ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আরিফিন শুভঃ দ্যা ট্রান্সফর্মার

মাহাবুব মোর্শেদ রিফাত
প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার, ০৫:৩০ পিএম
আরিফিন শুভঃ দ্যা ট্রান্সফর্মার

 

একটা সময় ছিলো যখন গল্প নির্ভর চলচ্চিত্র অভিনয়ের জন্য ঢাকাই চলচ্চিত্রে একসাথে একঝাক তারকা অভিনেতা ছিলেন। আমাদের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন নায়ক রাজ রাজ্জাকের মতো দুর্দান্ত অভিনেতা। আমাদের ছিলো আলমগীর, ফারুক, সোহেল রানার মতো অভিনেতারা। সেই সাথে এই আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্রে ছিলো পুরো নব্বই দশক কাপিয়ে বেড়ানো সোহেল চৌধুরী, ওমর সানী, বাপ্পারাজ, সালমান শাহ, রুবেল ও জসিমের মতো অভিনেতারা।

একটা সময় পাশের দেশ ভারতে্র কলকাতা কিংবা বলিউড থেকেও অনেকটাই এগিয়ে ছিলাম আমরা। ওই সময়টাতে প্রায়শই পাশের দেশের সুপারস্টারদের সাথে অভিনয়ে টেক্কা দিতেন আমাদের সালমান, রাজ্জাক আর রিয়াজেরা। কালের ধারায় দর্শকদের রুচির পরিবর্তন এসেছে। সেই সাথে বদলে গেছে নায়কের সংজ্ঞা। বিশ্ব চলচ্চিত্রের অনেক দেশেই বাণিজ্যিক সিনেমার নায়ক বলতেই আজকাল বোঝায় দুর্দান্ত অভিনয়ের সাথে পেশি বহুল শরীর।

ধীরে ধীরে সেই ধারায় যুক্ত হয়েছেন হলিউড, বলিউড, তামিল, মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে আমাদের পাশের দেশের কলকাতার নায়কেরা। এখন সিনেমা হলে নায়কের দুর্দান্ত বডি ল্যাংগুয়েজ আর অভিনয়ের পাশাপাশি দর্শক সিটি বাজিয়ে ওঠে সালমান খান, আমির খান, টাইগার শ্রুফ, জিত, দেবদের পেশিবহুল শরীর দেখে। একঝাক দুর্দান্ত নায়ক আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্রে থাকলেও জসিম থেকে শুরু করে রুবেল, আলমগীর, রিয়াজ বা হালের সুপারস্টার আমাদের সাকিব খান কারো মধ্যেই ছিলোনা ফিটনেস ধরে রাখার প্রবনতা। তাই ঢালিউড সিনেমার নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ভুঁড়িওয়ালা, হেলে দুলে চলা নায়কের প্রতিচ্ছবি।

২০১০ সাল! খিজির হায়াত খান পরিচালিত “জাগো” সিনেমায় অভিষেক হয়েছিলো এক যুবকের। উচ্চতা, লুক আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ মিলিয়ে নায়কোচিত সেই যুবকটির নাম আরিফিন শুভ। শুরুর দিকে অভিনয়ে খুব একটা পরিপক্বতা না থাকলেও গল্প আর চরিত্রের প্রতি ডেডিকেশন দেখা গিয়েছিলো তার পরবর্তী সিনেমাগুলোতে।

২০১৫ সালে অভিনয় করেন শিহাব শাহীন পরিচালিত “ছুয়ে দিলে মন” নামের সিনেমাটিতে। এতোদিনের অভিনয় দক্ষতাকে বেশ ভালভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন এই সিনেমাটিতে। ধীরে ধীরে অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করলেও ঠিক যেন ব্যাটে বলে কি একটা মিলছিলো না। অনেকের মাঝেই অভিনয় দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেলো। নানান গুঞ্জন আর নিন্দুকের কথাকে পেছনে ঠেলে ফিরলেন আরিফিন শুভ। হ্যা বলছি “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমার কথা। দীপঙ্কর দীপনের প্রথম সিনেমা ঢাকা অ্যাটাকে পুলিশের স্পেশাল টিমের সদস্যা “আবিদ রহমানের” চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে মন জয় করে নিলেন অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমীর।

বাংলা সিনেমায় যে কয়জন অভিনেতা খুব ভালো অভিনয় দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন আরিফিন শুভ যেন তাদের রেখে যাওয়া হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্যই নিজেকে নিয়ে প্রতিনিয়ত নানান ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করে চলেছেন। আরিফিন শুভ এমন একজন অভিনেতা যিনি চরিত্রের প্রয়োজনে প্রায় অসম্ভব কাজগুলোকেও নিজের ডেডিকেশনের মাধ্যমে আলোর মুখ দেখিয়েছেন। অভিনয় দক্ষতাকে আরো বাড়িয়ে নিতে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফিল্ম স্কুল থেকে কর্মশালা সম্পন্ন করেছেন।

