ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০২১, ৭ মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভাসানচরে নতুন করে বাঁচার আশা


প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ শনিবার, ১০:১৬ এএম
ভাসানচরে নতুন করে বাঁচার আশা

শুধু প্রাণটুকু হাতে নিয়ে বেঁচে থাকবে বলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের ভয়ে অন্ধকার রাতে বাংলাদেশে প্রবেশ। চাইলে বাংলাদেশ সরকার সে সময় আটকাতে পারতো রোহিঙ্গাদের। কঠোর হতে পারতো সীমান্ত এলাকায়। কিন্তু না উদারতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। নিজেরই ১৬ কোটির বেশি মানুষ। তারপরও ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে ১১ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করছে বাংলাদেশ। তাদের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাসহ সবধরণের চাহিদা মেটানো শুধু কঠিনই নয় দুঃসাধ্যও বটে। বারবার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলে আবেদন করেও হোঁচট খাচ্ছে বাংলাদেশ। পাশে নেই বন্ধু রাষ্ট্র ভারত ও চীন। তারপরও রোহিঙ্গাদের বোঝা না ভেবে তাদের থাকার ব্যবস্থা করছে বাংলাদেশ।

নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে ২ বছর আগে তাদের একটি অংশকে হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ শেষে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা স্থানান্তর প্রক্রিয়া। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার একর আয়তনের চরটিতে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে সেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

শুক্রবার স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরুর পর প্রথম ধাপে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প থেকে বাসে ও জাহাজে করে দুই দিনের দীর্ঘ যাত্রা শেষে ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গার একটি দলটি ভাসানচরে পৌঁছায়।

রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের শেষ নেই, তারা সংশয়ের কথাও জানাচ্ছে। তবে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় নতুন ঠিকানায় যেতে আগ্রহী। মিয়ানমারের মতো পোড়া লাশের গন্ধ নেই, সম্পদ হারানোর ভয় নেই, নিরাপত্তার অভাব নেই, তাই স্বস্তি তাদের চোখেমুখে।

কক্সবাজারের আশ্রয় ক্যাম্পে বাঁশ আর ছাউনির তৈরি ঘর, ঘিঞ্জি পরিবেশের চেয়ে ভাসানচরের নতুন ঠিকানা নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে তাদের। ক্যাম্পে থাকা ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে এক লাখ মানুষকে অধিকতর নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনতে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার।

ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য রোহিঙ্গাদের দলটিকে বুধবার রাতে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। উখিয়া ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো করা হয় কয়েক ডজন বাস। বৃহস্পতিবার সেসব বাসে করে মোট পাঁচটি কনভয়ে উখিয়া থেকে তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। বাসগুলোর সামনে ও পেছনে ছিল আইন-শৃংখলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর রাতে তাদের রাখা হয় বিএএফ জহুর ঘাঁটির বিএএফ শাহীন স্কুল ও কলেজের ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেখান থেকে শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে তাদের বোট ক্লাব, আরআরবি জেটি ও কোস্ট গার্ডের জেটি থেকে নৌবাহিনী ছয়টি এবং সেনাবাহিনীর একটি জাহাজে তোলা হয় ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

এরআগে নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরকে মানুষের বসবাসের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করে বাংলাদেশ সরকার। এরপর বিদেশি পর্যবেক্ষকরা পরিদর্শনও করেন। এরআগে মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে আগেই ভাসানচরে নিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলকে দেখার জন্য ভাসান চরে পাঠানো হয়। তারা ফেরার পর তাদের কথা শুনে রোহিঙ্গাদের একাংশ ভাসান চরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে বলে জানা যায়। শুক্রবার তাদের প্রথম দলটি সেখানে পৌঁছালো। 

রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি দ্বীপে পৌঁছানোর পর প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা এ প্রকল্প ঘুরে দেখে যেতে পারেন।  তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে এবং কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত হওয়া, সেটাই সমস্যার একমাত্র স্থায়ী সমাধান। বলেন, একইসঙ্গে আমরা বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক চেষ্টাকে খাটো করা এবং ভুল ব্যাখ্যা না করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

ভাসানচর আশ্রয়ন প্রকল্পে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার থাকার জায়গা। প্রতিটি গুচ্ছগ্রামে রয়েছে ১২টি হাউজ। পাকা দেয়ালের ওপর টিনের শেডের প্রতিটি হাউজে রয়েছে ১৬টি করে কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে চারজনের একটি পরিবারের থাকার ব্যবস্থা। আপাতত ২২টি এনজিওর মাধ্যমে এই রোহিঙ্গাদের খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর কথা জানিয়েছে সরকারি কর্মকর্তারা।