ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

যেখানে ‘ড্রাইভার’ পদ যেন আলাদীনের চেরাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার, ০৪:০০ পিএম
যেখানে ‘ড্রাইভার’ পদ যেন আলাদীনের চেরাগ

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার আবদুল মালেককে নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। একজন অষ্টম শ্রেণি পাশ ড্রাইভার বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছে। ঢাকা শহরে তার বাড়ি পাওয়া গেছে এখনো পর্যন্ত ৭টা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, আসলে তার কত সম্পদ রয়েছে- সেটি আরও তদন্ত করতে হবে; তারপর জানা যাবে তার কি পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। তবে মালেক একা না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেক ড্রাইভারই অনেক ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। তারা অনেক বিত্তশালী বলে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এখন ড্রাইভার-পিয়নদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করছে। এই সকল অনুসন্ধানে পাওয়া যাচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বিভিন্ন অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে যে, সরকারি কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের চাকরি যেন আলাদীনের চেরাগ। এই সমস্ত ড্রাইভাররা তাদের কর্তাদের দুর্নীতির সুযোগে নিজেরা বেশুমার দুর্নীতি করে এবং ফুলে-ফেঁপে উঠেন। এদের ঢাকা শহরে বাড়ি রয়েছে, অঢেল সম্পত্তি রয়েছে, গ্রামের বাড়িতে জমি করেছেন। গ্রামে এদের যে সমস্ত বাড়ি-ঘর রয়েছে, সেগুলো দেখলে চমকে উঠতে হয়। এই রকম ১০ টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দা সংস্থারা, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ড্রাইভাররা অনেক বিত্তশালী এবং ড্রাইভার পদে নিয়োগ পেয়েই, তারা যেন আলাদীনের চেরাগ পান। এই রকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হলঃ

হিসাব রক্ষণ বিভাগ

হিসাব রক্ষণ বিভাগে বা এজি অফিসে যে কোন সরকারি চেক তোলা হয়। এই সমস্ত চেক গুলো তোলার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিতে হয়। এই ঘুষের পরিমাণ চেকের পরিমাণের ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠা-নামা করে। আর হিসাব রক্ষণ বিভাগের একাধিক ড্রাইভার বিশাল বিত্তশালী। তাদের ঢাকায় বাড়ি আছে, বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে বলেও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আছে।

তিতাস গ্যাস

তিতাস গ্যাস সরকারের আরেকটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। যেখানে বড় কর্তাদের দুর্নীতির সুযোগ নেন ড্রাইভাররা। তারাও ফুলে-ফেঁপে উঠেন। তবে তিতাস গ্যাসে শুধু ড্রাইভার নন, অন্যান্য নিন্ম পদের কর্মচারীরাও অনেক বিত্তশালী। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের বাড়ি-ঘর ও সম্পদ রয়েছে বলে প্রাথমিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জানা গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ

বিদ্যুৎ বিভাগের ড্রাইভার, মিটার রিডাররা অনেক ধনী এবং তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের কথা- সবাই জানে। এই সমস্ত ড্রাইভাররাও বড় কর্তাদের দুর্নীতির সুযোগে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।

কাস্টমস

সরকারের আরেকটি দুর্নীতি যুক্ত খাত হল কাস্টমস। কাস্টমসে যে সমস্ত ড্রাইভাররা কাজ করেন, তারাও অনেক বিত্তশালী। এই খাতে অনেক অনেক ড্রাইভারেরই বিপুল পরিমাণ সম্পদের খবর পাওয়া যায়।

রাজউক ও গণপূর্ত

রাজউক ও গণপূর্ত সরকারের আরেকটি দুর্নীতি আক্রান্ত খাত। রাজউক এবং গণপূর্তে যারা ড্রাইভারের চাকরি করেন, তাদের অনেকেরই বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং বাড়ি ঘর থাকার তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাজউকে ভুয়া জমি, প্লট, বাড়ি ইত্যাদি লেনদেনের ক্ষেত্রে যে বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি হয়, তার ভাগ ড্রাইভারও পেয়ে থাকেন।

এলজিইডি

স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগ আরেকটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত, যেখানকার ড্রাইভার দের বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের একাধিক ড্রাইভারের ঢাকায় বড় ধরণের বাড়ি-ঘর রয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে।

সড়ক ও পরিবহণ

সড়ক ও পরিবহণ খাতের ড্রাইভাররাও অনেক বিত্তশালী। তাদেরও অনেকেরই ঢাকায় বাড়ি আছে। গ্রামের বাড়িতে তারা জমি-জমা সহ অনেক সম্পত্তি করেছে।

বিআরটিএ

বিআরটিএ’র ড্রাইভাররাও অনেক দুর্নীতিবাজ। এখানকার ড্রাইভার ও নিন্ম পদের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনেক সম্পত্তি থাকার, কথা শোনা যায়। বিশেষ করে এখানে নানা রকম অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে বড় কর্তারা যখন আর্থিকভাবে লাভবান হন, তখন ড্রাইভাররাও তার সুযোগ নেন।

ভূমি       

ভূমি খাতেও যারা ড্রাইভার রয়েছে তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে। এক সময় ভূমির কুতুবকে নিয়ে ব্যাপক পরিমাণ আলোচনা হত। তবে এখন শুধু এক কুতুব নয়, ভূমির অনেক ড্রাইভার ও নিন্ম পদের কর্মচারীরারই যেন আলাদীনের চেরাগ পেয়েছে।

বন বিভাগ

আরেকটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হল বন বিভাগ, যেখানকার ড্রাইভার এবং নিন্ম পদের কর্মজীবীরা অনেক বিত্তবান।

অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো যত দুর্নীতিগ্রস্ত, সেই প্রতিষ্ঠানের ড্রাইভার গুলোও তত বিত্তশালী। অর্থাৎ বড় কর্তারা যখন দুর্নীতি করেন তখন ড্রাইভাররাও দুর্বিনীত হয়ে উঠেন। তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা অসম্ভব হয়ে পরে। কাজেই উপরের দুর্নীতি বন্ধ না করলে, ড্রাইভারদের অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়া বন্ধ করা যাবে না- বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।