তবে এতোকিছু ছাপিয়ে আরিফিন শুভকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে একটি সিনেমা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী নিয়ে বাংলাদেশ ভারত যৌথ প্রযোজনায় পরিচালক শ্যাম বেনেগাল নির্মাণ করছেন একটি চলচ্চিত্র। এটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে চরিত্রে অভিনয় করছেন আরিফিন শুভ। যদিও অনেকের মাঝে এখনো গুঞ্জন রয়েছে বাঙ্গালীর আবেগ জড়িত যে নামটির সাথে সেই মানুষটির চরিত্রের ভার ঠিকঠাক বইতে পারবেন কিনা শুভ। তবে শুভর ডেডিকেশন আর চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোভাসা ইংগিত দেয় এই ইতিহাস রচনা করতে যাওয়া চলচ্চিত্রটিতেও আরিফিন শুভ তার কারিশমা দেখাবেন।

ঢাকা অ্যাটাক সিনেমার সাফল্যের ধারাবাহিকতায় শুরু হয় শুভর আরেকটি পুলিশ থ্রিলার সিনেমা ‘মিশন এক্সট্রিম’। ইতোমধ্যেই সিনেমাটির শুটিং, এডিটিং সহ অনেক কাজই সম্পন্ন হয়েছে। মুক্তির অপেক্ষায় থাকা আরিফিন শুভর এই সিনেমাটি নিয়েই শুরু হয় আরেকটি গুঞ্জন। আরিফিন শুভর সর্বশেষ সিনেমা ছিলো আহারে, যেটিতে ওজন বাড়ানোর দরকার হয়েছিলো চরিত্রের প্রয়োজনে। কিন্তু সমস্যার শুরু সেখানেই, ফয়সাল আহমেদ পরিচালিত মিশন এক্সট্রিম সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য যখন শুভকে নির্বাচন করা হয় তখন আরেফিন শুভর ওজন ৯৪ কেজি।

সেইসাথে পেটে জমেছে বিশাল এক মেদ এর স্তুপ। অন্যদিকে মিশন এক্সট্রিমের শুটিং শুরু হতে বাকী মাত্র নয় মাস। এই অল্প সময়ের মধ্যেই আরিফিন শুভকে করতে হবে একটি অসাধ্যসাধন যা বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসে আগে কেউ করেননি আগে। মিশন এক্সট্রিমের “নাবিদ আল শাহরিয়ার” চরিত্রটির জন্য কাজ শুরু করলেন শুভ। শুরু হলো ঢাকাই সিনেমার ইতিহাস বদলে দেওয়ার গল্প। নিয়মিত জিম, ডায়েট দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ শুনতে যতোটা সহজ মনে হচ্ছে আরিফিন শুভর এই নয় মাসের ট্রান্সফরমেশন জার্নিটা অতোটা সহজ ছিলো না।

বলতে গেলে খাওয়া, ঘুম আর দিনের অধিকাংশ সময়ের সঙ্গী ছিলো জিমনেশিয়াম আর শুভর ইন্সট্রাকটর। মাঝে ঘটলো বিপত্তি, অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার কারনে পায়ের গোড়ালিতে রিপিটেটিভ টিস্যু ড্যামেড হয়ে থেমে গেলো শুভর জিমনেশিয়াম মিশন। কিন্তু হেরে যাবার পাত্র নন শুভ, ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবথেকে বেশি ডেডিকেটেড মানুষটি আবারো ফিরলেন জিমে যার পেছনে ছিলো আরেফিন শুভর ইচ্ছাশক্তি আর মনের জোর। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ঢাকাই সিনেমাপ্রেমীরা সাক্ষী হলো একটি ইতিহাসের। আরিফিন শুভ তার মিশন এক্সট্রিম সিনেমার জন্য যে বডি ট্রান্সফরমেশন যুদ্ধ চালিয়েছেন তার জন্য তিনি অনেকের কাছেই আইডল হয়ে থাকবেন। সেই সাথে দিন দিন অভিনয় দক্ষতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যুদ্ধে লড়ছেন আমাদের আরিফিন শুভ।

সময়ের চাকায় ভর দিয়ে সিয়াম আহাম্মেদ, এবিএম সুমন, তাসকিন রহমান, শরিফুল রাজ, রোশান ও ইয়াশ রোহানরা যুক্ত হয়েছেন আমাদের চলচ্চিত্রে। একজন আরিফিন শুভ হয়তো রাতারাতি বাংলা সিনেমাকে বদলে দিতে পারবেন না। কিন্তু চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে পরিবর্তনের যে ইতিহাস তিনি রচনা করেছেন সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে হয়তো সামনের দিনগুলোতে ঢাকাই চলচ্চিত্র পাবে আরো অনেক ফিটনেস সচেতন নায়ককে। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই ফিটনেস আইডল হিসাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে আরিফিন শুভর নাম।

বাংলা ইনসাইডারের পাঠকদের জন্য আরেফিন শুভর বডি ট্রান্সফরমেশন ভিডিওটির লিংক দেওয়া
হলো –