ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ক্ষমতা হস্তান্তর কোন পথে?

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ রবিবার, ০১:৩৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ক্ষমতা হস্তান্তর কোন পথে?

 

ভোটের পর পরাজিত পক্ষ ফলাফল মেনে নিচ্ছে না এমন ঘটনা তৃতীয় বিশ্বের দেশে অহরহ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে এমনটা হবে সেটা কল্পনার বাইরে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার পর সেখানে এমন অনেক কিছুই ঘটে গেছে যা দেশটির ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।

নির্বাচনের প্রায় পাঁচ ছয় সপ্তাহ আগে; হেরে গেলে খুব সহজেই ক্ষমতা ছাড়বেন না বলে আভাস দিয়ে আলোচনায় আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলে তিনি এই আভাস দেন।  

নির্বাচনে যদি তিনি পরাজিত হন তাহলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে - এমন নিশ্চয়তা তিনি দিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন "দেখা যাক কী হয়", তার পর তিনি ডাকযোগে দেয়া ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তার সন্দেহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

ক্ষমতায় আবার আসীন হচ্ছেন এমন আভাস দিয়ে ট্রাম্প বলেন‘, আপনারা দেখবেন যে হস্তান্তর নয়, `অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ` ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।"

কিন্তু ট্রাম্প যদি নির্বাচনের ফল মানতে অস্বীকার করেন, তা হবে সাম্প্রতিককালের এক অভূতপূর্ব ঘটনা এবং সেক্ষেত্রে কি ঘটবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ট্রাম্প যদি হেরে যান তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কি হবে? ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বলেছেন, সে ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে দিতে সামরিক বাহিনী ডাকা হতে পারে।

রিপাবলিকান সিনেটর মিট রমনি’র মত হচ্ছে ‘‘শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর গণতন্ত্রের মৌলিক ব্যাপার, এটা না থাকার মানে হচ্ছে বেলারুস হয়ে যাওয়া।’’ অপর এক সিনিয়র রিপাবলিকান সিনেটর লিজ চেনি বলেন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্ত সংবিধানের অংশ এবং প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার জন্য আবশ্যিক।

ট্রাম্পের একজন মিত্র সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও বলেন - যদি সুপ্রিম কোর্ট জো বাইডেনের পক্ষে রায় দেয় - তাহলেও রিপাবলিকানরা নিবাচনের ফল মেনে নেবে।

আইন বিশেষজ্ঞ এবং ম্যাসাচুসেটসএর এ্যামহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক লরেন্স ডগলাস অবশ্য বলেছেন নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে গেলে বিশেষ করে ব্যবধান সামান্য হলে তিনি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করবেন।

লরেন্স ডগলাস "উইল হি গো? ট্রাম্প এ্যান্ড দ্য লুমিং ইলেকশন মেল্টডাউন ইন ২০২০" নামে একটি বই লিখেছেন যা আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটিতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান পরীক্ষা করে সবিস্তারে তুলে ধরেছেন- ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকার করলে কী কী হতে পারে।

লরেন্স ডগলাস বলেছেন ‘যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পদ্ধতি এধরণের সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত নয়। তার কথা - `মার্কিন সংবিধান শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করে না বরং ধরেই নেয় যে এমনটাই হবে।`

২০০০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোর পপুলার ভোট বেশি পেলেও সাংবিধানিক সংকট এড়াতে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এ ছাড়া ১৮০০ ও ১৮৭৬ সালেও নির্বাচনের ফলাফল অস্পষ্ট হলে সংবিধান ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে আপোষরফা হয়েছিল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটেছিল তখন।

১৮৭৬ সালের নির্বাচনে তিনটি অঙ্গরাজ্যে এমন হয়েছিল। দুই প্রার্থী ডেমোক্র্যাট হেইস ও রিপাবলিকান টিলডেন দুইজনই ২৭০ এর কম ইলেকটোরাল ভোট পেয়েছিলেন। এখনকার মত তখনও সিনেট ছিল রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণে, আর কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ছিল ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন তা নিয়ে দুই পক্ষে কয়েক মাস ধরে তীব্র বিবাদ চলেছিল। তখন আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইউলিসিস এস গ্রান্ট । সংকট এড়ানোর জন্য তিনি সামরিক শাসন জারি করার কথাও ভেবেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত এক আপোষ ফর্মুলায় পরাজয় স্বীকার করে নেন হেইস, প্রেসিডেন্ট হন টিলডেন। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে একটা আইন করা হয়েছিল যে একটি অঙ্গরাজ্য কখনো একটির বেশি নির্বাচনী রিপোর্ট দিতে পারবে না। কিন্তু এখন আইন বিশেষজ্ঞরা উপলব্ধি করছেন যে ১৮৮৭ সালের ওই আইনের অনেক ফাঁক-ফোকর রয়ে গেছে।

এ অবস্থায় সম্ভব্য কি ঘটতে পারে তার একটা আগাম চিত্র অনুমান করেছেন লরেন্স ডগলাস। এ অবস্থায় দু পক্ষই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন। কিন্তু তাতেও সমাধান হবে না কারণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের বিষয়ে কোন বিতর্ক একবার কংগ্রেসের কাছে গেলে তা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালত কোন ভুমিকা রাখতে পারে না - এবং ১৮৮৭ সালের সেই আইনে এর সমর্থন আছে।

তখন আদালত সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে তারা এতে হস্তক্ষেপ করবে না। ডগলাস বলছেন, এ অবস্থায় দেখা গেল, কংগ্রেসে অচলাবস্থা তৈরি হলো। কোন পক্ষই পরাজয় স্বীকার করছে না। সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হলো।

ট্রাম্প তখন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে তার `বিজয়` সুরক্ষিত করার জন্য সামরিক বাহিনী ডাকতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে জিতেছেন তা স্পষ্ট না হলে, কংগ্রেসের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হবেন।

ডগলাস মনে করছেন, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি হয়ত ন্যান্সি পেলোসি শপথ গ্রহণ করাবেন, আবার অন্যদিকে আরেক বিচারপতি ক্ল্যারেন্স টমাস শপথ গ্রহণ করাবেন ট্রাম্পকে। এমনও হতে পারে যে কেউই শপথ নিলেন না এবং ট্রাম্প, বাইডেন ও পেলোসি - এরা সবাই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব এবং অধিকার দাবি করতে পারেন। ডগলাস লিখছেন এর মধ্যে ট্রাম্প হয়তো এমন সব টুইট করা শুরু করলেন যা সহিংসতা উস্কে দিতে পারে।

তিনি বলছেন, "মনে রাখতে হবে এদেশে প্রচুর বন্দুক আছে এবং এর অধিকাংশ আছে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে উগ্র সমর্থকদের হাতে।”

ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ করতে হলে ট্রাম্পকে বিপুল ভোটে পরাজিত হতে হবে। বিপুল ব্যবধানে স্পষ্ট পরাজয় হলে হয়তো তিনি তা মেনে নেবেন। তবে এর জন্য `ডিপ স্টেট` এবং অনিবন্ধিত অভিবাসীদের দায়ী করতে পারেন।

কিন্তু যদি দেখা যায় যে জয় পরাজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করছে পোস্টাল ভোট - তাহলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে।