ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

রেলওয়ের কেনাকাটায় ‘সাগর চুরি’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১১:৫৯ এএম
রেলওয়ের কেনাকাটায় ‘সাগর চুরি’

 

টাকার অঙ্ক দেখে যে কারোরই মনে হতে পারে, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের কর্তারা তালা, বালতি কিংবা বাঁশি নয়, কিনেছেন ‘আকাশের চাঁদ’। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভিন্ন স্টেশনের মালপত্র কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৩ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে কেনা হয়েছে। সেখানে একটি তালার দাম পড়েছে পাঁচ হাজার ৫৫০ টাকা।  একটি প্লাস্টিকের বালতি কিনতে লেগেছে ১ হাজার ৮৯০ টাকা। আর সাধারণ ফুঁ দেওয়া যে বাঁশি, সেটা কেনা হয়েছে ৪১৫ টাকায়। এমন ‘সাগরচুরি’ হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের কেনাকাটায়। বাজার দরের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে অটবি প্লাস্টিক চেয়ার। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ২০০ টাকা। প্রতি সেট চেয়ারের বাজারদর ১১ হাজার ২২০ টাকা হলেও কেনা হয়েছে ৪৯ হাজার ৪৭০ টাকায়। এদিকে বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে কেনা হয়েছে ৪০টি উন্নত মানের লোহার ফিক্সড ক্যাশ সেভ। বাজারে দাম ৩০ হাজার ৮০০ টাকা হলেও প্রতিটি কেনা হয়েছে ৬০ হাজার ৪৯০ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৪৭৫ টাকা। 

পরিবহন অডিট অধিদপ্তর যে নিরীক্ষা করেছে তাতে প্রায় প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার কেনাকাটার প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করেছেন।
দ্বিগুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে ১০০টি উন্নত মানের কাঠের অভিযোগ বাক্স। প্রতিটি তিন হাজার ৭৪৮ টাকা দরে। কিন্তু বাজারে প্রতিটির দাম ভ্যাটসহ এক হাজার ৫০৮ টাকা। এতে ক্ষতি হয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার টাকা। তিন গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে ১৫০টি ইলেকট্রিক দেয়াল ঘড়ি। প্রতিটি ঘড়ি কেনা হয়েছে চার হাজার ৪৯৮ টাকায়। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি ঘড়ির দাম এক হাজার ৫০০ টাকা। এখানে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তিন লাখ ৮২ হাজার ২০০ টাকা। তিন গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে ২০০টি ফায়ার বাকেট এবং ৮০টি ফায়ার বাকেট স্ট্যান্ড। অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বাজার দরের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে কেনার কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ছয় লাখ ৫৮ হাজার ৬৮০ টাকা।

১৬ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে পেডাল ডাস্টবিন। পেডাল ডাস্টবিনের গায়ে প্রতিটির দাম লেখা আছে ৬০০ টাকা। ৩০ শতাংশ ভ্যাটসহ তা হবে ৭৮০ টাকা। অথচ কেনা হয়েছে প্রতিটি সর্বনিম্ন আট হাজার ৯৯৫ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ৭৫০ টাকা।

ভিআইপি পর্দা কেনা হয়েছে ১১ গুণ বেশি দামে। এক হাজার ২০০ টাকা দামের পর্দা কেনা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকায়। বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে ব্যবহারের জন্য এসব পর্দা কেনা হয়। ভিআইপি পর্দা কেনা হলেও তা রেজিস্টারে হিসাব রাখা হয়নি । বাজার যাচাইও করা হয়নি। কাল্পনিকভাবে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ভিআইপি পর্দা কিনে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৩০ টাকা। ১১ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে লাগেজ ফিতাসহ ৭৫ হাজার ওয়াগন কার্ড (ওপিটি কার্ড-২১৬)। গত বছরের ২০ জানুয়ারি ৫০ হাজার কার্ড কেনা হয়েছে ৪৯.৩৮ টাকা দরে। পরে একই বছরের ১৭ জুন ২৫ হাজার কার্ড কেনা হয়েছে ১৯.৯৯ টাকা দরে। আলাদাভাবে একই দ্রব্য কেনার দরেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। অডিট কমিটি বাজার যাচাই করে জানতে পারে, ওই কার্ডের প্রকৃত দাম ৩.৪০ টাকা। এতে আর্থিক ক্ষতি  হয়েছে ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৫০ টাকা।

