ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘অনতিবিলম্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৫:০১ পিএম
‘অনতিবিলম্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে’

প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিকল্প নির্বাহী পরিচালক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেছেন, ‘অনতিবিলম্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে। ২০১৪ সাল থেকে যেই হাসপাতালটির অনুমোদন নেই, সেই হাসপাতালটিকেই করোনা পরীক্ষার অনুমতি দিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আমি আমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, এ ধরনের অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করার পূর্বে কিছু কাগজপত্র যেমন- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আছে কিনা, ট্রেড লাইসেন্স আছে কিনা, এসব দেখা বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। এসব না দেখেই কিংবা নাই জেনেও করোনা পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়ার মানে হলো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার বিনিময়ে এটা করা হয়েছে।’ রিজেন্ট হাসপাতালের কেলেঙ্কারির বিষয়ে ‘বাংলা ইনসাইডার’ এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) এই চেয়ারম্যান সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে একজন আমাকে ফোন করে একটা ওষুধের বিষয়ে বললেন, ওষুধটি ব্যবহারে উপকার হচ্ছে। আমি যেন বিএমআরসি থেকে ওষুধটাকে রিকগনাইজ করে দিই। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও আমাকে এ বিষয়ে বললেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাকে ‘চাচা’ বলে ডাকেন। আমিও তাকে খুব স্নেহ করি। কিন্তু তারপরও সরাসরি আমি তাকে বললাম, ‘এটার কিছু নিয়ম কানুন আছে। সেগুলো পেরিয়ে না আসলে এ ধরনের অনুমোদন আমি দিতে পারবো না। নিয়মের বাইরে যাওয়া যাবে না’। এর দু’মাস পরে তখনকার স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান খান আমাকে মন্ত্রীর কথা বলে আবার অনুরোধ করেন যে, একটু তাড়াতাড়ি যেন আমি অনুমোদনের ব্যবস্থা করি। আমি তখনও তাকে সরাসরি বলি যে, ‘এটা সম্ভব নয়। সব নিয়ম কানুন পেরিয়ে তবেই অনুমোদন পেতে হবে। এ ব্যাপারে আমাকে দ্বিতীয়বার আর অনুরোধ করবেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে এখানে বসিয়েছেন। আমি আইনমাফিক সবকিছু করবো’। আমি এই উদাহরণটি এ কারণেই দিলাম যে, অনেক অনুরোধ, তদ্বির আসতেই পারে। কিন্তু অনুরোধ আসলেই নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সেটা মানতে হবে, এটা কোনো কথা হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে কে কতটা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন, তা আমি জানি না। কিন্তু অর্থের লেনদেন যে হয়েছে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এটা স্বাভাবিক যে, সব ধরনের লাইসেন্স আছে কিনা সেটা মন্ত্রী মহোদয়ের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি মহোদয়ের অবশ্যই এগুলো দেখার দায়িত্ব। তিনি যদি সেটা না-ই করেন, তবে তিনি কি কাজ করেন- সেটা এক বড় প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সবাইকে কোনো দরকারে ফোন করলে পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সময় তারা ফোন ধরতে না পারলেও পরবর্তীতে কলব্যাক করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, একান্ত সচিবও এটা করেন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তা ব্যক্তিদের কোনো কাজে ফোন দিলে পাওয়া যায় না। করোনা মোকাবেলার টেকনিক্যাল সব কাজগুলো এখান থেকে হওয়ার কথা। এই অফিসটার সবচেয়ে বেশি তৎপর থাকার কথা। অথচ এই অফিসটাই একেবারে অথর্ব হয়ে বসে আছে। একের পর মাস্ক, পিপিই নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে অভিযগ এলো। আরও বিভিন্ন বিষয়ে রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাসপাতালে নানা অভিযোগ পাওয়া গেল। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ হাসপাতালগুলোতে গেলেন না। করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত বিভিন্ন হাসপাতালে কোথায় কি হচ্ছে, সেটা তো তাদের গিয়ে দেখা দায়িত্ব। তারা বসে বসে কোন কাজটা করছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি যে, এই অফিসের সবাই অসৎ নন, অনেকেই আছেন যারা সৎ। তবে এটা প্রমাণিত যে সবাই অথর্ব। না হলে এত এত কেলেঙ্কারি- দুর্নীতি হচ্ছে কি করে!’

ডা. মোদাচ্ছের আলী বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে তো অভিযোগের পাহাড়। আগেও এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু তারপরও কেন কোনো তদন্ত হয়নি। এমনকি এখনও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে নমনীয় আচরণ করছে। এতে এটাই প্রমাণিত হয়ে যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ ওই হাসপাতালের সাথে যুক্ত, এমনকি ওই হাসপাতালে তাদের কারও মালিকানার অংশও থাকতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা একটা ছবিতে দেখলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির কামরায় তার উপস্থিতিতে রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ পায়ের উপর পা তুলে খোশ গল্প করছেন। সেখানে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলানকেও দেখা গেছে। শোনা যায়, ডা. এম ইকবাল আর্সলান নাকি দিনের অনেকটা সময় ডিজির অফিসেই থাকেন। তিনি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বললেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি পদে কোনো আমলাকে নিয়োগ দেওয়া হলে ফল ভালো হবে না। তার এই বক্তব্যের মানে কি? ডিজি’র কামরায় সাহেদের সঙ্গে তার থাকার মানে কি? এগুলোর তদন্ত হওয়া উচিৎ।’

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাত ভঙ্গুর বলে যে অভিযোগ করছে সাধারণ মানুষ, এটা সত্য বলে আমি মনে করি। আমি এটাও মনে করি যে, বর্তমান সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করার জন্যই স্বাস্থ্য খাতের কেলেঙ্কারিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হচ্ছে। সরকারবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদে জেঁকে বসেছেন। একের পর এক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তাই এখনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে।’