে সবুজ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ বাড়ছে। তাই লাল, হলুদ এবং সবুজ জোন চিহ্নিত করা হচ্ছে। 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, সবকিছু খুলে দেওয়ার পর এভাবে লাল, হলুদ এবং সবুজ জোন চিহ্নিত করলে আবার নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাঁরা মনে করছেন নানা কারণে বাংলাদেশকে এই জোন হিসেবে বিভক্ত করা বিভ্রান্তিকর এবং ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে তাঁরা কতগুলো যুক্তি উপস্থাপন করছেন।

প্রথমত তাঁরা বলছেন যে, বাংলাদেশে এখন সবথেকে বেশি সংক্রমিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম, এরপর তৃতীয় স্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ। অথচ এই এলাকাগুলোই হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। রেড জোন হওয়ার কারণে যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম-নারায়ণগঞ্জ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে অর্থনীতির কি হবে? অর্থনীতির গতি সঞ্চারণের জন্যেই বাংলাদেশ ঝুঁকি নিয়েও সবকিছু সীমিত আকারে সচল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় গত ৩১শে মে। আবার এখন যদি রেড জোন বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে অর্থনীতি সম্পূর্ণ গতি হারাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জ। এই তিনটি জেলাই যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে পরিস্থিতি খারাপ হবে।

দ্বিতীয়ত, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বাংলাদেশে সামাজিক সংক্রমণ এখন ছড়িয়ে পড়েছে। যেটিকে এখন সবুজ জোন মনে করা হচ্ছে, কম ঝুকিপূর্ণ মনে হচ্ছে, তা আগামীতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। আবার যেটা এখন হলুদ জোন হিসেবে মনে করা হচ্ছে সেটাও রেড জোন বা সবুজে পরিণত হতে সময় নিবেনা। তাছাড়া আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করছে এবং এর ফলে সামাজিক সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে চলাচল বন্ধ করাটা অসম্ভব ব্যাপার। উদাহরণ দিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বলেন যে, ঈদের ছুটির আগে ঢাকাকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। মানুষ যে যেভাবে পেরেছে ছুটে চলে গেছে। কাজেই সবকিছু খুলে দেওয়ার পর আমাদের এমন জোন ম্যাপ ভাগ দেয়াটা কতটুকু সফল হবে সেটা এখন বড় প্রশ্ন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া তাঁরা মনে করছেন যে, এখন গোটা বাংলাদেশই একটি জোন। তাই কোথায় কম সংক্রমণ, কোথায় বেশি সংক্রমণ সেটি বড় বিবেচ্য বিষয় নয়। কারণ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং কম সংক্রমিত যে জায়গাগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেই জায়গাগুলোতে কম পরীক্ষা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রামে অনেক বেশি পরীক্ষার কারণে অনেক বেশি শনাক্ত হচ্ছে। বরং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জোন ম্যাপ ভাগ করার আগে ব্যাপক পরীক্ষা প্রয়োজন, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঈদের ছুটিতে মানুষের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া একটি নতুন সঙ্কট তৈরি করেছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে দরকার ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা, সংক্রমিতদের চিহ্নিত করা, সংক্রমিতদের আলাদা করা এবং তাঁদের কন্টাক্ট ট্রেসিং করা। এখন জোন-জোন ভাগ করলে পরস্থিতি উন্নতির থেকে অবনতি হওয়ার শঙ্কাই বেশি।