ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আমলাদের সাতখুন মাফ!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০২০ শুক্রবার, ০৬:৫৯ পিএম
আমলাদের সাতখুন মাফ!

সাম্প্রতিক সময়ে আমলাদের শীর্ষ সংগঠন পাবলিক সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশন এক নজিরবিহীন কাজ করেছে। তারা সভা করে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিচার দাবি করেছে। একজন সংসদ সদস্য যদি কোন অন্যায় করেন আইনের লঙ্ঘন করেন তাহলে আইনের স্বাভাবিক গতিতে তার বিচার হবে । ঘটা করে আমলাদের সংগঠন তার বিচার দাবি করাটা কতটুক শিষ্টাচার সম্মত এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। যে এমপি একজন আমলাকে হুমকি ধামকি গালাগালি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে সেটি নিঃসন্ধেহে অন্যায় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। কিন্তু সেটার জবাব দিতে গিয়ে ফরিদপুরে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা জড় হয়ে প্রতিবাদ করা, ঢাকায় সভা করে সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বিচার দাবি করাটা কতটুকু রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার অনুসরণ করা হয়েছে সে প্রশ্ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং প্রশাসনিক অঙ্গনে নানারকম আলোচনা হচ্ছে। নিশ্চয়ই নিক্সন চৌধুরী যে কাজটি করেছেন সে কাজটি সঠিক হয়নি। সত্যি সত্যি তিনি যদি এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে থাকেন তাহলে সেটি অন্যায় । এ ব্যাপারে যেহেতু এখন মামলা হয়েছে, এটি একটি বিচারাধীন বিষয়। এ নিয়ে তিনি মিথ্যা বলেছেন বা কতটুক সত্য বলেছেন সে নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বাংলাদেশের আমলারা অনেক অপরাধ করেন। কিন্তু তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। আমলাদের কোন অপরাধের বিচার হয় না, তাদেরকে দুর্নীতি দমন কমিশনের দরজায় কড়া নাড়তে হয় না। এমনকি তাদের অপরাধগুলোকে আস্তে আস্তে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয়। আমরা শুধু এই সরকারের আমলে নয়, স্বাধীনতার পর থেকে দেখেছি আমলারাযেন সবকিছু থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং তাদেরযেন সাতখুন মাফ।

আমরা যদি একটু পিছনে ফিরে তাকাই আমরা দেখব যে, বঙ্গবন্ধুর আমলে যারা আমলা ছিলেন, যারা ছোড়ি ঘুরিয়েছিলেন, এমনকি যারা প্রধান আমলা ছিলেন তাদেরই একজন ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর খুনি মোস্তাককে শপথ পাঠ করিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের বদৌলতে আমলারাই ক্ষমতাবান হয়েছিলেন। আবার এরশাদের আমলে এই আমলারাই সরকারের মুলশক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। এমকে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর উদাহরণটা বাংলাদেশ আমলাতন্ত্রের ডিগবাজির একটি ভালো উদাহরণ হিসেবে সব সময় উল্লেখ করার মতো। এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলী দুজনেই ছিলেন এরশাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সচিবদের অন্যতম। কেরামত আলী ছিলেন এরশাদের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, তিনি অন্যান্য মন্ত্রীদের কেও নিয়ন্ত্রণ করতেন। এরশাদের পতনের পর এই দুই আমলাই ছুটে গিয়েছিলেন ৩২ নম্বরে। কিন্তু শেখ হাসিনা এরশাদের বিশ্বস্ত আমলাদের তার দলে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর তারা ছুটে যান বিএনপিতে এবং চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিএনপির মনোনয়ন পান।

নাটকীয় ভাবে বিএনপি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় এবং ওই বিজয়ের পর দেখা যায় এই দুইজনই আমলা থেকে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও আমরা দেখেছি যে ডাকসাইডে আমলারা রাজনীতি কে নিয়ন্ত্রন করেছেন। কিন্তু সে সমস্ত আমলারা বিচারের ঊর্ধ্বে থেকে গেছেন। ডঃ কামাল সিদ্দিকী বেগম জিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী আমলাদের একজন ছিলেন। কিন্তু কামাল সিদ্দিকী এখন বহাল তবিয়তে বিদেশে শিক্ষকতা করছেন। আর বেগম জিয়ার ঘনিষ্ঠ আমলা ছাবিহ উদ্দিনের কোন বিচার হয়েছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের আমলে উপরমহল থেকে শুরু করে নিচের আমলাদের অনেক অপকর্ম দুর্নীতি এবং অনিয়মের কোন বিচার হয়নি। সর্বশেষ উদাহরণ দেয়া যায় রিজেন্ট হাসপাতাল এর যে কেলেঙ্কারি ঘটে গেল। প্রতারক শাহেদের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যখন চুক্তি করলো করোনার চিকিৎসার জন্য, যখন শাহেদকে ধরা হলো তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে জানতে চাওয়া হলো তারা কি ভাবে চুক্তি করেছে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বললেন, তৎকালীন সচিব আসাদুল ইসলাম এর মৌখিক টেলিফোনের নির্দেশে তিনি এ চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। প্রতারক শাহেদের বিচার হচ্ছে কিন্তু যেই সচিবের নির্দেশে এটি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে সে সচিব এর ব্যাপারে তদন্ত কতটুকু এগিয়েছে? সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য খাতে করোনা কালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিভাগে যে দুর্নীতি অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর দায়ভার তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব আসাদুল ইসলামেরও, কিন্তু তার কিছুই হয়নি। বরং তিনি পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সচিব হয়েছেন।

বাংলাদেশে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুর্দান্ত প্রতাপশালী আমলারা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জালিয়াতি করেছিলেন। এই জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন জনপ্রশাসনকে এদের চাকুরীচুত্য করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। সেই সুপারিশে কয়েকজন আমলা পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু জালিয়াতির অভিযোগে তাদের বিচার হয়েছে কি? আমরা দেখি যে জামালপুরের জেলা প্রশাসক যেভাবে ন্যক্কারজনক কান্ড করেছেন তার বিরুদ্ধে কি কোনো নারী নির্যাতন মামলা হয়েছে? কিংবা কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক যেভাবে রাতের অন্ধকারে সাংবাদিককে পিটিয়েছেন সেটি কি ফৌজধারী কার্যবিধিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? আমলাদের কাজে যেমন হস্তক্ষেপ করা উচিত না, জনপ্রতিনিধিরা যেমন আমলাদেরকে যখন তখন গালমন্দ করতে পারেন না ঠিক তেমনি ভাবে আমলাদেরও বিচারের আওতায় আনা দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে একটি আইন হয়েছে যে, কোনো আমলাকে সরকারের অনুমতি ছাড়া গ্রেপ্তার করা যাবে না। এর ফলে আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে । যার কারণে আমলাদের যে কেউ কেউ এক ধরনের নতুন দৌরাত্ম্য এবং অনিয়ম করার আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল মনে করেন। আর এ প্রেক্ষিতে আমলাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। আমলারা যদি জবাবদিহিতার বাইরে থাকে তাহলে সুশাসন সুদূরপরাহত হতে বাধ্য।