ঢাকা, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২০ মঙ্গলবার, ০৯:০১ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?

করোনা মোকাবেলার শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একের পর এক দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড করছে, তাঁদের অযোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে, তাঁদের সমন্বয়হীনতা প্রকট আকারে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি এবং অযোগ্যতা যত দিন যাচ্ছে তত প্রকাশ্য হচ্ছে। আর এসমস্ত বাস্তবতার প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকি করার দায়িত্ব নেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকে তাঁদের পরামর্শ দেন যেন তারা জনকল্যাণ করতে পারে, জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বক্তব্য খণ্ডন করাই যেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ হয়ে উঠেছে। আমরা যদি দেখে নেই যে করোনা পরিস্থিতির পর থেকে কিভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বক্তব্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছে তাহলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে।

পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারি

প্রধানমন্ত্রী যখন সারাদেশের সবগুলো জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যু্ক্ত হয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে মাস্কগুলো দেওয়া হয়েছে সেই মাস্কগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সুরক্ষা সামগ্রীগুলোও মানসম্মত নয়। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকতাদের বললেন যে এন-৯৫ মাস্ক বলে যেগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো আসলে এন-৯৫ মাস্ক নয়৷ মোড়কে এন-৯৫ লেখা থাকলেও বাস্তবে তা নয়। একইসঙ্গে যে জিনিসগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে সেগুলো সঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে কিনা, মোড়কে যা লেখা আছে তা ভেতরে ঠিকঠাকভাবে আছে কিনা তা যাচাই করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু এর পরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডনের জন্য উঠেপড়ে লাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে সিএমএইচডি`র সাবেক পরিচালক পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে যে দুর্নীতি হয়নি তার ফিরিস্তি দেওয়া শুরু করেন এবং উপর্যুপরি ৩ দিন এই ফিরিস্তিগুলো দেন। যেন তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যই খণ্ডন করছেন। এরপর সিএমএইচডি’র পরিচালককে বিদায় দিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু বিদায় নেওয়ার সময় তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে প্যানডোরা বাক্স খুলে দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির হোতা কারা, কিভাবে দুর্নীতি হচ্ছে তাঁর বিস্তারিত তুলে ধরেন।

দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতির কথা। তিনি বলছেন দুর্নীতি যারাই করবে, বিশেষ করে করোনাকালে যারা দুর্নীতি করবে তাঁদের ছাড় দেওয়া হবেনা এবং এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তরফ থেকে তদন্তের নির্দেশনা দেন। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি এবং তদন্ত রিপোর্টে যাদের নাম এসেছে তাঁদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়নি।

এক ব্যক্তিকে পাঁচ দায়িত্ব

এই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে এবং এটা যে এক প্রকার স্যাবোটাজ সেটা আরো স্পষ্ট হয় যখন করোনা মোকাবেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক এক ছাত্রদল নেতাকে। শুধু দায়িত্ব নয়, ঐ নেতাকে পাঁচটি দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছিল এবং এই বিষয়টি যখন প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে তখন প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সেই ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করে। এরপর নতুন সচিব আব্দুল মান্নান দায়িত্ব গ্রহণের পর এই ব্যাপারটি নিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত অনেক বিলম্ব হলেও ডা. ইকবাল কবীরকে সেই পাঁচটি দায়িত্ব থেকে ওএসডি করা হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডা. ইকবাল কবীরের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করে, ভাবখানা এমন যে যেন প্রধানমন্ত্রী ভুল বলছেন এবং তারাই সঠিক। 

বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা

বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং করোনা চিকিৎসা শুরুতে বিনামূল্যে ছিল। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে বেসরকারি হাসপাতালগুলো বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষা করাবে এবং সরকার টাকা দিবে৷ কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসার জন্য সরকারি টাকাও যেমন নিতে শুরু করে অন্যদিকে জনগণের টাকাও হাতিয়ে নেওয়া অব্যহত রাখে। এই অবস্থা প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তিনি কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের নাম উল্লেখ করে বলেন যে যারা সরকারি টাকা নেওয়ার পর জনগণের টাকাও নিচ্ছে তাদের সরকারি টাকা বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘুমিয়ে ছিল। তাহলে কি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গোপন যোগসাজশ ছিল? প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বেসরকারি হাসপাতালগুলো এখন যেমন খুশী তেমন বিল হাঁকছেন, এটা নিয়ন্ত্রণে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর।

২০ কোটি টাকা ১ মাসের বিল

ঢাকা মেডিকেল কলেজে করোনা ইউনিট করা হয়েছে অনেক গড়িমসির পর এবং প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে। এইখানে চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়ার ১ মাসের বিল এসেছে ২০ কোটি টাকা। এই বিল নিয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে এরকম আর বিল দেওয়া হবেনা মর্মে এবারের বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন বিষয়টি অস্বাভাবিক, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলেন, তিনি বললেন যে, বিল সব ঠিকই আছে, কোন বাড়তি বিল হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রী কি বলতে পারবেন যে, এই ১ মাসে কতজন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী ডিউটি করেছেন, কতটি হোটেলে থাকা হয়েছে, হোটেল ভাড়া কত হয়েছিল এবং অন্যান্য খরচ কি? তিনি  না জেনে বুঝে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অবস্থান করলেন। এটা শুধু শিষ্টাচার বিরোধী নয়, বরং জাতীয় সংসদীয় নিয়মনীতির-ও পরিপন্থি। এভাবেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। আসলে করোনা মোকাবেলা নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার মিশনে নেমেছে এবং এই মিশনে সফল হওয়ার জন্য সবাই যার যার অবস্থান থেকে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নতুন সচিব আব্দুল মান্নান একাই যেন স্রোতের বিপরীতে লড়ছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা পালনের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময় অল্প কয়েকদিন এবং পুরো বিষয়টিই যখন একটি সিণ্ডিকেটের কাছে জিম্মি তখন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব একা কি করবেন সেটাও দেখার বিষয়।