ঢাকা, শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের তিন চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০১৭ শুক্রবার, ০৮:০০ পিএম
জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের তিন চেষ্টা

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’- আমাদের জাতীয় সংগীত, আমাদের অহংকার। জাতীয় সংগীতের মুর্ছনায় আমাদের হৃদয়ের আবেগ যেন উথলে ওঠে। আমরা দেশের প্রতি এক অনাবিল ভালবাসায় সিক্ত হই। ইউনেস্কোর মতে, পৃথিবীর মধুরতম সংগীত গুলোর মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত একটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নির্বাচন করেছিলেন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনন্য সৃষ্টি আমাদের হৃদয়ে ছোয়া প্রাণের সংগীত। কিন্তু সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, অন্তত তিনবার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনবার নানা কারণে শেষ মুহূর্তে এই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

জাতীয় সংগীত প্রথম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় খুনি মোশতাক সরকার। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যার পর জিয়া-ফারুক-ডালিম চক্র রাষ্ট্রপতির আসনে বসায় খন্দকার মোশতাক আহমেদকে। ক্ষমতায় বসেই মোশতাক ‘বাংলাদেশ বেতার’ নাম পরিবর্তন করে রেডিও বাংলাদেশ করেন। ‘জয় বাংলা’ বাদ দিয়ে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথিতে দেখা যায়, ১৯৭৫ এর ২৫ আগস্ট ‘রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায় অনুযায়ী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের লক্ষে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করা হয়।  কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. দ্বীন মুহাম্মদকে।  কমিটিকে ‘এক মাসের  মধ্যে পরিবর্তিত জাতীয় সংগীত’ প্রস্তাব করতে বলা হয়।  দ্বীন মুহাম্মদ কমিটি তিনটি বৈঠক করে। তারা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ চল চল চল’ এবং ফররুখ আহমেদের ‘পাঞ্জেরী’ থেকে  যেকোনো একটি জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে প্রতিবেদন জমা দেয় ১ নভেম্বর।  কিন্তু ক্যু পাল্টা ক্যুতে ওই প্রস্তাবের মৃত্যু ঘটে। ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের ৩০ এপ্রিল, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দ্বিতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এক গোপন চিঠিতে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গান ভারতীয় জাতীয় সংগীত। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকও নন। হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন কবির লেখা গান জাতীয় সংগীত হওয়ায় মুসলিম উম্মাহ উদ্বিগ্ন। এই গান আমাদের সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থী বিধায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন আবশ্যক।’ প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠিতে ‘আমার সোনার বাংলা’র পরিবর্তে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’কে জাতীয় সঙ্গীত করার প্রস্তাব করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠি পেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রেডিও, টেলিভিশন এবং সব সরকারি অনুষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশ গানটি প্রচারের নির্দেশনা জারি করে। এ সময় রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি প্রথম বাংলাদেশ গাওয়া শুরু হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়ার মৃত্যুর পর এই উদ্যোগ সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের তৃতীয় দফা উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়। ২০০২ সালে শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি যৌথ ডিও প্রধামন্ত্রীর বরাবরে জমা দেন। উল্লেখ্য, এরা দুজনই যুদ্ধাপরাধী এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। ২০০২ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে দুজন যৌথভাবে বলেন,’সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের ইসলামি মূল্যবোধ ও চেতনার আলোকে জাতীয় সংগীত সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন।‘ প্রধানমন্ত্রীর এই অনুরোধ পত্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রি খুরশীদ জাহান হক,বিষয়টি ‘অতি গুরত্বপূর্ণ’ বলে সচিবের কাছে প্রেরণ করেন।সচিব জাতীয় সংগীত পরিবর্তন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এখতিহার বহির্ভূত বিষয় বলে, তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করে ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট। এরপর এ সম্পর্কে আর কোনো তৎপরতা নথিতে পাওয়া যায় নি। বেঁচে যায় আমাদের প্রাণের সংগীত। আমাদের চেতনার উৎস।

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ

Save