প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে ভিজিটিং চেয়ার। ৩০ শতাংশ ভ্যাটসহ ওই চেয়ারের প্রতিটির প্রকৃত বাজারদর ছয় হাজার ৮২৫ টাকা, কিন্তু পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ২০টি ভিজিটিং চেয়ারের প্রতিটি কিনেছে ১৬ হাজার ৮৭০ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দুই লাখ ৯০০ টাকা। ২০১৯ সালের ১৭ জুন দ্বিগুণ দামে কেনা হয় ২২০টি লাগেজ ট্রলি, যার প্রতিটির বাজারদর তিন হাজার ৩০০ টাকা, কিন্তু কেনা হয়েছে প্রতিটি ১০ হাজার ২৯৮ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৬০ টাকা।

৫০০টি উন্নত মানের পাপোশ কেনা হয়েছে চার গুণ বেশি দামে। প্রতিটি পাপোশের প্রকৃত বাজারদর ৩০০ টাকা হলেও কেনা হয়েছে এক হাজার ৪৭৬ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

তোশিবা ব্র্যান্ডের একটি ফটোকপিয়ারের বাজারদর ভ্যাটসহ এক লাখ ১১ হাজার ২৮০ টাকা হলেও তা কেনা হয়েছে চার লাখ ৬৩ হাজার ২০ টাকায়। চার গুণ উচ্চমূল্যে ফটোকপিয়ারটি কেনার কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭৪০ টাকা।

৩২ সেট তিন সিটের গদিযুক্ত স্টিল ফ্রেমের চেয়ার কেনা হয়েছে ওই অর্থবছরে। এসব চেয়ার বাজারদরের চেয়ে চার গুণ বেশি দামে কেনা  হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬ টাকা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তিন সিটের চেয়ার কেনা হলেও সরবরাহ করা হয়েছে দুই সিটের চেয়ার।

২০১৯ সালের ১৪ মার্চ ১০০টি উন্নত মানের ফার্স্ট এইড বক্স কেনা হয়। প্রতিটি বক্স কেনা হয়েছে ছয় হাজার ৪৯৬ টাকা দরে। ওই বক্সের প্রতিটির বাজারদর এক হাজার ৪৫০ টাকা। এতে ক্ষতি হয়েছে চার লাখ ৬১ হাজার ১০০ টাকা।

এ বছরের শুরুর দিকে পরিবহন অডিট অধিদপ্তর রেলওয়ের বিভিন্ন মাল কেনাকাটাসহ অন্যান্য বিষয়ে নিরীক্ষা করে। এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের এমন সাগর চুরির বিষয়টি উঠে আসে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে বেশি দামে মালপত্র কেনা হয়েছে। এতে তছরুপ হয়েছে সরকারের ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

এসব ব্যাপারে রাজশাহীর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ ভুঁঞা বলেন, ‘অডিট হয়েছে শুনেছি। অডিট প্রতিবেদনের একটি কপি আমার কাছে আসার কথা। এখনো আসেনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই দায়িত্বে আমি ছিলাম না। ২০২০ সালে আমি এখানে এসেছি। কেনাকাটা যা হয়েছে তা আমার আসার আগে। তার পরও অডিট প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যা করার আমি করব।’

বাজার দরের চেয়ে বাড়তি দামে স্টেশনের বিভিন্ন মাল কেনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম রেজা সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে নেই। আমি দায়িত্ব নিয়েছি কিছু দিন হলো। বিষয়টি জানি না। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বিষয়টি দেখব।’